অলীক সুখ


খুব ছোটবেলায় সমীরের বাবা মারা যাওয়ায় সমীর খুব অর্থকষ্টে ভুগেছে। ওর মা মনীষা বেশী শিক্ষিত ছিল না। সমীরের বাবা কারখানার শ্রমিক ছিল। তিনি মারা যাওয়ায় এবার সমীরের মা লোকের বাড়ী কাজ করা শুরু করল। ছোট্ট সমীর একা বাড়ীতে থাকত।সকালে স্কুলের মিড ডে মিল থেকে খাওয়া জুটে যেত। কিন্তু বিকেলে সমীরকে খিদেয় কষ্ট পেতে হত। পাশের বাড়ীতেই এক মারোয়াড়ী ভদ্রমহিলা থাকতেন। উনি খাবারের লোভ দেখিয়ে সমীরকে দিয়ে টুকটাক ঘরের কাজ করিয়ে নিতেন,এমনিতে কাজের লোক রাখলে মায়না দিতে হবে কিন্তু সমীরকে শুধু খাবারের লোভ দেখিয়েই সব কাজ হয়ে যেত।ওই মহিলা খুব ভোজন রসিক ছিলেন। ওনার হাতে হাতে কাজ করতে করতে সমীর ওনার দেখে দেখে মটর পনীর,চানা মশলা,তড়কা এইসব রান্না করা শিখে গিয়েছিল।

মাধ্যমিকের পর আর পড়া হয়নি সমীরের কারণ ওর মা মনীষা এবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন।সমীর বাধ্য হয়ে একটা হোটেলে কাজ নিল। হোটেলটা খুব একটা ছোট হোটেল নয়। সমীরের হাতের রান্না ভাল ছিল দেখে হোটেলের মালিক ওকে কাজে রেখেছিল।ও কুকের কাজও করত আবার ওয়েটারের কাজও করত।পুরি,ধোসা,পনির বাটার মশালা ইত্যাদি ভেজ আইটেমের হোটেল।প্রচুর ভির। কাজ শেষে রোজ সমীর গভীর রাতে বাড়ী ফেরে। এভাবেই একদিন রাতে ফিরে বিছানাতে শোওয়া মাকে ডাকতে গিয়ে দেখল যে মা আর জীবিত নেই। বুকের ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল সমীরের। মা ছাড়া তো অন্য কোন কিছুই কোনদিন ভাবেনি ও। মায়ের শ্রাদ্ধশান্তি করে আবার আগের মত কাজে মন দিল সমীর। কিন্তু মাঝে মাঝেই ওর মনে হত যে, "কেন এসব করছি আমি???আর কার জন্যই বা করছি??শুধু নিজের জন্য কাজ করার দরকার আছে কি?"..কিন্তু তাও রোজকার অভ্যাস বসে কাজ করে যেত।

একদিন হোটেলের এক কাষ্টমার মহিলাকে দেখে অবাক হয়ে গেল সমীর। অবিকল ওর মায়ের মুখ বসানো। ভদ্রমহিলার সাথে একজন ভদ্রলোকও ছিলেন সম্ভবত ওনার স্বামী । সমীর নিজেই ভদ্রমহিলাকে অ্যাসিস্ট করতে গেল।ও বলল,"বলুন স্যার-ম্যাম আপনাদের কি লাগবে??....ওনারা পুরি আর চানা মশালার অর্ডার দিলেন। সমীর অর্ডার নিয়ে সার্ভ করার পর মহিলার খাওয়া দেখতে লাগল। খেতে খেতে মহিলা হঠাৎ তার স্বামীকে বলে উঠলেন,"এই দেখ না!!!এদের চানা মশলাটা দারুন হয়েছে। আমি টি.ভি দেখে বাড়ীতে যেটা বানিয়েছিলাম সেটা তো কই এত ভাল হয় নি।নিশ্চই এরা অন্যরকম ভাবে বানায়"...এই বলে ভদ্রমহিলা সমীরের দিকে তাকিয়ে বললেন,"এই ভাই শোনো না!!তোমরা চানা মশলাটা কিভাবে বানাও গো??একটু আমাকে বল না??"...ভদ্রমহিলার স্বামী এবার ভদ্রমহিলাকে ঠেলা দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলেন,"কি করছ কি তুমি???..ওদের স্পেশাল রেসিপি ওরা বলবে নাকি??...হোটেলে এসে এরকম বোকার মত আচরণ কোরো না।"..ভদ্রমহিলা এবার আবার সমীরের দিকে তাকিয়ে চোখ ছলছল করে বেশ জোরে জোরে বলে উঠলেন,"কি গো!!তোমরা আমাকে রেসিপি বলবে না??!এত হিংসে তোমাদের মনে???কি হয় গো বললে??"...সমীরের মনে হল যেন ওর মা ওর কাছে আবদার করছে। ও বলল,"কেন বলব না ম্যাডাম....নিশ্চই বলল"...এই কথা বলে সমীর ওই ভদ্রমহিলাকে রেসিপি বলতে লাগল।

ওনারা চলে যেতেই হোটেলের মালিকের ঘরে ডাক পড়ল সমীরের। মালিক প্রথমেই সমীরের গালে সোজা এক চড় কষিয়ে দিল আর বলল,"শালা শুয়োরের বাচ্চা!!আমার ব্যবসা ডোবাবি???কাষ্টমারকে রেসিপির দানছত্র করছিস???....কাল থেকে এমুখো হবি না"....

কাজ গেল সমীরের। আর কোথাও সমীরের চাকরী হল না।সব হোটেলের মালিকরাই জেনে গেছে যে সমীর কাষ্টমারকে রেসিপি দান করেছে।লোকে এখন ওকে ব্যঙ্গ করে 'দাতা কর্ণ'...বলে।ওদিকে ওই মহিলাটি সমীরের দেওয়া রেসিপি দিয়ে রান্না করে জগৎবিখ্যাত হয়ে গেলেন।লোকে বলতে লাগলো,"বৌদি/কাকীমা তো সাক্ষ্যাত দেবী অন্নপূর্ণা!!..কি রান্নার হাত...ভাবা যায় না।"..

সমীর এখন ভিক্ষে করে।ওর একার খুব একটা খেতে লাগে না। তাই পেট ভরার জন্য যতটুকু ভিক্ষে করা দরকার ততটুকুই করে আর বাকী সময়টা সামনেই গঙ্গার পারে যে শিবমন্দির আছে তার চাতালে গিয়ে শুয়ে থাকে।কোন দিন ইচ্ছে হলে বাড়ী ফেরে আবার কোনো কোনোদিন ফেরেও না।

একদিন ওই মন্দিরের চাঁতালে শুয়ে থাকতে থাকতে একটা ছোট বাচ্চার কান্না শুনতে পেল সমীর। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল একটু দূরে একটা বছর দেরেকের বাচ্চা বসে কাঁদছে। তার থেকে আর একটু দূরে এক ভিখারিনী আরও দুটো বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে বসে আচ্ছে।ওই বাচ্চাগুলো অবশ্য একটু বড়। সমীর এগিয়ে গিয়ে ওই মহিলাটিকে জিজ্ঞাসা করল,"ওই বাচ্চাটি কি তোমার??"...মহিলা মাথা নারাল। অগছালো এলো চুলে নিষ্পাপ দুটি চোখ। বেশ সুন্দর দেখতে মেয়েটিকে।সমীর জিজ্ঞাসা করল,"ও কাঁদছে কেন?"..মেয়েটি বলল,"ও ভাত খেতে চাইছে।কোথা থেকে দেব ভাত??ওদের বাবা দু-মাস আগে মারা গেছে।আমি তো কোনো কাজ জানি না তাই ভিক্ষে করি।আজ ভিক্ষে মেলে নি"...সমীরের কাছে ভিক্ষের দশ টাকা ছিল।কয়েকটা বিস্কুট কিনে এনে বাচ্চাগুলোকে দিল। ওদের মা কেও দিতে চাইল কিন্তু ও নিল না।

রাত হল। চাঁদের আলোয় মন্দিরের চাঁতালেই ঘুমিয়ে পড়ল সমীর।

সকালে তিনটে বাচ্চারই কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল সমীরের। ও উঠে দেখল তিনটে বাচ্চা হাপুস নয়নে কাঁদছে। ওদের মা কে দেখা গেল না।সমীর জিজ্ঞাসা করল,"তোদের মা কই?"..একটি বাচ্চা বলল,"রাতে আমার জল তেষ্টা পেয়েছিল বলে জল আনতে গিয়েছিল। তারপর আর ফেরে নি"...সমীর এবার একটু সামনে এগিয়ে গেল।কিছুদুরে গিয়ে দেখল যে পুলিশ জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। ভিরের মধ্যে দিয়েই দেখার চেষ্টা করল সমীর। ওই মহিলাটির মানে ওই বাচ্চাগুলির মায়ের রক্তাক্ত মৃতদেহ পরে আছে। সারা শরীরে ধর্ষণের চিহ্ন।"...

পুলিশ বডি নিয়ে চলে গেল। সমীর বাচ্চাগুলোর সম্পর্কে কিছুই বলে নি পুলিশকে। পুলিশও সমীরকে কিছু জিজ্ঞাসা করে নি।

বাচ্চাগুলো খিদের জ্বালায় কাঁদছে।খুব কষ্ট হল সমীরের। ও বেশী বেশী করে ভিক্ষে করতে লাগলো। আজ ভাল টাকা হয়েছে। বাচ্চাগুলোকে খাওয়ানোর পরও পয়সা বেঁচে গেল। হঠাৎ কি মনে হল সমীরের ও নিজের বাড়ীতে দৌড়ে গেল আর একটা কড়াই আর কিছু বাসন নিয়ে আসল। বাকী পয়সা দিয়ে সামান্য আলু, নুন,তেল আর ব্যাসন কিনে এনে দুটো ইঁটের ভাজে গঙ্গার পাড়ে পড়ে থাকা শুক্ন ডালপালা ঢুকিয়ে চপ ভাজতে লাগল।বড় দুটো বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে নিল। একটু বাদেই খদ্দের জমতে লাগলো। বিক্রি হওয়ার পর সেই টাকা দিয়ে আবার আলু, তেল ইত্যাদি সব জিনিস কেনা হল আর আবার চপ ভাজা হল। রাত্রে সব বিক্রি হওয়ার পর চাল কিনে ভাত রাঁধা হল।তারপর চপ দিয়ে সবার ভাত খাওয়া হল।রাত্রে বাচ্চাগুলোকে নিজের বাড়ীতে নিয়ে এল সমীর।

এক বছর পর।এখন সমীরের চপের দোকান বেশ নাম করে গেছে।আলু ছাড়াও টম্যাটো, মোচা,ভেজ ইত্যাদি বিভিন্ন চপ বানায় সমীর। একদিন উপরের ফ্ল্যাটের এক মহিলা চপ কিনতে এসে সমীরকে জিজ্ঞাসা করলেন,"ভাই তোমার টম্যাটোর চপটা খুব ভাল হয়।কিভাবে বানাও বলবে??"..সমীর চুপ করে রইল।মহিলাটি নাছোড়বান্দা, ও জিজ্ঞাসা করে যেতেই লাগলেন।শেষে সমীর বাধ্য হয়ে উত্তর দিল,"চপ খাচ্ছেন খান।জিজ্ঞাসা করবেন না।"...মহিলাটি বলে উঠল,"বাবা!!কি স্বার্থপর চপওয়ালা রে বাবা'..আর কোনদিন এখান থেকে চপ কিনব না"...এই বলে চলে গেলেন।কিন্তু মহিলাটি নিজের কথা রাখতে পারলেন না। এত সুন্দর চপ খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে শেষে নিজে না এসে নিজের মেয়েকে পাঠিয়ে চপ আনাতে লাগলেন।সমীর ওনার মেয়েকে চেনে তাই ওনার কান্ড দেখে মনে মনে মুচকী মুচকী হাসে। সমীর এখন অনেক স্বার্থপর হয়ে গেছে।আর হবেনাই বা কেন???বাচ্চাগুলো যে ওকে এখন বাবা বলে ডাকে।ওদের পেটের কথা ভেবে যে স্বার্থপর হতেই হয় সমীরকে।নিজের গোপন রেসিপি সবাইকে বলে দিলে কি আর তারা সমীরের কাছে চপ খেতে আসবে??..বোধহয় না।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.