নিখোঁজ



নীরার আজ একটুও ফুরসত নেই। গত কয়েকদিন ধরেই সন্ধেবেলাটা সে দম ফেলার সুযোগ পাচ্ছে না। আজ তো আরও ব্যতিব্যস্ত অবস্থা। আত্মীয়স্বজন পাড়া- প্রতিবেশীতে পুরো বাড়িটা গিজগিজ করছে। আদর- আপ্যায়ন, হাসি- ঠাট্টা, রঙ্গ- রসিকতায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। আজ নীরার মেয়ের বিয়ে।

নীরার মেয়েকে দেখতে অসম্ভব সুন্দরী। ডানাকাটা পরীর মত তার রূপ। নীরাকেও এই বয়সে ঠিক এরকমই দেখতে ছিল। নীরার মেয়ে প্রতিমার মত টানাটানা চোখ পেয়েছে জন্মসূত্রে। মেয়েকে দেখলেই নীরার নিজের যৌবনের অনেক ধুলো চাপা স্মৃতি মনে পড়ে যায়। সাথে একটা প্রচ্ছন্ন মাতৃসুলভ গর্বও সে অনুভব করে।

নীরার স্বামীর সাথে খুব একটা বনিবনা নেই। আজকের দিনেও নীরা তার স্বামী অতুলের সাথে ভাল করে কথা বলেনি, শুধু না বললেই নয় এমন কয়েকটা জরুরি বক্তব্য ছাড়া। আসলে মেয়েকে অতুল কোনোদিনই ভালবাসতে পারেনি। নীরাকে বারবার কথা শুনিয়েছে কন্যা সন্তান জন্ম দেবার জন্য। তাদের স্বামী- স্ত্রীতে ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি লেগেই আছে। অন্য কোনও মেয়ে হলে হয়ত এতদিনে আলাদা থাকার সিদ্ধান্ত নিত। শুধু মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই নীরা আজো কলুর বলদের মত এই সংসারের ঘানি টানছে। মাঝেমাঝে অসম্ভব বিরক্তি লাগে নিজের ওপর। কিন্তু তাও তারা সমাজের সামনে এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করে যেন তাদের চেয়ে সুখী দম্পতি দুনিয়ায় খুব কমই আছে।

আজ নীরার ওপর প্রচুর দায়িত্ব। তার স্বামীর যেহেতু দায়িত্ববোধ বলে কোনও বস্তু নেই তাই তাকেই সবদিক সামলাতে হচ্ছে। এখানে- ওখানে গিয়ে আত্মীয়স্বজনদের আদর আপ্যায়ন করছে আর পুরো অনুষ্ঠানটায় যাতে কোনও খামতি না থেকে যায় তার তদারকি করছে।

হঠাৎ কোরাসে মেয়েরা চিৎকার করে উঠল, ‘বর এসেছে! বর এসেছে!’ নীরা শুনেই ছুটে বেরিয়ে গেল বরযাত্রীদের অভ্যর্থনা করতে। শঙ্খ আর উলুধ্বনিতে পুরো পরিবেশ মাতোয়ারা হয়ে উঠল। নীরা অনুভব করল তার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। তার দুঃখ হচ্ছিল যে তার সন্তান তাকে ছেড়ে অন্যের ঘরে পাড়ি দিচ্ছে। কিন্তু একইসাথে একটা আনন্দও হচ্ছিল যে তার মেয়ে নিজের পছন্দের মানুষের সাথে সংসার করার সুযোগ পাবে। হয়ত তার মেয়ের দাম্পত্য জীবন তার মত এতটা প্রেমহীন হবে না।

নীরার জামাই বেশ লম্বা আর সুপুরুষ। ও এখন একটা বহুজাতিক সংস্থার বেশ উঁচু পদে কর্মরত। প্রায় তিন বছর ধরে নীরার মেয়ে-জামাইয়ের প্রণয়ের সম্পর্ক, যা আজ অবশেষে পরিণয়ের রূপ নিচ্ছে। নীরা প্রাণভরে জামাইকে আশীর্বাদ করল।

নীরার মেয়ে লাল রঙের একটা বেনারসি শাড়ি পরেছে। ভারী সোনার গয়না, ঝোলা কানের দুল আর চন্দনের শোভায় রূপ যেন একেবারে ফেটে বেরোচ্ছে। নীরা মেয়েকে কনের বেশে দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে গেল।

আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিয়ের মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে। নীরা আবার অতিথিদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পুরোহিত মশাই প্রস্তুত। পবিত্র বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়ে শুরু হবে এক নতুন দাম্পত্য। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে। এমন সময় নীরার ছোটবেলার বন্ধু লতা ছুটতে ছুটতে তার কাছে এল। ফিসফিস করে নীরার কানে- কানে বলল, ‘তোর মেয়েকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!’

নীরা এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। কিন্তু আত্মীয় পরিজনদের সামনে সে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটা প্রকাশ করল না। ও লতাকে নিয়ে এদিক- ওদিক খুঁজতে শুরু করল। খবরটা ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। শুরু হল ফিসফাস, গুঞ্জন আর যত রাজ্যের কষ্টকল্পনা। চারিদিকে হুলস্থুল পড়ে গেল। নীরা তার মেয়েকে চিৎকার করে ডাকতে লাগল। কিন্তু কোনও সাড়া পেল না। নীরার স্বামীসহ অন্যান্যরাও ওর খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

নীরার মনে একটা অজানা আতঙ্কের সঞ্চার হল। তার সমস্ত শরীর উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিল। বাড়ির ছাদ, উঠোন, রান্নাঘর, বাথরুম, বাগান- কোথাও আর খুঁজতে বাকি থাকল না। কিন্তু তার মেয়ে নেই, কোথাও নেই।

নীরার নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। আর একা ... প্রচণ্ড একা। এত লোকের মাঝে এই একাকীত্বের অনুভূতি নীরার কাছে অসহ্য ঠেকছিল। মনে হচ্ছিল, সারা পৃথিবী তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করছে, খিলখিল করে হাসছে। নীরার এখন মাথা টলছে। চোখের সামনের সবকিছু ঝাপসা হতে- হতে দূরে ... বহু দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কত লোক চিৎকার করছে, কিন্তু কোনও শব্দ তার কানে আসছে না। তার জগতটা আস্তে- আস্তে বর্ণহীন, শব্দহীন হয়ে আসছে। এমন সময় নীরার দুঃস্বপ্নটা ভেঙে গেল।

নীরা জেগে উঠল নার্সিং হোমের বেডে। তার সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে আছে। নীরা অভ্যাসবশে যত্ন- সহকারে নিজের পেটে হাত বোলালো। বুঝতে পারলো, শ্বশুরবাড়ির অমতে যে মাংসপিণ্ডটা তার পেটে তিলতিল করে বেড়ে উঠছিল, সেটা এখন নিখোঁজ।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.