খুব অদ্ভুতভাবেই তিন ভূতের দেখা হয়েছিল। থাকত তারা আলাদা জায়গায়। যে যার জায়গা থেকে বিতাড়িত হয়ে শেষ পর্যন্ত তারা ঠাঁই নেয় একটা বহু প্রাচীন বটগাছে। খোলা মাঠে একটা বটগাছই শুধু ছিল। যে সে বটগাছ নয়, অনেক তার ডালপালা। রাতের অন্ধকারে তার ধারে কাছে দিয়ে যাবার সাহস কেউ দেখাত না।


এখন কথা হল- তিন ভূত একসাথে এখানেই বা আশ্রয় নিল কেন? তার একটা জোরালো কারণ অবশ্যই আছে। এই তিন ভূত তিন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তাদের নাম শুনলেই তাদের জ্ঞানের বহর বোঝা যায়। ভূতমহলে তারা পরিচিত অতীতভূত, বর্তমানভূত আর ভবিষ্যৎভূত নামে। যেমন তাদের নাম, তেমনই তারা অহংকারী। প্রত্যেকেই ভাবত সে সর্বজ্ঞানী। অতীতভূত অতীতের সব খবর রাখত। কোনো ভূত যদি তার অতীত জীবন নিয়ে জানতে উৎসুক হয়, সোজা চলে যায় অতীতভূতের বাড়ী। অতীতভূতও গম্ভীর হয়ে তাদের পুরনো জীবনের কথা বলে তাদের তাক লাগিয়ে দেয়। বর্তমানভূত আবার বর্তমান সময় ছাড়া কোনো কিছুরই খবর রাখে না। তার মতে অতীত বা ভবিষ্যৎকালের কোনো গুরুত্ব নেই। বর্তমানকালই হল আসল। ভবিষ্যৎভূত আবার শুধু ভবিষ্যতের কথাই বলে। তার মতে ভবিষ্যৎ না জানলে সবকিছুই বৃথা। এই তিন ভূতকে নিয়ে বাকী ভূতেরা পড়েছে বেজায় মুশকিলে।


কিছু ভূতের বক্তব্য অতীত নিয়ে ভেবে কোনো লাভ নেই। কিছু ভূত ভাবে অতীত বা ভবিষ্যৎ ছাড়া বর্তমান প্রাণহীন। আবার কিছু ভূত ভাবে-- ভবিষ্যতের কথা যারা বলে তারা বুজরুক। মনের দুঃখে তিন ভূত তাই এক গভীর রাত্রে যে দিকে দু’ চোখ যায় সেদিকে বেরিয়ে পড়ে। তারা যে ভূতসমাজের মেরুদণ্ড একথা যখন কেউ বুঝল না তখন তাদের চলে যাওয়াই ভালো।


খুব অলৌকিকভাবে তাদের দেখা হয় এক প্রাচীন বটগাছে। ভূত যখন তারা, অলৌকিক কিছু তো ঘটবেই তাদের সাথে। অতীত ভূত বটগাছের একটা ডালে বসে নিজের অতীতের কথা ভাবছিল। বর্তমান ভাবছিল এই বর্তমান জীবন আমায় কি দিল? আর ভবিষ্যৎ ভাবছিল ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর লাভ কী? মনের দুঃখে তারা বটগাছের ডালেই ঘুমিয়ে পড়ল।


তখন রাত প্রায় তিনটে। হঠাৎ করে একটা হো-হো হাসিতে তিনজনের ঘুম ভেঙে যায়। ভূত হলেও তারা তিনজনেই একটু চমকে ওঠে। হাসির উৎস জানার জন্য লম্বা লম্বা পা ফেলে তারা তিনজনেই একে একে নীচে নামে। আর তখনই একে অপরকে দেখতে পায়। একে অন্যের পরিচয় জেনে আরো অবাক হয়। ।


কিন্তু এখন কথা হল- কে হাসল? এই জনমানবহীন নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে হাসার মত সাহস ভুত ছাড়া আর কার আছে? কাউকেই তো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। তিন ভূত তখন নিজেদের ক্ষমতা লাগাতে বসল। নাহ্‌ এই অদ্ভুত ঘটনা তো সময়কেও হার মানায়। যে ঘটনার ব্যাখ্যা অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ দিতে পারছে না, সেই ঘটনা তো অত্যাশ্চর্য, অতীব অলৌকিক।


সারাদিন ভেবেও এই রহস্যের কোনো কিনারা হয় না। সুতরাং তিন ভূত ঠিক করে আজ রাতে আবার সতর্ক থাকতে হবে। গভীর রাত। তিনটে বাজে। আবার সেই হো-হো হাসি। হাসি আর থামতেই চায় না। আরে, এ তো বটগাছটা হাসছে। তিন ভূত মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। ত্রিকালজ্ঞ বটগাছ। ভূত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছুই নাকি তার নখদর্পণে। তা তার এই হাসির মানে কি? কোনোভাবেই এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তিন ভূত বটগাছের দ্বারস্থ হল।


এবার বটগাছ গম্ভীর। তার নীরবতা তিন ভূতকে অধৈর্য করে তুলল। অতীত প্রশ্ন করল-‘আপনার এই হাসির মানে কি ছিল?’ বর্তমান জিজ্ঞেস করল-‘আপনি এখন আর হাসছেন না কেন?’ ভবিষ্যৎ প্রশ্ন করল-‘আপনার হাসি ভবিষ্যতে থাকবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা আছে?’ বটগাছ এবার মুখ খুলল- ‘এইজন্যই তোমাদের কদর নেই ভূতসমাজে।‘


‘এর মানে কি?’ তিন ভূত জানার জন্য উৎসুক।


মানে হল-‘তোমরা আলাদা আলাদা ভাবে যা কিছু ভাবছ, তা আমি একসাথে ভাবতে পারি।

অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ এই তিনটে একসাথে না হলে সময়কে আর তার সাথে জড়িত যা কিছু, ঠিকভাবে বিচার করা সম্ভব হয় না।‘ ‘হতেই পারে না’-তিন ভূত সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল।


‘চলো তবে একটা খেলা খেলি। তোমরা তো জানো যে আমার ধারেকাছে দিয়ে কেউ যেতে সাহস পায় না। আমি এমন উপায় করব, যাতে মানুষ অতীতের ভয়কে ভুলে বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আমার সাথে নির্ভয়ে আর শান্তিতে কাটাবে। তোমরা দেখি তিন ভূত অতীতের মতই বর্তমান আর ভবিষ্যতেও মানুষের মনে আমাকে নিয়ে একই ভয় রেখে দিতে পার কিনা। কিন্তু একটা কথা, প্রত্যেককে আলাদা ভাবে ভয় দেখাতে হবে।‘


তিন ভূত বলল-‘ঠিক আছে, আমরা তোমার চ্যালেঞ্জ নিলাম।‘


পরের দিন সকালে বটগাছটা ঠিক করল- মানুষের মনে শান্তির ছায়া প্রদান করবে। বটগাছ সবুজ ডালপালায় ভরে উঠল। চারপাশে খাঁ খাঁ রোদ। তারই মাঝে বটগাছের তলায় ঠাণ্ডা ছায়া অনেক পথিককে আকৃষ্ট করল। বহু পথিক প্রচুর রোদ মাথায় করে যাবার সময় দু’দণ্ড গাছের তলায় বসল।


সবে তারা দু’চোখ বুজে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে, অমনি সোঁ-সোঁ আওয়াজ। বটগাছের ডালপালাগুলো খুব জোরে নড়ে উঠল। অতীতভূত একনিমেষে পথচারীদের মনে পুরনো ভয়কে আবার জাগিয়ে তুলল। কিন্তু আগের কথা ভেবে লাভ কি? আগে তো বটগাছের তলায় বসে এত শান্তি পাওয়া যেত না। সুতরাং দু’দণ্ড এখানে না বসে উঠবই না। পথচারীদের সিদ্ধান্ত শুনে অতীতভূত পরাজিত হয়ে মাথা নীচু করে চলে গেল।


এ বার বর্তমানভূতের পালা। হঠাৎ করে বটগাছের চারপাশে একটা ছম্‌ছমে পরিবেশ তৈরী করে দিল। কিন্তু সেই পরিবেশকে উপলব্ধি করার মত মানসিক স্থিতি তো পথচারীদের নেই। তারা তো বটগাছের তলায় বসে মহানন্দে নিদ্রা দিচ্ছে। অগত্যা বর্তমানভূতেরও সব প্ল্যান নষ্ট হয়ে গেল।


এবার ভবিষ্যৎভূতের পালা। পথচারীদের ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন আনল ভবিষ্যৎভূত। ভবিষ্যতে এই বটগাছের তলা কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে, তার একটা ভয়ানক চিত্র দেখে পথচারীদের ঘুম ভেঙে গেল। একটু ভয় পেলেও বটগাছের এই মনোরম পরিবেশ তাদের সব ভয় দূর করে দিল। ভবিষ্যৎভূতও হাল ছেড়ে দিল অগত্যা।


তিন ভূত মাথা নীচু করে আবার বটগাছের ডালে উঠে বসল।


বটগাছ আবার হো-হো করে হেসে উঠল। ‘দেখলে তো, অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ একসাথে বিচার না করে কোনো ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সবকিছুরই গুরুত্ব আছে। অন্ধভাবে কোনো বিশেষ কালকে বিশ্বাস করে দিন কাটানো ঠিক নয়। এখন থেকে চেষ্টা কর, একে অন্যের থেকে কিছু শিখতে।‘


সময়কে আমরা মাঝে মাঝেই ভুল ভাবি। আমরা ভুলে যাই যে সময়ের সাথে আমরা এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। আমরা যা অতীতে শিখি তাই বর্তমানে প্রয়োগ করি। আমাদের বর্তমানই আমাদের ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। সব কালের মধ্যেই একটা শিক্ষা থাকে। সেই শিক্ষাই আমাদের পরিচয়।






bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.