খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার

‘-প্রিয়া তুমি আজ সকাল থেকে এত চুপচাপ কেন আছো বলো তো? প্রতিদিন দুপুরবেলা এই সময়টা আমরা দুজনে আড্ডা মারি, কিন্তু আজ তুমি আসো নি। আমি ডাকতে তবে এলে। রোজ তুমি নিজেই আমায় বলো’-বৌদি তোমার খাওয়া হলো, আমি কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি’। আর আজ আমিই তোমায় ডেকে ডেকে সারা। তুমি তো জানো, বৃষ্টিকে স্কুলে পাঠিয়ে, রান্না ছাড়াও ঘরের আর সব কাজ করি আমি। তারপর স্নানটা সেরে নিই। ঠাকুরপো খেয়ে কলেজ চলে গেলে বাবা মাকে খেতে দিই। তারপর আমরা দুজনে খেয়ে নিয়ে চলে আসি আমাদের এই আড্ডা-ঘরে। হ্যাঁ মানছি, আজ একটু দেরী হয়ে গেছে। আসলে বৃষ্টির মান্থলি একজ্যাম চলছে তো, ওকে পড়াচ্ছিলাম, তাই সব কাজে একটু দেরী হয়ে গেছে। বাপ রে...ক্লাস ফাইভে কী শক্ত শক্ত সাবজেক্ট গো। আমাদের সময় এসব কিছুই ছিল না বলো।

আচ্ছা আমিই শুধু বকবক করে যাবো, তুমি কিছু বলবে না? দ্যাখো, তুমি আমার ননদ বটে, তবে আমি কিন্তু তোমাকে আমার খুব প্রিয় এক বন্ধু ভাবি। তুমি তা জানো। আমাদের বয়সও তো প্রায় সমান সমান। কত আর হবে, বত্রিশ-তেত্রিশের মতো। সে যাইহোক, তোমার এত চিন্তিত থাকার কারনটা তো বললে না। তবে একটু অনুমান করতে পারছি আমি। বাবা মা কাল পাকা কথা বলে এসেছেন। শেখর বিয়ের জন্য রাজী হয়েছে। সামনের মাসে দিন ও ঠিক হয়ে গেছে। তাই তো? খুব টেনশন হচ্ছে না? দ্যাখো প্রিয়া, একদম টেনশন কোরো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভগবান আমাদের সবার জন্য কিছু না কিছু ভেবে রাখেন আগের থেকে। আমরা তা বুঝতে পারি না। আর তাছাড়া শেখর আমার নিজের ভাই বলে বলছি না, ছেলেটা ভাল। ভাল চাকরী করে। নিজে থেকে তোমাকে পছন্দ করেছে সব জেনে শুনে। তার মানে ও তোমাকে ভালবাসে। আর তুমিও তো ওকে পছন্দ করো। বাব্বা...আমি কি আর দেখি নি, ও যখন এখানে আসে, তোমরা দুজনে কি করো।

আমার খুব ভাল লাগে জানো, তোমাদেরকে দেখে। তোমার জীবনের একটা স্থিতি দরকার। সব না হলেও তোমার দেখা কিছু স্বপ্ন তো পূরণ হওয়া দরকার। আর আমি তো আছি, শেখরকে আমি বলে দেবো, তোমাকে খুব খেয়াল রাখবে। ব্যাপারটা দারুন হবে, তাই না প্রিয়া, আমি তোমার বৌদি, তুমি আমার বৌদি। এবার তো একটু হাসো। তবে তোমার অভ্যাস আমি জানি, মন খারাপ হলে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রথমে একটু কাঁদবে, তারপর হাল্কা হয়ে নিয়ে হাসবে।

আমাদের, মেয়েদের জীবনটাই এমন জানো তো। শুধু এগিয়ে চলতে হয়। সব অতীত ভুলে গিয়ে সবাইকে নিয়ে বর্তমানে বাঁচতে হয়। একটু কেঁদে তারপর আবার হাসতে হয়। প্রতিটা মানুষের ইচ্ছার দাম দিতে হয় আমাদের। সেবা করা, ক্ষমা করা, ভুলে যাওয়া-এ সবই মেয়েদের জন্য। জীবনের প্রতিটা অধ্যায়ে একটার পর একটা ভূমিকা পালনের দায়ীত্ব নিতে নিতে সে তার নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্বটাই ভুলে যায়। কারন, সেই আদীমকাল থেকে আমাদের বুকে বাসা বেঁধে থাকে এক নিবিড় আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা। তাই সুনিশ্চিত কোনো ভালবাসার আশ্রয় পেলে তাকে আমৃত্যু আঁকড়ে ধরে থাকি আমরা। জন্মের পর বাবা-মায়ের আশ্রয়, বিয়ের পর স্বামীর, তারপর সন্তানের। অনেকের তো কারোরই নয়।

তুমি ভাবছো, আজ আমি কেন এত লেকচার দেওয়ার মুডে এসে গেলাম। আসলে কি জানো তো প্রিয়া, তোমাকে দেখে, আজ আমার নিজের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। তোমাকে হাসতে বলছি বটে, তবে আমিও পারি নি সেদিন, হাসিমুখ থাকতে। উনিশ পেরিয়ে সবে কুড়িতে পড়েছি। বাবা নিয়ে এলো আমার জন্য এক সম্বন্ধ। কত উৎফুল্ল হয়ে মাকে শোনাচ্ছিল, কোচবিহারের জমিদার পরিবার। জমিদারী নেই, কিন্তু অনেক নাম ডাক আছে। অনেক সম্পত্তি, বিশাল বাড়ি, অনেক বড়লোক। মাও শুনে খুব খুশি হয়েছিল। বলেছিলো ‘আমাদের নন্দিতার কপালটা ভাল, নাহলে এত ভাল পাত্র পাওয়া যায়’। বাবা সায় দিয়ে বলেছিল ‘ঠিক বলেছ তুমি। আর আমাদের নন্দিতা কম কিসের, বিয়ে পড়ছে, দেখতে শুনতে ভাল, নাচ জানে, কত গুনবতী মেয়ে আমার। তুমি দেখো, আমাদের নন্দিতা খুব সুখী হবে’।

সেদিন রাতে খুব কেঁদেছিলাম আমি। জীবনের প্রথম আশ্রয় খোয়ানোর ভয়ে। মনে হয়েছিল-বাবা-মা ভাইকে ছেড়ে আমাকে চলে যেতে হবে অন্য এক পরিবারে, যাদের কাউকে আমি চিনি না, জানি না। আমার মাও তাই করেছিল। মায়ের মাও। আমাকেও চলে যেতে হবে এ বাড়ি ছেড়ে অন্য এক নতুন আশ্রয়ে। যে মানুষটার কাছে আমাকে পাঠানো হচ্ছিল, আমি তাকে দেখি নি। তার সম্পর্কে কিছুই জানি নি। বাবা জেনেছিল সবকিছু। আসলে হয়তো কি জানো, বিয়ের জন্য মেয়েদের ইচ্ছাটা খুব একটা জরুরী নয়। কারন বিয়ের মতো কোনো এক অবশ্যম্ভাবী কার্যকে ইচ্ছা অনিচ্ছার পরিমাপে অযথা দেরী করে লাভ হয় না। বিয়ে তো মেয়েদেরকে করতেই হয় একদিন। আর তাছাড়া বাবা-মা তাদের সন্তানের ভালটাই চায়। আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে নি, আমি কি চাই।

তবে জানো প্রিয়া, তোমার দাদার ফোটো আমি দেখেছিলাম। খুব সুপুরুষ লাগছিল। মনে মনে শিহরিত হচ্ছিলাম। ফটো দেখেই ভেবে নিতে শুরু করেছিলাম স্বামী হিসাবে। এটা সব মেয়েদের জীবনেই হয়। নিজের জীবনে যা কিছু ছিল, তার সবকিছুরই প্রাধান্য কমে আসছিল। আমার পড়াশনা, আমার নাচ, আমার বন্ধু-বান্ধব, আমার ছোট্ট ছোট্ট শখ-স্বপ্ন এসব কিছু ছাপিয়ে আমার বিয়েটাই হয়ে দাঁড়াচ্ছিল প্রধান। নাচ আমার জীবনের একটা অঙ্গ ছিল। সবাই খুব প্রশংসা করতো আমার নাচ দেখে। ভেবেছিলাম নাচই বোধহয় আমার জীবনের সাথী হবে একদিন।

তারপর তোমার দাদা আমাকে বিয়ে করে নিয়ে এলো এই বাড়িতে। বাবা যা যা বলেছিল, সব কিছু দেখেছি আমি এখানে। এত বিশাল, এত জাঁকজমক শ্বশুড়বাড়ি দেখে খুব খুশি হয়েছিলাম সেদিন। এখানে এসে পেলাম নতুন করে আর এক বাবা মা, ঠাকুরপো আর তোমার মতো সুন্দর এক বন্ধু। এ বাড়ির সবাই আমাকে খুব ভালবসতে শুরু করলো। তোমার দাদাও। ধিরে ধিরে তোমাদের রায়চৌধুরী বাড়ির গৃহিনী হয়ে উঠলাম। জীবনের নতুন জগতের এক নতুন স্বাদ পাচ্ছিলাম। হঠৎ একদিন দেখলাম, সে জগতে তোমার দাদা নেই। ওনার কাছে সময়ই ছিল না আমাকে দেওয়ার মতো। স্ত্রীর মর্যাদা, সম্মান অনেক পেয়েছি, শুধু পাই নি স্বামীকে বন্ধুর মতো। নিজের কাজে ও ব্যস্ত থাকতো। রাজনীতি ওর প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আস্টেপৃষ্ঠে। পার্টির প্রচার, পার্টির লোকজন, তাদের ক্রোশ আক্রোশ এসব নিয়েই থাকতো ও।

তুমি তো জানো, ভোটের আগে সারাদিন বাড়িতেই ফিরতো না। কোথায় থাকতো, কি কাজ করতো, কি খেতো এ সব কিছুই আমার জানার খুব ইচ্ছা হতো। আসলে ঐ মানুষটাকে আমার জানার খুব ইচ্ছা হতো। আমি তো রেখেছিলাম আমার জীবনের আনকোরা সাদা খাতা ওনার সামনে। ধুলো জমে গিয়েছিল সেই স্বপ্নগুলোর প্রত্যেক পরতে পরতে। রাজনীতির বাইরে আমার জন্য তোমার দাদার কোনো জায়গাই ছিল না। নাচকে সঙ্গী করতে চেয়েছিলাম। বাবা বলেছিলেন, রায়চৌধুরী বাড়ির বৌ নেচে বেড়াক, সেটা শোভা দেয় না। বাবাকে অসম্মান করা আমার কাছে শোভা দেয় নি।

তখন তো তোমার বিয়ে পাশ করা হয়ে গেছে। তুমি তোমার এয়ার হোস্টেস হওয়ার স্বপ্ন পূরনের রাস্তা খুঁজছিলে। আামি রান্না ঘরের জানালা দিয়ে উন্মুক্ত এক আকাশ খুঁজছিলাম। তারপর হঠাৎ একদিন অনুভব করলাম একমুঠো স্বপ্নের অস্তিত্ত্ব আমার নিজের মধ্যে। বৃষ্টি পেটে এসেছিল। সবাই খুব খুশি হয়েছিল। দিনের পর দিন আমরা দুজনে বড় হতে থাকলাম। একসাথে। আমি আর বৃষ্টি।

সারাদিন বৃষ্টি ঝরছিল সেইদিন শ্রাবনে। আমার চোখ শুকনো ছিল। শেষ হয়ে গিয়েছিল সব চোখের জল। তোমার দাদাকে তখন শ্মশ্বানে নিয়ে চলে গেছে সবাই। বোঝার চেষ্টাও করি নি কোন পার্টির লোক বা কারা তোমার দাদাকে খুন করেছে। শুধু এটুকু বুঝেছি আমি আরও একবার আশ্রয় খোয়ালাম।

সাদা শাড়ীতে আমাকে ভাল দেখাচ্ছিল না। তুমিই সেদিন প্রতিবাদ করেছিলে। বাবা-মা রাজী হয়েছিলেন রঙীন পরার জন্য। কিন্তু প্রিয়া, সত্যি করে বলো তো, রঙের প্রয়োজনই বা কি ছিল আমার জীবনে। সাদা তো সব রঙেরই মিশ্রণ। পঁচিশ বছর বয়সে বিধবা হয়ে যাওয়ার চেয়ে বেরঙীন আর কি হতে পারে বলো?

একটু আগে বলছিলাম না, সব অতীত ভুলে গিয়ে সবাইকে নিয়ে বর্তমানে বাঁচতে হয়। একটু কেঁদে তারপর আবার হাসতে হয় মেয়েদেরকে। বাঁচতে হয় অন্যের জন্য। আমি তো হেসেছিলাম শুধু বৃষ্টিরই জন্য। তখন তোমার এয়ার হোস্টেস কোর্সের ট্রেনিং চলছে। নিজের শর্তে তোমাকে বেঁচে থাকতে দেখে খুব ভাল লাগতো আমার।

জানো, কলেজের বন্ধুরা আমাকে সুন্দরী বলতো। সুন্দর কাকে বলে ওরা যদি তোমায় দেখতো, তাহলেই বুঝতো। তোমার সব হাসি-আহ্লাদের সাথী ছিলাম আমি। একদিন দৌড়ে এসে তুমি তোমার চাকরীর খবরটা শোনালে। একটা এয়ার লাইন্সে চাকরী পেয়েছিলে তুমি। তোমার স্বপ্নের আকাশে তোমার সাথে নিজেকে উড়তে দেখেছিলাম। সেই সাথে মিসও করেছিলাম তোমাকে। তুমি কত কত দিন বাড়ির বাইরে থাকতে। বৃষ্টি তখন সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। আমি আবারও একা হয়ে গিয়েছিলাম। ঠাকুরপো নিজের পড়াশোনা আর খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।

তারপর তো তুমি সব জানো। আমি আর কি বলবো। তখন থেকে তো শুধু অতীতের কাসুন্দি ঘেঁটে যাচ্ছি। তুমি তো একটাও কথা বলছো না। প্লিজ প্রিয়া, এমন চুপচাপ থেকো না। মেনে নিতে শেখো। তোমার বাবা যেদিন তোমার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলেন, সেদিনও তো তুমি মেনে নিয়েছিলে। ইচ্ছা না থাকলেও আমাদের জীবনের অধ্যায় তো বদলাতেই হয়। আর তাছাড়া অমন ভাল সরকারী চাকরী করা পাত্র বাবা হাতছাড়া হতে দেন নি। তোমার বিয়ের পর আমাদের সবাইকে ছেড়ে তুমি চলে গেলে শ্বশুরবাড়ি। যেমন আমি এসেছিলাম।

কিন্তু কি করে বুঝবে বলো, কোন মানুষ কেমন হবে। তোমার শ্বশুরবাড়ির লোকগুলো ভাল ছিল না। তোমার চাকরীটাও ছাড়িয়ে দিল। অত্যাচারও কম করতো না। স্বামী তোমাকে সাপোর্টও করে নি। তুমি বাঁধা পড়লে আত্মত্যাগের সেই চিরাচরিত বন্ধনে। তুমি তো এমন জীবন চাও নি। তবুও তো মেনে নিতে শিখেছিলে।

জানো তো প্রিয়া, ভগবান মেয়েদেরকে অসীম এক সহনশীলতা দিয়ে এ পৃথিবীতে পাঠান। আমরা যতই মডার্ন হয়ে যাই না কেন, সব মেয়েদের জীবনে কোথাও না কোথাও এই জায়গায় মিল থাকে। তবে তোমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সহ্যের সীমার বাইরে যাচ্ছিল। বাচ্চা জন্ম দিয়ে, স্বামী সংসার নিয়ে সুখে ঘর করতে চেয়েছিলে তুমিও। কিন্তু পারলে না।

সব ছেড়ে চলে এলে একদিন বাপেরবাড়ি। আমাকে জড়িয়ে ধরে সেই একই কান্না কাঁদলে আরও একবার। বাবা তোমার ডিভোর্স করিয়ে নিলেন।

আরে...একি! তুমি কাঁদছো কেন প্রিয়া? প্লিজ কেঁদো না। আসলে দোষ আমারই। আমি যে কেন তখন থেকে পুরানো সব আজেবাজে কথা বলছি, বুঝতেই পারছি না। থাক আর বলবো না এ সব কথা। দেখো বিকেল হয়ে গেছে। আজ আর ঘুমানো হল না। আচ্ছা তুমি আমার নতুন মোবাইটা দেখেছো? যে-সেভেন। খুব ভাল।

প্লিজ প্রিয়া, চিন্তা কোরো না, বদলাবে সবকিছু। কোনোকিছুই চিরস্থায়ী নয়। তুমি, আমি, আমাদের জীবন, সব বদলাবে একদিন। আমি বদলেছি বৃষ্টির জন্য। শেখর বদলাবে তোমাকে। তুমি ওর কথা ভাবো। ও তোমাকে বিয়ে করতে চেয়ে কোনো করুনা করছে না। শেখর নিজে আমাকে বলেছে, তোমাকে ওর খুব পছন্দ। হ্যাঁ, তোমার চেয়ে ও দু বছরের ছোট বটে। তবে আজকালকার যুগে এসব কোনো মানে রাখে না। আকছার হচ্ছে এমন।

আমি তোমাকে নিজের বোনের মতো ভালবাসি প্রিয়া। তোমাকে এইভাবে আমি আর দেখতে পারছি না। আমি এ বাড়িতে আর কোনো নন্দিতা দেখতে চাই না। বাবা-মাও তোমার জন্য খুব চিন্তা করেন। তুমি স্বামী সন্তান নিয়ে সংসার করছো ওঁরা এটা শেষ বয়সে দেখে যেতে চান। সেকেলের মানুষ তো, তাই ওঁদের ধারনা মেয়েদের একমাত্র সুরক্ষিত স্থান- স্বামীর ঘর। সমাজ ব্যবস্থাও তাই বলে। শাস্ত্রেও তাই লেখা আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আমরা শাস্ত্র আর ভাগ্যকেই মেনে এসেছি। তাই তো, দেখো না তোমার আর শেখরের ভাগ্যে এই বিয়েটা লেখা ছিল। যাও তো ভাল্লাগে না। তুমি আর কতক্ষণ চুপ করে থাকবে বলো তো? ঐ দেখো আমার ফোন বাজছে। নতুন রিংটোন লাগিয়েছি, দেখেছো। দাঁড়াও দেখি কার ফোন।

-হ্যালো...হ্যাঁ শেখর বল...। কেমন আছিস...। এতক্ষন তোর কথাই হচ্ছিল...। কাকে আবার, প্রিয়ার সাথে...। বাবা মা কেমন আছে রে...। আচ্ছা...। হ্যাঁ বল কি বলবি...। আরে চুপ করে আছিস কেন, বল না...। মানে...? শেখর তুই এসব কি বলছিস...? দ্যাখ ভাই, আমার মাথায় কিন্তু কিচ্ছু ঢুকছে না...। তুই এটা করতে পারিস না...। তুই তো সব জেনেশুনেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলিস...। হ্যাঁ কিন্তু সেসব তো পুরানো কথা...। রাজী হওয়ার আগে তোর এসব কথা ভাবা উচিত ছিল...। আমি কোনো কথা শুনতে চাই না, এ বিয়েটা তুই করছিস...। না মানে? দ্যাখ শেখর, একবার প্রিয়ার কথা ভাব...। প্লিস শেখর...। শেখর...? হ্যালো...হ্যালো...ইডিয়ট।

আরে...প্রিয়া তুমি কোথায় চললে। আর একটু বসো না প্লিজ আমার কাছে। তুমি তো সব শুনলে। কি আর বলি বলো। শেখরের ফোন ছিল। বলছে, এ বিয়েটা ও করতে পারবে না। অনেক সমস্যা আছে। একি! তুমি হাসছো। হ্যাঁ, আমারও খুব হাসি পাচ্ছে জানো। সাথে খুব রাগও। শেখরের উপরে নয়। ভগবানের উপর। আর কতকাল, কত পরীক্ষা উনি নেবেন আমাদের কাছ থেকে। এর শেষ কোথায়? জানি না ভগবান।

তবে তুমি মন খারাপ কোরো না প্রিয়া। ভেবে নাও কিছুই ছিল না। কিছুই হয় নি। বাবা-মাকে আমি সামলে নেবো। তুমি নতুন করে বাঁচবে। আবার। আগের মতো। তুমি চাকরীর চেষ্টা করো। ওজনটা একটু কমালে তুমি আবার আগের মতো আমার এক বিউটিফুল এয়ার হোস্টেস ননদ হতে পারবে। তুমি পারবে প্রিয়া। আমি তোমার সাথে আছি। তোমার বয়সই বা কত হয়েছে। সারাটা জীবন পড়ে আছে এখনও। তোমাকে পারতেই হবে। আমি পারি নি আমার নাচ নিয়ে বেঁচে থাকতে। কিন্তু জানি, তুমি পারবে। বলতে পারো আর কতকাল আমরা শুধু এই খিড়কি থেকে সিংহদুয়ারের গন্ডির আবদ্ধে বেঁচে থাকবো? তুমি একটিবার প্রান খুলে, তোমার স্বপ্নের আকাশে উড়ে দেখাও প্রিয়া। শুধু একটিবার। তুমি আমার জন্য। প্লিজ......।

কি...আমার দিকে তাকিয়ে দেখছো কি? আমার সব মনে আছে প্রিয়া। সব কথা। তুমি না খুব জিদ্দি। আমার কথা একদম শোনো না। কেন শুনলে না তুমি আমার কথা? তোমার কি মনে আছে, সেদিন দুপুরে এই কথাগুলোই আমি তোমাকে......। উফ! বাববা...ঐ দেখো মা ডাকছেন। তোমার সাথে উনি আমায় একটুও কথা বলতে দেন না। এক্ষুনি এই ঘরে চলে আসবেন। আর প্রতিদিনের মতো সেই একই কথা বলবেন-‘বৌমা পাগলামী কোরো না। আর কতদিন প্রিয়ার ফোটোর সাথে কথা বলবে তুমি? ওড়নার বাঁধন খুলে তুমি নিজেই ওকে সিলিং ফ্যান থেকে নামিয়ে ছিলে। প্রিয়া চলে গেছে নন্দিতা। আমরা মেনে নিয়েছি। তুমিও মেনে নাও’।

মাকে কি করে বোঝাই বলো তো প্রিয়া। তুমি কোথাও যাও নি। আমার কাছে আছো। আমার সামনে আছো। সবসময়। এবার আমি চলি কেমন। বৃষ্টি বোধহয় স্কুল থেকে ফিরে এসেছে। কাল দুপুরে আবার কথা হবে। বায়...। লাভ ইউ...’।

=======================================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.