মা..

"মা! ও মা.." দিনের মধ্যে ঠিক কতবার ডাকি বলুন তো মাকে? কয়েকবার নাকি অজস্রবার?? তাও সত্যি কথা বলতে কি নিজেদের দরকারেই বেশি ডাকি। মায়েদের মধ্যে বিশেষত কোনো রহস্য যেমন থাকে না, আর থাকলেও আমরা তো দেখতেই পাই না! তেমনি আগেকার অনেক মা'রা ছিলেন সাদামাঠা চেহারার একজন বৈচিত্রহীন মানুষ। সে ঘরেও কি কিংবা বাইরেও কি। মায়েদের তোলা শাড়িগুলো আলমারি থেকে বের হতো কদাচিৎ, কোথায়ই বা তেমন যেতেন মায়েরা??
মাতৃ দিবসের ঠিক আগেরদিন যে সব মায়েদের কথা আমি বলতে চলেছি বা যে মায়ের কথা বলছি তিনিও এই 'সবেতেই অভিযোগহীন' শ্রেণীভুক্ত।
অসুখ-বিসুখের বালাই নেই তাই ডাক্তারের কাছেও যাওয়া নেই! ছোটবেলায় স্কুলে দিয়ে আসা নিয়ে আসার জন্য অবশ্যই মা, কিন্তু সপ্তাহ শেষে বাবা বাড়িতে এলে ভাই-বোন চিড়িয়াখানা কিংবা পার্ক যাওয়া চাই'ই চাই, মা কোনোদিনই সঙ্গী হন নি! অবশ্য প্রায় ধরেই নেওয়া হয়েছিল মা যাবে না কারণ ঘরে অনেক কাজ, ঘোরা বেড়ানো নেহাতই বিলাসিতা ছাড়া তাঁর কাছে আর কিছুই নয়।
মায়ের নামটাও মায়ের মতোই সাদামাটা আকর্ষণহীন। বাড়ির মেয়ের নামে বাড়াবাড়ি রকমের কিছু ঐশ্বর্য থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক। কারুর বিয়ে বা মৃত্যু সংবাদে এও মা ধীর স্থির, কোনো ঘটনাতেই বাড়তি আবেগ ফুটে উঠতো না মায়ের চেহারাতে।
শুধু কোনো কারণে চিৎকার করলে মা পাশের রান্না ঘর থেকে ছুটে এসে বলতো, 'কি রে পড়ে গেলি? লাগলো??' মায়ের উৎকণ্ঠাকে পাত্তা না দিয়ে আমরা একে অন্যের সাথে মারপিটে ব্যস্ত থাকতুম। মা মুচকি হেসে চলে যেত। মায়ের হাসির কোনো বিশেষত্ব ছিল না, মায়ের গালে টোল ও পড়ত না, কিংবা মায়ের চোখে মুখের বিন্দু বিন্দু পরিশ্রমের ঘামগুলোও ছিল মায়ের মতোই সাদামাটা আর বর্ণহীন।
পাশের বাড়ির এক ভদ্রমহিলা খুব সেজে গুজে মায়ের সাথে গল্প করতে আসতেন। ভদ্রমহিলার অনর্গল কথার মাঝে মাকে দেখতুম শুধু হ্যাঁ বা না'তেই উত্তর দিতে, ভদ্রমহিলা নিজের স্বামী সন্তানের বীরত্বের কাহিনী শুনিয়ে টুনিয়ে মায়ের হাতের চা, মুড়িমাখা খেয়ে বিদায় নিতেন।
শুধু প্রতিবেশী কেন? আপাতদৃষ্টিতে রহস্যহীন মাকে আমরা ভাই বোনেরাও বেশি গুরুত্ব দিতাম না! বাবার প্রবল ব্যক্তিত্বের কাছে বরাবরই পরাজিত মাকে নিত্যদিন কেন দরকার তা আমাদের ছোট্ট মাথাতে আসতো না!! আর আসবেই বা কি করে? নিজের ঘরে ঢুকলেই যে পরিপাটি করা বিছানা, গোছানো টেবিল, আয়রন করা স্কুলের ড্রেস, ঝাঁ চকচকে জুতো, সবকিছু রেডি থাকতো বলে মাকে আর প্রয়োজনও পড়ত না! কেবল খাবার সময় মায়ের খোঁজ শুরু হতো, দেরি হলে সাথে থাকতো হুংকার ও। আবার কখনো কখনো অমুক বন্ধুর মা কি দারুন রান্নাটা করেছিল জানো, ধুস তুমি তো ওটা করতেই পারো না বলে এদিকে চেটেপুটে মায়ের হাতের রান্না করা মাংস খেয়ে নিতাম!! মাকে দেখতাম রাগ তো নয়ই বরং মুখ টিপে হাসছে।
হ্যাঁ মা ও হাসতো, কি আশ্চর্য বলুন? কিন্তু সে হাসি ছন্দহীন বৈচিত্রহীন। আসলে হাসি কান্নার মতো রহস্যময় আবেগগুলো যেগুলো নিয়ে আমরা সারাদিন ভেবে মরি, নিজেদের রহস্যে মোড়ার চেষ্টা করি, অদ্ভুত ভাবে মায়ের কাছে নিতান্তই রহস্যহীন হয়ে যেত! আমার যখন চিকেন পক্স হলো, তখন মায়ের মুখ দেখে আমি ঠিক বুঝতাম যে কতটা দুশ্চিন্তায় মায়ের দিন কাটছে। বাবা যখন শনি রবির ছুটির শেষে বেরিয়ে যেত, তখন বাড়িতে কার্যত নিঃসঙ্গ মাকে আমরা সময় করে কখনো জিজ্ঞেস করে উঠতে পারিনি যে, মা তুমি খেয়েছো? কিছু লাগবে?
এরকমই একদিন গরমকালের শুরুতে দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর যখন একটা আমের খোসা ছাড়িয়ে আঁটি'টাকে নিয়ে আয়েশ করে ঘরের জানলার ধারে বসেছি, হঠাৎ দিদির চিৎকারে ছুটে গিয়ে দেখি মা রান্নাঘরের মেঝেতে কাত হয়ে শুয়ে আছে!!
ডাক্তার এসে বললেন মাইনর হার্ট অ্যাটাক!!
বিশ্বাস করুন, আমরা বাড়ির সদস্যরা সেই প্রথম শুনলাম যে, আমাদের পরিবারের এই সদস্যটির একটি 'হার্ট' ও ছিল!!

" শূন্য থেকে আসোনি তুমি
এসেছিলে মাতৃগর্ভে।
সেই থেকে যাত্রা তোমার
হলো শুরু রঙ্গিন এই ভূস্বর্গে। "

পুনশ্চ-: চলুন না, আপনারা যারা এখনো মা থাকা সত্বেও নিজেদের আবেগগুলো মায়ের কাছে তুলে ধরতে লজ্জা পান বড়ো হয়ে গেছি এই অজুহাতে, আবার সেই ছোটবেলার মতো একটু মাকে বেশিই না হয় জ্বালাতন করতে শুরু করি? কোনো দিবস বা বিশেষ সময় নয়, চলুন কাল থেকেই শুরু করি!!

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.