পলাশিয়া

(১)

সাতটা বাজে। কোমরের বেল্টটা আটকাতে আটকাতে বিশ্বনাথ বউকে তাড়া লাগায়-‘কি গো, হোলো? তাড়াতাড়ি আনো। সাতটা বেজে গেল যে। এতটা রাস্তা যেতে হবে তো’। রমা টিফিন কেরিয়ারের মুখটা আটকে পলিথিন ব্যাগে ভরতে ভরতে রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ‘এই নাও, বাবারে বাবা! বাবুর লাফালাফি দেখ একবার’।এইটুকু বলে টিফিনটা হাতে দিয়ে রমা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল বিশ্বনাথের সামনে; দ্বিধাগ্রস্থ ভাবে মাথা নিচু করে আঁচলের খুঁটটা বাঁ হাতের আঙুলে জড়াতে থাকে।

চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বিশ্বনাথ বলে-কিছু বলবে? যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। একরাশ দ্বিধা নিয়ে কোন রকমে কাঁপা কাঁপা গলায় রমা বলল-‘বাড়িওলা দিনুবাবু এসেছিলেন। আট মাসের ভাড়া বাকি। নতুন বছর আসতে বাকি আর একটা মাস। এ’মাসের মধ্যে বাকি টাকা মিটিয়ে দিতে হবে। মুদির দোকানের ছোকরাটা এসে বলে গেছে-বাকীতে আর একচিমটে নুন ও দেবে না।’ এক নিঃশ্বাসে কোনোমতে কথাগুলো বলে রমা চুপ করে।

কথাগুলো শুনে বিশ্বনাথের মাথায় কারখানার বয়লারটা যেন জ্বলে উঠল। চিৎকার করে উঠল-‘তো আমি কি করব! মাইনের টাকাগুলো কি আমি মদ খাই না ফূর্তি করে ওড়াই। তোদের হাঁ এই তো সব ঢালি। নিজের বলতে আমার কিছু আছে নাকি। চটি জোড়া দেখেছিস। শালা ম্যানহোল হয়ে হয়ে গেছে।আমি আর পারছি না, পারব না।’ বলেই টিফিনের ব্যাগটা হাতে নিয়ে দুদ্দাড় করে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল।

মনের মানুষটার আচরণে রমা স্তম্ভিত হলেও অসহায় বোধ করে। অন্য যে কেউ হলে এত কথার , অপমানের উত্তর দিত। কিন্তু সে অন্য ধাতুতে গড়া। মানুষটা করবেই বা কি ভেবে তার দু’চোখ বেয়ে জল নেমে আসে।

সংসারের অবস্থা সে ভালোমতো জানে। বিশ্বনাথ দিন রাত পরিশ্রম করে। ছেলেটা স্কুলে পড়ে। ক্লাস ফোরে। পুষ্টির অভাবে শীর্ণ আর অর্থের অভাবে দীর্ণ দশা পোষাকে পাড়ার “খিচুড়ি-স্কুলে” যায়। পড়বে যে সে বইও নেই। স্কুলের দিদিমণিরা বলেন-সুমন বেশ ব্রাইট। খেয়াল রাখবেন যেন ড্রেনেজড না হয়ে যায়। রমার নিজের পড়নের শাড়ীটা কয়েক’শ রিফু-তে অ্যাবস্ট্রাক্ট ডিজাইন হয়ে গেছে; সে দিকে হুঁশও নেই। একেই অল্প আয়ে সংসার চলে না তার ওপর ছ’মাস কারখানা বন্ধ ছিল। কি করে যে চালিয়েছে সে শুধু ভগবান জানেন। তিনটে পাড়ার বাচ্ছাকে পড়ায় রমা, আহামরি না হলেও সুমনের এটা-ওটা আবদার পূরণে হেল্পলাইনের কাজ করে; তাও আবার দু’মাস-তিন মাস বাকি থাকে। আর ওদেরই বা কি বলবে; ওদের বাবারাও তো বিশ্বনাথের মতই কোথাও না কোথাও ‘এই গেল এই গেল’ কাজ করে ।তবু রমা পড়ায়। বিশ্বনাথের কথা ওকে ভেতরে চুড়মার করে দিয়েছে; কিন্তু ওর কষ্টটা অন্য কারণে। বিশ্ব-র হাত ধরেই একদিন বাড়ির কারুর টানকেই আমল না দিয়ে জীবনের অজানা পথে পা বাড়িয়েছিল। যার ভালবাসাকে পুঁজি করেই তিলতিল করে তৈরী করছিল জীবনের ইমারৎ, সেই প্রিয় মানুষের কাছে এমন দুর্ব্যবহার তাকে যন্ত্রনা দিয়েছে। দু’চোখ জলে ভাসল।

(২)

পলাশের লালে লাল হয়ে রয়েছে ফ্যাক্টরির ভেতরের পিচ ঢালা রাস্তাটা। কালো পিচের ওপর লাল টকটকে পলাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে যেন চাপচাপ রক্ত! রক্ত? গাছের ও কি রক্ত হয় নাকি? রক্তের ছোপ পাশ কাটিয়ে যেতে হবে! এক্কাদোক্কা খেলার মত বিশ্বনাথের জীবনের রাস্তাটাও যে এমনই। গুলিয়ে যাওয়ার সব উপকরণ যে জীবন গুছিয়ে রেখে দিয়েছে, শুধু সুযোগ মত চাপিয়ে দিলেই যেন জীবনের কাজ হাসিল! অসহিষ্ণু বিশ্ব দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটের ওপর ঘষতে থাকে। পলাশকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে মনে মনে বকতে থাকে-একি করলো সে; সে তো এরকম না। এ তো তার স্বভাব নয়। রমার কি দোষ! দোষ তাদের কপালের। বেসতো ছিল দুজনে। লেখাপড়ায় ভালো ছিল, রমাও কম না। নিজের শহরের নাম করা স্কুলে পড়ার যোগ্যতা নিয়ে কোনো সংশয়ের সুযোগ কেউ পায়নি। এইচ. এস.-এর আগে থেকেই রমাকে চিনতো। ধীর, স্থির, মৃদুভাষিনী রমাকে ভালো না লেগে উপায় ছিল না। মনের ভেতরে ছিল ঘর বাঁধার স্বপ্ন। তির্ তির্ করে বইছিল ভালোবাসার স্রোত।

এক চাবড়া পলাশ ফুল প্রায় মাড়িয়ে ফেলছিল প্রায়; বিশ্ব কোনমতে বাঁকাচোরা লাফ দিয়ে শেষ রক্ষা করল! ওর মনে হল, কই সে তো রমার মনকে এই রকম “মাড়িয়ে” যাওয়া এড়াতে পাড়লো না! আজ সকালের কি কান্ডটাই না বাধিয়ে বসেছে। বিশ্বনাথ মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হতে থাকে। রমার মুখটা মনে পড়ে সে আরও চঞ্চল হয়ে উঠল। সে রমাকে, সুমনকে খু-উ-উ-ব ভালোবাসে , কিন্তু এ পোড়ার অভাব তাকে মাঝে মাঝেই তার স্বভাব বিরুদ্ধ করে তোলে।

লাল পলাশের আভায় বিশ্বনাথের মন ছাপিয়ে ভেসে ওঠে সেই ফেলে আসা দিন গুলো। ভালবাসার ফাগুনে, আগুণ ঘিরে এল।

বিধাতা হাসলেন। সেরিব্রাল অ্যাটাকের অছিলায় মরণ এসে হঠাৎ শুধু তার বাবাকেই নিয়ে গেল তা নয় মা-মরা বিশ্বনাথকে এই বিশ্বসংসারে পুরোপুরি অথৈ জলে ফেলে দিল। সেদিন সে টের পেল ‘সুপারিশ’ এই শব্দটা কি ভয়ংকর রকমের বাস্তব। এর দরজায় ওর দরজায় মাথা ঠুকে , ধর্ণা দিয়েও ‘শব্দটার’ কোন আশীর্বাদ না থাকায় জুটলো না যোগ্যতা মতো কোন চাকরি। ঢুকতে হয়েছে টায়ার-ফ্যাক্টরিতে।

ছিন্নভিন্ন বিশ্বনাথের অবস্থা আরও নির্মম করে তুলল রমার বাবার স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। রমার বিয়ের ব্যবস্থা পাকা হয়ে গেল। রাতের অন্ধকারে রমা শিক্ষা-দীক্ষা-পারিবারিক শৃঙখলা সব কিছু কে পাশে সরিয়ে তার হাত ধরে এসে ওঠে এই আধা শহরে। চোয়াল দুটো যত জোর পারে চেপে চোখ বন্ধ করে বিশ্ব মলিন-মুচকি একটা হাসি ছুঁড়ে দিল লাল-লাল ফুল থোকার দিকে। মন বলে –রমা ভুল করেছে। কি পেল রমা? কি দিতে পেরেছে সে। অভাব, অভাব আর অভাব ! এ’লড়াই এর কাছে পরাজয় না মানলেও আপোসের করুণা নিয়ে বাঁচতে হচ্ছে। আপোসের যে কি জ্বালা তা কারও কাছে বলে জুড়নোর কোন অজুহাত খুঁজে পায় না বিশ্ব। বাবা হয়েও ছেলের ন্যূনতম চাহিদা, প্রয়োজন মেটাতে পারছে না। প্রিয়তমের মন রাখতেও অপারগ। অতীতে দেখ স্বপ্নগুলো যেন বর্তমানের জল-কাদায় দাঁড় করিয়ে মুখ ভ্যাংচায়।

বিশ্বনাথের সম্বিত ফেরে ফ্যাক্টরির ভোঁ-ও-ও-ও শুনে। এঃ দেরি হয়ে গেল।প্রায় ছ’মাস পরে ফ্যাক্টরি খুলেছে আজ নিয়ে এই সাত দিন হল। নতুন বছর আসতে বেশি দেরি নেই। আশা-নিরাশায় দুলতে দুলতে বিরাট চোয়ালের মত লোহার তৈরী গেট দিয়ে ঢোকে। অ্যাটেনডেন্সে সই করে ঢোকে নিজের ব্লকে।

(৩)

“কি ব্যাপার বলতো রমা! হুঁ ? আশীষবাবুর পড়ানো হয়ে গেলেও বাড়ী যাওয়ার তাড়া নেই। নোটসের খাতা রোজই বিশ্বকে দিস্ আর নিস্। টিউশন কি আমরা কেউ পড়ি না।একই ব্যাচে তো আমরা সব্বাই নোটস্ নিই,তোর খাতায় কি কিছু এক্সট্রা ‘নোটস্’ থাকে? হি হি হি ...” ...ফিচলেমির গুরুমা অর্পিতার কূটলামি ভরা উক্তি শুনেও না শোনার ভান করে পাশ কাটাতে যাচ্ছিল রমা। এক হ্যাচকা টানে ব্যাগ সমেত রাস্তার পাশে জামরুল গাছটার নীচে টেনে থামাল অর্পিতা। ঘিরে ধরেছে মিতা, শ্রাবন্তী-চোখগুলো সবার দুষ্টুমিতে ভরা, মুখে আবিষ্কারের তৃপ্তি। ভাবখানা-‘এইবার পেয়েছি’-আমাদের ফাঁকি দেওয়া।

‘না কিছু না-ডিক্টেশন নিতে গিয়ে বিশ্ব কিছু কিছু মিস্ করে যায়-তাই সেগুলো ভেরিফাই করে নেয়।’

‘দ্যাখ যেটা তোর দ্বারা হবে না সেটা করিস না-মিথ্যে বলতে পারিস না-চেষ্টাও করিস না-সত্যিটা বল্’-মিতা দাবড়ায়।

‘আরেঃ! আমরা কি কেউ বলেছি যে আমাদের ভাগ দে-শুধু শ্রবণে শান্তি! তাও দিবি না, কি হিংসুটে রে তুই’-শ্রাবন্তীর খোঁচাটা অর্পিতা খপ্ করে ধরে নিয়ে বলল-‘হ্যাঁ ও একাই তো সুন্দরী – আমরা তো সব বাঁদরি;-ভগবান ‘বিশ্বনাথকে’ তুষ্ট করতে পেরে উনি মাতা পার্ব্বতী হয়ে কৈলাসবাসী হবেন-তা মাতা আমরা তো পাপী-একটুখানি কানে অমৃত ঢালুন না –প্লিজ...।’

রমা চুপ করে মাথা নীচু করে অর্পিতার লং-স্কার্টের ঝিকমিক চুমকির দিকে চেয়ে রইল।

‘দ্যাখ বেশী তেলানোর মুডে নেই-বলবি তো বল্ না হলে এই রইলি তুই-চললাম’-হাত ছাড়িয়ে অর্পিতা চলে যেতে গেল।

‘দাঁড়া যাস না।’রমা জামা টেনে ধরে। “হ্যাঁ বিশ্ব আমাকে ভালোবাসে কিন্তু...”

‘ওহ মাই গড্। আই নিউ ইট। মিতা বেট আমি জিতেছি, খাওয়াটা নো মিস। দেখলি তো আমি তোদের ব্লেছিলাম না-আমাদের ম্যাডাম সিংকিং অ্যান্ড ড্রিংকিং ওয়াটার অফ্ কৈ্লাস ’-অর্পিতা চিৎকার করে উঠল।

‘কি করে? কবে? কি ভাবে? সব বল্’। শ্রাবন্তীর আর তর সইছে না।

‘উফ তোরা না বড্ড ভাবছিস-আমি কিছুই করিনি ’-রমার কথা শেষ হবার আগেই সকলে চেঁচিয়ে উঠল-

“মানে!”

‘না মানে আমি কোন রেসপন্স করিনি’।

রান্নাঘরে কৌ্টো-বাটা কাপড় দিয়ে মুছতে মুছতে রমার মনে পড়ছিল সেই সব দিন গুলোর কথা। হঠাৎ করে তার জীবনে বিশ্বনাথের আসা, জড়িয়ে পড়া সারা জীবনের বাঁধনে, নানা ওঠাপড়াময় রাস্তায় এক সাথে চলার শুরু।

‘তোর খাতাটা একটু দিবি।আমি তো পরে এসেছি। কটা ক্লাস মিস করে গেছি। দিবি?’ –একটা চশমা পড়া, ফর্সা, ল্যাকপ্যাক সিং-এর মত কিন্তু ডিসেন্ট ছেলে আস্তে করে রমা কে বলে; সম্মতির আশায় ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। এই ব্যাচে নতুন এসেছে –আর.কে.এম. –এ পড়ে-হাঁদা-টাইপ।

কোন উত্তর না দিয়ে খাতাটা এগিয়ে দেয় রমা।

‘থ্যাংক য়্যু’। আরেকবার ‘থ্যাংক য়্যু’ দিয়েছিল খাতাটা ফেরৎ দেওয়ার সময়।

ব্যস্ ঐ পর্যন্তই। ক্রমে খাতা দএওয়া-নেওয়াটা যেন অভ্যাসের মধ্যে পড়ে গেল। রমা উসখুস করত-কি রে বাবা খাতাটা চাইছে না কেন!

মুচকি হেসে রমা উনুনের খুপড়িতে হাত ঢোকায়। একমুঠো আধপোড়া কয়লা নিয়ে বেরিয়ে এল হাত। কিন্তু সেদিন ব্যাগের খাপ খুলেই অবাক; একমুঠো লজেন্স! হাতে নিয়ে মুখ তুলতেই দেখে- হাসিমুখে বিশ্ব “হ্যাপি বার্থ ডে”।

‘তুই কি করে জানলি?’

‘অর্পিতারা জোরে জোরে বলাবলি করছিল, আমি শুনে ফেলেছিলাম, সরি!’

‘হুম। থ্যাঙ্ক য়্যু, এই নে খাতা’।

‘ও হ্যাঁ দে।’

কয়েকদিন পরে বিশ্ব যখন খাতা ফেরত দিল। বাড়িতে পড়তে বসে খাতা খুলে রমার গলা শুকিয়ে গেল। নোটস এর একটা প্যারাগ্রাফের মধ্যে থেকে ‘আর-এ-এম-এ-আই-এল-ও-ভি-ই-ওয়াই-ও-ইউ’; লেটারগুলো ফ্লুরোসেন্ট মার্কার দিয়ে হাইলাইট করা। ছেলের সাহস দেখ।

রমার কিন্তু রাগ হল না-অবাক হল, হাসি পেল আবার একটু ভয়ও করল।

রমা বন্ধুদের সব বলে ফেলল।

‘কি রে তুই!’

‘দ্যাখ-এখনি বিশ্ব বাইরে আসবে। ঢং না করে এই খাতা দেওয়া-নেওয়াটা কেই কনফার্মেশন এক্সচেঞ্জে কনভার্ট কর। খু-উ-উ-ব ভালো ছেলে রে, আমাদের পাড়াতে থাকে, মা নেই, বাবা কলেজে পড়ায়, ভালো ছবি আঁকে-মাইরি বলছি এবার না আমিই ওকে প্রপোজ করে দেব। যদিও আমাকে ফিরেও দেখেনি কোনোদিন।’ অর্পিতা ভয় দেখালো।

‘নাঃ!’ লজ্জিত রমা কুঁকড়ে গিয়ে বলল ‘কি করি বল? আমার ভয় করে।’

মিতে ভেঙিয়ে উত্তর দিল-‘ন্যাকা! কোডিং-এই জবাব দে’।

হাত লেগে সরষের ডিবেটা উলটে গেল। মেঝে থেকে সাবধানে সাপটে তুলতে তুলতে রমার মনে হল-এভাবেই সেদিন খাতা জাপটে , খটখটে রোদে দাঁড়িয়ে কোনমতে বিশ্বকে খাতা দিয়েই পালিয়ে এসেছিল। জীবনের সব দায় ভার বিশ্বর হাতে দিয়েই যেন চলে এসেছিল।

ঘরের আলনার জামা-কাপড় ভাঁজ করতে করতে রমার মনে পড়ল-তুমুল বৃষ্টিতে পাবলিক বুথের আধভাঙ্গা শেডের নীচে দাঁড়িয়ে দু’জনের সেই কাক ভেজা আর বিশ্বর ওকে আড়াল করার আপ্রাণ ব্যর্থ চেষ্টা করে যাওয়া।ভিজে সপসপে রমা শুধু বাইরেই ভেজেনি মনের প্রতিটি কুঠুরি জলময় হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বর অজান্তেই থুতনি চুঁইয়ে পড়া জলধারা রমার নারীত্বের গ্রস্ত-উপত্যকার মাঝ দিয়ে বয়ে চলে যাচ্ছিল গভীর ঢালে; শিহরিত করছিল তাকে।মনে পড়ল-বিশ্বর বাবা মারা যাওয়ার দিনটার কথা। সবে থার্ড-ইয়ার পরীক্ষা দিয়েছিল। হাউ হাউ করে কাঁদছিল ও, ওকে দেখে রমাও। বিশ্ব-রমা জানতও না ওদের জন্য জীবন কোন নাট্য-বিশেষের পটকথা রচনা করে রেখেছেন।

এঃ, বেলা গড়িয়েছে, একদম বুঝতে পারেনি রমা। সুমনের আসার সময় হয়ে গেছে। স্কুলে মিডডে মিলের ব্যবস্থা হওয়ায় দুপুরের খাওয়াটা স্কুলেই হয়। আনমনা রমার মনে হল -এ কি হচ্ছে! কেন হচ্ছে-ছটফটিয়ে ওঠে।

(8)

আনমনা ভাবে সিফট সেরে জলে-কাদায় ভরা রাস্তা ডিঙিয়ে বাড়ি ফিরতে প্রায় সন্ধ্যে। বাড়ির গলিতে ঢুকতে গিয়ে দেখে লোড-শেডিং। ঘরে আলো জ্বলছে না। হাত-পা ধুতে ধুতে বিশ্বনাথ মৃদু ডাকে-‘রমা’! ভেতর থেকে কোন সাড়া আসে না। বিশ্বনাথ বিব্রত বোধ করে বোধ করে, সকালের ঘটনা মনে পড়ে ভেতর থেকে কুঁকড়ে যায়। ঘরে ঢুকে চোখ সইয়ে দেখে বিছানায় সুমন শুয়ে; রমা মাথার কাছে নিথর ভাবে বসে।

‘কি হয়েছে?’

ছেলের গায়ে হাত দিয়ে বিশ্ব আঁতকে ওঠে, এ যে আগুণ।

মুদির ধার শোধের টাকা দিয়ে বড় রাস্তার ওষুধের দকান থেকে তখখুনি গিয়ে ক’টা ট্যাবলেট নিয়ে আসে।

রাতে বিশ্ব লম্ফের কাঁপা আলোর সামনে বসে আছে। ছেলেটা একটু ঘুমিয়েছে। কাঁচা পেঁয়াজ আর রুটি, কলাই করা সাদা থালায় নিয়ে রমা আঙুল দিয়ে ফাকা জায়গাটায় দুর্বোধ্য সংকেত আঁকছে। সাদাকালো পোড়া দাগময় রুটির দিকে তাকিয়ে বলে-‘আমায় ক্ষমা কর রমা। প্লিজ। আমি যে কি করি বুঝে উঠতে পারি না। সকালের কথাগুলো আমি মন থেকে বলিনি , তুমি ভীষণ কষ্ট পেয়েছ জানি। কি করবে বল! তোমাকে আমি স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারি না, সত্যি ; কিন্তু বিশ্বাস কর আমি এতটা নীচ নই’।

বিশ্বনাথ কাপা হাতে রমার হাতটা চেপে ধরলো। তার গলা ধরে আসছে। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে। হাত কেমন অসাড় লাগছে।

রমা কিছু বলল না। শুধু মুখ তুলে চাইল। চোখে অনুযোগের মুক্ত টল টল করছে। ঠোটের কোণে মেখে রয়েছে এক বর্ণণাতীত বর্ণছটা। দু’জোড়া চোখ, তাদের ভাষা বুঝল।একটু পেঁয়াজ , এক টুকরো রুটির মধ্যে পুরে রমার মুখের সামনে ধরতেই রমার যেন বাঁধ ভেঙে গেল। ঝাঁপিয়ে পড়ল বিশ্বনাথের বুকের ওপর। পরম স্নেহে বিশ্ব রমার মুখটা চেপে ধরে রাখল নিজের বুকের ওপর। কতক্ষণ কে জানে। কোন কথা নেই। শুধু ধুক-পুক ধুক-পুক শব্দ বিনিময়ে কথা বলে চলল দুই হৃদয়। একে অপরের সাথে। চোখের জল ভিজিয়ে নিয়ে গেল বিশ্বনাথের বুকের কয়েক মণ ভার; রমা পেল আঁকড়ে থাকার সম্বল।

‘মা জল খাব।’

‘দিই সোনা’, ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ে রমা।

অনেক রাত অবধি জল-পট্টির ঠান্ডা জল শুষে নিতে থাকে সুমনের জ্বর, জমা হতে থাকে অ্যালমুনিয়ামের বাটির জলে। কখন যে বিশ্ব রমার কোলে মাথা গুঁজে হারিয়ে গেছে পরম শান্তির, চেনা গন্ধ-মাখা বাগানে। রমার বুকের আঁচল সরে গেছে, মোহময়ী, বর্তুল-তট ঘুমন্ত বিশ্বর কাছে নেমে এসেছে। কোমল আবেশে রমা তার ‘বিশ্ব’-কে চেপে ধরে।

কলতলায় বাসন মাজার শব্দে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে বিশ্বনাথ।

ইস- বড্ড দেরি হয়ে গেছে। রাতে সুমনের জ্বরটা আর আসেনি। পাশেই শুয়ে আছে, সাদা পোকাটার মত। ছোট্ট কপালে এসে পড়ছে সকালের আলো। দেবশিশু যেন। নাঃ আর জ্বর নেই। ‘এখনও বসে আছ! দেরি হয়ে যাবে না?’ রমা ভেজা হাত আঁচলে মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকেই বলল। বিশ্ব ওর হাত দুটো ধরে কাছে টেনে নিয়ে জাপটে ধরে।

‘আঃ, ছাড়ো, ছেলে উঠে পড়বে, চান সেড়ে ফেল না হলে কলের জল চলে যাবে’।

‘ও কে ম্যাডাম!’ বিশ্ব হতাশ হওয়ার ভান করে কাঁধে গামছা নিয়ে বেরিয়ে গেল।

ঝটপট রেডি হয়ে নিয়ে ব্যাগ হাতে বেড়োতে বেড়োতে বিশ্ব বলল-‘রমা আজ তাড়াতাড়ি ফিরব’। রমা হাসিমুখে বিদায় জানায় তার প্রিয় মানুষটিকে।

(৫)

‘মানছি না মানব না। কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও।আমাদের দাবী মানতে হবে মানতে হবে’।বিশ্বনাথ হতভম্ব হয়ে যায়।

আবার।

আজ ‘পলাশের’ পাশে ইউনিয়নের ঝান্ডা হাতে কয়েকশ শ্রমিক সমস্বরে মালিকের মুন্ডুপাত করছে। আবার লক-আউট। বিশ্ব নিমেষে যেন চোখে অন্ধকার দেখে। ভারহীন মনে হয় শরীর। দুনিয়া যেন দুলে উঠল। সহকর্মী বিনোদকে জিগ্যেস করায় খাঁটি ‘ইলিশে’ উত্তর এল-

‘সকালে আইস্যা দেহি হেই দরজাডার উপর হেই পুষ্টারখান সাঁটানো।’ বিনোদ বলে চলে-‘মনে আসে, ইউনিয়নের দাদারা ম্যানেজার বাবুর অপিস ভাঙছিল, অরে প্যাদাইছিল? পুলিশ আইয়া হ্যাগরে ধরছিল। কাউলকা অদের ছাইড়া দিতে হইব দাবিতে গেরাও করছিল। তুই ত কুনও খবর রাখস না’।

বিশ্ব অধীর হয়ে ওঠে। বিনোদ বলে চলে-‘হালার মালিক পষ্ট কইছে হইব না তার উপর আবার পয়সার অবাব, ব্যাতন দিতে পারব না, বকেয়া তো একদম না। এহনে সব কিছু মিশাইয়া তালগোল পাকাইয়া জগা-খিচড়ি হইয়া অনিদ্দিষ্ট কালের লাইগ্যা কারখানা বন্ধ কইর‍্যা দেতেছে...’।

বক্তব্যের পুরোটা বিশ্বনাথের কানেও গেল না। ‘কারখানা বন্ধ’ এটুকু শুনেই সে ধপ করে বসে পড়ে মোরাম বিছানো পলাশ গাছের তলায়। চোখে ভেসে ওঠে রবার গলানো ধোঁয়া। মাথার ওপর দিয়ে চলে দ্রুতগামী ট্রেন। কারখানা বন্ধ শব্দটাকে মাঝখানে রেখে যেন মাথাটা লাট্টুর মত পাক খেতে থাকে। চোখ ঝাপসা হয়ে এল। লুটিয়ে পড়ল বিশ্বনাথ। সংজ্ঞা হারানোর মুহূর্তেও কানে আসে-

‘মানছি না মানব না’। চারিদিক লালে লাল।

-------

প্রচ্ছদঃ পিনাকী



bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.