আকাশ


জীবন টা অনেক সময় একটা রোমাঞ্চকর ক্রিকেট ম্যাচের মতন মনে হয়, শেষ বল অবধি কে জিতবে আর কে হারবে বোঝা খুব মুস্কিল আর তার জন্য শেষ অবধি খেলা তোমায় দেখতেই হবে, আর এ খেলাটা আমি দেখছি , হয়তো ম্যাচের প্রথম থেকে নয় তবে সেখান থেকে যেখান থেকে দেখলে ম্যাচ কে আর এক ঘেয়ে লাগে না। আকাশ এ ম্যাচের একজন প্লেয়ার ।আকাশ কে আমি ছোট বেলা থেকে চিনি, আমার সাথে একই ইস্কুলে পড়তো কিন্তু ফাইভ থেকে টেন পর্যন্ত আমাদের বন্ধুত্ব খুব একটা গাঢ় ছিল না, আমি ছিলাম মধ্যমানের ছাত্র আর ও ছিল খুব দুরন্ত মস্তিস্কের ছাত্র, কাজেই ওর মেলা মেশা ছিল ওর মানের ছাত্রের সাথে। ক্লাসে যেমন বিশেষ একজন কেউ থাকে যাকে নিয়ে সবারই একটা কৌতূহল বিরাজ করে আকাশ সেই বিশেষ একজনের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল সেটা শুধু ওর পড়াশুনার জন্য নয় তার সাথে ছিল আরও অনেক কিছু, প্রথমত তার বাবা ছিলেন আমাদেরই ইস্কুলের শিক্ষক কাজেই তার প্রতি আমাদের দৃষ্টি ছিল একটু আলাদা, দ্বিতীয়ত তার চেহারা , গাট্টা গোঁটটা বেঁটে খাটো আর দুষ্টুমিতে ভরপুর এই ছেলেটিকে সবাই একটু ভয়ও পেতো। তবে বাবা ইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন বলেই হয়তো সে ইস্কুলে খুব একটা দুষ্টুমি করতো না তবে তার পাড়ায় , বাড়িতে তার দুষ্টুমির খবর আমাদের কাছে রোজ সকালে ইস্কুল শুরু হবার পর চলে আসতো। আকাশের বাড়ি ছিল ইস্কুলে থেকে মিনিট কুড়ি হাটা পথে , আর বাড়িতে ছিল এক বিশাল পুকুর সেখানে বাবু আয়েশ করে মাছ ধরতেন , তারপর ঘণ্টা খানেক সাঁতার কাটতেন তারপর ইস্কুলে আসতেন আর যথারীতি আসতে তার লেটই হতো। তার পড়াশুনায় বিশেষ মেধাটি আমাদের সামনে আসে অষ্টম ক্লাসে, আমাদের সময়ে অষ্টম ক্লাসের অঙ্ক ছিল প্রখর শীতে খালি গায়ে গঙ্গায় চান করার মতন, আমাদের মতন ছাত্রদের পাশ করা নিয়ে একটা সংশয় তৈরি হলেও আকাশ কে দেখতাম আশি নব্বই শতাংশ পেতে এবং সেই কারনেই তাকে আমরা সেই বয়স থেকে খুব সমিহ করে চলতাম। ইস্কুলের শিক্ষকরাও তাকে নিয়ে মাধ্যমিকের জন্য স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল, আর করবেনই বা না কেন এরকম প্রান চঞ্চল, মেধা সম্পন্ন ছাত্র তো ইস্কুলেরি গর্ব। কিন্তু ওই যে বললাম জবনের খেলায় কখন কি হয় কেউ জানেনা আর মানুষ ভাবে এক হয় আরেক, যে ছেলের জীবনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ , ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়াটা শুধু সময়ের অপেক্ষা ঠিক তখন থেকেই তার ভাগ্যের চাকা টা একটু গড়বর শুরু করে দিল।

সেবার অষ্টম ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষার আগে ফুটবল ম্যাচ খেলতে গিয়ে আকাশের ডান হাতটা খুব মারাত্মক ভাবে জখম হোল, আকাশ সে বার আর পরীক্ষা দিতে পারলো না । শোনা গেল ডান হাতে লোহার রড বসাতে হবে আর সেই হাতে সে কোনদিন স্বাভাবিক ভাবে লিখতে পারবে না। নবম ক্লাসে ওঠার পর শুনলাম আকাশকেও নবম ক্লাসে উঠিয়ে নেওায়া হয়েছে তার মেধার কথা বিবেচনা করে।

কিন্তু তার ভাঙা হাত আর তার সাথ দিলনা, কিন্তু তার আর তার বাবা মায়ের অসম্ভব মনের জোর ছিল সে বাম হাতে লেখা অভ্যাস শুরু করলো, কিন্তু ডান হাতের যে সহজশেলি ব্যাপার টা ছিল সেটা বাম হাতে আনা এতো কম সময়ে বেশ দুরূহ ব্যপার ছিল। কিন্তু আকাশ হাল ছারেনি , ভাগ্য তাঁর প্রতি বিরুপ হলেও সে নিজের চেষ্টায় অমানুষিক মনের জোরে মাধ্যমিকে প্রথম বিভাগেই উত্তীর্ণ হল।

এগারো ক্লাসে এসে আমার সাথে তাঁর বেশ বন্ধুত্ব হয়েছিল তার কারন আমিও প্রথম বিভাগে পাশ করে কোন এক অজানা কারনে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার মনস্থির করি আর সেই সুবাদে আমরা বেশ কাছাকাছি চলে আসি। আমাদের কোচিং ক্লাস ও একই ছিল কাজেই বন্ধুত্বটা গাড় হতে বেশী সময় নেয়নি।

আকাশের সাথে বন্ধুত্ব হয়ার পর ওর অনেক অজানা দিক আমি আবিস্কার করি, আকাশ খুব একগুঁয়ে ,যেটা ও মনে ধরে বসে থাকবে সেখান থেকে ওকে নামানো বেশ দুরূহ আর সেটা শুধু বন্ধু বান্ধবদের মধ্যেই সিমাবদ্ধ ছিলনা, সেটা বাড়িতে বাবা মার সাথেও চলতো। আমরা যখন বাবার সাথে কথা বলতে গেলে বার তিনেক ভাবতাম তখন আকাশ ও সবের মধ্যে যেতোই না , কোন কিছু অপছন্দ হোলে বাবার সাথে রীতিমত তর্ক জুড়ে দিত তাতে দুজনার মধ্যে বেশ গুরুতর ঝামেলা বাঁধত আর বেচারি আকাশের মাকে আসতে হত তা মিটমাট করার জন্য।

এগার বারো ক্লাসে যেমন সবার একটা ফ্রেন্ড সার্কেল গড়ে ওঠে তেমনি আমাদের পাঁচ ছয়জন বন্ধুমিলে একটা সার্কেল গড়ে উঠেছিল, ইস্কুল পড়াশুনা ছাড়া আমরা রাত দিন পরে থাকতাম আরেক বন্ধুর বাড়িতে, তখন না ছিল ইন্টারনেট না ছিল ফেসবুক আমরাই আমাদের নিয়ে মশগুল ছিলাম, সদ্য ওঠা গোঁফের ভাজে সুন্দরী মেয়ে দেখলে প্রেমের বাসনা মনে চলে আসতো, মোবাইল হীন জগতে প্রেমপত্র লেখার জন্য মনটা ব্যকুল হয়ে উঠত। তবে আকাশ কে দেখতাম এ সব ব্যপারে বেশ কয়েক যোজন দূরে থাকতে, আসলে ও খুব প্র্যাকটিকাল ছিল, রোমান্স , প্রেম ওর রক্তেই ছিল না সেটা ওর চেহারার জন্য না অন্য কারনে তা আমরাও খুব একটা জানতে চাইনি।

এগারো বারো ক্লাসের পাহার প্রমান পড়ার চাপ ও কিভাবে নিত ওর সেই ভাঙা হাতে সেটা ওই ভালো ভাবে জানতো তবে ক্লাসের টেস্টে ও ভালই ফল করত, আর আমরাও অবাক হতাম এটা ভেবে যে ওই ভাঙা হাতে যদি ও এরকম ফল করতে পারে তাহলে হাত ঠিক থাকলে না জানি কি হত। আকাশ যে ওর হাত নিয়ে মনকষ্টে ভুগত সেটা আমরা জানতাম, পরীক্ষায় তাঁর হাতের লেখা শেষের দিকে সময়ের চাপে একরকম হিজিবিজি হয়ে উঠত সে চেষ্টা করতো সামাল দেওয়ার কিন্তু সবটা পেরে উঠত না। অনেক ডাক্তার অনেক এক্সসারসাইজ করিয়েও তার হাতের সমাধান পুরো করা না গেলেও আকাশ কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম বিভাগেই পাশ করলো আর সেখানে আমরা কয়েজন ভালো হাতধারী দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হলাম।

আমরা একই কলেজে ভর্তি হলাম, পরীক্ষার ফলাফলে আমাদের বন্ধুত্বের কোন ঘাটতি হোল না । আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের বাড়ির লোকের খুব একটা চিন্তা না থাকলেও আকাশের বাড়ির লোকের বেশ চিন্তা ভাবনা ছিল আর সেই কারনেই গ্রাজুয়েশনের আগের বর্ষে আকাশ কে ব্যঙ্গালরে পাঠানো হোল ইঞ্জিন্যারিং পড়াতে এবং তাতে আকাশের খুব একটা ইচ্ছা যে ছিল তা বলতে পারিনা। আমরা তখন কলেজ জীবনে এক অজানা ভবিষ্যতের দোলাচলে সেই অমুল্য সময় নিয়ে ছেলে খেলা করে চলেছি।

আকাশ ব্যঙ্গালরে যাওয়ার পর বন্ধু মুখে শুনলাম বাবার টাকা থাকলে ব্যঙ্গালরে পাঠানো যায়, আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেসও করতে পারলাম না বাবা তোমার টাকা আছে কিনা তখন ভবিষ্যতের জন্য কোন চিন্তাই নেই , বাবার হোটেলে থাকি এবং সেটা সারাজীবন ফ্রিতেই পাব এই মানসিকতা নিয়েই জীবন চলতে লাগলো। এর মাঝে অবশ্য ডিপ্লোমা ইঞ্জিয়ানিরিঙ্গে চেষ্টা করলাম , দু বারের বার লাগিয়েও দিলাম কিন্তু প্রথম বর্ষের মাঝা মাঝি দুনিয়ায় আলোড়ন জাগানো কম্পুউটার কোর্সে ভর্তি হলাম এবার অবশ্য বাবার অনেক গ্যাঁট খসল কিন্তু সত্যি বলতে কি কম্পুউটার শিখে কি চাকরি করব তার কোন আন্দাজি ছিল না। শুরু হোল আমার কম্পুউটার দুনিয়া।

আকাশ কিন্তু ব্যঙ্গালরে পড়াশুনা করতে পারলো না, সে বার দুর্গা পূজার পরে একদিন রাত আট নটা নাগাদ সে আমার বাড়ি এসে হাজির হোল একেবারে সোজা ব্যঙ্গালর থেকে। তার কাছেই শুনলাম সে আর তার নিজের বাড়ি ফিরে যাবেনা, এর আগেও নাকি বার তিনেক সে ফিরে এসেছিল কিন্তু বাড়ির লোক তাকে জোর করে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল তার কোন কথা না শুনে, তাই এবার সে প্রতিজ্ঞা করেছে সে আর বাড়ি ফিরবে না। যা হোক আমার বাবা চুপি চুপি আকাশের বাবার কাছে খবর টা দিয়ে এল যে আপনার ছেলে আমার বাড়িতে। আকাশের বাবা সে রাতে এলেন না বললেল আজ থাক কাল সকালে যাবো।

সে রাতে আকাশ আমাকে বলেছিল তার ব্যঙ্গালরের কথা , কেন সে চলে আসতে চায় এবং সেটা ছিল একমাত্র তার সেই ভাঙা হাতের জন্য, ইঞ্জিনিয়ারিঙের ক্লাসে সে তার হাতের জন্য এমনই পিছিয়ে পরেছিল যে সেটা আর সে কভার করতে পারেনি, যে জানে সব, বোঝে সব, পারেও সব কিন্তু সেটা যদি প্রমান করতে না পারে তালে তার থেকে কষ্ট বোধ হয় আর নেই, সেই অসম্ভব মানসিক যন্ত্রণায় পিছিয়ে পড়ার ভীষণ কষ্টে সে এক প্রকার পালিয়েই এল এক সুন্দর ভবিষ্যতের সিমা রেখা থেকে। না আকাশ কিন্তু কাঁদে নি , তাকে আমি কাঁদতে খুব একটা দেখি নি তার যে মনে অসম্ভব জোড়।

পরদিন আকাশের বাবা এসে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে গেল। না আর আকাশ কে ব্যঙ্গালরে যেতে হয়নি। সে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে আমারই মতন কম্পুউটার কোর্স শুরু করলো। আমি ভাবতে লাগলাম মানুষের একী ভবিতব্য, যে ছেলের ভবিষ্যৎ আমরা চোখ বুজে বলে দিতে পারতাম , যে ছেলে কে নিয়ে সাড়া ইস্কুল , ছাত্র সবাই বাজি ধরতে পারত সে কিনা এখন সাধারন একটা কম্পুউটার কোর্স করছে।

কম্পুউটারে কিন্তু আমার ভাগ্য টা একটু ক্লিক করলো আমি একটা সাধারন চাকরি জুটিয়ে ফেললাম , কিন্তু আকাশ সাধারন চাকরি করবে না হয়তো এতে তার আঁতে লাগবে , হয়তো বাবা মা আরও অন্য কিছু তার জন্য ভাবছে কিন্তু আমি , আমার যে আর কোন উপায় নেই , সুযোগ নেই আমি তখন মাস মাইনের বারশ টাকার চাকরি নিয়ে আমার কর্ম জীবন শুরু করলাম।

আকাশ কিন্তু কম্পুউটারেও সুবিধা করতে পারলো না হয়তো সেই তার হাতের জন্য। এরপর আমার আর আকাশের জীবনে একটি ঘটনা ঘটলো, ছেলে চাকরি করে কিন্তু সেটা কি রকম টা না জেনে না বুঝে বাড়ি থেকে আমার বিয়ে দিয়ে দিল আর আমার বিয়ের মাস চারেক পরে আকাশের বাবা স্ট্রোকে হটাৎ করে মারা গেলেন, হয়তো ছেলেরি জন্য , ছেলের ভবিষ্যতের কোন নিচশয়তা নেই দেখে তিনি এক গভীর চিন্তায় নিজেকে এই জগত থেকে সরিয়ে নিলেন। আমি গেছিলাম , সেদিন্ই প্রথম দেখলাম আকাশ কে কাঁদতে , তবে সেটা হাউ হাউ করা কান্না ছিল না , ছিল এক বুকফাটা চোরা কান্না, না আমরা সেদিন কেউ মেনে নিতে পারিনি এতো কম বয়সে আকাশ কে পিতৃহীন হতে।

সময় এরপর ঝরের গতিতে এগোতে থাকলো , আকাশের সাথে আমার যোগাযোগ খুব কমে গেছিল , সব বন্ধুরা যে যার মতন সেটল হতে লাগলো আর আমার জীবনে একটা বেশ উত্থান হোল । জীবনের শত ব্যস্ততার মাঝেও আমি সব বন্ধু বান্ধবদের খোঁজ নিতাম , শুনে ছিলাম আকাশ আমাদের সেই ইস্কুলে প্যারা টিচারের কাজ পেয়ে ছিল, কয়েকদিন পর শুনলাম সে ওটা ছেড়ে দিয়েছে ।

বছর চারেক আগে খবর পেলেম আকাশ বিয়ে করেছে আর কোন এক কম্পানিতে জয়েন করেছে , বছর দুয়েক আগে খবর পেলাম আকাশের মেয়ে হয়েছে।

এখন আর কোন যোগাযোগ নেই কিন্তু আমার মন এখনও আকাশ কে নিয়ে ভাবে , জীবনের কাছে ওর অনেক অনেক বেশী পাওনা ছিল কিন্তু জীবন ওকে এখন পর্যন্ত সেই পাওনা দিলো না, তবে সময় শেষ হয়নি, আমরা এখন চল্লিশের কোঠায় , দেখার এখনও কিছু বাকী, আকাশের চূড়ান্ত সাফল্য দেখতে পেলে আমার থেকে বেশী খুশি হয়তো ওর মা-ই হবেন। সেই যে বলেছিলাম শেষ বল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

-----সমাপ্ত--------------------

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.