বনবিবি

বনবিবি

শীতের সকালের উথলে ওঠা আলোয় ভেসে যাচ্ছে মাতলা নদী।একপাশে ঝড়খালি অন্যপাশে বাংলাদেশ সীমান্ত।দুদিকের সবুজ বনভূমির মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে ভয়ঙ্কর তেজী যুবতী মাতলা।বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় সংগীতের সুর।মাতলা নদী উন্মুখ হয়ে ধাবিত হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের দিকে। নদীর বুকে ভেসে চলেছে একটি নৌকা।সেই নৌকায় ইতস্তত শুয়ে বসে রয়েছে পাঁচ জন যুবক।এই যুবকেরা প্রত্যেকেই কলকাতার বাসিন্দা- শিক্ষিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। নৌকার মাঝি প্রৌঢ় রমজান আলি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন তাদের দিকে।

এই এক দঙ্গল যুবক কে নৌকায় তোলার বিন্দুমাত্র ও ইচ্ছা ছিলনা রমজানের।আগে হলে মুখের উপর "না" বলে দিতেন তিনি।কিন্তু আয়লার পর তার এখন মরার দশা।ঘরটাও ভেঙে গেছে।সারাতে হবে।সরকারি সাহায্য আসে নামমাত্র।বড় মেয়েটা কাজের ধান্ধায় কলকাতায়।বড়ছেলেটা মজুরের কাজ করতে চলে গেল মুম্বাই।টাকা...টাকার এখন বড় দরকার।অভাব যেন দাঁত নখ বের করে তাদের গিলে খেতে আসছে।

এই যুবকেরা উঠেছে ঝড়খালি বনবাংলো তে।সকাল থেকে একটানা মদ খেয়ে চলেছে যুবকের দল।আর সেই সঙ্গে অশ্রাব্য মুখের ভাষা।রমজান ভাবছেন এই শহুরে ছেলেগুলো প্রত্যেকেই ভদ্র পরিবারের অথচ কি অসভ্য!তার মত বয়স্ক লোকের সামনে কি অশ্লীল ভাবে এরা মেয়েদের শরীর নিয়ে কথা বলছে।তিনি নিরক্ষর হলেও এদের চেয়ে অনেকই সভ্য।রমজান দাঁড় বাইতে বাইতে ভাবতে লাগলেন-এই আপদগুলো কতক্ষনে ঘাড় থেকে নামবে কে জানে!

কাকা..তুমি কখনও বাঘ দেখেছো কাকা? ছেলেটি মদ খেয়ে একেবারে চুর হয়ে রয়েছে।রমজানের কাঁধে হাত রেখে মুখের কাছে মুখ এনে সে আবারও একই প্রশ্ন করল। রমজান হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে বেশ কড়া দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকালেন। এইবার আরো একটি মাতাল যুবক টলতে টলতে এগিয়ে এলো।জড়ানো গলায় বলল-আঃ রাগ করছো কেন বস?চলো না -আজ একবার বাঘের ডেরায় নিয়ে চলো!আজ বাঘ মারবো।ছেলেটি এসে রমজানের গা ঘেঁষে বসল। রমজান ইস্পাত কঠিন কন্ঠে বললেন-"এখন জোয়ারের টান।আমারে বিরক্ত কোরেননা।যান-ভালভাবে বসেন"। এবার আরেকটি যুবক কাঁচা হুয়িস্কি গলায় ঢালতে ঢালতে বলল-গুরু,তোমার কাছে বাঘের গল্পের স্টক যা আছে বলোনা!সুন্দরবনে এলাম বাঘ দেখবো বলে।ধুর শালা!বাঘের কোনো চিহ্ন ই নেই!

এক ভয়ঙ্কর ক্রোধ রমজানের আপাদমস্তক জ্বালিয়ে দিল।রমজান এক বজ্রকঠিন হুঙ্কার দিয়ে বললেন-চোপ!একদম চোপ!খালি বাজে কথা।আর একটা বাজে কথা বললে আমি শাবল দিয়ে মাথায় বাড়ি মেরে সবকটারে জানে মেরে মাতলার জলে ভাসায় দেবো।প্রৌঢ় মানুষটি দাঁড় ফেলে শাবল নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন!বিদ্যুতের আলোর মত ঝলসে উঠেছে তার পাথরে কোঁদা শরীর।

(২)

উঠোনে বসে একমনে বিড়ি টানছেন রমজান আলি।তার ঐ রুদ্রমূর্তি দেখে বিলক্ষন ভয় পেয়ে গিয়েছিল শহুরে বাবু রা।যাদের বয়স তার সন্তানের সমান।তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন ওই বাচ্চাগুলোকে।ওরা শহরের লোক,ওরা কি করে জানবে যে দক্ষিন রায় এর রাজ্যে নৌকায় যেতে যেতে ঐ অশুভ কথা মুখে আনতে নেই।শহরের বাবুরা -যারা চিড়িয়াখানার নিশ্চিন্ত ঘেরাটোপে বাঘ দেখে অভ্যস্ত তারা ভাবে জঙ্গলের বাঘ ও বোধহয় তেমনই নিরীহ।তাদের ধারনাও নেই সুন্দরবনের গ্রাম কে গ্রাম পুরুষ শূন্য হয়ে গেছে ।মধু আনতে গিয়ে তাদের যেতে হয়েছে বাঘের পেটে। পড়ন্ত বিকেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন রমজান।মনের মধ্যে হু হু করা এক কান্না এসে ঝাপটা মারছিল।তার মনে পড়ছিল আবুল এর কথা।আবুল...তার বড় আদরের সন্তান।সেবার জঙ্গলে মধু আনতে যাবেন তিনি।তার চোদ্দো বছরের ছোট ছেলেটাও বায়না ধরল তার সঙ্গে যাবে।ছোট ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে যান রমজান।বনবিবি ও দক্ষিন রায়ের পুজো দিয়ে ছেলেকে নিয়েই বনের ভিতরে ঢুকলেন তিনি।

রাত হয়ে এসেছে।সারাদিন সংগ্রহ করেছেন প্রচুর মধু।নৌকার মধ্যে কুপি জ্বেলে রান্না চাপিয়েছেন রমজান।সঙ্গী আরিফুল গুনগুন করছে একটা ভাটিয়ালি সুর।আবুল মাছ কুটতে বসেছে।হঠাৎ নৌকাটা খানিক দুলে উঠল।একটা হলুদ আলো যেন বিদ্যুতের মত আবুল কে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে চলে গেল। আ..বু..ল !! রমজান এক প্রাণপন চিৎকার করে মরিয়া হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মানুষখেকো জন্তুটির উপর।বসালেন দা এর কোপ।আরিফুল একটা কঞ্চি আমুল বসিয়ে দিল বাঘটির চোখে।রমজান সেই সুযোগে ছেলেকে বাঘের মুখ থেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেন।হিংস্র জন্তুটি এবার রমজানকে আক্রমন করল।ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল তার সমস্ত শরীর।চোখের মধ্যে ছুঁচালো কঞ্চি ঢুকে যাওয়ায় বাঘটি অবশেষে রনে ভঙ্গ দিল।পালিয়ে গেল গভীর জঙ্গলে।কিন্তু ততক্ষনে সব শেষ হয়ে গেছে।ছেলের নিথর দেহ আগলে সারা রাত বসে রইলেন বাবা।

শেষ বিকেলের আলো এসে পড়েছে প্রৌঢ় রমজান আলি র বয়স্ক মুখে।সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে রক্তস্নাতা মাতলা।আকাশ জুড়ে শুরু হয়েছে রঙের হোলিখেলা।একটু পরেই শেষ হয়ে যাবে ক্লান্ত বিকেল।সন্ধ্যে ছুটে যাবে রাত্রির সন্ধানে।সারাদিনের অবিশ্রান্ত ওড়াউড়ির পর পাখি রা ফিরে যাচ্ছে তাদের নিজস্ব ঠিকানায়।রমজানের চোখে তার হারিয়ে যাওয়া ছেলেটির কৈশোরের নরম গন্ধমাখা মুখটা ভেসে ওঠে।সে বেঁচে থাকলে আজ ঐ শহরের ছেলেগুলোর বয়সি ই হোতো।রমজানের পাথুরে শরীর থেকে অস্ফুটে একফোঁটা অশ্রুবিন্দু তার কর্কশ গাল বেয়ে চিবুকের দিকে নেমে আসতে লাগলো।

============================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.