ধুর , তুমি না কি যে করো? আজ আমাদের কি প্রোগ্রাম ছিল রৌনক?আর তুমি কোথায় এলে?

বছর তিনেক প্রেমের ঝড় সামলে সবে সাতমাসের বিবাহিত জীবন ওদের। তাই অর্চিতার আব্দারে উইকেন্ডে রৌনক গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পরে কোনো না কোনো জায়গায়। সারাদিন খাওয়া দাওয়া...আনন্দের পর ঘরে ফেরা।

শনিবার হঠাৎ ছুটি পাওয়ায় অর্চিতা বলেছিল,বহুদিন মুভি দেখিনি ,চলো আইনক্স।

অর্চিতা গাড়ির মধ্যে হেডফোন গুঁজে শ্রেয়া ঘোষালে বিভোর।

রৌনক ড্রাইভ করছে। বন্ধ চোখ খুলতেই অর্চিতা চমকে উঠেছে। এ কোথায় এনেছে রৌনক! শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে ঝাঁ চকচকে মাল্টিপ্লেক্সের জায়গায় এত সবুজ বনানী ঘেরা কোনো একটা গ্রাম। রাস্তার দুদিকে লম্বা লম্বা গাছের সারিতে,অস্তগামী সূর্যের ক্ষীণ আলো আরো ম্রিয়মান হয়েছে। সবুজের বুক ছুঁয়ে মিশ কালো পিচের রাস্তাটা যেন সবুজ শাড়ির ডগায় কালো পাড়।

রৌনক বললো, আজ এই বনজঙ্গলে হারিয়ে যাব আমরা। শহরের কোলাহলকে দূরে ফেলে চলে যাবো অনেকটা দূরে। মাঝে মাঝে রৌনকের মধ্যে একটা শিল্পী এসে ভর করে। অনেকটা এই রকম- শব্দের মায়াবী আবেশে কবিতা লিখতে হয়তো পারে না, অথবা তার রংতুলিতে হয়তো জীবন্ত হয়না সবুজ বনানীরা ,তবুও এই রৌনকের চোখ দুটোতে থাকে একটা উদাসী মন কেমন করা সুর। আজও তাই অর্চিতা বললো, বেশ তবে তাই হোক।

গাড়িটা ছুটছে সম্পুর্ন অচেনা পথে। পাশ দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে ছোট ছোট জনপদ।

আকাশ কালো করে বৃষ্টির আগাম বার্তা জানাচ্ছে। তবুও ওরা আজ বাঁধন বিহীন।

বারণ না শুনেই অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়লো গাড়ির কাঁচে।

এদিকে বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। এতক্ষনে বিপদ বুঝতে পারলো রৌনক। অল্পবয়সী নতুন বউকে নিয়ে এমন জনমানবহীন রাস্তায় আসাটা বড্ড অর্বাচীনের মতোই কাজ হয়ে গেছে।

অর্চিতা একটু ভীতু গলায় বলল,রণ..এ কোথায় এলাম।বাড়ি ফিরবো কি করে?

রৌনক তখনও মজার সুরেই বললো, ফিরবো না।চলো ওই দূরে কটেজে আলো জ্বলছে। ওখানে থাকবো।

ওরা কেন অপরিচিত আমাদের থাকতে দেবে?

আরে গ্রামের মানুষের মনে অতটাও জটিলতা নেই।চলো...গাড়িটা কোনোমতে জল কাদা পেরিয়ে একটা একতলা সাদা বাড়ির সামনে দাঁড় করালো রৌনক। প্রায় আধ ভেজা হয়ে গিয়ে ওই বাড়ির বেলটা বাজালো অর্চিতা। বড্ড সংকোচ হচ্ছে।রাত আটটা- সাড়ে আটটার সময় কোনো অপরিচিতের বাড়িতে এভাবে বেল বাজাতে খুবই খারাপ লাগছে ওর। ওরা আজ সত্যি নিরুপায়।

দরজাটা খুললেন এক বছর ত্রিশের ভদ্রমহিলা। আধো অন্ধকারেও ভদ্রমহিলার গায়ের দুধে আলতা রংটায় চোখ আটকে গেলো অর্চিতার।

মহিলা বললেন, বলুন?

অর্চিতা সংকোচের গলায় বলল, ম্যাডাম...আমরা খুব বিপদে পড়েছি। বাইরে এত বৃষ্টি হচ্ছে যে আমরা গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরতেও পারছি না । ঠিক সেই সময় বিকট শব্দে কোথায় একটা বাজ পড়লো। খুব দূরে নয়, কাছে পিঠেই। ছোট্ট বাড়িটা যেন কেঁপে উঠলো। লোডশেডিং অনেক আগেই হয়েছে। ঘরে একটা হলদে আলোর ইমার্জেন্সি জ্বলছে। তার ক্ষীণ করুণা রশ্মি গেট পর্য্যন্ত এসে পৌঁছেছে। মহিলা বললেন, বাইরে ভীষণ দুর্যোগ। আপনারা যদি খারাপ মানুষও হন তাহলেও এই মুহূর্তে আমি আশ্রয় দিতে বাধ্য।

রৌনক আর অর্চিতা আধভেজা হয়ে ঘরে ঢুকলো।

ওদের সোফায় বসিয়েই মহিলা ভিতরের ঘরে চলে গেলেন। ওদের জন্য শুকনো পোশাক এনে বললেন, পাশের ঘরে গিয়ে চেঞ্জ করে নাও।

কথা হচ্ছিল চা খেতে খেতে।

ভদ্র মহিলার বয়েস দেখে যা মনেহয় তার থেকে অনেকটাই বেশি। প্রায় দশ বছর কমিয়ে রেখেছেন উনি। ওনার বয়েস বর্তমানে প্রায় চল্লিশ। এই ধরণের মুখশ্রী দেখেই বুঝি শিল্পীরা স্থান-কাল-পাত্র ভুলে তাদের তুলি ধরেন। এই ধরণের মুখশ্রী দেখেই বুঝি গায়ক তাল ভুল করেন। অর্চিতা তো বলেই ফেললো, আপনি কখনো মুভি করেননি?

মিতালিদি একটা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বললেন, সুযোগ পেলাম কই। ঘর-সংসার নিয়েই তো কাটিয়ে দিলাম সেই ছোট বয়েস থেকে। ওনার মাথায় সিঁদুরের রেখা দেখেই হয়তো রৌনক প্রশ্ন করলো, আপনার হাজবেন্ড কি বাইরে থাকেন?

মিতালীদি রৌনকের প্রশ্নের উত্তরটা সযত্নে এড়িয়ে গিয়ে বললেন, তোমরা রাতে ওই উত্তরের ঘরে শুয়ে পরো।

রাতে রুটি খাও তো?

কোথায় যেন চলে গেলেন মিতালীদি। তবে ওনার ব্যবহার বেশ আন্তরিক। আজকালকার দিনে এই দুর্যোগের দিনে সম্পুর্ন অপরিচিতকে কেউ বাড়িতে ঢুকতেই দেয়না। ইনি তো রীতিমত আতিথেয়তা করছেন।

রৌনক উঠে এদিক ওদিক তাকাতেই মিতালীদি বললেন, দক্ষিণের ঘরে যেন যেও না। উনি লোকজন একবারে পছন্দ করেন না। একবার আমার এক স্কুলবেলার বন্ধু এসেছিল বলে, আমাকে বাড়ি থেকেই বের করে দিচ্ছিলেন।

উনি এই সময় নিজের ঘরে গান শোনেন। ঐঘরে না ঢোকা বাঞ্চনীয়।

কথাটার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন নির্দেশই ছিল।

ছোট থেকে কেউ কিছু নিষেধ করলেই সেটার প্রতি একটা অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করে রৌনক।

ভদ্রলোককে একবার অন্তত চাক্ষুস দেখতে ইচ্ছে করছে।

স্ত্রীর বন্ধু বাড়িতে ঢুকলে যার আপত্তি, সেই প্রাগৈতিহাসিক জীবটিকে একবার তো দর্শন করতেই হবে।

মিতালী একটা পত্রিকা ওল্টাচ্ছে।রৌনক পায়ে পায়ে গুটি গুটি দক্ষিণের ঘরের দরজায়।

দরজার এক চিলতে ফাঁকে চোখ রেখেছে।

ভিতরটা অন্ধকার,কিছুই দেখা সম্ভব নয়। অসাবধানে অথবা উত্তেজনায় দরজায় হাত পড়ে যাওয়ায় দরজার ফাঁকটা একটু বাড়ল মাত্র।

একটা মানুষ, হাতে একটা বই, ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম উপভোগ করছেন মানুষটা। কোনো এক দুর্বার টানে রৌনক দরজাটা সম্পূর্ণ খুলে ঢুকে গেলো, মিতালীদির নিষেধাজ্ঞা না মেনেই দক্ষিণের ঘরের ভিতরে।

ভদ্রলোক ওর পায়ের আওয়াজ পেয়েই বললেন, কে?

একটু ঘাবড়ানো গলায় রৌনক বললো, আমরা আপনার অতিথি।

ভদ্রলোক রাগী গলায় বললেন, আবার..আবার মিতু এবাড়িতে লোকজন ঢুকিয়েছে।

না, সন্ধ্যেবেলাটাও দেখছি ওকে মুক্তি দেওয়া যাবে না।

অনুনয়-বিনয় করছিল বলেই , সন্ধ্যেবেলাটা বাড়িতে ছেড়ে দিয়েছিলাম। ওর স্বভাব বদলাবে না। বন্দী করেই রাখতে হবে মিতুকে।

তারপরেই আবার রৌনককে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনি কি মিতুর দিকে নজর দিলেন?

লালায়িত নজরে দেখলেন আমার মিতুকে?

মিতালীদির কথা না শুনে এঘরে ঢোকাটা সত্যি বড় অন্যায় হয়েছে রৌনকের। বোঝাই যাচ্ছে ভদ্রলোক মানসিক রোগী। সুন্দরী বউকে সন্দেহ করাই এনার স্বভাব।

রৌনক বললো, এসব আপনি কি বলছেন? আমি বিবাহিত,সঙ্গে আমার স্ত্রীও আছেন। তাছাড়া মিতালীদি কে প্রথম দেখেই আমার দিদির কথা মনে পড়েছে।

ভদ্রলোকের ব্যাঙ্গাত্মক হাসির স্বরে ঘরটা তখন গমগম করছে।

বাইরে তখনো এক টানা বৃষ্টির আওয়াজ। রৌনকের কেমন একটা শীত শীত করছে।


ভাই? দিদির চোখে দেখা? সম্পর্ক?

রাখুন মশাই ওসব অযৌক্তিক কথা। মিতুর দিকে তাকালে স্বয়ং মহাদেবেরও ধ্যান ভঙ্গ হয়ে যাবে। আপনি তো রক্ত মাংসের মানুষ।

এবার বিরক্ত লাগছে রৌনকের। অকারণে ভদ্রলোক ওর চরিত্রে কলঙ্ক ছেটাচ্ছেন।

মিতু....মিতু...

রাগী গলায় ডেকে উঠলেন ভদ্রলোক।

মিতালীদি আতঙ্কিত পায়ে ছুটে এসেছেন। ঘরের মাঝে রৌনককে দেখেই ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে।

বারণ করেছিলাম এঘরে আসতে। আমার অন্ধকারের মুক্তিটুকুও কেড়ে নিলে তোমরা?

অর্চিতাও পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছে,কি হয়েছে রৌনক?

মিতালীদি বললেন,একমাত্র রাতের অন্ধকারই আমাকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছিল গত পাঁচ বছর ধরে।

সন্ধ্যে ছটায় ছাড়া পেতাম,সকাল পাঁচটা পর্যন্ত।

ভোরের আলো ফোটার আগেই আবার বন্দী হতাম মিথ্যে সন্দেহের বেড়াজালে।

আজ তোমাদের সাহায্য করতে গিয়ে এই মুক্তির স্বাদ টুকুও হারালাম।

ভদ্রলোক বললেন, আবার তুমি পরপুরুষের সামনে বেরিয়েছ মিতু?

তুমি কি একটু শান্তিতে ঘুমাতেও দেবে না আমাকে?

রৌনক এতক্ষনে খেয়াল করলো, ভদ্রলোকের হাতে ওটা বই নয় পুরোনো এলবাম।

সম্ভবত লাল বেনারসী পরা মহিলাটা মিতালী দি, নরম দাড়ির মাথায় টোপর পরা লোকটিই রৌনকের সামনে বসে রয়েছে।

ভদ্রলোক নিজেদের বিয়ের এলবাম দেখছিলেন বোধহয়।

কেন মিতু..কেন তুমি আবার আমাকে খুনি বানাতে চাইছো?

আমি তো আর খুন করতে চাই না। কিন্তু যে চোখ দিয়ে এই ছেলেটি তোমাকে দেখেছে তাকে তো আমি ক্ষমা করতে পারবো না।

অর্চিতার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে।

অবাক লাগছে রৌনকের। মিতালীদি কোনো প্রতিবাদ করছেন না। ধীর পায়ে ঘরের উত্তর কোণে একটা কাঁচের আলমারীর সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মিতালীদি।

অর্চিতা ফিস ফিস করে বললো, মিতালীদির মুখটা দেখো একবার।

রৌনক চমকে উঠেছে!

গ্রীসভাস্কর্যের মত নিখুঁত সুন্দর মুখটা আস্তে আস্তে পাল্টে যাচ্ছে। গুটিয়ে যাচ্ছে মুখের গোলাপি চামড়াটা।

গোটা মুখ থেকে গলাটা পুড়ে যাওয়া একটা মানুষের অবয়বে পরিণত হয়েছে এই মুহূর্তে।

এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলাম মিতালীর সুন্দর মুখটা। এখন আর কেউ তাকায় না ওর দিকে। আমি দেখবো, আমি শুধু দেখবো ওকে। তবে মিতু আমি কিন্তু তোমাকে প্রাণে মারতে চাইনি। তুমিই হার্ট ফেল করলে।

আমি অনেক খুঁজেছিলাম..অনেক খুজছিলাম..তোমার ইনহেলারটা। ড্রয়ারে ছিল না বিশ্বাস করো।

তুমি বলো, তোমার সুমন কি তোমাকে মারতে পারে?

রৌনক চোখের সামনে দেখলো, মিতালীদি ওই কাঁচের আলমারীটার মধ্যে ঢুকে গেলো।

ভদ্রলোক উঠে গিয়ে একটা তালা ঝুলিয়ে দিলো পাল্লা দেওয়া আলমারীটার সামনে।

অর্চিতার হাতদুটো ঠান্ডা হয়ে গেছে। পাদুটো ভীষণ ভারী। কিছুতেই এক পাও হাঁটতে পারছে না।

ভদ্রলোক এদিকে ঘুরতেই দেখা গেল, ওনার গলার কালো গোল দাগ টা।

ভদ্রলোক বললেন, আমি খুনি নই, আমি প্রেমিক। তাই একদিনও মিতুকে একা থাকতে দিই নি আমি। ঐ যে ফ্যান থেকে ঝুলে পৌঁছে গিয়েছিলাম মিতুর কাছে। এখন আমরা একসাথে থাকি।

কেউ তাকাবে না আমার মিতুর দিকে। শুধু আমি দেখবো।

বলতে বলতেই হাতে একটা কাঁচের বোতলের ভাঙা টুকরো নিয়ে উনি এগিয়ে আসছেন রৌনকের দিকে।

অর্চিতা অস্ফুট গলায় বললো, রৌনক ছোট..এই বাড়িটার বাইরে বেরোতেই হবে।

আধো অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতেই চেয়ার টেবিলে ঠোক্কর খেয়ে ছুটছে নবদম্পতি। যাদের চোখে এখনো বিশ্বাসী ভালোবাসার ছবি আঁকা।

পিছন থেকে অদ্ভুত একটা হাড়হিম করা হাসির আওয়াজ।

কোনোমতে মায়াবী সাদা বাড়িটার বাইরে বেরোতে পেরেছে ওরা। আর পিছন ফিরে তাকাবে না ,আবার হাতছানি দিয়ে ডাকবে ওই মৃত্যুপুরী।

বাইরে তখনও অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে।

পিছনে মৃতুপুরীর সফেদ গায়ে বিদ্যুতের আলো পড়েছে ক্ষণে ক্ষণে।

সমাপ্ত

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.