রায়মাটাং এ ভয়ঙ্কর বিপদে

নিউজলপাইগুড়ির আগের স্টেশনের নাম ফালাকাটা।এক হেমন্তের খুব ভোরে যখন ফালাকাটায় নামলাম তখন প্রথম যে চমকটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল তা হল- ইস্টিশন থেকে(ফালাকাটা স্টেশন টি কে ইস্টিশন ই বলা উচিৎ)আমাদের দিকে দুচোখ ভরে তাকিয়ে রয়েছে চিরতুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা।এর আগে গরমকালে যতবার উত্তরবঙ্গে এসেছি ততবারই হাপিত্যেশ করে বসে থেকেছি কখন কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা পাব! তাই মেঘ না চাইতেই জলের মত -এই হাল্কা ভালবাসা মাখা ঠান্ডায় আমি আমার আঠেরো মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম সেই অপার সৌন্দর্যের দিকে।

হঠাৎ কাঁধে একটা হাত এসে পড়ায় চমকে দেখি আমার বন্ধু তপন এসে গেছে আমাকে নিয়ে যেতে। তপন আমার বাল্যবন্ধু।সে এখানে থাকে।উঠবো ওরই বাড়িতে। ফাঁকাফাঁকা শহরতলির মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম।শহরের একপ্রান্তে ওদের সাজানো গোছানো দোতলা বাড়ি। সেকন্ড রাউন্ড চা এর সময় তপন বলল-"তুই চা এর কাপটা নিয়ে ছাদে চলে যা।একটা সারপ্রাইস আছে"। বাড়ির একেবারে মাথায় উঠে দেখি নিজের অনন্ত রূপসম্ভার নিয়ে ঝকঝকে আলোয় ধ্যানমগ্ন ঋষির মত দাঁড়িয়ে রয়েছে চিরতুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা।মনে হল আমার আসাটা সত্যিই সার্থক হয়েছে।

পরেরদিন একটা গাড়িভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম।সামনেই ভুটান সীমান্ত।পশ্চিমবঙ্গ পেরোলেই ভুটানের যে শহরটি পড়ে তার নাম ফুন্টসিলিং।যদিও ভুটান অন্য একটি দেশ তবুও দুই দেশের মধ্যে কোনো পাসপোর্ট বা ভিসার ব্যবস্থা নেই।ফুন্টসিলিং শহরটি অত্যন্ত সাজানো গোছানো।সবচেয়ে মজা লাগে ভুটানি দের ঐ জবরদস্ত পোশাকের বাহার দেখলে।ভুটানে এখনও রাজতন্ত্র বর্তমান।তাই সমস্ত ব্যাপারেই একটা রাজকীয় আভিজাত্য আছে।ফুন্টসিলিং গুম্ফাটির শান্ত পবিত্রতাও ভীষন ভাবে মন কাড়ে।আরো মজা হল -ভুটানে তেলের দাম অনেক কম।তাই ভারতীয় ড্রাইভার দের ভিড় জমে যায় ভুটানের পেট্রলপাম্প গুলিতে।

ভোরবেলায় বেরিয়েছিলাম।হাতে অজস্র সময়।চারিদিকে ঝকঝক করছে সোনালি রোদ।কৈশোরের প্রেমের মত খুব হাল্কা একটা হিমেল হাওয়া আদর করে যাচ্ছে আমাদের চুলে ও মুখে।এইসময় পৃথিবীতে মানুষ হয়ে জন্মানোকে বড় উপভোগ্য ও সার্থক মনে হয়। ড্রাইভার বলল-চলুন রায়মাটাং ঘুরে আসি।

ঘন নীল আকাশের কোলে শুয়ে থাকা চিরসবুজ চা বাগানের পাশ দিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা।চা বাগানের মধ্যে মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেবদারু,ইউক্যালিপটাস,পাইন ,ফার সহ নানান নাম না জানা চিরহরিৎ বৃক্ষ। শহর ছাড়িয়ে আমরা ক্রমশ প্রবেশ করতে লাগলাম ঘন জঙ্গলাকীর্ন নির্জনতার মধ্যে।যেন আমরা চলেছি পৃথিবীর শেষ স্টেশনে।হঠাৎ চোখে পড়লো একটি আর্মি বেস ক্যাম্প।আর্মি বেস ক্যাম্প ছাড়িয়ে আরো বেশ কিছুটা যাওয়ার পর আমাদের অ্যামবাসাডার ডানদিকে মোড় নিল। -শুনতে পাচ্ছেন স্যর? -কি বলোতো? -ভাল করে শুনুন।আমি স্টার্ট বন্ধ করছি। দুর থেকে শুনতে পাচ্ছি ঝরনার শব্দ।তীব্র বেগে একটানা বৃষ্টি হয়ে গেলে যে শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি হয় এও অবিকল সেই শব্দ।রাস্তা অসহ্য রকমের এবড়োখেবড়ো।তারই মধ্যে দিয়ে খুব সাবধানে আমাদের গাড়ি এগোচ্ছে।প্রায় মাঝরাস্তায় পৌঁছে গেছি,কারন জলের শব্দ ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। এমন সময় একটা পাথর ও কাদার বাঁকে আমাদের গাড়িটা ভয়ঙ্কর ভাবে আটকে গেল। সঞ্জয়-মানে আমাদের ড্রাইভার একেবারেই অনভিজ্ঞ,তার বয়স কোনোভাবেই সতেরো আঠেরো র বেশি নয়।সে নানান কসরৎ করেও কিছুতেই গাড়িটিকে বের করতে পারলোনা।এইরকম সময়ে প্রথমেই সমস্ত রাগ এসে পড়ে ড্রাইভারের উপর।তেড়ে ধমক দেওয়ার পর ভাবলাম দোষ তো আমারও।আমিও তো বারন করতে পারতাম।স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সেই ঘন জঙ্গলের মধ্যে অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম।বেলা যদিও একটা দেড়টার বেশি নয় তবুও সেই ঝিঁ ঝিঁ ডাকা ঘন বনের মধ্যে বিরাজ করছে চির অন্ধকার।একটু আগেই এই বনের শোভায় মুগ্ধ হচ্ছিলাম অথচ এখন এই সবুজ অন্ধকারই আমাদের গিলে খেতে আসছে।দুপাশের ঘন জঙ্গলের মাঝের চুলের সিঁথির মত একচিলতে রাস্তায় ছড়িয়ে রয়েছে হাতির বিষ্ঠা।সেগুলি একেবারে টাটকা।তারমানে হাতিগুলি কাছাকাছিই আছে।এই জঙ্গলে র ভিতর থেকে আমাদের দিকে কড়া চোখে নজর রাখছে বাইসন,গন্ডার এবং চিতাবাঘের দল।পাশের একটা গাছ থেকে ট্র্যাঁয়ায়াওও....ট্র্যাঁয়ায়াওও করে একটানা ডেকে আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে একটা নাম না জানা লাল হলুদ পাখি।এতক্ষন আকাশে ছিল ঝকঝকে রোদ।হঠাৎ ই আমাদের বিপদ বুঝে সারা আকাশ জুড়ে হানা দিয়েছে কালো মেঘের দল।চারিদিক হয়ে উঠেছে রহস্যময়।প্রায় মিনিট কুড়ি পঁচিশ অক্লান্ত চেষ্টার পর ঘেমে নেয়ে গিয়েও আমরা একচুল ও নড়াতে পারলাম না আমাদের বাহনকে।সে যেন মরনপন জেদ নিয়ে ঠিক করেছে - একচুল ও না নড়ার।এদিকে টিপটিপ করে শুরু হয়েছে বৃষ্টি।

সঞ্জয় বলল-'আপনারা আর্মি ক্যাম্পে গিয়ে সবকিছু জানান দাদা।আমি এখানে আছি'। সেই আঁধার হয়ে আসা ধরনী তে টিপটিপে বৃষ্টির মধ্যে আঠেরো মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে আমি ও আমার স্ত্রী প্রাণপন ছুটতে লাগলাম।জঙ্গলের মধ্যে মোবাইলটাও কাজ করছিলো না।বাইরে এসেই তপন কে ফোন করে জানালাম।এক আদিবাসি মহিলার সঙ্গে দেখা হল।তিনি বললেন -যত তাড়াতাড়ি পারেন এখান থেকে যান।আমরা বিকেলের পর আর বাড়ির বাইরে যাইনা।এ জায়গায় তখন রাজত্ব করে হাতি ও বাঘেরা।প্রাণভয়ে ক্রন্দনরতা কন্যাকে কোলে নিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে ছুটতে লাগলাম সেই আর্মি বেস ক্যাম্প এর দিকে।যখন পৌঁছলাম -আমরা তিনজনেই তখন ঐ শীতের মধ্যেও একেবারে গলদ ঘর্ম হয়ে গিয়েছি। ................................................. আর্মি অফিসারদের অকল্পনীয় আন্তরিকতা ও সহযোগিতায় সেই একগুঁয়ে গাড়িটিকে জঙ্গল থেকে বের করা হল।তাদেরকে না জানিয়ে জঙ্গলে যাওয়ার জন্য সেনা জওয়ান রা বকাঝকাও করলেন।আমাদের সঙ্গে থাকা মিষ্টি ও ক্যাডবেরি আমরা সবাইকে ভাগ করে দিলাম। মধুরেন সমাপয়েত হওয়ার পর আমরা যখন ফিরে আসছি তখন আকাশে আবার দেখা দিয়েছে রোদের ঝিকিমিকি।সারা আকাশ জুড়ে তৈরি হয়েছে এক অনিন্দ্যসুন্দর রামধনু।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.