পাপাই


আই অ্যাম সো সরি বিদি


হাউ মাউ করে উঠলো বিদিশা| বেশ ভালো এগোচ্ছিল সবকিছু| পাপাই আর আমি এক গামলা বালি নিয়ে ঢেউ এর কবল থেকে খানিক সরে এসে রাজমহল বানাচ্ছিলাম আর বিদিশা একটু দূরেই ঢেউ এর সাথে কাবাডি খেলছিল ঠিক যেমনটা শাহরুখ খেলতো 'ডিয়ার জিন্দেগী' সিনেমায়| ফুরফুরে নোনতা হাওয়া, মন ভালো করা সমুদ্রের গন্ধ, ঢেউ ভাঙার শব্দ - এক্কেবারে পারফেক্ট শট চলছিল| বলা নেই কওয়া নেই চিল্লিয়ে উঠলো বিদিশা| স্বপ্ন তো পাতলা ঘুমের ফসল, তাই ঘুমটা গেলো ভেঙে|

ঘাড়টা কোনওমতে ঘুরিয়ে ফিরে তাকালাম বিদিশার দিকে|

"কি হয়েছেটা কি?"-বিরক্তি আর কাঁচা ঘুমে ঝিঁঝিঁ ধরছে মাথায়|

"ও...ওটা ক...কি ছিল?"

"কোনটা কি ছিল?" কথা জড়িয়ে আসছে আমার| তাও নিজেকে টেনেটুনে পাশ ফিরলাম|

দেখলাম বিদিশা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পায়ের কাছে সাদা দেয়ালটার দিকে| কোনও আসবাব আমি রাখতে দিইনি ওই দেওয়ালের গায়ে| ছোটবেলায় কোনও এক সিনেমায় অমন একখানা দেওয়াল দেখেছিলাম| ভেবেছিলাম কোনওদিন নিজের বাড়ি হলে ওইরকম দেওয়াল থাকবে সেখানে| একেবারে মসৃণ, সাদা ধবধবে| সুইচবোর্ড থেকে শুরু করে মশারি টাঙানোর হুক, বাঁধানো ছবি কিচ্ছুটি থাকবেনা| নিজের বাড়ি হয়নি, হয়েছে দু'কামরার ফ্ল্যাট| তবে শোয়ার ঘরে এই দেওয়াল আমি বানিয়েই ছেড়েছি| দেওয়ালখানা আমার ভীষণ প্রিয়| কেমন একটা কোমল শান্তির অনুভূতি হয় ওইদিকে তাকালে| তবে আমাকে কি যে বেঁধে রেখেছে তা বুঝিনা অবশ্য|

আপাতত মাথার দিকের জানলার পর্দার ফাঁক ঘেঁষে একফালি টাটকা রোদ এসে পড়েছে শূন্য দেওয়ালটার ওপর| আর সেদিকে তাকিয়েই অল্প অল্প হাঁপাচ্ছে বিদিশা| উঠে বসেছে বিছানার ওপর|

আমি একবার দেওয়ালটার দিকে চাইলাম একবার বিদিশার দিকে| কলেজে পড়তে সামনে দাঁড়িয়ে সিনিয়রদের টেবিল-টেনিস খেলা দেখার কথা মনে পড়ে গেলো|

"কি গো?"-দশ বছর পরও বিদিশাকে বোঝার চেষ্টা করি আমি|

"তুমি দেখতে পেলে?"-সেই দুর্বোধ্য প্রশ্ন|

"আরে কি দেখবো?"-নাহ! আজও মাথায় ঢোকেনা আমার|

"ওই দেওয়ালটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা|"-সব মেয়েদের মতোই ভিত্তিহীন যথারীতি|

"উফ! স্বপ্ন...স্বপ্ন ! ধুর, একটাই রোববার, ভাবলাম একটু দেরী করে উঠবো|"

পাশ ফিরে আপনমনে ছোট একটা ঘুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম| বিদিশা যা পারে করুক...বোকা বোকা যত...বন্ধ ফ্ল্যাটে কে নাকি ঢুকে এসে ঘরে দাঁড়িয়ে আছে...আজ শেষ করে দেবো...হেহে...শেষই করে দেবো তোকে...আই লাভ ইউ বিদি...দাওনা একটু, অমন করছো কেন...পাগল হলে নাকি...আমার কিচ্ছু প্রব্লেম নেই...তুমি টেস্ট করাও...হ্যাঁ এটাই ঠিক ডিসিশান...প্রব্লেমটা কার সেটা জানা না গেলেই কোনও ঝামেলা থাকবেনা...কারও তো হাতে নেই ব্যাপারটা...গোওওওল...অভিনয়ে সৌমিত্র চ্যাটার্জী উত্তমকুমারকে বলে বলে গোল দেবে...পোড়া কপাল...কি আর করবে বলো...ছাড়ো...তুমি কিন্ডারগার্টেন আমি পোস্টঅফিস...আরে বাবা ওসব কেনা যাবে না আর ঘুরতে গেলে দিঘা ব্যাস...ক্ষমতা নেই...ওটা হবে না...আজ থাকে...শাট আপ...না পোষালে দূর হয়ে যাও...প্লিজ বিদি...আই অ্যাম সো সরি...যেওনা প্লিজ...আই অ্যাম সো সরি বিদি...


আমি রাঁধতে জানিনা


"...দাদাবাবু, ও দাদাবাবু ! আরে বাজার যাবে তো ? কি রান্না হবে?"

কয়েকশো কিলো ওজনের চোখের পাতা দু'টো টেনে তুললাম কোনওমতে| লক্ষ্য করলাম বিদিশা নেই পাশে| কাজের মেয়ে রুমা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে|

"উম! তুই...ঢুকলি কি করে?"

"দরজা তো খোলাই ছিল| বলছি বাজার নেই| বৌদির গা তো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে| বাজার কে যাবে?"

কাল রাতে দরজা দিতে ভুলে গিয়েছিলাম, নাকি রুমা আসবে বলে বিদিশা ভোরের দিকে খুলে দিয়েছে ? কে জানে বাবা!

"বলি রান্না কি হবে?"

রুমা বকেই যাচ্ছে ক্রমাগত|

বিড়বিড় করে বললাম, "বৌদি কই?"

"ওই তো কম্পিউটারের ঘরে শুয়ে আছে| হাতটা ঝুলছিলো খাটের বাইরে| তুলে দিতে গিয়ে দেখলুম ধুম জ্বর| তুমি ওঠো|"

"হুম ! তুই দেখনা ফ্রিজে পটল, ঝিঙে, লাউ কিছু একটা পাবি|"

"আরে বাবা ফ্রিজ ফোঁ-ফাঁ| কালকের বাসি ডাল আর পোস্ত আছে| রোববার দুপুরে ওই খাবে নাকি?"

রুমার বেড়ে পাকামো অসহ্য লাগলো| খেঁকিয়ে উঠলাম, "যা তো ! ওই খাবো| তুই বসিয়ে দে ভাত|"

"আমার কি? আমি ভাত চড়িয়ে চললাম| কখন বাজার আসবে সে অপেক্ষায় বসে থাকতে পারবোনা| তিন বাড়ি কাজ পড়ে আছে|"-রান্নাঘরের দিকে চলে গেলো রুমা|

মনে মনে বললাম, দূর হ ! দূর হ !

কম্পিউটারের ঘরে একটা সিঙ্গেল-বেড আছে| বেতের চেয়ারে বসে কম্পিউটারে সিনেমা দেখতে দেখতে ঘাড়ে ব্যথা হয়ে গেলে বিছানায় গিয়ে বসি| কোনও কোনও দিন ওতেই ঘুমিয়ে পড়ি| ওই একটাই তো শখ আমার| ডেস্কটপ কম্পিউটারটাই তো আমার বাইশ ইঞ্চির সিলভার-স্ক্রীন|

দিন দু'য়েক ধরে বিদিশার ঠান্ডা লেগে ভাইরাল ফিভারের মতো হয়েছে| শুক্রবার ছুটি নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে| মজা করে ছুটি নেয় বিদিশা| আর আমার পোস্টঅফিস জিনা হারাম করে দিচ্ছে| হেড-ক্লার্ক হওয়ার পর মাইনে তো বাড়লো চার আনা| ছুটি কমলো গন্ডা খানেক| কবে যে রিটায়ার করবো !

ওব্বাবা! আরো চব্বিশটা বছর !

"কি গো? তুমি আবার এ ঘরে আসতে গেলে কেন?" বিদিশার কপালে হাত ছুঁইয়ে দেখলাম জ্বরটা ভালোই বেড়েছে|

কোনওরকমে চোখ খুললো বিদিশা| মুখে কিছু বললোনা|

ভাবছি টেস্টগুলো করিয়ে নিয়ে আসবো কিনা| ক'মাস আগেই হেড-ক্লার্ক পদে আমার প্রমোশন হওয়ার সময় একগাদা মেডিকেল রিপোর্ট জমা করতে হয়েছিল অফিসে| মল, মূত্র, কফ থেকে শুরু করে আলট্রাসোনোগ্রাফি, এইচ.আই.ভি কিচ্ছুটি বাদ ছিলোনা| কারা এই পলিসি বানায় তাই ভাবি| আবার বড় বড় করে চিঠিতে লেখা ছিল , '...অ্যাট ইওর ওন কস্ট!'

পকেটে সুন্দর করে মাইনাস পাঁচহাজার আর রোগের খাতায় প্লাস শূন্য| হাততালি! আমাকে শালা দেখলেই বোঝা যায় শরীরে কোনও রোগ নেই| যত্তসব!

নাহ! বিদিশাকে যা টেস্ট দিয়েছে দেখছি তাতে আরও পাঁচ| সামলাতে পারবে না পোস্টঅফিসের ক্লার্ক আর ক্লাস গুনে মাইনে পাওয়া কিন্ডারগার্টেনের টিচার| পারবেনা বাপু পারবেনা| পারলে এতদিনে বাচ্চা অ্যাডপ্ট করে নিতাম আমরা| বাজার খুব খারাপ| জ্যান্ত মানুষ আস্ত গিলে খাচ্ছে ইকোনমিটা|

অত:পর, থার্মোমিটার - একশো সাড়ে এক - ক্যালপল - এক ঘন্টা পর নিরানব্বই - হাত ঝেড়ে দু'জনে চান ধান করে রোববারের বারবেলায় বাসি ডাল পোস্ত দিয়ে ভাত খেয়ে নিশ্চিন্দি|

আর উপায়টাই বা কি? রুমা পালালো, বিদিশা রান্না করার মতো জোর পাচ্ছে না শরীরে, আর আমি রাঁধতে জানিনা| হেহে!


ওটা তো সিম্পল


খেয়ে দেয়ে বিদিশা শুয়েছে বেডরুমে| কম্পিউটারের ঘরে কাপুরুষ চালিয়ে বসেছি আমি| কাপুরুষ দেখেছি তা প্রায় বার বত্রিশেক| মহাপুরুষ ভাল্লাগেনা আমার| সে আপনি যতই একসাথে নাম দিন সত্যজিৎবাবু, আপনার কাপুরুষই সেরা|

মনে পড়ে বছর পনেরো আগের কথা| সদ্য এস.আর.এফ.টি.আই. মানে সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে| আমি টগবগ করে ফুটছি তখন ফিল্ম নিয়ে| খুঁজে বেড়াচ্ছি ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল আর করে বেড়াচ্ছি আজ বার্গম্যান, কাল কুরোসাওয়া, তো পরশু তারকোভস্কি|

এফ.টি.আই জানালো ডিরেকশন, সিনেমাটোগ্রাফি আর সাউন্ড-এডিটিং এই তিনটি বিষয়ের যেকোনো একটি নিয়ে পড়াশোনা করতে গেলে স্নাতক ডিগ্রি লাগবে| আমি তো ফিজিক্স নামক এক দুর্বোধ্য বিষয়ে একটা অর্থহীন অনার্স ডিগ্রি নিয়ে বসেই ছিলাম| চলে গেলাম ডিরেকশনের পরীক্ষাটা দিতে|

পাশও করলাম| তারপর ছিল ইন্টারভিউ| তেড়ে মুখস্ত করলাম সত্যজিৎ রায়| ইন্ডিয়ান সিনেমা মানে সত্যজিৎ রায়| আবার কি? আজকাল সিনেমার নামে কি যে সব ছেলেখেলা হয় বুঝিনা!

যাই হোক পথের পাঁচালি থেকে অরণ্যের দিনরাত্রি কাটিয়ে শাখাপ্রশাখা পেরিয়ে গণশত্রু-বাদ রাখলাম না কিছু| মধ্যিখানে কাপুরুষটা গঁদের আঠার মতো আটকে গেলো মনে| কিন্তু ইন্টারভিউতে প্রশ্ন এলো সিলেবাসের বাইরে থেকে| এক মাঝবয়সী আঁতেল জিজ্ঞাসা করলেন, "দেখেছো 'দা সাউন্ড অফ মিউজিক'?"

আমার তো ঘাম দেওয়া শুরু হয়ে গেছে| ওয়ার্ল্ড সিনেমার সাথে পরিচয় আমার ভালোই ছিল, তাও এটা যে কি করে মিস হয়ে গেলো বুঝছিলামনা|

বললাম, "ওটা দেখিনি, তবে 'গন উইথ দা উইন্ড' দেখেছি|"

পাশ থেকে একজন মন্তব্য করলেন, "বোঝো! ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে যাচ্ছে|"

ইন্টারভিউতে পাশ করার আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছিলো, বুঝতে পারছিলাম আমি| গোটা পঁচিশ মিনিটের ইন্টারভিউতে আমাকে সাউন্ড অফ মিউজিক নিয়ে নাকানি চোবানি খাওয়ালো| না বার্গম্যান, না সত্যজিৎ, না স্পিলবার্গ|

একগাদা জমাট রাগ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম| অনেক পরে সাউন্ড অফ মিউজিক দেখবার সুযোগ পেয়েছিলাম| বহু পুরোনো সিনেমা| তবে হলফ করে বলতে পারি, এই সিনেমার সিডি ঠিক মতো মার্কেট করা গেলে ঘুমের ওষুধের ব্যবসা লাটে উঠতো|

আর হ্যাঁ, নেশা আর পেশা আমার এক হয়নি| ফিজিক্সে পাশ করে সিনেমায় ফেল করে পোস্টঅফিসের কেরানি হয়েছি আমি| হাততালি তো বনতা হ্যায় ! তবে দেশ বিদেশের সিনেমা গিলতে আজও ভালো লাগে|

হুট্ করে পাপাই চলে এলো ঘরে|

"কি হয়েছে রে?"- আমি জিজ্ঞাসা করলাম|

পাপাই বললো, "আমার মনে হয় নায়ক কাপুরুষের চেয়ে অনেক ভালো সিনেমা !"

"ওহ ! প্লিজ| সত্যজিৎ নিজেও জানতেন ওই গল্পে কিস্সু নেই| ইন্টেনশনালি উনি উত্তমকুমারের গ্ল্যামার আর স্টারডমটা কাজে লাগিয়েছিলেন নায়কে|"

"এটা কি বলছিস? কাপুরুষে আছেটা কি? একটা লিনিয়ার আর প্রেডিক্টেবল গল্প| অন্যদিকে নায়কের সেই অদ্ভুত থ্রিল, সেই সাইকোলজিক্যাল অ্যস্পেক্ট|"

"সাইকোলজি? বড় সাইকোলজিস্ট হয়েছিস না তুই? বল তো, কাপুরুষের শেষে মাধবী কেন অদ্দুর থেকে রাতবিরেতে ঘুমের ওষুধটা চাইতে সৌমিত্রের কাছে দৌড়ে এলো?"

"আরে ওটা তো সিম্পল, পুরোনো প্রেমিকের সাথে একবার দেখা করতে|"

"হো হো হো হো..."-ফুসফুস সংকুচিত হয়ে চোখমুখ কুঁচকে এলো হাসির দমকে| হেসে গড়িয়ে পড়লাম বিছানায়|

হাসি থামলে আস্তে আস্তে বললাম, "কাপুরুষের এক বর্ণও বুঝিসনি তুই পাপাই|"

ও বললো, "আচ্ছা ! তুই তো বুঝেছিস, তাহলে তোর কাজকর্মে তা প্রকাশ পায়না কেন?"


পাপাইও ভালোবাসে


সিনেমা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম|প্রবল কাশির শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেলো| বিদিশা কাশছে| ধীরে সুস্থে উঠে বসলাম| তবে স্থীরতা উবে গেলো বিদিশার আঁতকে ওঠার আওয়াজে| বাধ্য হলাম কম্পিউটারের ঘর থেকে ছুটে বেডরুমে যেতে|

বিছানায় বসে বিদিশা| আমাকে দেখে কোনওরকমে উচ্চারণ করলো,

"ওটা কে?" ডান হাতের তর্জনী প্রসারিত করা আমার সাধের দেওয়ালটার দিকে|

"কি ব্যাপার বলতো? কি দেখছো তুমি?"

একটা ঢোঁক গিলে বিদিশা বললো,"তোমার মতো দেখতে| হাতে বেল্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| ঝপ করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য জ্বলে উঠেই নিভে গেলো| আজ সকালেও-"

"বেল্ট? আমার মতো দেখতে? দেখো, আমি কিন্তু বেল্ট পড়িনা| তুমি ভালো করেই জানো| অস্বস্তি হয় আমার|"

বিদিশা কেমন অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক পল| পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো তারপর|

আজও আমি পড়তে পারিনা বিদিশাকে| দশ-দশটা বছর পার হয়ে গেলো, তাও|

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে|

বিদিশা কি হ্যালুসিনেট করছে? কিন্তু জ্বর তো নেই এখন| অমন হয় নাকি? দেওয়ালের সামনে আমি দাঁড়িয়ে? তাও আবার হাতে বেল্ট| ধুস ! পাগলের প্রলাপ| তবে, কাল সকালে ব্লাড টেস্টটা করিয়েই ফেলবো|

বিকেল হয়ে এসেছে| কাজকর্ম কিছু নেই| ভাবছি ইউনাইটেড ক্লাবের বইমেলাটা থেকে একটু ঘুরে আসি| বিদিশা ঘুমোচ্ছে ঘুমোক| ওর না হয় জ্বর হয়েছে বলে শুয়ে আছে, আমি আর কত বসে থাকবো ঘরে ! আর তাছাড়া ওর সপ্তাহে চারদিন স্কুল| অঢেল ফ্রি টাইম| আমার তো এই একটাই দিন| যাই ঘুরেই আসি| ফেরার সময় বরং রাতের খাবার নিয়ে ফিরবো| বিদিশাকে রান্না করতে হবেনা আর ভালোমন্দ খাওয়াও যাবে| দারুণ ! দারুণ প্ল্যান ! ফ্রাইড রাইস আর চিলি চিকেন আনবো নির্মলা থেকে| ঝাল কম দিতে বলবো| আহা ! আমার ফেভারিট| পাপাইও ভালোবাসে|


ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি


"হার্ট অ্যাটাক?"-সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম আমি|

"হ্যাঁ , প্রাইমারি রিপোর্ট তো তাই বলছে|"

"কি করে সম্ভব? ওর তো ক'দিন ধরে ভাইরাল ফিভার চলছিল| আর হার্টের কোনও সমস্যাও তো ছিলোনা !"

"দেখুন, প্রথমত, হার্টের সমস্যার সাথে হার্ট অ্যাটাক ডাইরেক্টলি রিলেটেড নয়|দ্বিতীয়ত, শেষ কবে হার্টের টেস্ট করিয়েছিলেন আপনার মিসেস? ব্লাডই বলুননা, রুটিন ব্লাড থেকেও অনেক কিছু ধরা পড়ে|"

আমি মনে করতে পারিনা শেষ কবে পাড়ার এপোলো ক্লিনিকে গিয়েছিলো বিদিশা| আর এইবার তো ব্লাড টেস্ট করানোর সুযোগটাই পেলোনা| হতাশাটা সবে দানা বাঁধতে শুরু করেছে বুকে| আমাকে আমতা আমতা করতে দেখে ডাক্তারও ঝোঁক বুঝে কোপটা মেরেই ফেললো|

"আই অ্যাম ভেরি সরি ফর ইওর লস প্রদীপ্তবাবু !"-বলে চলে গেলো| ঠিক সিনেমার মতন অদৃশ্য হলো কুয়াশায়| বেশ অবাক হলাম হাসপাতালের মধ্যে কুয়াশা দেখে| কুয়াশার রহস্যোদ্ঘাটন করতে গিয়ে খেয়াল করলাম আসলে কেঁদে ফেলেছি আমি| সবকিছু ঝাপসা চোখের জলে, কুয়াশায় নয়|

বহু যুগ পর ডুকরে কেঁদে উঠলাম|

সবাই তাকাচ্ছে আমার দিকে| ভাবছে, আহা, উহু, বেচারা, কপালটাই খারাপ, সময়টাই খারাপ, অত ন্যাকামোর কি আছে? রোজ কয়েকহাজার বউ অকালে মরছে ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি…


ডিরেক্টরকে কুর্ণিশ

বিদিশার বাবা নেই| মা এসেছিলো| কাঁড়ি কাঁড়ি দোষের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেলো আমার ঘাড়ে| চুপচাপ সব শুনলাম আমি| তারপর বিদিশার মুখাগ্নি করে বাড়ি ফিরলাম ভোর রাতে|

আমার আত্মীয় বলতে এক দুঃসম্পর্কের ভাইপো এসেছিলো| আসলে কাকা পিসি মাসি কারও সাথেই তো সম্পর্ক আমি রাখিনি কোনওদিন| ছোট থেকেই নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিয়েছিলাম| একদিন পেলাম বিদিশাকে| ওকে সঙ্গে নিয়ে বৃত্তটাকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর করে ফেললাম| বেশ ভালোই চলছিল| চলছিল বেশ ভালোই...

বাড়ি ঢুকে কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলামনা| আলো ফোটেনি এখনও| গোলোকধাম হয়ে উঠেছে দু'কামরার ফ্ল্যাটটা| চোখে ধাঁধাঁ লাগছে|

বিদি বলে ডাকলাম কয়েকবার| ও আশেপাশে থাকলে শান্তির ঘুম হতো আমার, কিন্তু এখন তো...

কম্পিউটারের ঘরে ঢুকলাম|

চোখে পড়লো তাক থেকে একটা ডিভিডির বাক্স উঁকি দিচ্ছে| পেড়ে নিলাম সেটা| দেখলাম ঘষা লেগে নামধাম উঠে গেছে| কালো কুচকুচে বাক্সখানা পরে আছে শুধু| সিনেমার নামটা কিছুতেই পড়তে পারলামনা| এটাই চালাই| কি আর করবো ! কম্পিউটার-এ ঢুকিয়ে প্লে টিপে দিলাম|

বেতের চেয়ারে গা এলিয়ে দিতেই ছবি ফুটে উঠলো| প্রিন্টটা খারাপ| সবকিছু অস্পষ্ট| মনে হচ্ছে অনেকবার দেখা বহু পুরোনো কোনও সিনেমা| তাও নামটা মনে করতে পারলামনা কিছুতেই|

ঘরের মধ্যিখানটায় ছত্রী-ওয়ালা ইয়াব্বড় একটা খাট রয়েছে| তার পাশে দরজার দিকে পিঠ করে মেঝেতে বসে বছর দশেকের একটা ছেলে কিসব করছে| আন্দাজ করলাম খেলছে|

ক্যামেরার বিশেষ হেলদোল নেই| ছেলেটার ওপরই ম্যাক্সিমাম ফোকাস| আলগা করে জুম কমিয়ে নেওয়া হলো|

বা ! ডিরেক্টরের হাতের কাজ ভারী সুন্দর|

আচমকা একটা দশাসই চেহারার লোক ঢুকে এলো ঘরে| মনে হয় ছেলেটার বাবা| অল্প অল্প টলছে|

ওমা ! ওটা কি হাতে? ও তো মোটা বেল্ট !

ছেলেটা ফিরে তাকানোর সুযোগ পায়নি| তার আগেই সপাটে বেল্ট এসে পড়লো পিঠে| ককিয়ে উঠে এককোণে সিঁটিয়ে এলো বেচারা|

ভেরি স্যাড !

"ঠাম্মাকে পিটিয়েছিস আজ আবার ?" - চোখ পাকিয়ে গলা চড়ালো ছেলেটার বাবা|

"আমাকে জোর করে মাছ খাওয়াচ্ছিল তো!"-মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে উঠলো বাচ্চা ছেলেটা|

"চোপ ! একদম চোপ ! ডোন্ট ফরগেট হু ইজ দা বস ইন দিস হাউস| মাছ এসেছে মানে মাছ খেতে হবে তোমাকে|"

চেঁচিয়ে উঠলো ছেলেটা, "মাছ ভালো লাগেনা আমা-" – কথা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা ছোবল এসে পড়লো| এই বারেরটা ঠোঁটের ওপর| ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো|

ইশ ! হোয়াট এ বাস্টার্ড ! তবে ডিরেক্টর সিনগুলো ফুটিয়ে তুলেছে খাসা|

"হতভাগা জন্মেই মাকে খেয়েছিস| এখন আমায় খাচ্ছিস| কালার টিভিটা ভাঙার পর শিক্ষা দিলাম| তাও শুধরোলি না| আজ শেষ করে দেবো| শেষই করে দেবো তোকে|

আছড়ে পড়তে লাগলো বেল্টের ঘা, একের পর এক|

হঠাৎ হাসি ফুটে উঠলো ছেলেটার মুখে| নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে হাসছে| সেই হাসি স্তব্ধ করে দিতে লড়াই অবশ্য চালিয়ে যাচ্ছে লোকটা|

ইয়েস ইয়েস ! অ্যাবসলিউট জিনিয়াস| আমিও শুনেছিলাম যন্ত্রণার সময় মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলে ব্যথার মাত্রা অনেকাংশে কমে|

ডিরেক্টরকে কুর্ণিশ !

মারধরের পর ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো ছেলেটার বাবা| ক্যামেরাটা অল্প টিল্ট হতেই চোখে পড়লো সাদা ধবধবে মসৃন দেওয়ালটা|

মনে পড়েছে ! তার মানে এই সিনেমাতেই দেওয়ালটা দেখেছিলাম|

ছেলেটা মাটিতে বসে আছে দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে| ডিরেক্টর বলতে চাইছেন, এই মসৃন ক্ষতহীন দেওয়ালটাই ছিল ছেলেটার ক্ষতের ওপর স্বস্তির একমাত্র প্রলেপ|

হাততালি অনিবার্য|বাজাও তালি!


আমার অনিচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত


সিনেমাটা ওখানেই শেষ| অদ্ভুত !

নাম ধাম চরিত্রদুটোর পরিচয় কিচ্ছু নেই| দেওয়ালের দিকে তাক করে ঝুপ করে নিভে গেলো ক্যামেরা| সিনেমার ভাষায় যাকে বলে শার্প কাট|

আমি এইবার বুঝেছি বিদি দেওয়ালের দিকে কি দেখছিলো| ও এই সিনেমাটা দেখেছে কখনও| আমিই দেখিয়েছি হয়তো| কোনও কারণে ওর সাবকনশাস থেকে অত্যাচারী বাবার ইমেজ ফরমেশন হচ্ছিলো| কিন্তু বেল্ট হাতে 'হিচকক অ্যাপিয়ারেন্স' করা লোকটা আমিই কেন হলাম বুঝছিনা!

বুকটা ভারী হয়ে এলো আর গলাটা বুজে| বিদিকে বুঝে ওঠার আগেই চলে গেলো ও| কি স্বার্থপর !

ভীষণ কষ্ট হতে লাগলো আবার|

ভোর হয়েছে অনেকক্ষন| কম্পিউটারের ঘরে আর থাকতে পারলাম না| এক ছুটে বেডরুমে এসে বিদির নরম তলপেটে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলাম| আমার তো মা ছিলনা| কোনওদিন ছুঁইনি মাকে| বিদিই আমাকে চিনিয়েছিলো গন্ধটা| বলেছিলো, ওর তলপেটের ওই মন কেমন করা গন্ধটাকেই মা-মা গন্ধ বলে|

মাথায় হাত রেখে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে বিদি| বলছে, "এমন করলে চলে বলো ? নিজেকে সামলাতে হবে তো এবার !"

"তোমাকে ছাড়া কি করে থাকবো আমি বিদি?" - প্রবল হাওয়ায় মোমবাতির শিখার মতো কাঁপছে আমার গলা| এই বুঝি নিভে যাবে|

"পারবে পাপাই, পারবে !"- বাবা মাঝে মধ্যে ডাকতো ওই নামে| বিদি এসে থেকে 'পাপাই' ছাড়া অন্য কোনও নামে ডাকেনি কোনওদিন| আমি অপলক চেয়ে রইলাম ওর দিকে|

বললো, "তুমিই তো তোমার না হওয়া ছেলে, কলেজের পর হারিয়ে যাওয়া বন্ধু, নিজের অত্যাচারী বাবা-সব তো তুমি নিজে| ওই নিয়েই তো তোমার ঘর পাপাই| এতবার আমার বলা সত্ত্বেও তো চিকিৎসা তুমি করালে না| মাথার ডাক্তার মানেই তুমি পাগল নও| যন্ত্রণাগুলো ওই দেওয়ালের দিকে তাকালে কমে না সোনা| বরং ভিতরে চেপে রাখা যন্ত্রণাগুলো সমস্যা আরও বাড়ায়। নিজেকেই নিজে বেঁধে রাখলে| আমি আর ছিলাম কতটুকু জুড়ে বলো? চেষ্টা তো আমি করেছিলাম| আমাকে কেন, কাউকেই তো কোনওদিন ঢুকতে দাওনি তুমি|"

আমি বুঝতে পারছি, বিদি আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে|

আমার দেওয়ালে পড়ে থাকা এক চিলতে মিঠেকড়া রোদ্দুর আর ভোরের পাখির ডাকের মধ্যে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে বিদিশা| আমার বিদি|

কি ভীষণ সুন্দর দেখতে লাগছে ওকে| অলংকারহীন সদ্য ঘুম-ভাঙা মুখে অল্প অল্প হাসছে|

বলছে, "ভালো থেকো তুমি! খেয়াল রেখো নিজের| আমি আসি, কেমন !"

আমি থেমে থেমে বলি, "সবার মতো তুমিও আমাকে ভুল বুঝলে? ওই দেওয়াল আর উপেক্ষিত দীর্ঘশ্বাসটা ছাড়া তো কোনওদিনই কিছু ছিলোনা আমার| একাকীত্ব আর স্বার্থপরতাটা আমার অনিচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত বিদি ! আমার অনিচ্ছাকৃত সিদ্ধান্ত|"

ঘাড় ঘুরিয়ে দেওয়ালের দিকে চাইতেই চোখে পড়লো| দেখলাম পাপাই এগিয়ে আসছে হাতে চামড়ার বেল্ট নিয়ে| বিদিকেও খেলাম বলে রাগ করেছে| আমাকে খুব মারবে এবার !



bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.