ভুলো

"মাসী! আজ ওই রাস্তার কুকুরটা আমাকে কামড়ে দিতো তাই না?"

"দূর পাগলা! কুকুর কামড়ায় না।"

"ও তো আমার দিকেই তেড়ে আসছিল।"

"কিন্তু গলিতে ঢুকে গেল, তাই না?"

"হ্যাঁ!"

"তাহলে তোকে কামড়াতে আসলো কই! ও তো গলির দিকে যাচ্ছিল।

বুড়ো ভাম ছেলে, কলেজে পড়িস আর কুকুর ভয় পাস! শোন সায়ন তোকে একটা গল্প বলি,

আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছি। দেখি বাড়ির সামনের বড় নালাটা থেকে কুঁইকুঁই শব্দ ভেসে আসছে। নালার পাড়ে ঝুঁকে তাকিয়ে দেখি একটা ছোট্ট কুকুরছানা ভিজে একসা হয়ে একটা প্লাস্টিকের উপর আদ্ধেকটা ভেসে আর আদ্ধেকটা জলে। আমি দৌঁড়ে গেলাম বাড়ির ভিতরে। মা কে বাপির কথা জিজ্ঞেস করতে মা আঙুল তুলে দোতলার দিকে দেখাল। বুঝলাম মা - বাপির ঝগড়া হয়েছে। আমি ব্যাগটা ফেলে সিঁড়ির দিকে দিলাম একছুট। বাপি টিভি দেখছিল। আমাকে অমন হাঁফাতে দেখে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "কি হয়েছে?"

আমি বললাম, "তাড়াতাড়ি চলো নালায় একটা কুকুরের বাচ্চা পড়ে গেছে।" বাপি আর আমি একমুহূর্ত না ভেবে রাস্তায় এলাম। বাপি নালায় নেমে কোনোরকমে বাচ্চাটাকে তুলে আনলেন। তারপর বাচ্চাটাকে এনে ভালো করে স্নান করালেন। আমাদের বাইরের গ্যারাজে ওর থাকার জায়গা হলো। নাম দিলাম 'ভুলো'। মা প্রথম প্রথম রেগে যেতেন। তারপর মা কে দেখে লেজ নাড়ত, মা আর কিছু বলতেন না।

আমার ন্যাওটা ছিল খুব, স্কুল থেকে এসেই ওর সাথে খেলা করতাম। মা আমাকে মারতে এলে মায়ের দিকে গরগর শব্দ করে তেড়ে যেত। বাপি আমাকে বকলে বাপিকেও রাগ দেখাতো। একদিন স্কুল থেকে ফিরছি, বাড়ির সামনে দেখি বেশ ভিড়। গিয়ে দেখি ভুলোকে একটা গাড়ি প্রায় চাপা দিয়ে ফেলেছে। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচেছে সে। পায়ে বেশ চোট পেয়েছে। আমাকে দেখেই ওর কান্না কমে গেল। মা বললেন, "গ্যারাজের গেট খোলা পেয়ে ছুটে বাইরে বেড়িয়ে গিয়েছিল। রাস্তার বড় কুকুরগুলো ওর দিকে তেড়ে যেতেই রাস্তা পারাপার করতে গিয়েছিল, একটা গাড়ির সামনে পড়ে পায়ে চোট লাগে।"

আমি ওকে কোলে তুলে বাড়ি নিয়ে এলাম, ব্যান্ডেজ করে দিলাম। সুস্থ হতে দিন সাতেক লাগলো। অবশ্য পরদিন ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন বাপি।

দেখতে দেখতে ভুলো বড় হয়ে গেল। বড় হতেই বাঘের মতো বড়সড় হয়ে উঠলো। রাস্তার সাধারণ কুকুরদের থেকে সাইজে বড়। সাদাকালো ছোপ গায়ের রঙ, বাপি একটা কালো বেল্ট এনে পড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাতে আরো সুন্দর লাগতো ওকে।

আমি সকালে স্কুল গেলে ভুলো আমার সাথে যেত। সারাদিন একা গেটের বাইরে বসে আমার অপেক্ষা করত। ফেরার সময় ও আমার সাথেই ফিরত। সন্ধ্যায় আমি টিউশনে যেতাম ও আমার সাথেই যেত, আমার সাথেই ফিরত। বাপির চিন্তাও ছিলনা আমাকে নিয়ে। অমন বডিগার্ড থাকলে চিন্তা থাকবেনা সেটাই স্বাভাবিক। তবে টিউশন থেকে ফেরার সময় বাপি আসতেন, আমরা তিনজন একসাথে বাড়ি ফিরতাম।

দেখতে দেখতে আমি কলেজে উঠলাম। কলেজে যেতাম বাসে করে। বাড়ি থেকে দশ কিলোমিটার দূরে কলেজ। তাই ভুলো বাসস্টপেজেই অপেক্ষা করতো আমার। ভুলো একদিন এমনই অপেক্ষা করছিল আমার, দু-তিনটে রাস্তার কুকুরের সাথে মারামারি হয় ওর, ওই কুকুরগুলো ভুলোর ঘাড়ে কামড়ে দেয়। ট্রিটমেন্ট করিয়েও ওকে বাঁচানো গেলনা। বয়সও হয়েছিল, নাহলে ওই কুকুরগুলো ওর সাথে পারতোনা।

সেই প্রথম আপন হারানো কাকে বলে আমি বুঝলাম। প্রিয় বন্ধু মারা গেল আমার। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম।

এর দুবছর পর আমার বিয়ে হয়ে গেল তোর মেসোর সাথে।

বাড়ির লোক দেখেশুনে বিয়ে দিল। তোর মেসোর বদলির ডিউটি। আমি ছত্তিসগড়ের সরকারি কোয়ার্টারে থাকি একা। আর তোর মেসো জঙ্গলে মাওবাদী এরিয়ায় পোস্টিং। প্রথম প্রথম খুব ভয় করতো, অভ্যাস নেই, সপ্তাহে একবার তোর মেসো বাড়ি আসত। কোনো সপ্তাহে ডিডটির চাপে ওনার আসা হতোনা। বিয়ের দুবছর পর পিঙ্কি হলো।

ওখানে মাসের কুড়িদিন রাতের দিকে লোডশেডিং থাকতো। সেদিন অন্ধকার রাতে পিঙ্কিকে বুকের দুধ খাইয়ে ঘুম পারানোর চেষ্টা করছি। টেবিলে মোমবাতি জ্বালানো ছিল। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়বার আওয়াজ। কোয়ার্টারগুলোতে চোর-ডাকাতের ভয় নেই, গার্ড আছে। আশেপাশে লোকজনও আছে, তবে একটু দূরে। আমি নির্ভয়ে দরজা খুললাম, দেখি দরজার বাইরে পাশের কোয়ার্টারের বিহারি ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। আমাকে বললেন,"আন্দার আনেকো নেহি কহিয়েগা ভাবিজী?" আমি ইতস্তত বোধ করেও ভদ্রতার খাতিরে ভিতরে আসতে বললাম। উনি ভিতরে ঢুকতেই আমার নাকে তীব্র একটা গন্ধ এসে লাগলো। বুঝলাম উনি আকণ্ঠ পান করে এসেছেন। সোফায় বসে উনি বললেন, "আপকা হাজবেন্ড ইঁহা নেহি র‍্যাহতা হ্যায়, অকেলে আপ ক্যায়সে সামাল লেঁতিহে ভাবিজী? আরে আপ উতনা দূর কিঁউ খারি হ্যয়! থোড়া পাস তো আইয়ে!" বলে উনি আমার হাতটা ধরে কাছে টানতে গেলেন, আমি দিলাম এক ঝটকা। উনি ছিটকে পড়ে গেলেন। আমি চেঁচাতে যেতে উঠে আমার মুখটা চেপে ধরলেন। এমন সময় ঘরঘর শব্দে একটা চারপেয়ে ছায়া ওনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, উনি চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেলেন। সেই ছায়াটা ভুলোর সাইজের। সেই ছায়াটার সাথে ওনার তীব্র স্বরে ধ্বস্তাধস্তি চলতে লাগলো। আমাদের চেঁচামেচি শুনে আশেপাশের কোয়ার্টারগুলো থেকে লোকজন দৌঁড়ে এসে ওনাকে তুললেন, দেখি এক হাতে কামড়ানোর স্পষ্ট দাগ সেখান থেকে গলগলিয়ে রক্ত বেড়াচ্ছে আর এক হাতের মাংস ঝুলছে। সারা ঘরে রক্ত ভেসে যাচ্ছে। কেউ আমাকে কিছু আর জিজ্ঞেস করেনি, ওনাকে হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরদিন তোর মেসো এসে আমাকে আর পিঙ্কিকে কলকাতায় শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। পরে তোর মেসোর মুখে শুনেছিলাম ওই লোকটার চাকরি চলে যায়।

এবার বল এমন বন্ধু তুই কোথায় পাবি?"

"হুম বুঝলাম। গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়েছে এবার ঘুমিয়ে পড়ো। কাল ফিরতে হবে আমাকে।"

-----------------------------

তিনবছর পর,

"হ্যাঁ রে সায়ন আমাকে ফোন করে ডাকলি যে হঠাৎ?"

"এই কুকুরছানাটা দেখো, কিনে এনেছি। জার্মান শেপার্ড।"

" আরে বাহ্! খুব সুন্দর, কি নাম দিয়েছিস এর?"

" মাসী এটা তোমার জন্য এনেছি, তুমি একে নিয়ে যাও। অতবড় বাড়িতে মেসো আর তুমি থাকো, দিদি থাকে সেই তার শ্বশুরবাড়িতে।"

"সে ঠিক আছে, কিন্তু নামটা বললি না?"

"এর নাম দিয়েছি ভুলো।"

"ভুলোওঅঅ!"

বিড়বিড় করে বলে উঠেছিল মাসী, চোখের কোনে চিকচিক করছে জল। একটা সময় অনাথ সায়নের পড়াশুনোর সমস্ত খরচ মাসীই বহন করেছেন। হয়ত এটাই ওনার সেরা উপহার...

***সমাপ্ত***

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.