রংবাসান্ত ও মামাবাবু

রংবাসান্ত ও মামাবাবু

বিশ্ব আবহাওয়া দিবসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে হোলি স্পেশাল গপ্প

[আগে যারা মামাবাবু সিরিজের লেখা পড়েননি, তাদের জন্য ভূমিকা স্বরূপ বলতে পারি আমি শুভম বসু এবং আমার মামাবাবু প্রতাপ চন্দ্র রায়, আমার মামাবাবু আমায় একটি রোবট এনে দিয়েছে জাপান থেকে, যার নাম সুপারট্রনিক্স। আমার মামাবাবু সত্য পিপাসু, অন্যায় সহ্য করেন না। অবসরপ্রাপ্ত এয়ারফোর্সের সেনা। আমাদের ফ্ল্যাট কমপ্লেক্সে থাকে। আমার মা, বাবা সারাদিন আমায় শুধু পড়াতে মন দিতে বলে কিন্তু ফাঁক পেলেই আমি মামাবাবুর সাথে অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে যাই, বিপদেও পড়তে হয়। আমার প্রিয় বন্ধু অর্ক ও মিস্টার বর্মন ডেপুটি কমিশনার, যিনি মামাবাবুকে প্রশাসনিক সহায়তা করেন।]

এই ঘটনাটি রঙের দোল উৎসব সম্পর্কিত। এই পৃথিবীতেই ঘটেছে। আজ। আজ হয়তো আপনারা ভুলেছেন বিশ্ব আবহাওয়া দিবস। আজকের দিনে বিশ্বের বুকে এমন বিপদ নেমে আসবে কল্পনা করিনি। তবুও ভোর থেকে যা যা ঘটল তা সময় আকারে লিখছি। ভোর ৫.০৫ – সুপারট্রনিক্স আমায় ডাকছে। উঠে দেখি সে একটি কাগজ নিয়ে দাঁড়িয়ে। ভিন গ্রহের বার্তা। ইংরেজি তর্জমা করে বুঝলাম, যে আমাদের পৃথিবীতে এই বিশ্ব আবহাওয়া দিবসে রংবাসান্ত নামক গ্রহ থেকে আক্রমণ করবে। এবং আমাদের এই আবহাওয়া উষ্ণায়ণের পিছনে তাদের হাত রয়েছে। আমি সুপারট্রনিক্সকে জিজ্ঞাসা করতেই সে বলল তার ট্রান্সমিটারে এই বার্তাটি এসেছে। আর সে পরীক্ষা করে দেখেছে রংবাসান্ত নামে একটি গ্রহ মহাকাশে সত্যিই রয়েছে। ৫.১০ – মামাবাবুকে ডাকলাম। চিন্তিত হল। কম্পিউটারে মেগাহার্জ পরীক্ষা করে দেখল পৃথিবীর উত্তর-পশ্চিমে ৮৮ নটিক্যালে অবস্থান করছে। খুব দ্রুত পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসছে। মামাবাবু তৎক্ষণাৎ জানতে চাইল কেন রংবাসান্ত গ্রহ পৃথিবীকে আক্রমণ করতে চাইছে.... ৫.১২ – রংবাসান্ত জানাল, আমাদের পৃথিবীতে যে দূষণ হচ্ছে তাতে মহাবিশ্ব ক্ষতিগ্রস্থ। তাদের গ্রহেও আমাদের কারণে রোগ ছড়িয়েছে। তাই এই দূষিত গ্রহকে ধ্বংস করতে চায়। ৫.১৩ – মামাবাবু দূষণের কথা স্বীকার করে নিলেন। কিন্তু সাথে এটাও জানালেন পৃথিবীবাসীরা চেষ্টা করছে এই দূষণ হ্রাস করার। আর অন্য গ্রহ যদি প্রভাবিত হয় তাহলে মানুষকে হত্যা করে তার সমাধান হবে না। এছাড়াও তারা যে ক্ষতিগ্রস্থ, তাদের যে অসুখ হয়েছে তার প্রমাণ পাঠাতে বললেন। ৫.১৭ - হঠাৎ খুব জোড়ে একটি শব্দ এলো ছাদের থেকে। দ্রুত ছুটে গেলাম। মামাবাবু ছাদের ভিতর আগে প্রবেশ করল না। সুপারট্রনিক্সকে পাঠাল। সে সবুজ সংকেত দিতেই হাজির হলাম। একটি বাক্স। তাতে একটি রঙিন বল। সাথে বার্তা। আমাদের গ্রহের প্রাণীরা দূষণের ফলে গোলাকার বলে পরিণত হচ্ছে। তাকে দেখতে এমন ছিল। (পূর্বে দেখতে রঙিন বাঁশের মতো ছিল।) খুব সরু হাত ও মুখ। তবে সবটুকুই রঙিন। তারা এই রোগের টীকা চায়। নতুবা কয়েকঘন্টার মধ্যে পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কিছু বর্ষণ করবে। ৫.৪৮ – মামাবাবু অনেকক্ষণ ধরে জেলির মতো রঙিন থকথকে বলটি দেখল। বেশ স্পন্দন রয়েছে। কিছু একটা বলছিল। মামাবাবু সুপারট্রনিক্সের সাহায্যে জানল সেই পদার্থটি বলতে চাইছে পৃথিবীর থেকে যে জীবাণু অতিবেগুণী রশ্মি ভেদ করে বহির্বিশ্বে যায়, তারই একটি অংশ তার শরীরে প্রবেশ করেছে। তাদের দেশে নাকি সব কিছুই রঙবেরঙের। তারা রং পরিবর্তনও করতে পারে। এই জীবাণুটি তার শরীরে প্রবেশ করেছে বলেই শরীরটা দলার মতো বল আকৃতির লাগছে। আমি ভাল করে কয়েকটি ছবিও তুললাম। কিন্তু জেলি ছাড়া কিছুই বুঝতে পারলাম না। প্রাণীটার নাম জিজ্ঞেস করায় জানাল নীলোৎপাস। সকাল ৬.১১ – মামাবাবু এক বিজ্ঞানী বন্ধুকে ফোন করলেন। ধরল না। রিং হচ্ছে। ৬.১২ – পুনরায় মোবাইলে চেষ্টা করলেন। ধরেছে। শান্তিনিকেতন যাচ্ছেন। তিনি জানালেন যে জীবাণু প্রবেশ করে সে প্রাণীর শরীর থেকে জল জাতীয় কিছু বেরিয়েছে? মামাবাবু জানালেন হ্যাঁ কিছুটা তরল রয়েছে। উনি বললেন আজ তো হবে না। দু’দিন পর ফিরবেন। তবে এটুকু বলতে পারেন, প্রাণীটিকে মিনারেল ওয়াটারে স্নান করালে উপকার হতে পারে। ৬.১৮ – মামাবাবু এক জার মিনারেল ওয়াটার আনলেন। ছাদে রোদ্দুর। তাই বলটি আমার ঘরে আনল। যথারীতি আমার মা দেখে উপদেশ দিলেন ভাল করে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আপদটাকে মেরে ফেল। তারপর আবর্জনার গাড়িতে ফেলে দিতে। মামাবাবু বললেন দিদি এখন যা আমরা দেখছি। ৬.২২ – নীলোৎপাস নামক রঙীন বলটি মামাবাবু বেশ কিছুবার বড় চিমটে দিয়ে ধরে জলে চুবিয়ে তুলে নিল। বাক্সটি পরিষ্কার করে সেখানে রাখল। ৬.২৩ – ইতিমধ্যে একটি বার্তা পুনরায় পাঠিয়েছে। গ্রহটির থেকে জানতে চাইছে কি চাই আমরা। মামাবাবু জানালেন পৃথিবীতে প্রচুর দেশ। প্রচুর রাজনৈতিক মত। সে একজন সত্য সন্ধানী। তাই তার পক্ষে কিছুই জানানো সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায় সে এই প্রাণীটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। সময় চাই। ৬.৫৯ - নীলোৎপাসের শরীর থেকে আর তরল বের হয়নি। তবে প্রাণীটি ঘুমিয়ে গেছে মনে হয়। আগে ঘন ঘন রঙ পরিবর্তন করছিল এখন বেশ গোলাপী। তাকে ডাকা হল কিন্তু নিশ্চুপ। ৭.১৭ – আমি বাথরুম ও ব্রাশ করে এলাম। সুপারট্রনিক্স বলল সব ঠিক আছে মনে হয়। কোনও নতুন বার্তা নেই। ৭.১৯ - নীলোৎপাস-কে একটি কাঁচের পাত্রে রাখা হল। নিচে দেওয়া হল বালতিতে কিছু ররফ। এই গ্রহটি শান্তির। শীতলতা চায়। তাই বিশ্রামের সুব্যবস্থা। আমাদের এখানে প্রচন্ড গরম...রুম টেম্পারেচরই তো ২৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উপরে। ৮.০৪ – আমি খবরের কাগজ দেখছিলাম। মামাবাবু নিজের ঘরে। বাবা মা টিভি-তে অনুষ্ঠান দেখছে....হঠাৎই কাঁচের বাটি থেকে আওয়াজ এলো। সুপারট্রনিক্স বলল জল চাইছে। যে জলে তখন স্নান করালাম। ৮.১৭ – জেলিটার রং এখন সবুজ। চুপ করে রয়েছে। ৮.৩১ – রংটা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। জেলিটা শক্ত হচ্ছে...। মামাবাবুকে ডাকলাম। নীলোৎপাস বলল সে সুস্থ বোধ করছে। ৮.৩৭ – রংবাসান্ত গ্রহ থেকে বার্তা এলো, তারা এই মিনারেল ওয়াটারের ব্যবহার শিখে নিয়েছে। তারা সমস্ত পরিশুদ্ধ জলের ট্যাংক ও প্ল্যানে আক্রমণ করবে। সব পানীয় জল তুলে নিয়ে যাবে। মামাবাবু সোজা জানিয়ে দিল যা ইচ্ছে করুক তবে এই নীলোৎপাসকে তারা ফেরত পাবে না। এটিকে ফ্রিজ করে রেখে দেব। ওরা হাসল। বলল বরফ হলে তো নীলোৎপাস সুস্থ হয়ে যাবে। ৮.৩৮ – মামাবাবু বললেন সব জানলা খুলে দে। রোদ আসুক। আমিও দেখি ওদের নীলোৎপাস কি করে বাঁচে... ৯.১৯ – জেলিটা একেবারে লাল হয়ে গেছে। নানা রং এর মধ্যে পরিবর্তন করেছিল। কিন্তু এখন টকটকে লাল। মামাবাবু বলল জানলা বন্ধ করে দে। শব্ধ আসছে বাঁচাও বাঁচাও। ৯.২১ – এটা বার্তা এলো। ওরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে পৃথিবীর কোনও ক্ষতি করবে না। কারণ ওরা দেখতে পাচ্ছে পৃথিবীবাসীরা নিজেরাই বিশুদ্ধ জলের জন্য লড়াই করবে। তাই ওরা এই প্রযুক্তি শিখেছে। তবে মামাবাবুর কাছে জানতে চাইল কেন নীলোৎপাসকে না মেরে আবার জানলা বন্ধ করে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। মামাবাবু জানাল মানুষের মন রয়েছে। মানুষ এখনও রংবাসান্ত গ্রহের মতো অমানবিক নয়। মানবিকতা আছে বলেই এতো দুঃখের মধ্যেও আনন্দ। মামাবাবু ওদের বলল তোমরা রংয়ের গ্রহ হয়েও, শান্তির শীতলতা বাস করেও শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিতে পারো না। সব নিজের করে নিতে চাও। কিন্তু আমরা শান্তিকামী। আমরা রংয়ের উৎসবে শুধু মেতেই উঠি না, সৌভাতৃত্ব ছড়িয়ে দিই। ৯.২৭ – জেলিটির নীচে বেশি করে বরফ দিয়ে দিলাম। ৯.৩৫ – জেলিটা আস্তে আস্তে শক্ত হচ্ছে। সুপারট্রনিক্স কেমন যেন ভয় পাচ্ছে। ১০.১৮ – এখন ঘরের মধ্যে জ্যোতি ছড়িয়ে গেল। জলন্ত টিউব লাইট। যেন হেঁটে এগিয়ে আসছে.... ..... ১১.১৭ – এই একঘন্টায় আমি কোনওক্রমে মামাবাবুর বুদ্ধির জন্য বেঁচে গেলাম। পরে সবটুকু বলছি। ১২.০৫ – এখন একটু ভাললাগছে। টিউব লাইটি তখন বেশ উজ্জ্বল হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছিল। সুপারট্রনিক্স বলল নীলোৎপাস মন চাইছে। শুভদার (মানে আমি) মন ভেদ করে ঢুকবে। মামাবাবু এসেই খুলে দিল জানলা। সূর্যের আলো আসার সঙ্গে সঙ্গেই একটা বিস্ফোরণ...। তারপর যখন জ্ঞান ফিরল, মামাবাবু একদিকে মাটিতে আমি অন্যদিকে। সুপারট্রনিক্স জল এনে আমার মুখে ও মামাবাবুকে দিয়েছে। সেই টিউবলাইটের মতো জিনিষটা বিস্ফোরিত হয়েছে। ঘরের একটা স্থানে জেলি ও অ্যাসিডের মতো পরে রয়েছে। আমার মা-বাবা ছুটে এসেছে। গজ গজ করছে। আমি বললাম একদম স্পর্শ করো না। ওটা গ্লাভস পরেই হাত দিতে হবে। সুপারট্রনিক্স এর মধ্যে সংকেত পেয়েছে। ঐ রংবাসান্ত গ্রহ থেকে আমাদের হুমকিও দিয়েছে....ওদের সহকর্মীকে হত্যা করায় আমাদের পৃথিবীতে ওরাও অজানা ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের উপর হামলা করবে। মামাবাবু উঠে দাঁড়ালেন। হাসলেন। বললেন - মন দৃঢ় হলে মানবসভ্যতাকে রংবাজী করে হারানো যাবে না। আমরা তোদের বাঁচার রাস্তা বলে দিলাম। পরিশুদ্ধ জল তোদের জীবাণু থেকে মুক্তি দেবে তার কথা জানালাম। তোরা আমাদের মন চুরি করতে চাইলি। তাই তো এই সূর্যের আলোয় নীলোৎপাস মারা গেল। রংবাসান্ত গ্রহের উদ্দেশ্যে বার্তা লিখে পাঠাল। প্রিয় রংবাসান্ত, তোমরা প্রচন্ড লোভী। তাই তোমাদের সহকর্মীর মৃত্যু হল। তোমাদের আমরা বাঁচার উপায় জানিয়েছি। তোমরা তা শিখে আমাদের আক্রমণ করতে চেয়েছো। তাছাড়াও আমার ভাগ্নেকে হত্যা করে তার মন নিয়ে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। তাই তোমাদের এই শাস্তি। আর তোমরা এই গ্রহে প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ তোমরা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারবে না। এই গ্রহে সর্বদাই সূর্যের উত্তাপ থাকে। হ্যাঁ, শীতল দেশ রয়েছে। অতিরিক্ত শীতলতায় তোমরা প্রবেশ করলে নিজেদের পরমাণুর গঠন থেকে বিচ্যুত হবে। তাই রংবাসান্তে তোমরা বসন্ত পালন করো। তোমাদের জীবাণুতে আমাদের ক্ষতি হবে না। কারণ জীবাণুরা এই উত্তাপে নিজেরাই মারা যাবে। আর আমাদের মতো রঙিন হতে দাও। আর ভবিষ্যতে আমাদের উপর আক্রমণ করার আগে মনে রেখো আমরা পৃথিবীবাসীরা মন ও মস্তিষ্কের সাথে বুদ্ধি ধারণ করি। সেই বুদ্ধির অভিজ্ঞতায় তোমাদের উপকার ছাড়া অপকারও করতে পারি। ইতি, মামাবাবু মামাবাবু ঘরের মধ্যেই নীলোৎপাসের দেহে স্পিরিট দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। আজ আমাদের নীলোৎপাসে পোড়া আজই আমাদের দোল তোরা তো পূর্ণিমার চাঁদ দেখিসনি বল রে হরি বোল.... **** একটাই দুঃখ এই রহস্যের সমাধান বাড়িতেই হল। এরপর যদি কিছু নতুন সংকেত সুপারট্রনিক্সকে পাঠায় তাহলে আপনাদের নিশ্চয়ই জানিয়ে দেবো...চলুন নীলোৎপাসের সৌজন্যে একটু রং খেলার পর মাংসভাত হয়ে যাক।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.