গণ ধোলাই


সোনাই! এ্যাঁই সোনাই! সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও ছোট্ট সোনাই কে খুঁজে পেলোনা রিমা,,

বেলা বারোটা প্রায় বাজে,,পলাশ চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে গেছে,আজ অফিসে ছুটি নিয়েছে,,অনেকগুলো লিভ জমা আছে তাই।রিমার শ্বাশুড়ি সেই সকাল নটায় গেছেন সামনের রাধা মন্দিরে হরিনাম শুনতে।

বাড়িতে দুই বছরের সোনাই আর রিমা,,রান্নায় ব্যাস্ত রিমা,,তাও মাঝে মাঝে সোনাইকেও দেখতে হয়।

পাঁচ মিনিট আগেই সোনাইকে দেখে মাটনটা কষতে গেলো রিমা, এসে দেখে সোনাই নেই।

বাইরে এসেই রিমার চিৎকার শুনে রাস্তার লোক,প্রতিবেশী জড়ো হয়ে গেলো।

একজন পলাশকে ফোন করলো।

যদি কেউ নিয়ে পালায় এই আশায় দুচারজন আশেপাশে দৌড়ে গেলো, কারণ এইটুকু সময়ের মধ্যে বেশিদুর পালানো সম্ভব নয় বাচ্ছাটাকে নিয়ে।

পলাশ আসতে রিমা আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা,হাউ হাউ করে কান্নাকাটি করতে লাগলো।

একজন স্থানীয় কাউন্সিলরকে ফোন করে বিষয়টি জানালেন,কাউন্সিলর দমদম থানায় ফোন করে বড়বাবুকে ব্যাপারটা জানালেন,,উনিও আশ্বাস দিয়ে ঘটনাস্থলে নিজে আসছেন বললেন।

ইতিমধ্যে প্রায় তিরিশ মিনিট হয়ে গেছে সোনাইকে পাওয়া যাচ্ছেনা।

রিমার শ্বাশুড়ি আর পলাশ রিমাকে সান্তনা দিচ্ছেন।

.

দমদমের এই এলাকাটা থেকে থানার দুরত্ব প্রায় পঁচিশ মিনিট।মেইন রোডের থেকে প্রায় হেঁটে এক মিনিটের দুরত্বে পলাশরা থাকেন।বিধবা মা,স্ত্রী রিমা আর একসন্তান সোনাই,,কে যে বাচ্ছাটিকে তুলে নিয়ে গেলো সেটাই কেউ বুঝে উঠতে পারছেনা।

-----------------------

হঠাৎ,

দুজন পাড়ার ছেলে হাত ধরে টানতে টানতে রানী পাগলিকে নিয়ে এলো,আর একজনের হাতে সোনাই।

রিমা তো দৌড়ে গিয়ে তার হাত থেকে সোনাইকে প্রায় কেড়েই নিলো।

সবাই ক্রোধে রানী পাগলীর উপর ফেটেই পড়লো।তাদের মধ্যে একজন বললো,বাচ্ছাটাকে নিয়ে এ্যাই পাগলিটা আদর করছিলো মেইন রোডে,,আমরা না আনলে যে কি হতো!!

রনির মা রনিকে স্কুলবাস থেকে আনবেন বলে বাইরে বেড়িয়ে দেখেন এই কান্ড,,পলাশদের চারটে বাড়ির পরেই থাকেন ওনারা,,ক্লাস থ্রি তে পড়ে রনি।উনি বললেন হ্যা,এই পাগলীটা রনির দিকেও ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে থাকে,,

ভিড় থেকে দুচার জন ওনাকে সমর্থন করতেই জনতার উদোম মার দেওয়া শুরু হলো রানী পাগলীকে।

-----------------------

দমদম থানার বড়বাবু কুশল মিত্র আসতেই ভিড় ঠেলে কোনোরকমে রানী পাগলীর দিকে এলেন,

রানী পাগলীকে দেখলেন ঠোটের পাশ দিয়ে কালচে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে আর চোখ দুটো খোলা,,আর বলে উঠলেন শি ইজ নো মোর,,

এটা শুনেই ভিড়টা দূরে সরে গেলো,,সবাই চুপচাপ।

-----------------------

রনি মা কে রাস্তায় না পেয়ে একাই বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে থাকলো,বাড়ির কাছে দেখে এত্তো লোক! একটু ঘাবড়ে গেলো,,দেখে ওইতো মা দাঁড়িয়ে।

পুলিশ দেখে তো ভয় পেয়ে রনি সোজা দৌড়ে মায়ের কোলে।

রনি জিজ্ঞাসু হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করলো,কি হয়েছে মা!

মা বললেন রনিকে,রানী পাগলী সোনাইকে নিয়ে পালাচ্ছিলো,ধরা পড়েছে,,

না মা!! রানী পাগলী আমাদের স্কুল বাসটার থেকে সোনাইকে বাঁচালো,,আমি নিজে দেখেছি।সোনাই দৌড়াচ্ছিলো,,আর একটু হলে আমাদের স্কুলবাসটা সোনাইকে ধাক্কা মারতো।

এটা শোনার পর পুরো ভিড়টা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেলো।যারা রানী পাগলীকে মারছিলো তাদেরকে কেউ ধারেকাছেও দেখতে পেলোনা আর।


.

বড়বাবু দমদম থানায় এসেছেন প্রায় দেড়বছর,,এই রানী পাগলী মোড়ের মাথার বাসস্ট্যান্ডে থাকে।

শান্তশিষ্ট প্রায় বৃদ্ধা পাগলীটা কে সবাই রানী পাগলী বলে ডাকে,,কতোবছর রানী পাগলী এখানে আছে কেউ জানেনা,কেউ বলে দশছর,কেউ বলে তারও বেশি হবে।এই বাসস্ট্যান্ডই ওর আস্তানা।

সম্ভুর চায়ের দোকানে পুলিশের জীপটা নিয়ে এলেই এই বোবা পাগলীটা এসে হাজির হতো,,উনি চা বিস্কুট খাওয়াতেন,,বড় মায়া পড়ে গিয়েছিলো পাগলীটার উপর।

.

.

বড়বাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সামনে থাকা এক কনস্টেবল কে ডেকে স্থানীয় ফটোগ্রাফার কে ডাকতে বললেন,তারপর বডিটা পোস্টমর্টেম এ নিয়ে যেতে হবে।

হঠাৎ নিজের মনেই তিনি বলে উঠলেন, আবার হতাশায় ভোগা জনগণের হাতে নির্মম একটা গণধোলাই।।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.