ঢং।

পাশের ঘরের দেওয়াল ঘড়িটা জানিয়ে দিল সাড়ে দশটা বাজে। রোজই জানায়। কিন্তু অন্যদিন এইসময় সবকিছু কীরকম ওলটপালট হয়ে যায় আমার। প্রাণপণ চেষ্টা করি নিজেকে ঠিক রাখার। পারিনা। প্রচণ্ড ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে আমার শরীর। আর তো বড়জোর পনেরো মিনিট। তারপরেই...

কিন্তু আজ আমার আর ভয় করছিল না। বরং একটা চাপা উত্তেজনা টের পাচ্ছিলাম সমস্ত শরীরে। আমি তৈরি। আজ আততায়ী নয়, আঘাত করব আমিই।

আমার এই পরিবর্তনের পিছনে যে মানুষটার হাত আছে তার নাম সূর্য। তখন দুপুর আড়াইটে বাজে। লুকিয়ে, বলতে গেলে প্রায় চোরের মত গিয়েছিলাম ওর ফ্ল্যাটে। আমার অনুরোধেই ও আজ অফিস যায়নি। কিন্তু আমার কথা শুনে চমকে উঠেছিল সূর্যও, “তা কী করে হয়? ও আমার সিনিয়র। আমি কী করে ওর এগেন্সস্টে যাব?”

পায়ের তলায় মাটি সরে গিয়েছিল। সূর্য সব জানে। তবু মরিয়া হয়ে চেপে ধরেছিলাম ওকে, “তুমি আমার পাশে দাঁড়াবে না সূর্য? তাহলে তো আমি শেষ হয়ে যাব। আমার তো তিনকুলে কেউ নেই সূর্য। আর তুমি তো জানো, রজত আমাকে চাকরি করতে দেয়নি। আমার কোনও ইনকাম নেই। আমি একলা কী করে লড়ব?”

গলা ভারি হয়ে এসেছিল; বাধ্য হয়েই থেমে গিয়েছিলাম। কিন্তু আর কোনও কথা বলেনি সূর্যও। হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল ওর মুখ। আর চোখ দুটো অসহিষ্ণু। ও যেন আর আমাকে দেখতে চায়না এখানে।

দেড় বছর ধরে সূর্যকে চিনি। সূর্য আমার বর রজতের জুনিয়র। প্রথমবার ওকে দেখেছিলাম আমাদের বাড়িতে। কী একটা কাজ নিয়ে রজতের কাছে এসেছিল। আমিই দরজা খুলে বসিয়েছিলাম ওকে। সেদিনই ওর দু’চোখের মুগ্ধতা দৃষ্টি এড়ায়নি আমার।

ওই মুগ্ধতা তো আমারই জন্য। বুঝতে দেরী হয়নি। বিয়ের পর তখন সবে ছ’মাস হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেই টের পেতে শুরু করেছিলাম রজতের আসল রূপ। তাই আঁকড়ে ধরেছিলাম সূর্যকেই। রজতের আড়ালে একটু একটু করে এগিয়েছিল আমাদের সম্পর্ক। সামনে পাহাড় প্রমাণ বাঁধা। রজত জানতে পারলে আর রক্ষে নেই। তা সত্ত্বেও অল্প অল্প করে নিজেকে মেলে ধরছিলাম সূর্যর কাছে। কিন্তু তখনও জানতাম না এই অবজ্ঞা আমার পাওনা রয়ে গেছে সূর্যের কাছে!

তবে শেষ পর্যন্ত আমাকে খালি হাতে ফিরতে হয়নি। একটু পরেই বদলে গিয়েছিল সূর্য। আমি তখন সবে দরজার দিকে পা বাড়িয়েছি, হঠাৎ শুনতে পেয়েছিলাম সূর্যর কণ্ঠস্বর, “লীনা।”

এই ডাকটা শোনার জন্যই তো অপেক্ষা ছিল আমার। চোখের পলকে ঘাড় ঘোরাতেই দেখেছিলাম সূর্যের দু’চোখে বিষণ্ণতা। সে বলেছিল, “সরি। আমি তোমাকে হেল্প করতে চাই।”

“সত্যি?” মুহূর্তে খুশী চলকে উঠেছিল আমার গলায়।

“হ্যাঁ, কিন্তু রজতদা তোমাকে কী করেছে?”

“তুমি জানতে চাও?”

“না জানলে তোমাকে হেল্প করব কীভাবে?”

সূর্যর ভরসা পেয়ে ঝড় উঠেছিল আমার প্রতিটি স্নায়ুতে। গণ্ডগোল হয়ে গিয়েছিল সবকিছু। মনে হয়েছিল কিছুটা অন্তত ওকে দেখানো দরকার। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধই ছিল। দু’বার ভাবিনি, ওর সামনেই টেনে খুলে ফেলেছিলাম নিজের কুর্তিটাকে।

সূর্য আর আমি একই বয়সী। আঠাশ বছরে পা দেওয়ার আগেই বেশিরভাগ মেয়েরই বিয়ে হয়ে যায়। কিন্তু ওই বয়েসে অনেক ছেলেই ব্যাচেলর থাকে। সূর্যও ব্যাচেলর। তার উপর আমাদের ভিতরে কোনওদিন শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। তাই প্রথমবার আমার শরীর দেখে সে ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরেই আরও গাঢ় হয়েছিল ওর দু’চোখের বিষণ্ণতা।

জিনসের উপর এক টুকরো ব্রা। লজ্জা লেগেছিল নিজেরই। মাথা নিচু হয়ে গিয়েছিল। তবু দু’হাত দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করিনি শরীরটাকে। ওকে কাছে পাওয়ার জন্য যে তখন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে মন।

সূর্য বোধহয় বুঝতে পেরেছিল আমার মনের কথা। এগিয়ে এসে সে বুকে টেনে নিয়েছিল আমাকে। ওর কণ্ঠস্বরেও গভীর বিষণ্ণতা, “একটা মেয়েকে একলা পেয়ে কেউ এভাবে আঁচড়ায়, কামড়ায়, আর সিগারেটের ছেঁকা দেয়। ছিঃ।”

হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে। লুকোতে পারিনি, বলে ফেলেছিলাম সত্যি কথাটা, “এতো কিছুই নয় সূর্য। আমার পুরো শরীরটা দেখলে বুঝতে পারতে মানুষ কতটা নীচে নামতে পারে।”

“আমি সব বুঝতে পেরেছি লীনা। তোমায় কথা দিলাম, মানুষ হিসাবে, বন্ধু হিসাবে সবসময় তোমার পাশে থাকব। কিন্তু লড়াইটা তো শুরু করতে হবে তোমাকেই।”

কান্না বাধ ভেঙেছিল চোখের পাতায়। ভিজিয়ে দিয়েছিলাম সূর্যর বুক। সূর্য আমাকে টেনে নিয়েছিল ওর বুকের আরও কাছে। সারা শরীরে ব্যথা। সূর্যের গাঢ় আলিঙ্গনে যন্ত্রণায় টনটন করে উঠেছিল বুক আর পিঠের কাছটা। তবু ভাল লাগছিল আমার। বেরোবার চেষ্টা করনি ওই বাহুবন্ধ থেকে। কেটে গিয়েছিল আরও খানিকটা সময়। তারপর বলেছিলাম, “পুরুষের স্পর্শ যে এত সুন্দর হয় তা আমার ধারণা ছিল না সূর্য।”

আচ্ছা, নেশা মানে কী? শুনেছি ভালো লাগা। তাহলে কি আমারও নেশা হয়ে গিয়েছিল? আজ সূর্য ঠোঁট রেখেছিল আমার ঠোঁটে। কিন্তু আর এগোতে দিইনি ওকে। বেরিয়ে এসেছিলাম ওর ফ্ল্যাট থেকে। রজত ফেরার আগেই বাড়ী ঢুকতে হবে আমাকে।

সূর্যর বাড়িটা আমাদের বাড়ি থেকে লোকাল ট্রেনে পাঁচটা স্টেশন দূরে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে ছটা বেজে গিয়েছিল। রজতের ঠাকুরদার তৈরি বাড়িটার বয়স কম সে কম ষাট বছর। দোতলা বিশাল বাড়ি। অথচ মানুষ বলতে আমরা দু’জন। বাড়িটার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় যেন একটা বিশাল দৈত্য হাঁ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আর ভিতরে ঢোকা মানে তো স্বেচ্ছায় ওর পেটের ভিতরে নির্বাসনে যাওয়া। কিন্তু আজ ওই খারাপ লাগাগুলো ছুঁতে পারছিল না আমাকে। বাড়ি ফিরে বসেছিলাম বেডরুমে। কিছুটা বিহ্বল। কোথা দিয়ে যে সময়গুলো বেরিয়ে যাচ্ছিল খেয়াল ছিল না সেটাও। হঠাৎ কানে এসেছিল একটা চিৎকার, “হ্যাট, হ্যাট, ভাগ।”

গলার স্বরটা রজতের। পাশের ঘর থেকে আসছে। একজন গিটারিস্ট যখন পুরো মুডে গীটার বাজান তখন হঠাৎ তার ছিঁড়ে গেলে তাঁর মন যেরকম বিষিয়ে যায় তেমনই বিষিয়ে উঠেছিল আমার মন। তবু উঠে উঁকি মেরেছিলাম পাশের ঘরে।

পাশের ঘরের দুটো দরজা। ঘরে ঢোকার জন্য একটা, আর তার ঠিক উলটোদিকে বারান্দায় যাওয়ার জন্য একটা। বারান্দার দরজাটার মাথাতেই টাঙানো রয়েছে দেওয়াল ঘড়িটা। এটাও রজতের ঠাকুরদার কেনা। ঘড়িটার সাইজ এতোটাই বড় যে ঘরে ঢোকার দরজায় দাঁড়ালেও প্রথমেই চোখ পড়ে ঘড়িটার দিকে। আটটা বাজে। রজত দাঁড়িয়েছিল বারান্দার দরজা থেকে একটু ভিতরে। আর বারান্দার পাঁচিলের উপর বসেছিল একটা বিড়াল।

স্ট্রীট ল্যাম্পের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল বিড়ালটাকে। হুলো। শুধু চেহারাটাই নয় লেজটাও বেশ মোটাসোটা। ধপধপে সাদা লোমে ঢেকে আছে সারা শরীর।

বিড়ালটা নতুন। আগে কখনও দেখিনি। আশে পাশের বাড়িগুলোতেও অনেকেই বিড়াল পোষে। কিন্তু কোনটাই এর মত সুন্দর নয়।

বিড়ালটাকে কোলে তুলে আদর করতে ইচ্ছা করছিল। কিন্তু সে উপায় নেই। পৃথিবীতে দুটো জিনিসকে রজত সবথেকে বেশি ঘেন্না করে। একটা আমি আর একটা বিড়াল।

বিড়ালের চোখে দু’রকম অভিব্যক্তি থাকে। হয় আদুরে, নয় ভয়ের। রজত বেড়ালটাকে তাড়াচ্ছে। ওর ভয় পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ও পালাচ্ছিল না। আদুরে চোখে তাকিয়েছিল রজতের দিকে।

“শালা হারামি।” হঠাৎ রাগের চোটে চীৎকার করে উঠেছিল রজত। তারপর আমাকে পাশ কাটিয়ে উঠে গিয়েছিল ছাদের দিকে।

আমার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। কিন্তু মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ভিতরেই দুম দুম করে সিঁড়ি বেয়ে সে নেমে এসেছিল। আমি অবাক হয়ে দেখেছিলাম রজতের হাতে ধরা রয়েছে লোহার পাইপটা।

কয়েকমাস আগে একটা নতুন জলের লাইন করার সময় কেনা হলেও তখন কাজে আসেনি পাইপটা। এতদিন পড়েছিল ছাদের ঘরে। পাইপটা বেশ ভারি। এটা দিয়ে মারলে বিড়াল কেন মানুষও ঘায়েল হয়ে যাবে।

রজত বিনা কারণে একটা বিড়ালকে এই রড দিয়ে পেটাবে। ব্যথা লেগেছিল আমার বুকেই। কিন্তু ঘাড় ঘোরাতেই দেখেছিলাম কোথায় বিড়াল। এর মধ্যেই সেটা হাওয়া হয়ে গেছে।

আমাকে পার করে রজতও এগিয়ে গিয়েছিল বারান্দার দরজাটার দিকে। কিন্তু বেড়ালটাকে না পেয়ে সে ফিরে তাকিয়েছিল আমার দিকে। চোখ দুটো রাগে ফুটছে। ধক করে উঠেছিল আমার বুক। শেষ পর্যন্ত আমাকেই...

কিন্তু আজ বোধহয় আমার দিনটা ভাল। আমাকে পাশ কাটিয়ে সে পাইপটাকে সিঁড়ির পাশে ফেলে সোজা নেমে গিয়েছিল নীচে।

রজত এবার নিচের ঘরে বসে মদ খাবে। পৌনে এগারোটার আগে আর উপরে আসবে না। কিন্তু তারপরের আধঘণ্টাই সারাদিনের মধ্যে সবথেকে ভয়ঙ্কর সময়। রজতের মধ্যে তখন জেগে ওঠে একটা পিশাচ। পুরুষত্বহীন ওই মানুষটা নিজের হতাশা মেটায় আমার শরীরের উপর দিয়ে।

সূর্যর ফ্ল্যাট থেকে ফেরার সময় ভেবেছিলাম আর রজত উপরে আসার আগেই বন্ধ করে দেব দরজাটা। যতই ধাক্কাক আর গালাগালি দিক, কিছুতেই খুলব না। কিন্তু পাইপটাকে দেখে অদ্ভুত একটা শিরশিরানি খেলে গিয়েছিল আমার শরীরে। অনেক মার খেয়েছি। তখন কেউ ছিল না আমার পাশে। কিন্তু এখন আমার পাশে আছে সূর্য। আজ আমি পালটা মারবই।


রাত এগারোটা। ক্ষেপা হাতির মত টলতে টলতে রজত এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমি দাঁড়িয়ে আছি দেওয়াল ঘেঁষে। রজত ভাবছে আমি অসহায়। যা খুশী তাই করবে। কিন্তু ও জানেনা আমার পিছনে লুকনো আছে পাইপটা।


চাপ রক্ত বয়ে যাচ্ছে পুরনো আমলের লাল মেঝের উপর দিয়ে। রজত যখন আমার খুব কাছে ঠিক তখনই আমি বার করেছিলাম পাইপটা। ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুম করে ওটাকে বসিয়ে দিয়েছিলাম ওর মাথায়।

করোটি ফেটে রক্ত বেরোচ্ছে। চিত হয়ে মানুষটা পড়ে আছে মেঝের উপরে। কোনও সার নেই।

রজতের জ্ঞান ফিরবে কিনা তা জানিনা। কিন্তু এত বড় একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেও আমার ভয় করছিল না। আজ বিকেলে সূর্যর ফ্ল্যাট থেকে বেরবার সময় সে আমাকে বলেছিল, “লীনা আজ রাতটা কোনওরকমে কাটিয়ে দাও। কাল সকালেই থানায় গিয়ে রজতের নামে একটা এফ আই আর করবে।” কিন্তু এখন বদলে গেছে অনেক কিছুই। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। ভাবলাম সূর্যকে একটা ফোন করি।

আমার মোবাইলটা পড়ে আছে বিছানার উপরে, কিন্তু সেটাতে হাত দেওয়ার আগেই টের পেলাম ল্যান্ড ফোনটা বাজছে।

এত রাতে কে ফোন করল? ফোনটা কি আমার ধরা উচিৎ? এক সেকেন্ডের ভিতরেই নিয়ে ফেললাম সিদ্ধান্তটা। একটু এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়ালাম রিসিভারের দিকে, “হ্যালো।”

“রজতদা আছে?”

গলার আওয়াজটা ঠিক চিনতে পারলাম না। ভয় করল। তবুও গম্ভীর গলায় বললাম, “কী ব্যাপার বলুন?”

“আপনি কে বলছেন?”

“ওনার স্ত্রী।”

“ও লীনাদি। ভাবলাম রং নাম্বার হয়েছে। আমি সৌম্য।”

সৌম্যও রজতের জুনিয়র। চিনি। মাঝে মধ্যে কাজের জন্যই বাড়িতে আসে। একটু আশ্বস্ত হলাম, “কী হয়েছে? তুমি তো জানো দাদা রাত আটটার পর ফোন অফ করে দেয়।”

“একটা খারাপ খবর আছে। আজ রাত আটটার সময় লাইন পেরোতে গিয়ে কাটা পড়েছে সূর্য। রজতদাকে...”

হঠাৎ যেন কারেন্ট খেলাম। সৌম্য তার কথা শেষ করার আগেই হাত থেকে খসে পড়ল রিসিভারটা। আর ঠিক তখনই মাথার ভিতরে বিদ্যুতের মত ঝলক দিয়ে উঠল আরও একটা কথা, ঠিক রাত আটটার সময়েই তো...

পাথরের মত ভারি হয়ে গেল শরীরটা। কাঁদতেও পারলাম না। শুধু এক অনুভূতিহীন শূন্যতা সাপের মত পেঁচিয়ে ধরল আমাকে।

--------



bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.