সন্ন্যাসিনী


"বল... ডাক আমায় ঠাম্মা...ঠাম্মা"...ছোট্ট সরমাকে কোলে নিয়ে বলে উঠলেন প্রমীলাদেবী। সরমা বলে উঠলো, "ঠাম্মা...ঠাকুমা।"... এই বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো ছোট্ট এই ফুল টি।প্রমীলা দেবী মৃদু হেসে দুই পায়ের মধ্যে সরমাকে নিয়ে কবিতা বলে উঠলেন,"ঘুঘু সই...

তালপুত কই..."। ছোট ছোট পায়ে সারা বাড়ি আলো করে ঘুড়ে বেরায় এই শিশুকন্যা সরমা ডাকনাম খুকুমণি, যে "মানুষের প্রথম ডাক মা'...এই চিরাচরিত সত্যের এক ব্যতিক্রম হিসেবে জীবনের প্রথম ডাকে ডেকে উঠছিল নিজের পিতামহী কে,"ঠাম্মা,...ঠাকুমা।'

এই বালিকা সরমা আধুনিক যুগে কৃষ্ণলীলার মত এক নতুন লীলা সৃষ্টি করেছিল । ওর এই লীলাখেলায় মেতে উঠেছিল ব্যানার্জী বাড়ীর দালান,চিলেকোঠা,উঠান,বাগান,বারান্দা,...এই সব কিছু।

,"পায়ে মল পরবে আমার খুকু।"....এই বলে পায়ে নুপুর পড়িয়ে দিলেন প্রমীলাদেবী।..নুপুর পরে রেকর্ডে বাজা রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালে তালে অপটুভাবে নেচে উঠলো এই ছোট্ট শিশুটি।ফোকলা দাঁতে টোল পড়া গাল।মুখে বুড়ো আঙ্গুল চোষে সরমা।মুখ থেকে হাতটা নামিয়ে দেন প্রমীলাদেবী।"এই খুকু মুখে হাত দেয় না।আঙ্গুল চোষে না।আঙুল সরু হয়ে গেলে রাজপুত্তুর বিয়ে করবে না যে"...বললেন তিনি।

"রাজপুত্তুর কি গো?"..আধো আধো গলায় প্রশ্ন করে সরমা।

প্রমীলাদেবী বললেন," রাজপুত্তুর কি তা জানিস না?... বোকা মেয়ে।আয় তোকে রাজপুত্তুরের গল্প বলি"...

ঠাকুমার কোলে বোসে ধীরে ধীরে সোনার কাঠি রূপোর কাঠি,ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী,রাজা রানী রাজপুত্তুরের জগতে হারিয়ে যেতে থাকে সরমা।

সাল ১৯৪৭ বাংলাদেশের এককালের জমিদারের বংশধর হরিপদ ব্যানার্জী,আর শ্যামাপদ ব্যানার্জী যখন তাদের দুইজন স্ত্রী প্রমীলা দেবী আর দীপ্তিবালা দেবীকে নিয়ে সমস্ত জায়গা জমি ছেড়ে এদেশে চলে এসেছিলেন তখন সঙ্গে করে শুধু এনেছিলেন ৫০০ ভরি গয়না আর সামান্য কিছু টাকা।তাই দিয়ে এখানে বাড়ী আর কিছু জমিও কিনলেন। জমিদার না হলেও একান্নবর্তী বনেদী পরিবারের ঐতিহ্য নিয়েই নিজেদের নতুন জীবন নতুন করে শুরু করছিলেন তারা। দুই ভায়েরই চার ছেলে। হরিপদ বাবু আর প্রমীলা দেবীর অবশ্য একটি মেয়েও ছিল, নাম ইরাবতী।দারুন পড়াশুনায়।সে যুগে ক্লাস ফোরের পর বৃত্তি পরীক্ষা বলে একটা পরীক্ষা হত, সেই পরীক্ষায় সমস্ত রাজ্যের মধ্যে ফার্স্ট হয়েছিল ইরা।হরিপদ বাবু অনেক আশা করে মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছিলেন কলকাতায়। একটা বাড়ী ভাড়া করে থাকতেও লাগলেন। কারণ মেয়েকে যে কোলকাতার ভাল স্কুলে পড়াতে হবে।তার মেয়ে যে অনেক বড় মানুষ হবে একদিন।...

কিন্তু হঠাত একদিন রাতে জ্বর আসে ইরার, কিছুতেই কমে না। ডাক্তার এসে বলেন নিউমোনিয়া হয়েছে, হসপিটালে দিতে হবে।সবই দেওয়া হয় কিন্তু শেষমেশ ইরা আর বাঁচে নি।

এরপর প্রমীলা দেবী বহুকাল মানষিক ভারসাম্যহীনতার মধ্যে কাটিয়েছিলেন। মাঝে মাঝেই চিৎকার করে মেয়ের নাম ধরে ডেকে উঠতেন,"কোথায় গেলি রে? ইরু মা আমার,কাছে আয় না..."....তারপর আপন মনেই শিশুর মত কেঁদে উঠতেন।

এরপর দিন গেছে, মাস গেছে, বছর গেছে।স্মৃতির মাঝে হারিয়ে গেছে ইরা। হরিপদ বাবু মারা গেছেন। প্রমীলাদেবীর চার ছেলেই বড় হয়ে গেছে,তারা সংসারী। এরপর আবার হঠাৎ একদিন তার ছোটছেলে অরুন আর ছোট বউ রীনার কোল আলো করে এল আবারও একটি কন্যাসন্তান।এও বংশের একমাত্রই মেয়ে।আর কোন মেয়েই জন্মায়নি এই বংশে, বাকী আর সবার ঘরেই ছেলে হয়েছে। খবর পেয়ে ছুটে আসেন প্রমীলা দেবী।সদ্যজাত সরমাকে দেখে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি।," এ তো একদম আমার ইরুর মত দেখতে।আমার ইরু ফিরে এসেছে আমার কাছে।"..এই বলে নিজের আঁচলে জড়িয়ে নিজের ঘরে সরমাকে নিয়ে গেলেন।

শুধুমাত্র স্তন্যপান করানো ছাড়া মা হিসেবে সরমাকে খুব একটা স্নেহ করার সুযোগ পেলনা রীনা। ভেতরে কান্না কাটি করলে স্বামী অরুন তাকে বোঝায়," মায়ের বয়েস হয়েছে।খুকুকে নিয়ে একটু আনন্দে থাকলে থাক না।এতে দু:খ করার কি আছে?তোমার তো আরও দুটো ছেলে আছে।ওদের নিয়েই থাক না।"...

চোখের জল মুছে মাথা নাড়ে রীনা।ওদিকে ঠাকুমায় ঘেরা জগতে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে সরমা।

ঘড়ের সামনে প্রমীলা দেবী একটা ফুলের বাগান করেছিলেনে। গাঁদা,চন্দ্রমল্লিকা, জুঁই,স্থল পদ্ম,গোলাপ,চাঁপা,টগর ফুলের দুনিয়ায় ফোলা ফ্রক পরে, মাথায় লাল ফিতে বেঁধে নেচে,গেয়ে খেলে বেরায় সরমা। সে এক স্বর্গীয় দৃশ্য। নিচের পাটির মাড়িতে ছোট্ট দুটো দাঁত,গালে টোল, গোল গোল ফোলা ফোলা হাতের তালু, পায়ে মল.... কখনো কখনো ফ্রকের উপর বাচ্চাদের হলুদ রঙের শাড়ী পরে পুতুল কোলে নিয়ে প্রতিদিন নতুন নতুন লীলাখেলা দেখায় এই নিস্পাপ বালিকাটি।পরিবারের সকলে সব দু:খ ভুলে যায় ওর এই মধুর হাসিতে।

নিজেদের বাড়ীতেই ক্ষেত জমি,গরুর গোয়াল,ছাগল,মুরগী সব ছিল। সরমার জ্যাঠা তরুন আর তার খুড়তুতো ভাই মানে শ্যামাপদ বাবু আর দ্বীপ্তিবালা দেবীর ছেলে শ্যামল এইসব দেখাশুনা করে।

বাকী ভায়েরা সবাই চাকরীই করে।তবে পরিবার একান্নবর্তী। ভাগাভাগি, লড়াইয়ের ধারনা এখন অবধি তাদের মনে প্রবেশ করেনি।

বিধবা ঠাকুমার সাথে বাগানে হাতে হাতে কাজ করে সরমা।গরুর গোয়াল থেকে গোবর এনে সার দেয় গাছে। মন দিয়ে গাছ লাগাতে লাগাতে হঠাৎ পাশে চোখ পরে সরমার।দেখে বট্টু ওকে হা করে দেখছে। খিল খিল করে হেসে ওঠে সরমা আধো আধো গলায় বলে।..."ও ঠাম্মা দেখনা বট্টু আমায় কিভাবে দেখছে।ওর বোধহয় খিদে পেয়েছে।যাই ঘাস খাওয়াই ওকে।"....এই বলে ঘাস তুলে তুলে ছাগলছানাটার মুখে দিতে থাকে,বাগানে বেড়া দেওয়া আছে যাতে পাস থেকে গরু ছাগল না ঢুকতে পারে, কিন্তু এই ছাগোলছানাটা বোধহয় বেড়ার ফুটো দিয়েই ঢুকে এসেছিল, ছোট্ট ছাগলছানাটিকে ভালবেসে ঘাস খাওয়াতে থাকে ছোট্ট সরমা। প্রমীলাদেবী মুচকি হেসে বলে ওঠেন,"হ্যাঁ রে ও তো তোকে খুব ভালোবাসে দেখছি।দেখ তোর রাজপুত্তুর হয়তো।ব্যাঙ রাজপুত্তুরের মত অভিশাপে ছাগল হয়ে গেছে বোধহয়।"....মজা করলেন প্রমীলা দেবী,সরমার একটু মিষ্টি হাসি দেখার জন্য এরকম অনেক মজাই তিনি করে থাকেন,উনি ভালভাবেই জানেন যে সরমা চিরকাল শিশু থাকবে না, একদিন বাস্তবটা ঠিকই বুঝবে। কিন্তু তার অজান্তেই শিশু সরমার মনের সাদা কাগজে কখন যে গভীর ভাবে লেখা হয়ে গেছিল এই বাক্যটি তা তিনি নিজেই জানতেন না...অভিশাপে রাজপুত্তুর যদি ব্যাঙ হতে পারে তো ছাগলই বা হবে না কেন? তাছাড়া ঠাকুমা যখন বলেছেন তখনতো ঠিকই বলেছেন।ব্যাঙ রাজপুত্রের গল্পও তো ঠাকুমার মুখ থেকেই শোনা...তার মানে বট্টুও আসলে রাজপুত্তুর অভিশাপে ছাগল হয়ে গেছে ।..সেদিন থেকে সরমার নতুন বন্ধু হয়ে গিয়েছিল এই বট্টু নামক ছাগলছানাটি। সে ছিল তার কল্পনার জগতের ভাবি রাজপুত্তর, 'সরমার ভালোবাসা পেয়ে একদিন সে মানুষে পরিনত হবে আর রানী করে তার রাজ্যে নিয়ে যাবে সরমাকে'...এই ধারনা নিয়ে চলতে থাকে সরমা।....ঠাকুমার পর তার নতুন জগত তৈরি হয় এই বট্টুকে নিয়ে।

দিন যায় মাস যায়। রোজ রাতে ঠাকুমার কাছে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমায় সরমা। কিন্তু ওর শিশুমন তো আর জানত না যে একদিন ওর ঠাকুমা চিরঘুমে ঘুমিয়ে পড়বেন।..."ও ঠাকুমা ওঠো না? উঠছো না কেন তুমি?...সকালবেলা সরমার কান্না শুনে প্রমীলাদেবীর ঘরে ছুটে গেলেন সবাই।..সরমাকে কোলে তুলে সরিয়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন মা রীনা। কিন্তু প্রবল জেদে মায়ের হাত ছাড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে সরমা,"না আমি ঠাম্মাকে ছেড়ে কোত্থাও যাব না।ঠাম্মা ও ঠাম্মা ওঠ না তুমি।"...

ফুলের খাটিয়ায় চড়ে বিদায় নিল ঠাম্মা,চোখের জল আর থামে না,"ঠাম্মা কোথায় গেল গো? তোমরা ফিরিয়ে আন ঠাম্মাকে।"...ছোট ঠাম্মা দ্বীপ্তিবালা দেবী ভোলান সরমাকে। ঠাকুরঘরে নিয়ে গিয়ে শ্রীকৃষ্ণ -এর মূর্তি দেখিয়ে বলেন যে," ওনার কাছে আছে রে তোর ঠাকুমা।কাঁদিসনা তুই,আমরা সবাই একদিন ওঁনার কাছেই যাব।"

ধিরে ধিরে কান্না থামে সরমার। ছ-মাস বাদে স্কুলে ভর্তি হল সে। পড়ায় মন বসে না তার।মনে মনে একটাই কথা ভাবে যে কবে ছাগলছানা বট্টু রাজপুত্তুর হবে আর ওকে তার রাজ্যে নিয়ে যাবে।স্কুল থেকে ফিরে বাগানে গিয়ে বট্টুর গলা জড়িয়ে সুখ-দু:খের কথা বলে সরমা।..."ও বট্টু রাজপুত্তুর তুমি কবে মানুষ হবে গো? আমার না ঠাকুমাকে ছাড়া কিচ্ছু ভালোলাগে না।"

স্কুল থেকে কমপ্লেন আসে সরমার নামে।পড়া বোঝেনা সে। বাড়ীতে প্রাইভেট টিউটর রাখা হয়। মামনী দি,ক্লাস টুয়েলভে পড়ে, হাতখরচের জন্য সরমার মত ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ায় সে।....সরমা খুব গল্প করে মামনী দির সাথে।," ও মামনী দি, জানো? আমার বট্টু রাজপুত্তুর না আমায় একদিন রানী করে নিয়ে যাবে।....মামনীদি হেসে বলে," তুমি ঠিক করে অঙ্ক কর,নাহলে কোন রাজপুত্তুরই রানী করবে না"...মামনী দির কথায় মন দিয়ে পড়াশুনো করে সে। ক্লাস ওয়ানে উঠল সরমা।

না: মামনীদি আর পড়াবেনা সরমাকে। ওর যে বিয়ে। বিয়েতে বাবা-মায়ের হাত ধরে নেমন্তন্ন খেতে গেল সরমা। কি সুন্দর লাগছে মামনী দি কে? ঠিক যেন রাজকুমারী, আর ওই তো গাড়ী থেকে নামলো মামনীদির রাজপুত্তুর।কি সুন্দর দেখতে।

"হ্যাঁ গো? আমি যেদিন মামনীদির মত বড় হব তুমি সেদিনকেই রাজপুত্তুর হবে তাই না?..এখন তো আমি খুব ছোট... আমি জানি তাই তুমি রাজপুত্তুর হচ্ছ না"..বট্টুকে উদ্দেশ্য করে বলে সরমা।

বাড়ীতে বিরাট বড় প্যান্ডেল,রক্ষাকালী পূজো, এক বিরাট বড় তান্ত্রিক এসেছেন যজ্ঞ করতে,বাড়ীতে প্যান্ডেল হয়েছে, অনেক লোকজন নিমন্ত্রিত হয়েছেন। প্রতি দশ বছর অন্তর অন্তর ব্যানার্জী বাড়ীতে এই পূজো হয়।সরমার বয়েস এখন সাত। এর আগেরবার যখন পূজো হয়েছিল তখন সরমার জন্মই হয়নি।

সকাল থেকে বট্টু গাছের সাথে বাঁধা আছে। মা কে জিজ্ঞাসা করে সরমা," বট্টু রাজপুত্তুর কে তোমরা বেঁধে রেখেছো কেন? বল না?"....সরমাকে ধমক দেন ব্যাস্ত রীনা,"আ: খুকু দুষ্টুমি করে না, যাও ঘরে গিয়ে পড়তে বস গিয়ে।"....বাড়ীর সবাই কে ডেকে ডেকে একই প্রশ্ন করে সরমা।সদুত্তর মেলে না কারোর কাছেই। মনে কু ডাকতে থাকে সরমার।

যজ্ঞের আগুন লাগান তান্ত্রিক।যজ্ঞের শেষে টানতে টানতে বট্টুকে নিয়ে আসা হল। চারিদিকে ঘণ্টাধ্বনি,শঙ্খ ফুঁ আর উলুধ্বনি।সরমা প্রাণপণ চিৎ কার করতে থাকে, " বট্টুকে কি করছ তোমরা?"...হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যেতে চায় ও।মা রীনা হাত চেপে ধরে সরমার। রীনা এক হাতে শঙ্খ ফুঁ দিচ্ছে আর অপর হাত দিয়ে সরমার হাত জোর করে চেপে ধরে রেখেছে।চোখ বড়বড় করে ইশারায় ও ধমকাচ্ছে সরমাকে।

তান্ত্রিক খাঁড়া নিয়ে এগিয়ে এলেন। মন্ত্র পড়তে পড়তে খাঁড়া দিয়ে এক কোপে বট্টুর মাথাটাকে নামিয়ে দিলেন ধর থেকে।

বুকের মধ্যে কেমন যেন করে উঠল,মাথাটাও ঘুরে উঠলো, জ্ঞান হারালো সরমা।

এবার রীনার চৈতন্য ফিরলো। হাত থেকে শঙ্খ ফেলে দিয়ে সরমার অচেতন দেহটাকে ধরে ঝাঁকাতে লাগলো রীনা। সরমার বাবা অরুন ধমকে ওঠেন স্ত্রীকে,"তোমার জীবনে কোন কাণ্ডজ্ঞান হল না। কোন বুদ্ধিতে তুমি বাচ্চাদের বলীর সামনে এনেছ?....যাও ঘরে নিয়ে যাও ওকে...আমি ডাক্তার ডেকে আনছি।"...

কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরলো সরমার,... মুখে কোন কথা নেই...চোখ দিয়ে জল পরেই চলেছে।...ডাক্তার ওষুধ লিখে দিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু মুখে আর 'রা'নেই সরমার।

সরমার ছোড়দা বিল্টু। এক নম্বরের দস্যি আর দুরন্ত ছেলে।ওর বয়েস এখন দশ। আজ ওর ভারী আনন্দ।মটন কষা হবে, যা নাকী ওর প্রিয় খাওয়ার। পাঁঠার মাংসের হাড়ি নামতেই ছুটে গিয়ে চামচ দিয়ে চারপিস তুলে খাওয়া শুরু করে দিল সে। হঠাৎ কি মনে হল ও অসুস্থ সরমার ঘরে গিয়ে হাজির হল।, "এই খুকু...পাগলী কোথাকার,পাঁঠাবলী দেখে আবার কেউ অজ্ঞান হয়? আমার তো দারুন আনন্দ লাগছে।আজ মটন হয়েছে মটন।এই নে তুই ও একটু খা।"....এই বলে একটু মাংসের টুকরো ছিঁড়ে ঢুকিয়ে দিল সরমার মুখে।...সরমা সোজা দৃষ্টিতে বিল্টুর মুখের দিকে তাকালো আর সঙ্গে সঙ্গেই হরহর করে বমি করে দিল।তারপর আবারও অজ্ঞান হয়ে গেল।....ধুম জ্বর এল সরমার।জ্বর আর কমে না। হসপিটালে দিতে হল। এবছর ব্যানার্জী বাড়ীর রক্ষাকালী পূজোটাই মাটি হয়ে গেল।

সাইক্রিয়াটিস্ট অনেক চিকিৎসা করলো সরমার,..কিন্তু আর ঠিক করা গেল না ওকে। মাছ মাংস বা এজাতীয় কোন আমিশজাত খাওয়ার ও আর খেতে পারে না। ওই গন্ধ পেলেই বমি করে দেয় ও। ওর জন্য আলাদা নিরামিষ রান্না হয় বাড়ীতে।স্কুলেও যায় না সরমা, খালি পরীক্ষার সময় পরীক্ষাটা দিয়ে আসে।অসুস্থ বলে স্পেশাল পারমিশন করানো হয়েছে ওর জন্য। কারোর সাথে মেশেনা ও,খালি ঘরে একা বসে নানারকম ছবি আঁকে।

এখন বড় হয়ে গেছে সরমা।বয়েস সাতাশ বছর, প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে বি.এ পাশ-টা করেছে। নিজের জন্য ঘরে আলাদা উনুন নিয়ে বিধবাদের মত নিরামিষ রান্না করে খায় ও।কথা খুবই কম বলে।এখন ও ভালমতই জানে যে বট্টু ওর কল্পনা ছিল কিন্তু তবুও সেদিনকার সেই ভয়াবহ স্মৃতি থেকে কিছুতেই বেরিয়ে আসতে পারেনি সরমা।

ছোরদার বউ মালতী দিনরাত খোঁটা দেয় সরমাকে।,"ঢঙ দেখে আর বাঁচি না,...এক নম্বরের শয়তান।নিজেরটা নেবেন,রান্না করবেন আর খাবেন,...ঘরের জন্য কুটোটি নারবেন না।,পাগল না ছাই... এক নম্বরের শয়তান, বিয়ে করলে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে খাটতে হবে তাই বিয়ে না করার জন্য এসব পাগলের নাটক করে,...কোনো বাড়ীর মেয়েরা এত আল্লাদ পায় না বাপু।,আর পাগলই যখন তাহলে পাগলাগারোদে দাও না কেন তোমরা? আর না হলে কোন আশ্রমে দাও, বাড়ীতে এসব কেন বাবা?....আমার বাবা আমায় প্রচুর টাকা পণ দিয়ে এ বাড়ীতে বিয়ে দিয়েছে।এটা আমার বাড়ী,আর আমার বাড়ীতে এসব ন্যাকামি আমি একদম সহ্য করবো না এই বলে দিলুম।"....

সত্যি কথা বলতে বাড়ীতে কাজের লোক রান্নার লোক সবই রয়েছে।কাউকেই কোন কাজ করতে হয় না।

আসলে যেকোন কারনেই হোক সরমাকে কোনভাবেই সহ্য করতে পারছিলনা মালতী ।

চোখের জলে ঠাকুর ঘরে শ্রীকৃষ্ণ-এর সামনে গিয়ে মুক্তির পথ খোঁজে সরমা।কিন্তু কোথায়ই বা যাবে ও? বাড়ীর বাইরের জগত তো কিছুই চেনেনা সে।

এল বসন্ত,এল দোলখেলা, পাড়ায় উৎসব, কৃষ্ণপূজো উপলক্ষে পাড়ায় অনুষ্ঠান, নিমন্ত্রিত হন এক ইস্কনের সন্ন্যাসী। একজন ইউরোপীয়ান, মায়াপুর থেকে এসেছেন। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংলিশ আর বাংলায় কৃষ্ণকথা শোনাতে থাকেন তিনি,তার সাথে তাদের আশ্রমের কথাও বলেন তিনি। মন দিয়ে তার সব কথাগুলো শোনে সরমা। সেদিন রাতেই সিদ্ধান্ত নেয় সে। ঘরের বিছানায় একটা চিঠি ছেড়ে যায় সে।

সন্ন্যাসী :-তোমার বাড়ীর লোক কিছু ঝামেলা করবে না তো? তুমি যে এভাবে চলে আসছ।

সরমা:-না গুরুদেব,আমি অ্যাডাল্ট।আর আমার জন্য ঝামেলা করার মত কেউ আর আমার নেই।মা-বাবা দাদা আর বৌদিদের সাথে সুখেই আছেন।

সন্ন্যাসীর পিছু পিছু মায়াপুরের পথ ধরলো সরমা।

১৫ বছর কেটে গেছে। আজ মাতা সরমা আনন্দপুর পশু-আশ্রমের প্রধান সন্ন্যাসিনী। তার মুন্ডিত মস্তক, গেরুয়া বসন,সদা হাস্যময় মুখমন্ডল। তার এই বৃহৎ আশ্রম অনাথ পশুদের জন্য। রাস্তায় পরে পরে মার খাওয়া কুকুর, বিড়াল, কিছু রুগ্ন গরু ছাগল সবাইকে স্থান দেওয়া হয় এখানে। আশ্রমের লোকজন সব নিরামিষাশী। কিছু কিছু অনাথ শিশুকেও রাখা হয় এই অনাথ পশুগুলোর সাথে খেলা করার জন্য। এই আশ্রমটার জন্য অনেক খেটেছে সরমা, অনেক বলে কয়ে সরকারি সাহায্য আনতে হয়েছে।আজ সে সফল এক পশুপ্রেমী সন্ন্যাসিনী, নিজের আধ্যাত্মিক কল্পনায় নিজের ঠাকুমা আর বট্টু রাজপুত্তুরকে শ্রীকৃষ্ণ-এর পায়ের কাছে কল্পনা করে সে।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.