একি !! এ কি করলে তুমি ?
রান্নাঘরের মেঝেয় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া কাপের টুকরোগুলো ছড়িয়ে
আছে , প্রমিতার বড় শখের ছিল ওগুলো ।
আজ রমলা মাসী আসে নি , তাই বেলা বারোটায় নিজেই কাপড়গুলো কেচে ছাদে মেলতে গিয়েছিল প্রমিতা , তখনি প্রচণ্ড ঝনঝন শব্দ কানে যেতেই দৌড়ে এসে দেখে এই অবস্থা ।
বল ? কি করছিলে তুমি এখানে ?
ভীত , সন্ত্রস্ত সুরমা অসহায় ভাবে তাকিয়ে ছিলেন পুত্রবধূর দিকে ।
কি হল ? কথা বলছ না কেন ? কি করে ভাঙ্গল ওগুলো ? ঝাঁঝিয়ে উঠলো প্রমিতা। ক্ষীণ সুরে মিনমিন করে সুরমা বললেন , " ওই তাক থেকে বড় থালাটা নামাতে গিয়ে কি করে যে কাপগুলো পড়ে গেল ! "
" বলি থালাটা কি কারণে নামাতে এসেছিলে ? " অপরাধী গলায় সুরমা বললেন , " ভেবেছিলাম মোচাটা একটু বেছে দেবো , সুকু শখ করে এনেছে , কিন্তু তিন দিন ধরে পড়েই রয়েছে দেখে ভাবলাম , তোমার সময় নেই , আমি একটু বেছে দিলে তুমি করে নেবে , মোচার ঘণ্ট , সুকু বড্ড ভালোবাসে ।"
চিৎকার করে উঠলো প্রমিতা , " কিইইই ??? আমি তোমার ছেলেকে ভালো করে খাওয়াই না , এটাই বলতে চাইছ তুমি ? আমার জন্যেই দুবেলা পেট পুরে খেতে পাচ্ছ ভালো ভালো খাবার , বুঝলে ? আর মোচা তোমার ছেলে শখ করে এনেছে না কি তুমি বলেছ বলে এনেছে ? এই বয়সেও নোলা যায়না তোমার ? "
অপরাধী মুখে চুপ করে থাকেন সুরমা । সত্যিই তিনিই সুকু কে বলেছিলেন মোচা আনতে , খুব খেতে ইচ্ছে করছিল যে মোচার ঘণ্ট । মা ছেলে দুজনেরই বড় প্রিয় এটা ।
" কোন আক্কেলে মোচা বাছতে এসেছিলে ? বলি চোখে তো ভালো দেখতে পাও না , তার ওপর হাত কাঁপে , সারাবছর তোমার অসুস্থতার কারণে কত টাকা খরচ হয় সে খবর রাখো ? "
"এই মোচাটাই যত নষ্টের গোড়া , খূব লোভ হয়েছিল , তাই না ? দাঁড়াও দেখাচ্ছি , " বলেই ঝুড়ি থেকে মোচাটা তুলে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল প্রমিতা ।
দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে নেমে এল সুরমার , কেন যে মোচাটা বাছতে এসেছিলেন !
দূর থেকে ঘটনাটার সাক্ষী হয়ে রইল সুকু ওরফে সুকুমার , বছর পঁয়তাল্লিশের সুকুমার জানে এখন সে কিছু বলতে গেলে প্রমিতা রাগে মাকে আরও অপমান করবে , আর ভাল্লাগে না এসব ।
আজ শনিবার , অফিস ছুটি ছিল , কাল তো রবিবার । রোববারে সক্কাল বেলা বাজার করে আনল সুকুমার , প্রমিতা আর ছেলে মেয়েকে বলল , আজ সে রান্না করবে । আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠলো ওরা , মাঝে সাঝে এমন করে সুকুমার , খুব ভালো রান্না করতে পারে ও , নিজের রান্না সবাইকে খাওয়াতে ভালোবাসে ।
"কি মেনু বাবা ? " জিজ্ঞেস করলো বুলটি , "এই তো , মুগ ডাল , বেগুনি , চিকেন কষা , আমের চাটনি আর মোচার ঘণ্ট " বলল সুকুমার ।
এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল প্রমিতা , এবার মুখ খুলল , " ওহ !! তাই তো বলি , মাকে মোচার ঘণ্ট খাওয়াতেই হবে তাহলে তোমায় ? বুড়ি সব লাগিয়েছে তোমায় , তাই না ? "
"আহ , প্রমিতা , আস্তে , মা শুনতে পাবেন , মা কিছু বলেন নি আমায় , আমি দেখেছি , কেন এমন করো তুমি মায়ের সাথে ? কবে বুঝবে তিনি আমার মা !! আমার খারাপ লাগে "
"ইহহ !! মা সোহাগী ছেলে এসেছেন ! সারাজীবন মায়ের আঁচল ধরা হয়েই থাকো "
" বল্টু যদি কোনোদিন তোমার থেকে দূরে সরে যায় , কেমন লাগবে তোমার ? "
বলে সুকুমার ।
"হুহ , বল্টুকে কত ভালোবেসে বড় করছি আমি , সে আমার থেকে দূরে যাবে ? কখনো না " বলল অহংকারী প্রমিতা ।
অবাক হয়ে বলল সুকুমার , " আমার মাও তো আমাকে অনেক ভালোবেসে বড় করেছেন , নিজে মা হয়ে অন্য মায়ের দুঃখ বোঝো না ? কেমন মানুষ তুমি ? "
........... রান্না শেষ , খাবার থালায় সাজিয়ে ডাইনিং টেবিলে রেখে , মাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে এল সুকুমার । থালায় মোচার ঘণ্ট দেখে সব বুঝে ফেললেন সুরমা , সোনার টুকরো ছেলে তাঁর , সুকুমার , এমন ছেলে যেন সব মায়েরা পায়।
নিজের অজান্তেই কখন চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল সুরমার , নিজেই জানেন না , সুকুমার মাকে জড়িয়ে ধরল , ছেলের বুকে মুখ রেখে সব জমানো দুঃখ চোখের জলের সঙ্গে বের করে দিচ্ছিলেন সুরমা , আর স্তব্ধ হয়ে দেখছিল বুলটি আর বল্টু ....।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.