অরুন্ধতী

অরুন্ধতী

বৌদি তোমার ঐ নীল শাড়িটা আমাকে আজ একটু পড়তে দেবে ? তিন্নিটা সেই কখন থেকে ঘ্যানঘ্যান করছিল , এতক্ষণে তবে একটু ঘুমিয়েছে । বৌদি ওকে কোল থেকে বিছানায় শোয়াতে শোয়াতে বলে , সে তো দিতেই পারি । কিন্তু আজ চুড়িদার ছেড়ে শাড়ি , কি ব্যাপার ? বৌদির ইঙ্গিতে লজ্জা পেয়ে যায় অরুন্ধতী , ধ্যাৎ তুমি যে কি বলো না বৌদি !!!! কতদিন সিনেমা দেখতে যায়নি , আজ বন্ধুরা সবাই যাচ্ছে । অনেক কষ্টে মা'কে কাছ থেকে যাওয়ার অনুমতি আদায় করেছি । টুবলু দুর্গাপুজোর মেলায় কেনা বড় বলটা নিয়ে খেলছিল । কি শুনেছে কে জানে , ছুটে আসে ঘরে । পিসি আমিও যাব তোর সাথে , আমিও অনেকদিন সিনেমা দেখিনি । টুবলুর কথায় তো ননদ - বৌদি হেসে সারা , কি পাকা হয়েছে এইটুকু বয়সে । আজ তোর বাবা ফিরুক বলছি দাঁড়া , পড়াশুনোর নাম নেই আর পাকা পাকা কথা । চল্ এখুনি পড়তে বসবি । অরুন্ধতী টুবলুকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে বলে , তুমি যদি ঠিকঠাক পড়াশুনো করে নাও আমি তোমার জন্য একটা দারুণ মজার জিনিস নিয়ে আসব । গ্রামে সিনেমা হল নেই , তাই সিনেমা দেখতে হলে যেতে হয় কাছের মফস্বল শহরে । ট্রেনে বেশিক্ষণ লাগে না , ঐ চল্লিশ মিনিট মতো । এগারোটা বাইশের লোকালটা না ধরলে দেড়টার নুন-শো টা দেখা সম্ভব নয় । একটু তাড়াতাড়ি-ই স্নান - খাওয়াটা সেরে নিতে হয়েছে তাই । অনভ্যস্ত হাতে শাড়ি পড়তেও একটু সময় লাগে । গলায় পুরী থেকে কেনা মুক্তোর মালা , কানে ছোট্ট একটা দুল । টিপ পড়তে ভালো লাগে না ওর , কিন্তু আকাশ খালি বলবে একটা টিপ না পড়লে মুখটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে । তাই একটা ছোট্ট মেঘরঙা টিপও পড়েছে কপালে । বৌদি বলছিল , এবার পুজোর হলুদ সিল্কটা পড়তে । কিন্তু নীল রঙটা আকাশের খুব পছন্দ , তাই তো আজ নীলেই সাজাচ্ছে নিজেকে । প্রায় ছ'মাস পর আজ দেখা হবে আকাশের সাথে । পুজোর ছুটিতে হোস্টেল থেকে এসেছে , একবার দেখা করতে চাইছে কদিন থেকেই । কিন্তু কোন কারণ ছাড়া অরুন্ধতী তো আর শহরে আসতে পারে না । আকাশ ওদের গ্রামে আসতে চেয়েছিল , অরুন্ধতী-ই বারণ করেছে । এই ছোট গ্রামে লুকিয়ে আকাশের সাথে দেখা করলে ঠিক চেনাজানা কারো চোখে পড়বে আর বাবার কানে উঠবে কথাটা । এতোটা বড় হয়েছে তাও বাবাকে এখনো যে ভীষণ ভয় পায় । তাই বাধ্য হয়েই বন্ধুদের সাথে সিনেমা যাওয়ার কথাটা বলতে হয়েছে বাড়িতে । আকাশকে বারবার বলেছে , সন্ধ্যের আগেই কিন্তু ওকে বাড়ি ফিরতে হবে । নাহলে দাদা খুব বকাবকি করবে । বেশিক্ষণ আটকে রাখবে না , কথা দিয়েছি আকাশ । মোবাইল , জলের বোতল , রুমাল এগুলো রাখার জন্য একটা সাইডব্যাগ ও নিতে হয়েছে । বেড়নোর আগে আয়নায় নিজেকে আরো একবার জরিপ করে নেয় , বোধহয় আকাশের চোখে কেমন লাগবে তার শেষ মুহুর্তের মাপজোপ..... স্টেশনে ঢোকার আগে একটা ফোন করো বাড়িতে , তোমার দাদা না হয় একটু এগিয়ে যাবে । স্টেশনের রাস্তাটা ভালো নয় , তোমরা ঐ কটা মেয়ে একাএকা আসতে হবে না । উফ্ মাগো ...... দরজা থেকে বেড়নোর সময়েই হোঁচট লাগে । আহা রে বেড়তে গিয়েই হোঁচট লাগলো , একটু বসে যা দেখি । মা বিপদতারিণী মা রক্ষা করো মেয়েটাকে । বসার সময় নেই , ট্রেনটা মিস করবে তাহলে । বাঁপায়ের আঙুলটাতে বেশ লেগেছে , পা টা গোটাতে গিয়ে যেন কিসে আটকে যায় । নড়াতে পারছে না পা- টা , সারা শরীরে কি অসহ্য যন্ত্রণা । হাত দুটোও যেন বাঁধা রয়েছে । চারদিকে কি অন্ধকার !!!! আস্তে আস্তে সব ঘটনা একটু একটু করে মনে পড়ছে । দুপুরের নির্জন স্টেশন , ট্রেনটা একটু লেট । খুব সহজ ভাবেই কথা বলছিল অপেক্ষমান যাত্রীটির সাথে । কিন্তু কথা বলতে বলতেই কেমন যেন করতে থাকে শরীরটা , মাথাটা কেমন যেন ঘোরের মতো লাগছে । একটু আগেও তো ঠিক ছিল , ঐ পাশের যাত্রীটি খৈনি নেওয়ার পর যে গন্ধটা এলো তাতেই কেমন করতে থাকলো যেন শরীরটা । ট্রেন না ধরে বাড়ি ফিরে যাবে সে ক্ষমতা টুকুও যেন পাচ্ছে না । মোবাইলটা বের করে বাড়িতে একটা ফোন করতে গিয়েছিল..... কি হয়েছিল আর কিছু তো মনে নেই । মাঝে একবার যেন জ্ঞান ফিরেছিল , অসহ্য পাশবিক যন্ত্রণায় আবারো হারিয়ে গিয়েছিল অচেতনতার গভীরে । অন্ধকারের মধ্যেও অনুভব করছে নিজের বিধ্বস্ত অবস্থা । সারা শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসহ্য জ্বালা-যন্ত্রণা । দমবন্ধ করা ঘরটাতে একটু বাতাসের জন্য বুকটা ছটফট করছে , গলাটা শুকিয়ে আসছে অসহ্য তেষ্টায় । ভাবনার তার ছিঁড়ে আবারো তলিয়ে যাচ্ছে অতলে । স্যার এখনো তো জ্ঞান-ই ফেরেনি , মালটা কি টেঁসে গেল ? ভোর তো হয়ে গেল , যা করার এখনি করতে হবে ? লাশটা কি ফেলে দিয়ে আসবো রেললাইনের ধারে ? কারো কথার আওয়াজে যেন আবারো যেন চেতন জগতে ফিরছে ধীরে ধীরে । কার কথা বলছে ওরা , ও তো বেঁচে আছে । তবে লাশ বলছে কাকে ? এতো শরীরের যন্ত্রণা তো এখনো বলছে ও বেঁচে আছে । একফোঁটা জল না পেলে প্রাণটা বেড়িয়ে যাবে মনে হচ্ছে । নিজের ক্ষত-বিক্ষত শরীরটাকে একটুও নড়াতেও পারছে না । শুকনো জিভটাকে মুখের ভিতর থেকে একটা ঢোক গিলে তেষ্টা নিবারণের বৃথা চেষ্টা । কষ দিয়ে গড়িয়ে আসা শুকনো আঠালো কিছুর নোনতা একটা স্বাদ যেন অনুভব করে জিভের স্বাদকোরক । শরীরের গভীরের তীব্র জ্বালায় গুটিয়ে আসছে শরীরটা । সহ্যের শেষ সীমাটাও বোধহয় অতিক্রম হয়ে যাচ্ছে এবার । অসহ্য কষ্ট , অসহ্য যন্ত্রণা ,, মৃত্যু কি এতটাই কষ্টের !!!!!! বাবার শাসন , মায়ের বকুনি , দাদার স্নেহ , বৌদির প্রশ্রয় , তিন্নি - টুবলু - আকাশ সবার মুখগুলো কেন এমন আবছা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে । কোথা থেকে যেন ভোরের আলোর হালকা রেখা ঢুকছে ঘরের মধ্যে । রাত শেষ হয়ে আসছে । দিনের আলোর গভীরে ধীরে ধীরে যেন হারিয়ে যাচ্ছে রাতের অরুন্ধতী.....

**************************************************

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.