ফেক প্রোফাইল

মেঘা আর অতসী শুধু স্কুলের বান্ধবীই নয়, খুব কাছের প্রতিবেশীও। সেই নার্সারির দিনগুলো থেকে ওরা বেস্ট ফ্রেন্ড। এমন কোন দিন নেই যখন ওরা টিফিন ভাগ করে খায়নি বা একসাথে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরেনি। যেখানে মেঘা সেখানেই অতসী। লোকে ওদেরকে জোড়া শালিকও বলে। একজন অসুস্থ হলে আর একজন তার বাড়ি গিয়ে পড়া বুঝিয়ে দিয়ে আসে, একসাথে বিকেলে পার্কে বেরনো, একসাথে কোচিং যাওয়া আসা সব একসাথেই চলে আসছে। স্বভাবের দিক থেকে অতসী একটু শান্ত, চোখের চশমা নাকে নেমে এসে একটা ইনটেলিজেন্ট লুক দেয়। মেঘা সে তুলনায় একটু চঞ্চল, প্রান খোলা, হাসিখুশি মিশুকে। ক্লাসের পড়া দেওয়াই হোক বা পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়াই হোক, সবেতেই একে অপরকে সাহায্য করা তো আছেই, স্যারদের হাত থেকে দুজনে দুজনকে রক্ষা করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একবার অঙ্ক পরীক্ষার আগে মেঘার খুব জ্বর হোল, প্রায় কিছুই প্র্যাকটিস না করে পরীক্ষা দিতে চলে এসেছিল মেঘা। তবে ভাগ্য ভালো যে অতসীর পেছনেই সিট পড়েছিল মেঘার, অতসী খাতা মেলে ধরেছিল মেঘার চোখের সামনে। আর ধরা পড়বি তো পড় একেবারে অঙ্কের দিদিমনি আরতি মিসের হাতেই। কিন্তু অতসী বাঁচিয়ে দিলো মেঘাকে। বলল- "ওকে কিছু দেখাইনি, আমি খাতা চেক করছিলাম তাই বেঞ্চের উপরে ছড়িয়ে গেছিল।" সেইবার অঙ্কে মেঘার নাম্বার কম হয়েছিল, কিন্তু পাশ করে গেছিল অতসীর জন্যে। এইবছর ওরা উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে, রেজাল্ট বেরোতে আরও কিছুদিন সময় আছে। এর মধ্যে মেঘা একবার মামার বাড়ি গেছিল বেড়াতে, আর ফিরে আরার পর থেকেই সব কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে। অতসী কেমন বদলে গেছে, মেঘার সাথে ঠিক করে কথা বলছে না। সবসময় মেঘাকে এড়িয়ে এড়িয়ে চলছে। মেঘাদের বাড়ির ঠিক পেছনের বাড়িটাই অতসীদের, মেঘার বেড রুমের জানলা আর অতসীর বেড রুমের জানলা মুখোমুখি। আগে ওই জানলা দিয়ে দেখা হলেই কথা হতো অতসীর সাথে। রবিবার অতসীদের বাড়িতে মাংস রান্না হলে মেঘাদের বাড়িতে দিতে আসতো অতসী, মেঘার মাও যখন নতুন কোন ডিশ বানায় তখন অতসীর ডাক পড়বেই ওদের বাড়িতে। কিন্তু গত রবিবার দুপুরে অতসীর ভাই কুশ এসে বলল- "দিদিয়া আসবেনা বলল, তাই মা আমাকে দিয়েই মাংস পাঠিয়ে দিলো।" অতসীর এরকম বিহেভ করার কারন মেঘা কিছুতেই বুঝতে পারছেনা।

অতসী সবসময়েই মেঘার প্রতি খুব কেয়ারিং। কোন বিষয়ে মেঘার একটু বুঝতে অসুবিধে হলেই সে নিজে থেকে এসেই সব বুঝিয়ে দিয়ে যায়। আর আজ দুদিন হোল মেঘার ঠাণ্ডা লেগে গলা বসে গেছে, কথা বলতে পারছে না ঠিক করে। তবুও অতসী একবার ফোন পর্যন্ত করে নি। সেদিন কুশ এসে বলল দিদিয়া আসবেনা বলেছে, তখনি মেঘা ফোন করেছিল অতসীকে, কিন্তু অতসী ফোন তোলেনি। দুদিন আগে বিকেলে পার্কে গুঞ্জার সাথে দেখা হয়েছিল মেঘার। ও বলছিল অতসীর নাকি নতুন বন্ধু হয়েছে তাই আজকাল ও কারোর সাথে আর কথা বলবে না। নতুন বন্ধু কথাটা অবশ্য মেঘা বিশ্বাস করেনা। কারন গুঞ্জা মেয়েটা যা হিংসুটে, সবসময় মেঘা আর অতসীর মধ্যে ভাংচি দেওয়ার চেষ্টা করে। আর অতসী সহজে অচেনা কারোর সাথে বন্ধুত্ব করে না, এটা মেঘা জানে। টেস্ট এগজামের আগের ভাইফোঁটায় মেঘার দাদা নীল ওকে একটা নতুন স্মার্ট ফোন গিফট করেছিল, তখন মেঘা নিজের নামে একটা ফেসবুক প্রোফাইল খোলে। সেই প্রোফাইল থেকে বাকি বন্ধুদের ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। অতসীর আগেই একটা ফেসবুক প্রোফাইল ছিল। মেঘা প্রোফাইল খোলার পর থেকেই অনেক অচেনা ছেলেমেয়ের ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসতে থাকে। নতুন নতুন নানারকম বন্ধু পেয়ে মেঘা খুব খুশি হয়, সবার রিকুয়েস্ট অ্যাকসেপটও করে। একদিন মেঘা ওর প্রোফাইল খুলে অতসীকে দেখায় যে ওর কতো বন্ধু হয়েছে। তখন অতসী বলে অচেনাদের সাথে বেশি বন্ধুত্ব না করাই ভালো, সবাই যে বন্ধুত্ব করতে চায় তা নয়। এমনকি অনেক ছেলে আছে যারা মেয়ে সেজে প্রোফাইল খুলে মেয়েদের সাথে খারাপ ব্যাবহার করে, ওগুলো সব ফেক প্রোফাইল। মেঘা নতুন নতুন এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, তাই ও এতসব জানতো না। ফেক প্রোফাইল কি তা জানতো না। অনেকের সাথে কথা বলতে গিয়ে মেঘা কিছুদিন পরে বুঝেছে যে অতসীর কথাটাই ঠিক ছিল। তারপর থেকে মেঘাও আর কোন অচেনা লোকের ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট অ্যাক্সেপট করেনা। অতসী নিজেও এব্যাপারে খুব সচেতন, তাই গুঞ্জার কথাটা বিশ্বাস করতে ওর মন চাইল না। কিন্তু কি এমন হোল যে নতুন বন্ধুর জন্যে অতসী মেঘার মতো এতো পুরনো বন্ধুকে অ্যাভয়েড করবে। কিছুই বুঝতে পারছে না মেঘা, ওর মনটাও তাই বেশ খারাপ।

পরেরদিন বিকেলে পার্কে গিয়ে মেঘা যা দেখল, তাতে মনে হোল গুঞ্জার কথাটাই সত্যি। বরানগর থেকে মেঘার মাসি আর তার মেয়ে তিতলি এসেছিল ওদের বাড়িতে বেড়াতে। তিতলি মেঘার চেয়ে দুবছরের ছোটো। তিতলিকে নিয়ে মেঘা গেছিল পার্কে বেড়াতে। সেখানে গিয়ে ও দেখল অতসী একটা ছেলের সাথে বেঞ্চে বসে আছে মুখ নিচু করে। ছেলেটাকে মেঘা আগে কখনও দেখেনি, এমনকি এরকম কোন ছেলের সম্পর্কে অতসীর কাছে কিছু কোনদিন শোনেও নি। অতসীর রাপুঞ্জেলের মতো লম্বা চুল দেখে অনেক ছেলে ওর প্রেমে পড়েছে কিন্তু ও কাউকে কোনদিন পাত্তা দেয়নি। এমনকি মেঘাকেও সবসময় সতর্ক করেছে উচ্চমাধমিকের মতো জীবনের ভাইটাল সময়ে প্রেম ট্রেম থেকে দূরে থাকতে। আর অতসী কিনা নিজেই একটা ছেলের প্রেমে পড়ে গেলো, আর সেটা মেঘাকে একবারও জানাল না! অতসীকে পার্কে ছেলেটার সাথে দেখে মেঘার চোখ ফেটে জল আসতে লাগলো। ওখানে আর দাঁড়াতে পারেনি ও। তিতলির হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে বেরিয়ে গেছে পার্ক থেকে।

এরপর একদিন রাত্রে ডিনার সেরে এসে বিছানার উপরে জানলার ধারে এসে বসেছে, হাতে একটা বই। জন্মদিনে বাবার গিফট করা ব্যোমকেশ সমগ্রটা প্রায় শেষের দিকে, ওটাই কিছুটা পড়বে বলে খুলে বসলো মেঘা। আগে হলে এইসময়টা অতসীর সাথে ছাদে বসে কিছুক্ষন গল্প করত ওরা, তারপর ঘুমাতে আসতো। এখন সব বদলে গেছে। দুদিনের চেনা একটা ছেলের জন্যে অতসী মেঘাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এটা ভাবতে কষ্ট লাগলেও, মেঘা বাস্তবটাকে মেনে নিয়েছে। আসলে সত্যিটা কখনও বদলানো যায়না, মানুষ যেটা পারে সেটা হোল শুধু নিজেকে অবস্থার সাথে মানিয়ে নেওয়া। মেঘাও তাই করার চেষ্টা করছে। দু তিনলাইন সবে পড়েছে মেঘা, তখনি অতসীদের বাড়ি থেকে খুব চেঁচামেচির আওয়াজ এলো। অতসী খুব জোরে জোরে কাঁদছে আর বলছে- "টাকাটা আমার দরকার, তোমরা দেবে কিনা বল।" অতসীর বাবা মানে পলাশ কাকু বলছেন- "দেবো, কিন্তু এতো টাকা কিকরবে তুমি আগে বল।" মেঘা জানলার পর্দাটা সরিয়ে দেখল অতসীর ঘরে আলো জ্বলছে, তবে কেউ একটা দুম করে জানলা বন্ধ করে দিলো। অতসীর টাকা দরকার! কিন্তু কেন? একবার মেঘাকে তো ও বলতে পারতো। হয়তো টাকাটা জোগাড় করে দিতে পারতোনা মেঘা, কিন্তু সাহায্য করত যতোটা পারতো। হঠাৎ করে মানুষের মধ্যে এরকম একটা পরিবর্তন হয় কিকরে। অতসী তো এরকম উগ্র ছিলনা কোনদিন। আর সবচেয়ে অবাক ব্যাপার যেটা লেগেছে মেঘার সেটা হোল- অতসী সবসময় ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরে। জিন্স, টি-শার্ট, টপ এইসব। কিন্তু সেদিন পার্কে আপাদমস্তক নিজেকে একটা ফুলহাতা সালোয়ার কামিজ আর ওড়না দিয়ে ঢেকে রেখেছিল অতসী। মেঘা তো প্রথমে চিনতেই পারেনি অতসীকে। পরে নাকের উপরে ঝুলে থাকা চশমাটা দেখে কনফার্ম হয়েছে। অতসী কি কোন বিপদে পড়েছে! মেঘার মনে এবার সন্দেহ জাগছে।

মেঘা এবার তক্কে তক্কে থাকে অতসীর কার্যকলাপ দেখার জন্যে। একদিন ডাইনিং হলের সামনের জানলাটায় অতসী কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছিল, মেঘাকে দেখেতেই পর্দা টেনে দিয়ে সরে গেলো। মেঘার সন্দেহের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। একবার কি অতসীর বাড়িতে গিয়ে সামনা সামনি কথা বলবে। বলা তো উচিত। কি করবে অতসী মেঘাকে দেখে। কথা বলবে না, অ্যাভয়েড করবে বা হয়তো সোজা অপমান করে তাড়িয়েই দেবে। মেঘা মেনে নেবে সেটা। কিন্তু এর একটা বিহিদ করা দরকার। এরকম ভাবে আর চলতে পারেনা, কারনটা জানতেই হবে মেঘাকে। মেঘা গুঞ্জার কাছে শুনেছিল অতসী বিকেলে প্রায় প্রতিদিনই পার্কে যায়। তাই আজকে বিকেলে মেঘা রেডি হয়ে বসে আছে অতসীর পিছু নেবে বলে। যাই হয়ে থাকুক অতসীর, এর পেছনে ওই ছেলেটার হাত আছে নিশ্চয়ই। আর গুঞ্জার কাছ থেকে মেঘা খবর বের করেছে যে ছেলেটার নাম ঋক মজুমদার, সায়েন্স ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট। ওর বাবা একটা পলিটিক্যাল পার্টির লিডার, ছেলেটা এলাকার বখাটে বদমাশদের মধ্যে একজন। মেঘা বাড়ির পেছনের দিকে ছাদের ধারে আড়ালে বসে ছিল, নীচে গেটের ল্যাচ খোলার শব্দে তাকিয়ে দেখল অতসী সাইকেল নিয়ে বেরোচ্ছে। আজকেও অতসী একটা ফুল স্লিভ সালোয়ার পড়েছে, নিজেকে আপাদমস্তক ওড়না দিয়ে মুড়ে নিয়েছে। দেখে একটা কাপড়ের পুটুলি মনে হচ্ছে অতসীকে। মেয়েটার ড্রেস সেন্সটার বারোটা বেজেছে, তার সাথে মাথাটারও। ও নিশ্চই পার্কে যাবে, মেঘা তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। মেঘার সাইকেল রেডিই ছিল, একটু তফাৎ রেখে মেঘা অতসীর পিছু নিলো।

অতসী পার্কের রাস্তা ধরেই এগোচ্ছে। মেঘা একটু দূরে খুব ধীরে ধীরে সাইকেল চালিয়ে অতসীর পেছনে চলেছে। এক কিলোমিটার মতো যাওয়ার পর ডানদিকে একটা টার্ন আসে, সেই রাস্তা দিয়ে একটু এগোলেই পার্কের গেট। মেঘা দেখল অতসীও সেই রাস্তায় যাচ্ছে। অতসী পার্কের সামনে এসে সাইকেলটা পার্ক করছিল, এমন সময় দুটো ছেলে এগিয়ে এলো ওর দিকে। এর মধ্যে একটা ছেলেকে মেঘা চেনে, সেদিন যে অতসীর সাথে বসে ছিল। কিন্তু সাথের আর একটা ছেলে কে? এই ছেলেটা ঠিক মেঘাদের বয়েসি নয়, বয়েসে একটু বড় হবে। জামাকাপড় দেখে মনে হচ্ছে বেশ অভিজাত পরিবারেরই। দূর থেকে মেঘা বুঝতে পারছেনা তিনজনে কি কথা বলছে, তবে অতসীকে বেশ আপসেট দেখাচ্ছে। ওরা তিনজন পার্কে ঢুকল। একটু পরে মেঘাও একটা টিকিট কেটে পেছন পেছন ঢুকল। কিন্তু ওরা এতক্ষনে কোন দিকে গেছে মেঘা বুঝতে পারল না, আবার সহজে কাছেও যেতে পারবে না, যদি দেখে ফেলে ওরা। কিছুক্ষন এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে ওদের তিনজনকে দেখতে পেলো মেঘা। অতসী আর ওই ঋক নামের ছেলেটা একটা বেঞ্চে বসে আছে, আর বয়েসে বড় ছেলেটা ওদের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলছে। ওদের দেখে মেঘার গা জ্বালা করছে, বিশেষ করে ঋক হাত দিয়ে যখন অতসীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরছে। অতসী কেন কিছু বলছে না, শুধু মাথা নিচু করে বসে আছে। মেঘা ওদের সামনে একটু দূরে একটা কাঠচাঁপা ফুলগাছের আড়াল থেকে দেখছিল। এভাবে কিছুক্ষন চলার পর মেঘা দেখল দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা অতসীর পাশ ঘেঁষে বসে পড়ল। আর ঠিক তক্ষুনি মেঘার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। নীলদার দেওয়া স্মার্ট ফোনটা বের করে পটাপট দু তিনটে ছবি তুললো ওদের। তারপর হন হন করে পার্ক থেকে বেরিয়ে গেলো। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে মেঘার ইচ্ছে হচ্ছিল ছবিগুলো কাকু কাকিমা দেখিয়ে দেয়। তাহলে এসব বন্ধ হবে, আর অতসীকেও বেশ জব্দ করা যাবে। কিন্তু মেঘা সেটা করবে না। এটা নিয়ে সরাসরি অতসীর সাথেই কথা বলবে আগে। তাই বাড়ি ফিরে মেঘা অতসীর বাড়ি ফেরার জন্যে ওয়েট করটা লাগলো।

অতসী যখন বাড়ি ফিরল তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। অতসীর ঘরের আলো জ্বলতে দেখে মেঘা বুঝতে পারল অতসী ফিরেছে। মেঘা আর দেরি না করে অতসীদের বাড়ি পৌঁছে গেলো। কাকিমা দরজা খুলেছে। মেঘা কাকিমাকে দেখে একটু হেসে বলল- "কাকিমা অতসী আছে?"

-"আছে তো। এখুনি তো ফিরলি তোরা একসাথে জানিস না?"

মেঘা মনে মনে ভাবল- অতসী তাহলে মিথ্যা কথা বলে বেরোচ্ছে ঘর থেকে। মুখে বলল- "হ্যাঁ, আসলে একটু দরকার ছিল, আমি ভুলে গেছিলাম তখন।"

-"হ্যাঁ, যা না। ও ঘরেই আছে।"

মেঘা অতসীর ঘরের দরজার কাছে এসে বুঝল দরজা খোলাই আছে। দরজাটা একটু ঠেলে পর্দা সরিয়ে মেঘা দেখল অতসী খাটের উপরে গোমড়া মুখ করে বসে আছে। কিছু না বলেই মেঘা ঘরে ঢুকে পড়ল। মেঘাকে দেখে অতসী বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো, পেছন ফিরে বলল- "তুই যা এখন। আমার সময় নেই। পরে আসিস।"

মেঘা চট করে দরজাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি তুলে দিয়ে বলল- "ও সময় নেই তাই না? তা থাকবে কেন? এখন তো নতুন বয়ফ্রেন্ড হয়েছে আপনার, আমার মতো মেয়ের সাথে আর সম্পর্ক রাখবেন কেন?"

-"দেখ তুই যেটা বুঝিস না, সেটা নিয়ে কথা বলবি না। এখন যা, প্লিস।"

-"না, যাবো না। আগে তুই বল আমাকে অ্যাভয়েড করছিস কেন? তুই নিজের মুখে পরিষ্কার বলে দে। আমি মেনে নেবো।"

-"আমি তোকে অ্যাভয়েড করিনি। আমার কিছু প্রবলেম আছে। এখন কথা বলতে চাইনা।"

-"আমি সেটাই তো জানতে চাইছি। কি প্রবলেম?"

অতসী এবার মেঘার হাত ধরে দরজার দিকে নিয়ে গিয়ে বলে- "তুই যা প্লিস। এখানে সিন ক্রিয়েট করিস না।"

মেঘা এক ঝটকায় অতসীর হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল- "ও আমি সিন ক্রিয়েট করছি তাই না। আর তুই কি করছিস? দেখাবো কাকিমাকে। একটু আগে তুই পার্কে দুতি ছেলের মাঝখানে বসে কি করছিলি, দেখাবো কাকিমাকে? আমার কাছে ছবি আছে।" এই বলেমেঘা মোবাইলে তোলা ছবিগুলো অতসীকে দেখাল। "এই নে দেখ।"

ছবিগুলো দেখে অতসী ভয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে তখন। ও মেঘার হাত ধরে বলল- "প্লিস এগুলো মাকে দেখাস না। আমি খুব বিপদে পড়েছি। এগুলো মা বাবা দেখলে আমাকে আর আস্ত রাখবে না।"

মেঘা অতসীকে খাটের উপরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে বলল- "তাহলে আমাকে সব খুলে বল কি হয়েছে। আর ওই ছেলে দুটো কে? ওরা তোর সাথে কি করছিল?"

অতসী বলে- "তুই যখন মামার বাড়ি গেছিলি তখন এই ছেলে দুটোর সাথে আমার দেখা হয়। ওই ঋক নামের ছেলেটা আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড ছিল। ওকে আমি চিনি, তাই ওর ফ্রেন্ডরিকুয়েস্ট নিয়েছিলাম। ঋক পড়াশোনায় খুব ভালো শুনেছিলাম। তুই চলে যাওয়ার দিন রাতে ওর সাথে চ্যাটিং হয়েছিল, সেদিন ওর জন্মদিন ছিল। আমি ওকে উইশ করেছিলাম। এমনিতে আগে দুএকবার কথা বলেছিলাম, খারাপ কিছু লাগে নি। তাই... ঋক বলল দুপুরে ওর জন্মদিনের পার্টি আছে, ওখানে লাঞ্চ করতে। অনেকবার ভেবে নিয়ে আমি রাজি হয়ে যাই। দিনের বেলায় ছিল বলে বেরোতে কোন সমস্যা ছিল না, আর ঋককে আমি আগেও দেখেছি কয়েকবার। তো আমি পরেরদিন দুপুরে গেলাম পার্টিতে। পার্টি ছিল ওর এক বন্ধুর বাড়িতে। ও বলল ওর বন্ধুর বাড়িতে কেউ নেই, তাই এখানেই লাঞ্চের ব্যাবস্থা করা হয়েছে। ওখানে ওর আরও অনেক বন্ধু-বান্ধবী ছিল। লাঞ্চ করার পর আমি ফিরে আসতাম। কিন্তু হঠাৎ আমার ভীষণ মাথা ঝিম ঝিম করছিল, চোখ ঢুলে পড়ছিল। এই অব্দি আমার মনে আছে। তারপর যখন আমি ঘুম থেকে উঠি, তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। ঋক আমাকে বলল আমি মাথা ঘুরে পড়ে গেছিলাম। তারপরে ওরা আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়। কিন্তু রাত্রেবেলায় আমাকে আমার কয়েকটা খারাপ ছবি আর ভিডিও পাঠায়, যেগুলো ওরা সেদিন বানিয়েছিল। এখন ওরা বলছে যে আমি যদি পাঁচ লাখ টাকা ওদের এখুনি না দিই তাহলে এই ভিডিও আর ছবি ওরা ইন্টারনেটের ওয়েবসাইট গুলোতে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করে দেবে।" এই অব্দি বলে অতসী আবার কাঁদতে শুরু করে দিলো।

-"তুই নিজে আমাকে বলিশ যে অচেনা কারো সাথে মিশবি না। আর তুই কিকরে একটা অচেনা ছেলের বার্থ ডে পার্টিতে চএল গেলি বল?"

-"আসলে আমি ঋককে একটু একটু চিনতাম আগে। কিন্তু ও যে এরকম করবে, ভাবিনি।"

-"ওদের কি টাকা দিয়েছিস।"

-"কিকরে দেবো? আমার কাছে যা ছিল আর কিছু টাকা বাবার কাছে চেয়ে নিয়ে হাজার পাঁচেক মতো দিয়েছি। আমি বলেছি এতো দেওয়া পসিবল নয়। ওরা বলছে মাসে মাসে দশ হাজার করে দিতে।"

মেঘা একটু ভেবে নিয়ে বলল- "হুম। শোন আমার কথা। এরকম ঘটনা আমি শুনেছি, নিউজে দেখেছি। এরা ব্ল্যাকমেল করে টাকা নেবে খালি। এদের এতো সাহস নেই যে ভিডিও আপলোড করবে। কারন সেটা করলেই পুলিশ ওদের ট্র্যাক করে ফেলবে। তুই ভয় পাসনা। ওদের বল যে তুই টাকা দিতে পারবি না, ওরা চাইলে তোর ভিডিও আপলোড করে দিক।"

-"কি বলছিস তুই জানিস? সত্যি করে দিলে কি হবে?"

-"আমার মনে হয় করবে না। আর যদি করে তখন ধরতে সুবিধে হবে।"

-"এসব বাড়িতে, পাড়ায় জানলে কি হবে বলতো? না না আমি করতে পারব না। তার চেয়ে ভালো টাকাটা জোগাড় করা। ভাবছি মায়ের কিছু গয়না আছে, ওগুলো দিয়ে কিছুটা মেটাবো।"

-"পাগল হয়েছিস তুই? শোন আমাদের পুলিশে যাওয়া দরকার, এসব ব্যাপার চেপে রাখা ঠিক না। আর কাকু কাকিমাকে জানানো উচিত তোর। টাকাটা পেয়ে গেলেও যে ওরা ভিডিও আর ছবি ডিলিট করবে তার কি মানে আছে? আরও টাকা চাইবে তখন কি করবি?"

-"আমি কিছু ভেবে পাচ্ছি না রে। আমার এখন মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমি না থাকলে আর এসব ঝামেলা হবে না।"

-"এসব কথা মাথাতেও আনবি না এখন বোকা। শোন আমি যাই এখন। ভেবে দেখি কি করা যায়। আর ওদের ফোন এলে বলবি তুই টাকা দিবিনা। কি করে তারপর দেখ।"

সেইদিন রাতে আর মেঘার ঘুম হয়নি। অতসীটা ভালো মতো ফেঁসেছে। ও এতো বোকা মেঘা জানতো না। তবে ছেলেগুলকে যেভাবে হোক ধরতেই হবে। আর এর জন্যে মেঘা একটা প্ল্যান করেছে। অতসীকে জোর করে বলা করিয়েছে যে ও টাকা দেবেনা। আর ঠিক সেটাই হয়েছে যেটা মেঘা ভেবেছিল। ছেলে দুটো রেগে গিয়ে বলেছে যে ভিডিও আপলোড করবে এবার টাকা না পেলে। আজ বিকেলে অতসী যাবে ওদের সাথে দেখা করতে। তবে মেঘা প্ল্যান করে জায়গাটা বদলে নিতে বলেছে। আজ ওরা পার্কের বদলে দেখা করবে একটা রেস্টুরেন্টে। সময় দিয়েছে একটু সন্ধ্যের দিকে, ছটায়। অতসীকে অনেক কষ্টে রাজী করাতে হয়েছে মেঘাকে। অতসী সময়ের একটু আগেই চলে এসেছে রেস্টুরেন্টে, কোনের দিকে একটা টেবিল বেচে নিয়ে বসেছে। মেঘা অতসীকে বলেছে- "ভয় পাস না, আমি আশেপাশেই থাকব।" অতসী বার বার সময় দেখেছে। ছটা বেজে গেছে। এমন সময় ওর মোবাইল বেজে উঠলো। অতসী দেখল ঋকের কল। ফোনটা তুলে নিয়ে হ্যালো বলতেই ঋক বলল- "কোথায় আছ?"

-"আমি রেস্টুরেন্টের ভেতরে।"

-"ওকে, আসছি আমরা।"

কথা শেষ হওয়ার দু মিনিটের মধ্যে অতসী দেখল ঋক আর ওর বন্ধু ঢুকছে। অতসীকে দেখে ওরা সামনের চেয়ারে এসে বসলো। এদিকে অতসীর হার্ট বিট বেরে গেছে। মেঘাও নেই আশেপাশে। বলেছিল থাকবে, কোথায় যে গেলো মেয়েটা। সামনের চেয়ারে বসেই ঋক বলল- "কি বলছিলে তুমি টাকা দেবেনা? তাহলে তো ভিডিওটা বিক্রি করেই আমাদের টাকাটা উঠাতে হবে। কি বল অমিতদা?" কথাটা বলে পাশের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ঋক হাসতে লাগলো। অতসীর ভয়ে হাত পা কাঁপছে। ও জানে এই অমিত নামের ছেলেটা ডেঞ্জারাস। এর আগেও ওরা এরকম করেছে কয়েকটা মেয়ের সাথে, অনেক খারাপ লোকের সাথেও যোগাযোগ আছে। অতসী খুব ভয়ে ভয়ে বলল- "আমি অতো টাকা কোথায় পাবো? আমার কাছে নেই।"

-"নেই? তাহলে জোগাড় করো। বাবাকে বল। তোমার বাবা তো বিজনেস ম্যান, মালকড়ি তো ভালই জমিয়েছেন নিশ্চয়ই। টা মেয়ের ইজ্জতের জন্যে ওখান থেকে আমাদের কিছু দিয়ে উপকার কি করবেন না?"

-"আমি বাড়িতে কিকরে বলব? বাবা মা জানে না কিছুই।"

এবার অমিত নামের ছেলেটা বলল- "জানে না তো জানাও। নাহলে দুনিয়ে জুড়ে লোকে দেখবে এই ভিডিও, ভাইরাল হয়ে যাবে কিন্তু। তখন কিকরে মুখ দেখাবে পাড়ায়?" অতসীর মুখে কথা নেই। বার বার ঠোঁট আর গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ওর। এতক্ষণ নাকের উপরে ঝুলে পড়া চশমাটার ভেতর দিয়ে টেবিলের উপরে তাকিয়ে ছিল অতসী। বাঁ হাত দিয়ে চশমাটা তুলতে গিয়ে ঋক আর অমিতের পেছনের টেবিলটায় খেয়াল পড়ল অতসীর। মেঘা বসে আছে, সাথে একটা ছেলে। ছেলেটা কে? অতসীর চেনা চেনা লাগছে, কোথাও দেখেছে ছেলেটাকে। আরে এটা তো নীল, মেঘার পিসতুতো দাদা। আগের বছর ভাইফোঁটার সমস্য দেখেছিল অতসী। নীলদা এখানে কি করছে? নিশ্চয়ই মেঘা ডেকেছে, একটা কথা পাঁচ কান না করলে মেয়েটার হয় না। অতসী মেঘাদের টেবিলের দিকে তাকিয়েছিল, ঋকের কথায় হুঁশ ফিরল। ঋক বলছে- "এদিক ওদিক কি দেখছ? অমিতদার কথাটা কানে যাচ্ছে না বুঝি। দাঁড়াও ছবিগুলো এবার তোমার বাড়িতে পাঠাতে হবে মনে হচ্ছে।" ঠিক এই সময় অতসী দেখল মেঘা সামনের টেবিল থেকে উঠে এসে ঋককে বলছে- "তার আআগে তোমার বাড়িতে এই সাউন্ড ক্লিপটা পাঠালে কেমন হবে বলতো?" এই বলে মেঘা টেবিলের নীচ থেকে টেপ দিয়ে আটকানো একটা মোবাইল বের করে ঋককে দেখিয়ে বলল- "এতে সব রেকর্ড হয়ে গেছে, আর ওই যে দেখছেন সিসি টিভি ওতেও ফুটেজ আছে। মেয়েদের অশ্লীল ছবি তুলে ব্ল্যাকমেল করার খুব শখ না! তোমার জেলে যাওয়ার ফুটেজ আপলোড করবো এবার, পাবলিকে দারুন খাবে।" মেঘার কথা শুনে ঋক আর অমিত পালাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পেছনে নীলদা দাঁড়িয়ে ছিল, ও ঋককে ধরে ফেলেছে। আর তখনি রেস্টুরেন্টের দরজার কাছে পুলিশও এসে উপস্থিত, অমিতও পালাতে পারে নি। দুজনকেই নিয়ে গেছে থানায়। এসব দেখে অতসী অবাক হয়ে গেছে। মেঘা বলল- "আমি আগেই জানাতাম পুলিশ ছাড়া এদের আটকানো যাবে না, তাই তোকে না জানিয়েই আমি নীলদাকে জানিয়ে রেখেছিলাম। ওই পুলিশ নিয়ে এসেছে, আগের বছরেই ক্রাইম ব্রাঞ্চ জয়েন করেছে না দাদা। রেস্টুরেন্টের মালিকের সাথে কথা বলে সিসি টিভির ফুটেজ নেওয়ার প্ল্যান আর এই টেবিলের নীচে মোবাইল রেখে দেওয়ার আইডিয়াটাও নীলদারই। কি বুঝলি?"

অতসী তখনও ভয়ে ঘামছে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল- "থাঙ্ক ইউ দাদাভাই। আর তোকেও অনেক অনেক থাঙ্কস মেঘা। আজ তুই না থাকলে আমি যে কি করতাম জানিনা।"

-"আরে আমি তো তোর বন্ধু নাকি। থাঙ্কস বলার কি আছে। তবে শোন, এবার কাকু কাকিমাকে ব্যাপারটা জানাতে হবে। থানায় যেতে হলে ওদের সাথে নিয়ে যাবি।"

-'হ্যাঁ রে, আমি ভুল করেছি। আমার উচিত ছিল প্রথম দিনেই বাব মাকে ব্যাপারটা বলা।"

-" অচেনা লোকজন মানেই ফেক প্রোফাইল তা নয়, চেনা লোকেরাও অনেকসময় মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায় এই সোশ্যাল নেটওয়ার্কে। সে গুলোও ফেক প্রোফাইল, বুঝলি। কে আসল বন্ধু আর কে ফেক সেটা সময় থাকতে নিজেকেই বুঝে নিতে হয়। তাই না?"

=================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.