বনকোঠার মাঠ

এবার দোলের ছুটিতে আমার সতীর্থ এবং অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু পলাশের সাথে ওর গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলুম দিন তিনেকের জন্য ৷ অপ্রত্যাশিত রকমভাবে ‘ঘরের ছেলে’ ক’রে নেওয়া ও দিনে চারবেলা বিপুল আয়োজনে পেটোপাচার সহযোগে আতিথেয়তার পাশাপাশি আমার আর বিশেষ প্রাপ্তি যা হ’ল তার একটি হচ্ছে ষোলো সদস্যের একান্নবর্তী পরিবারে অতি স্বল্পকালের জন্য হ’লেও বাস করার অভিজ্ঞতা, যা এযুগে বিরল বলা চলে, এবং অন্যটি হচ্ছে একটি অত্যন্ত রোমাঞ্চকর গল্প, ততোধিক শিহরণ জাগানো পরিবেশনে ৷ পতিতপাবনবাবু, পলাশের ঠাকুরদা, একজন প্রাক্তন ইতিহাসের শিক্ষকমশাই, তাঁর আট দশকাধিক আয়ুস্কাল ধরে সংগৃহীত বিবিধ ও বিচিত্র অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে যে নিজে একজন জীবন্ত গল্পসংগ্রহ, তা পলাশের মুখে আগেই শুনেছিলাম ৷ ঠাকুরদা আমাকেও নিরাশ করেননি ৷ তাঁর কাছে শোনা গল্পখানাই আজ শোনাই ৷

সন্ধেবেলা আমের আচার দিয়ে মাখা মশলা-মুড়ি, শশা, নারকেল নাড়ু আর তেলেভাজার সম্ভার নিয়ে পলাশদের দক্ষিণের উঁচু ভিজেরোয়াকে মাদুর পেতে ঠাকুরদাকে ঘিরে বসেছি পলাশ, আমি আর পিয়াল অর্থাৎ পলাশের বোন ৷ আগের দিনই ছিল দোলপূর্ণিমা, কাজেই ভিজেরোয়াক ফাল্গুনী জ্যোৎস্নায় একেবারে ভিজে যাচ্ছে ৷ গল্পের আসর হিসেবে এর চেয়ে উপযুক্ত পরিবেশ আর হয় না ! কথা হচ্ছিল আমার এখানে এসে কেমন লাগছে, পলাশদের গ্রাম ও আশেপাশে ঘুরে দেখেছি কিনা তাই নিয়ে ৷

-তা ভাই তুমি সজনি নদীর ওপাশটা ঘুরে দেখেছ তো ? কি দাদু, দেখাওনি বন্ধুকে ?

পলাশকে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুরদা ৷

-হ্যাঁ গো দাদু দেখিয়েছি ৷ তবে আজ সন্ধে হয়ে গেল ব’লে আর ওপারে গেলাম না ৷ কাল আবার যাব ৷ ওপারে খানিক গাছপালা ভরা বনকোঠার মাঠ ব’লে একটা ছোট জঙ্গল মত আছে, তোকে কাল দেখাব, বুঝলি তরুণ ?

পলাশ বলল ৷ আমি ঘাড় নাড়লাম ৷

-বনকোঠা বললে বলে মনে পড়ল ৷ আচ্ছা দিদিভাই আমি তোদের কখনো ক্ষেন্তিবুড়ির গপ্পটা বলেছি ?

ঠাকুরদা জিজ্ঞেস করলেন ও সঙ্গে সঙ্গে পিয়াল আর পলাশ সোরগোল করে উঠল ৷

-না না বলনি বলনি ৷ ওটাই বল ওটাই বল, এক্ষুনি ৷

ঠাকুরদা মাথা নিচু ক’রে খানিকক্ষণ চুপ থেকে তারপর শুরু করলেন ৷

-এ কাহিনী আমিও শুনেছিলুম মোড়লপাড়ার মাধাইখুড়োর কাছে সে কোন ছেলেবেলায় ৷ কাজেই সে অনেকদিন আগের কথা ৷ তখন ছিল সব জমিদারের আমল আর গাঁয়ে গঞ্জে না ছিল এত লোকবসত না এত রাস্তা ঘাট ৷ কলেরা, গুটি এসব হ’ত কখনো সখনো ৷ গাঁ কে গাঁ উজাড় ক’রে দিত ৷ আমাদের গাঁ-ও এখনকার মত ছিল না ৷ সজনি নদীর এপারেও ছিল বন আর ফাঁকা চর ৷ নদীটাও ছিল চওড়া, সারা বছর থাকত জল ৷ আর বর্ষাকালে তো একেবারে উথালি-পাথালি !

যাই হোক, সেকালে এ গাঁয়ে বাস করত এক বুড়ি ৷ বুড়ি বলছি বটে, তবে শরীর স্বাস্থ্য মোটেই জীর্ণ নয় বরং ভাল ৷ মুখখানাও সুশ্রী ৷ গায়ের রং এখন তামাটে হয়ে গেলেও বয়সকালে যে বুড়ি বেশ ফরসা ছিল তা টের পাওয়া যায় ৷ কুলকুল ক’রে বয়ে যাওয়া নদীর পাড়ে বুড়ির কুঁড়ে ৷ এ সংসারে তার নিজের বলতে কেউ নেই ৷ গ্রামের লোকবসতি এলাকা থেকে অনেক দূরে, এখানে একপ্রান্তে একলা কুঁড়েয় বুড়ির বাস ৷ কুঁড়ের দাওয়ায় ছিল বুড়ির উনুন ৷ সে উনুনে বুড়ি ভাজত মুড়ি ৷ সারা গাঁ আর আশেপাশের কিছু গ্রাম ঘুরে বাবুদের মুড়ির চাল এনে বনের কাঠকুটরো আর কুড়োনো গোবরের ঘুঁটে দিয়ে মুড়ি ভেজে দিয়ে আসত ৷ তখনকার দিনে মানুষ যার তার হাতের পাক খেত না, অথচ এই বুড়ির চেহারা ও আচার ব্যবহার এমনতর ছিল যে সে নিজেকে যে বামুনের মেয়ে বলেই জানিয়েছিল তা গাঁয়ের সকলে বিশ্বাস করেছিল ৷ তবে অবিশ্যি গাঁয়ের বিধানদাতা কিছু ব্রাহ্মণ একবার তাকে কিছু আচার বিচার সম্পর্কে জিজ্ঞেসপারা ক’রে তবেই নিদেন দিয়েছিলেন যে বুড়ি আসলে বামুনেরই মেয়ে কারণ ঐ সমস্ত নিয়ম-কানুন একমাত্র বামুনের মেয়েরই নাকি জানার কথা এবং বুড়িরও সেসব জানা ছিল ৷

- কিন্তু দাদু এটা কিরকম হ’ল ? গ্রামের অধিবাসী ব্রাহ্মণ কি না সে নিয়ে এত সংশয়টা কিসের ? সেতো এমনিতেই জানা থাকার কথা যে সে কোন্ বাড়ির মেয়ে বা বউ ছিল !

পলাশ যুক্তিসংগত প্রশ্ন তুলল ৷ ঠাকুরদা কাশি মিশ্রিত একটু হাসির পর চোখদুটো একটু বড় ক’রে আবার শুরু করলেন ৷

- সেইখানেই তো গপ্পটা লুকিয়ে দাদুভাই ৷ শোনো তারপর ৷ নদীর পাড়ে ছোট্ট কুঁড়েয় থাকত ঠিকই কিন্তু সে ছিল বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন৷ কুঁড়ের দাওয়া উঠোন ঝাঁট দিয়ে, গোলা দিয়ে নিত্যি পরিচ্ছন্ন রাখত ৷ নিজেও সে ভারি পরিপাটি থাকত আর কাজও করত তেমনি ৷ তাই অনেকেই তাকে মুড়ি ভাজতে দিত ৷ তার কাজের অভাব ছিল না ৷ পারিশ্রমিক হিসেবে কেউ বা দিত পয়সা, কেউ বা খানিক চাল, আলু ৷ বন থেকে খুঁজে আনা ফল-পাকুড়, শাক, ওল আর সজনে নদী থেকে ছেঁকে তোলা ক’খানা গুগলি-শামুক কিংবা কুচো চিংড়িতে দিব্যি চলত বুড়ির পাত ৷ তার মুড়ি ভাজার হাতটা বড় ভাল তো ছিলই, মানুষ হিসেবেও ছিল বেশ আলাদা ৷ কারো কাছে হকের চেয়ে বেশি না সে চাইত না ভিক্ষে আবদার করত ৷ কারো সাহায্যের বড়ো একটা সে অপেক্ষা করত না ৷ অথচ মুখে না বলত দরকারের বেশি আর না গলা উঁচিয়ে কথা ৷ মোটের উপর এই বিনয়ী অথচ সাবলীল বুড়িকে সবাই ভালোই বাসত ৷ তাই যখন সে গাঁ ঘুরতে বেরত, কেউ দু’ছড়া কলা কি ঘরের একখানা লাউ-কুমড়ো বা পুকুরের এক আধখানা মাছ বুড়িকে দিত ৷

এরপর ঠাকুরদা একটি লম্বা নিশ্বাস নিয়ে আবার বললেন -

- এমনি ক’রে বুড়ির জীবন ছিল বেশ সরল; কিন্তু মুশকিল ছিল অন্যখানে ৷ স্নেহ কি মমতা – এমন ধাতের কোন বস্তু তার বুকের কোনখানেও বুঝি একটুকরোও নেই ৷ মায়ের কথা না শোনা দামাল অথচ ফুটফুটে কোন কোলের শিশু দেখলে পরে সাধারণ মানুষের মনে যেমনি একটা স্নেহের ভাব আসে নিজে থেকে, বুড়ির তেমনটা মোটেই আসে না ! আদরের টানের বদলে বাচ্চা ছেলে কি মেয়ে দেখলে তার বুকের মধ্যে কি একখানা পালিয়ে যাওয়ার তাগিদ ঠেলা মারে ! তার অসহ্য লাগে ! ঐ তো সেবার হরিগাঁয়ের কুমারবাড়িতে পূজোর সময় মুড়ি দিতে গিয়ে কুমারগিন্নি বুড়িকে নাড়ু, মোয়া, চালভাজা কত কি দিলে ! আর বললে –

- হ্যাঁ গা, তুমি কোন চুলোয় নদীর ধারে জলে ঝড়ে কুঁড়ে বেঁধে থাকো ! আমাদের বাড়ি এসে থাকো না কেন, কও তো তুমি নাকি বামুনেরই মেয়ে ৷ মুখপানে চাইলেও মায়া হয় ৷ ছিরি দেখে তো ভাল ঘরের ঝি-বৌ ই মনে হয় ৷ মুড়ি টুড়ি ভাজবে, ঘরের দু-চাট্টি কাজ করবে আর আমাদের রুকু কে দেখবে ৷ থেকে যাও আমাদের বাড়ি বাছা ৷

কুমারদের একরত্তি নাতনি রুকু ৷ আধো-আধো কথায় মুখে খই ফুটছে, ভারি চঞ্চল অথচ ফুটফুটে ৷ দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে হয় ৷ কুমারগিন্নি এতখানি বললে অন্য কেউ হ’লে এককথায় রাজি হয়ে যেত ৷ বুড়ি একবার পিছন ফিরে তাকালে রুকুর দিকে ৷ রুকুও খেলা থামিয়ে এক মুহূর্তের জন্য বুড়ির চোখে তার বড় বড় চোখ রাখলে, আবার পরমুহূর্তেই আপন খেয়ালে মেতে গেল ৷ এদিকে তার দিকে তাকাতেই বুড়ির বুকে বুঝি বিদ্যুতের চাবুক পড়ল ! চোখ সরিয়ে নিল নিমেষে ! মাথার মধ্যে হাজারটা বিছে যেন হূল ফোটাচ্ছে ! রুকুকে তার সহ্য নয় ৷ মাথা নেড়ে অস্ফুট একটা “না” বলে ছুটে বেরিয়ে চলে এল কুমারবাড়ি থেকে ৷

- উফ্ কি কান্ড ! কিন্তু এরকম কেন হ’ল তার দাদু ?

পিয়াল জিজ্ঞেস করল ৷

ঠাকুরদা আবার একটু থামলেন ৷ তারপর পায়ের ভাঁজ বদলে বসে বললেন –

- এমনটাই হয় তার দিদিভাই ৷ সে স্নেহ করতে যে চায় না তা নয়, সে পারে না ! কারো উপর মায়া কারো জন্য স্নেহ তার সহ্য হয় না ! ফুটফুটে বাচ্চা দেখলে তার মাথায় যন্ত্রণা হয় আর বুকের মধ্যে ওঠে ঘূর্ণি ৷ সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ঘূর্ণি তাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায় ৷ তার মনটাকে পাকিয়ে নিঙড়ে দড়ির মত ক’রে টেনে নিয়ে যেতে চায় কোন সে কালান্তরের দূর পথে ! সে আর সহ্য করতে পারে না ৷ চোখ সরিয়ে নেয় ৷ মন থেকে স্নেহ, মায়া সব ছিটকে ফেলে দেয় ৷ নির্বিকার থাকে, থাকতে চায় ! মানুষের ভালবাসার টান সে অবহেলা করে, করতে হয় তাকে ৷ কিন্তু না ! মনের নরম কোমল শাঁসটা তো তার একেবারে শুকিয়ে যায় নি ! ভোরের বেলা ঘাসের শিশিরে পা ভিজিয়ে হাঁটতে তার আজও ভাল লাগে ভারি কিংবা ছাঁচের নিচে বেলফুলের ঝাঁপড়িটা – তাকেও তো ভালবাসে ভীষণ ৷ আর রোজ সকালে খুদের আশায় ক্যাঁচোড়-ম্যাঁচোড় ক’রে ঘর মাথায় করা শালিকজোড়া ? তাদেরও তো সে দুটি শিশুর মতই ভালবাসে ! এমনকি দাওয়ার কোণে উনুনটাকেও সে একটা প্রাণির মত ক’রে ভালবাসে ৷ তখন তো বুকের মধ্যে এমন হয় না ৷ মনের মধ্যে কামড়ে দেয় না কেউ ! তবে কি শুধু মানুষকেই ভালবাসতে পারবে না সে ? এমনটাই কি নিয়ম ? কিন্তু কেন ? কেন এমন ?

ঠাকুরদা তাঁর অদ্ভূত সুন্দর আবেগ আর উত্তেজনায় ভিজিয়ে গল্প বলে চললেন ৷ সে আবেগ বুঝি অবিমূর্ত হয়ে জ্যোৎস্নায় মিশে আমাদের জড়িয়ে ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মত বসিয়ে রেখেছে ৷ নিস্পন্দ আমরা শুনতে থাকলাম ৷

- কেন যে এমন সে জানে না ৷ বোঝে না ৷ কেবল যন্ত্রণা ৷ শুধুই যন্ত্রণা মনের মধ্যে, শরীরের মধ্যে, বেশি ভাবতে গেলেই ৷ তাই ভাবতে যায় না সে ৷ কেন এমন হয় তার সাথে ? কী দোষ তার ? আরও কত প্রশ্ন ৷ নাহ্ ! সে আর চেষ্টা করে না ৷ প্রথম প্রথম করত ৷ এখন আর করে না ৷ আর জেনেই বা কী লাভ ! কতটুকুই বা সে জানতে পারবে ? তার তো সবটাই অন্ধকার ! তার মাঝে একফোঁটা জোনাকির আলো জ্বেলে কী লাভ ?

হ্যাঁ, সে জানে না, বুঝলে ভাই, সে নিজেই জানে না সে নিজে কে ? কার হাত ধরে কেমন ক’রে এসেছে সে এই পৃথিবীতে ! স্মৃতির রাস্তায় পিছু হাঁটলে তা মোড়লদের উঠোনে এসেই শেষ হয়ে যায় ৷ তার বেশি আর কিছুতেই এগোয় না ! মাথা চিড়ে ফেললেও না !

ঠাকুরদা আমাদের দিকে চেয়ে থামলেন ৷ আমরা তিনজনে একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম অবাক চোখে ধাক্কা সামলাতে !

- দশ বছর আগে সে যখন জ্ঞান পেয়ে কাশতে কাশতে জাগলো সে ঝাপসা ঘোলা চোখে দেখল মোড়লদের উঠোনে সে শুয়ে ভিজে কাপড়-চোপড়ে ৷ দম নিতে কি কষ্ট আর মাথাটা বুঝি পেরেক দিয়ে গাঁথা মাটিতে এমনি ভারি ৷ তাকে ঘিরে কত লোকজন ! বদ্যি হাতের নাড়ি টিপে ধরে, একবার বুকের কাছে কান রেখে কী যেন বলছেন ৷ সামনে মোড়লমশাই নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে তাকে কত কী না জানি জিজ্ঞেস করছেন – কোন গাঁয়ে তার বাড়ি ? কী নাম তার ? কী হয়েছিল ? নাহ্ কিছুই বলতে পারেনি সে ৷ কিচ্ছু না ৷ পারবে কী ক’রে ? তার স্মৃতির শুরুই ছিল এখানে ৷ বর্ষার উথাল পাথাল নদী থেকে ভোরবেলা মাঝিরা তাকে উদ্ধার ক’রে এনে ফেলেছিল এই মোড়লদের আঙিনায় ৷ প্রাণ ফিরে পেল সে মোড়লদের দয়ার সেবায় ৷ একমাস ছিল তাদের বাড়ি, সুস্থ হ’ল ৷ তারা তাকে থেকেই যেতে বলল ৷ কিন্তু সে পারেনি ! ওদের উপর মায়া জন্মাতেই সে আর থাকতে পারে নি, কষ্ট হ’ত তার ভীষণ ! তাই ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল ৷ মোড়লমশাই দয়া পরবশ হয়ে তাকে গ্রামের প্রান্তে এককুচো জমিতে এই কুঁড়ে বেধে দেন ৷ কুঁড়ে হ’লেও মজবুত ৷ সেই থেকে দশ বছর সে এখানে কাটিয়ে দিল ৷

এ পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্ত্ব সম্পর্কে এর বেশি সে আর কিছুই জানে না ৷ তার বয়স কত ? পঞ্চাশ ? ষাট ? নাকি তারও বেশি ? জানে না সে ৷ লোকে যে তার মুখের ছাঁচ দেখেই বলে অনেক নাকি বড় ঘরের কেউ সে ছিল ! তাকে কি দেখতেও ভীষণ ভাল ছিল ? কোন অজানা ইতিহাস তার চেহারায় কী এক প্রলেপ দিয়ে গেছে ৷ না, সে প্রলেপ দুঃখের নয় ৷ একরকম উদাসীনতার, যার নিচে চাপা পড়ে গেছে রূপ, দয়ামায়া, অভিব্যক্তি, এমনকি বয়সটাও ! কিন্তু কী সেই ইতিহাস ? কী ? কী ? সেরাতেও বুড়ি তার কুঁড়েয় খাটিয়ায় শুয়ে ভাবছিল এসবই ৷ আর পাশের খোলা জানালা দিয়ে চেয়েছিল নদীর দিকে, বনের দিকে ৷ সেই রাতেও ছিল এমনি ফাল্গুনি চাঁদ আকাশে ৷ নদীর জলে গুলে যাচ্ছে চাঁদিনী আর নদীর ঢেউয়ে ছিটকে এসে পড়ছে পাড়ের গাছে-পাতায় ৷ ফাগুনে সজনি তে জল কম তাও মাঝে ডুবন জল হবে হয়ত ৷ বুড়ি নদীর দিকে চেয়ে ভাবতে থাকে ৷ এই সজনিই তাকে কোন অজানা থেকে ভাসিয়ে এনে ফেলেছে এখানে ৷ পথে ফেলে দিয়ে এসেছে তার সবটুকু স্মৃতি; না ঠিক সবটুকু নয় ৷ কড়া গণ্ডা শতকিয়া সে তো জানে ! সে তো গুণতে পারে, পয়সা চেনে, কথা বলতে পারে ৷ এসব সে কেমন ক’রে শিখল ? ছোটবেলায় ? কোথাকার ছোটবেলায় ? কোথায় জন্মেছে সে ? ওহ্ আর মনে করতে পারে না ! এবার মাথায় যে যন্ত্রণা হয় ৷ এ কেমন বিস্মৃতি তার ! বুড়ি দু’হাতে মাথা চেপে ধরে ৷

এমন সময় গল্পে বাধা পড়ে ৷ ভিতর থেকে ডাক আসে – পিউ , পিউ মা চা এর থালাটা একবার নিয়ে যা মা ৷

পিউ একটু রেগে গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে গেল ৷ যেতে যেতে ঠাকুরদাকে শাসিয়ে গেল –আমি না আসা পর্যন্ত আর একফোঁটাও বলবে না কিন্তু দাদু ৷

ঠাকুরদা হেসে আশ্বাস দিলেন – তাই হবে দিদি ৷

চা এলে চায়ে চুমুক দিয়ে পিউ বলল – আচ্ছা দাদু এটা কেমন ক’রে হয় ? বুড়ির এতকিছু মনে আছে অথচ নিজে কে ছিল সেটাই মনে নেই ! তুমিই বল তরুণদা ?

আমি বললাম – হতেই পারে ৷ অনেকে তো পাগল হয়েও অনেক কিছু মনে রাখে ৷

পলাশ বলল – পাগলের ব্যাপার জানি না ৷ তবে এরকম সম্ভব ৷ ঝন্টুমামা তো সাইকোলজির কি যেন কাজ করে ৷ তার কাছে শুনেছি এমন অনেকের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে হিস্ট্রিক্যাল মেমরি লস্ট কিন্তু অ্যানালিটিক্যাল মেমরি প্রিজার্ভড ৷ তার ফলে রোগীর মানসিক ভারসাম্য বা পুরনো স্কিল ঠিকই থাকে কিন্তু সে অ্যাকিউট আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এ ভোগে ৷

পিয়াল বলল – এক্ষেত্রেও কি এরকম ?

ঠাকুরদা এতক্ষণ চায়ে মন দিয়েছিলেন ৷ কাপ রেখে এবার বললেন – সে সব চিকিৎসেবিদ্যের ব্যাপার ভাই তোমরা পরে খতিয়ে দেখ ৷ গল্পে এরপর কী হ’ল তাই শোন ৷ ফের ঠাকুরদা শুরু করলেন, আমরাও একনিষ্ঠ হয়ে কান পাতলুম ৷

- প্রশ্নের জটে কাতর ও নিরুপায় বুড়ি জানালা দিয়ে দূরে নদীর ওপারে চেয়ে রইল ৷ ওপারের বন, উঁচু উঁচু নিশ্চল গাছেরা চাঁদিনীতে গা পেতে স্থির দাঁড়িয়ে আছে ৷ বনেরও পরে আছে একখানা ভাঙা পোড়ো বাড়ির ধ্বংসস্তূপ ৷ কোন জমিদারের নাকি কোঠা ছিল ৷ লোকে ডাকে ‘বনকোঠা’ বলে ৷ একসময়ে নাকি বিশাল বাড়ি ছিল ৷ আর ছিল সব রহস্যময় ঘর, গুমঘর, মাটির তলায় চোরকুঠুরি ৷ কাঠ খুঁজতে গিয়ে বুড়ি পাশ থেকে দেখেওছে সে কোঠা ৷ তবে ভেতরে বেশি যায়নি ৷ গাঁয়ের লোকের মুখে সে শুনেছে ওই ধ্বংসস্তূপের নিচে এমন অনেক অজানা সুড়ঙ্গ আছে যে তা দিয়ে ঢুকে গেলে পথ হারিয়ে বন্দী হয়ে যেতে হয় পাতালে ৷ বেরোবার পথ বন্ধ হয়ে ইঁট চুন-সুড়কির কোন ফাঁকে আটকে মারা পড়াও আশ্চর্য নয় !

এসব আবোল-তাবোল ভাবছিল বুড়ি ৷ তারপর নদীর ঠান্ডা দখিনী বাতাসে আর বেলফুলের মোহিনী গন্ধে কখন চোখের পাতায় পাতা লেগে গেছে ৷ এমন সময় কিসের যেন শব্দে তন্দ্রার ঘোর ভেঙে গেল ! চোখ খুলে কান খাড়া ক’রে সে শোনে ৷ নাহ্ কিছুই তো নেই ৷ পাশ ফিরতে গিয়ে থেমে গেল ! হাসি ! হ্যাঁ ঠিক শুনেছে সে ৷ কার একটা ক্ষীণ হাসি ৷ দূরে, অনেক দূরে হাওয়ার শব্দে মেশানো কার আবছা হাসি ! কে হাসে ? কে ও ? বিছানার উপর উঠে কানদুটো যত দূরে যায় বুড়ি পাতিয়ে বসে ৷ ঐ তো কে হাসছে খিলখিল ক’রে ! হাসিটা আরও কাছে আসে – আরও স্পষ্ট শোনা যায়, কাদের বাচ্চা মেয়ে হাসে ! আর তার মাথার মধ্যে এমন যন্ত্রণা কেন ? হাসিটাই বা তাকে এমন আচ্ছন্ন ক’রে তুলছে কেন ? বুড়ি শুনতে পায় – শুধু হাসি নয়, যত কাছে আসছে মেয়েটা কী যেন বলছে ফিসফিসিয়ে ! বুড়ি একবার সাহস ক’রে একবার জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করে ৷ কিন্তু পারে না ৷ মেয়েটা আরও জোরে খিলখিলিয়ে ওঠে ৷ জানালা বন্ধ ক’রে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সে ৷ কান পেতে বোঝে হাসিটা তার দরজায়, আরও শোনে সে স্পষ্ট, মেয়েটা ডাকছে ৷ হ্যাঁ হ্যাঁ তাকে ডাকছে আধো স্বরে - ক্ষেন্তি পিসি, ক্ষেন্তি পিসি, বাইরে এসো ৷

বুড়ি অস্ফুট গলায় কথা বলার চেষ্টা করে ৷ সে বুঝি ভীষণ রকম আবিষ্ট হয়ে পড়ছে মেয়েটার প্রতি ৷ আর মাথার ব্যাথাটাও কমে যাচ্ছে ! কে ও ? ও কি নিশি ? জিজ্ঞাসা করে – কে তুমি ? তুমি কে ?

হিসহিসে আধো গলায় হেসে উত্তর আসে – আমি গো পিসি, আমি ৷ বাইরে এস ৷ দেখ তোমার জন্য কি এনেছি আমি ৷

- কী ? কী এনেছ ? কে তুমি ? অমন চেনা লাগে কেন তোমার গলা !

- এসে দেখোই না আমি কে ৷ আমি গয়না এনেছি ৷ সোনার ৷ তুমি নেবে না ক্ষেন্তিপিসি ? দরজা খোল, আমার সাথে এস ৷

বুড়ি বুঝি একেবারে বশ হয়ে গেছে ৷ এক পা দু’পা ক’রে এগিয়ে গিয়ে কুঁড়ের আগল খুলে দেয় ৷ আর খুলে দিতেই মেয়েটির অট্টহাসিতে ভরে যায় চারদিক ৷ বুড়ি তাকিয়ে দেখে অদূরে উঠোনে বছর তিনেকের ছোট্ট মেয়েটি দাঁড়িয়ে হাসে আর হাতছানি দিয়ে ডাকে ৷ তার সোনালী গায়ে রূপোলী চাঁদের আলো পড়ে বুঝি আটকে রয়েছে সারা গা জুড়ে ৷ আর পা দু’খানি মাটিতে নেই ৷ যেন সে ভাসছে ৷ আর ছোট্ট পায়ের নুপূর বাজছে ঝুমঝুম ক’রে ৷ ভীষণ চেনা লাগে ৷ কে মেয়েটা কে ? পারে না সে মনে করতে ৷ সে আবার বলে – আমার সাথে এসো ক্ষেন্তি পিসি ৷ তোমার জন্য গয়না আছে আমার কাছে ৷ মানতাসা, মটরচূড়, পাতিহার, ঝুমকো ; নেবে না তুমি ? রতনচূড়, মতির মালা, টায়রা, নথ আরও কত কী ! নেবে না ? এস ৷

- নেব আমি নেব ৷ কই আমায় দাও ! কোথায় ?

পাগলপারা মোহাবিষ্ট বুড়ি দিকবিদিক জ্ঞানহারা হয়ে চলতে থাকে দ্রুতপদে মেয়েটার পিছু পিছু ৷ মেয়েটা যেন হাঁটে না, ভাসে ৷ ভেসে ভেসে চলে ঝোপঝাড় এর মধ্যে প্রতিসরণ ক’রে ৷

- দেব তো, এসো ৷ ওই যে আমাদের বাড়ি ৷ গাঙুলীবাড়ি, ওখানে আছে ৷ চলে এসো আমার সাথে ৷ তোমার সেই ষোলোভরি সীতেহার, তাও দেব ৷ আর তোমার দু’বাক্স গয়না, যা তুমি আগলে ছিলে সব আছে আমার বাড়ি ৷ এসো আমার পিছে ৷

- কই আমায় দাও ! দাও ! আমার সীতেহার দাও আমায় !

মোহান্ধ বুড়ি গাছপালা, ঝোপঝাড়, কাঁটায় ভ্রূক্ষেপ না ক’রে ছুটে চলে মায়াবিনীর পিছে ৷ পা কেটে যায় ছড়ে যায় পথে ৷ কাপড় ছিঁড়ে টুকরো হয় ৷ তবু সে ছুটে চলে ৷ এদিকে মায়াবিনী মেয়ে বলতে থাকে – আমার সাথে এসো ! তোমার সব হারানো গয়না আছে আমার কাছে ৷ আর তোমার মাথার ব্যামো তাও ভাল ক’রে দেব আমি ৷ তুমি আর আমি থাকব ওই প্রাসাদে ৷

বন, বন পেরিয়ে মাঠ, মঠের পর বকচর, বুড়িকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে সেই মেয়ে ৷ মন্ত্রাহতের মত ছুটন্ত বুড়ি কেবল বুঝতে পারে না এই মেয়ে তার এত চেনা লাগে কেন ! কে সে ? বোঝে না কিছুই ৷ ছুটে এসে একেবারে থামে নদীর উপর ! দেখে জলের উপর যেন ভেসে দাঁড়িয়ে মেয়েটি ! আবার হাসে খিলখিলিয়ে আর বলে – ওকি ! থামলে কেন ? সাঁতার জান না ? ক্ষতি নেই ৷ ডুববে নাকো তুমি ৷ এসো এসো ৷ ওই যে দূরে প্রাসাদ ৷ চলো , গয়না নেবে না ?

দূরে তাকিয়ে বুড়ি দেখে সত্যিই নদীর ওপারে একটা বিরাট বাড়ি , অনেক দূরে ৷ তার জানালায় জ্বলছে আলো ৷ নেমে পড়ে সে নদীতে ৷ অনেক কষ্টে স্রোত পেরিয়ে, একগলা জলে ডুবতে ডুবতে জেগে সে নদী পার হয় ৷ তারপর আলোমূর্তির অনুসরণে ঢোকে বাড়ির মধ্যে ৷ কেউ কোথ্থাও নেই ৷ ফাঁকা বাড়ি ৷ কিন্তু কি অপূর্ব তার শোভা ৷ ঝলমল করছে ঝাড়লন্ঠনের আলো দেওয়ালে দেওয়ালে ! পাথরের অপ্সরা চারিপাশে ! রূপোর আসবাবে সোনালী ঝালর ! অবাক বুড়ি এগিয়ে চলে মায়ামূর্তির দেখানো পথে ৷ একসময় সে তাকে নিয়ে যায় ভূগর্ভের এক গোপন কক্ষে ৷ সিঁড়িতে নামতে মেয়েটি বলে – ওই দেখ, যাও এগিয়ে যাও ৷ ওই যে ঘরে রাখা তোমার দু’বাক্স গয়না ! আরও কত সোনা ! সব তোমার ! যাও নাও ৷ তুমি তো চেয়েছিলে ! নাও ৷

- হ্যাঁ আমি চেয়েছি ! আমি চেয়েছি ! আমার গয়না ! গয়না আমার চাই !

উচ্ছ্বাস আর আনন্দে উন্মাদপ্রায় বুড়ি লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি পার ক’রে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে ৷ সেখানে দুইখানা খোলা বাক্সে থরে থরে ভর্তি হীরে, মুক্ত, সোনার হার, চুড়ি আরও কত অলঙ্কার ! শিশুর মত খামচে ধরে মুঠো মুঠো গয়না ! কখনো বা বাক্স জড়িয়ে ধরে ! সোল্লাসে চিৎকার করে ! আর তার চিৎকার আর সোনাদানার ঝনঝন আওয়াজ ছাপিয়ে ওঠে হাসি ! সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সে হেসে চলে ভীষণ রকম ! তারপর বলে – কি ? খুশি তো ক্ষেন্তিপিসি ? আমার মায়ের সব গয়না , আর তোমার যা কিছু আর সীতেহার সব দিয়েছি ; এবার আমি যাই ৷

এবার বুড়ির সম্বিৎ ফেরে ৷ খেলা থামিয়ে জিজ্ঞাসা করে – কোথা যাবে তুমি ? যেও না ! কে তুমি বলে যাও ৷ যেও না আমায় ফেলে !

মেয়েটি আরও খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ৷ ফিরে দাঁড়িয়ে বলে – আমায় চিনলে না ? আমি তো বিনি ! চিনতে পারছ না ? আমি তো গাঙুলীদের ছোট্ট খুকি বিনোদিনী ৷ মনে নেই তোমার ? আমি তোমার কত কোলে চড়েছি !

এবার ভয়ানক উদভ্রান্তের মতো বুড়ি বলে – কে ? কে বিনি ? নানা না আমি কোন বিনিকে চিনি নে ! চিনি নে !

- চেনো না ? চেনো না তুমি ?

হাসি থামিয়ে গম্ভীর দৃষ্টিতে এবার প্রশ্ন করে মেয়েটি ৷ আর এক পা এক পা ক’রে নেমে আসে বুড়ির দিকে ৷ আসতে আসতে তীব্র ভর্ৎসনায় দ্রুত বাক্যে আক্রমণ করতে থাকে বুড়িকে - চেনো না ? চেনো না তুমি ? তুমি খুন করেছ আমার মাকে ! খুন করেছ ! মনে পড়ছে না ?

- না মনে পড়ছে না ! আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না !

আরও আক্রমণাত্মক হয়ে এগিয়ে আসে মেয়েটি – তুমি আমাকেও মেরে ফেলেছ ! বল মনে পড়ছে না ! বল একবার ! খুনি ! তুমি খুনি !

এবার মাথায় হাত দিয়ে কুঁকড়ে গিয়ে বসে পড়ে বুড়ি ৷ তারপর ফুপিয়ে ওঠে -

- মনে পড়ে ! আমার সব মনে পড়ে ! আমি, আ-আ-আমি-ই মেরে ফেলেছি তোমার মাকে ৷ আমি !

এমন সময় চারদিকের আলো বুঝি নিভে আসে ! ধীরে ধীরে এক এক ক’রে গয়নাগুলো যেন উবে যায় ! পাগলের মত ক্ষিপ্র হয়ে বুড়ি ধরতে যায় কিন্তু যেটাই ধরে সেটাই তার হাত হ’তে বিলীন হয়ে যায় শূন্যে ! আবার মেয়েটির হাসিতে ভরে ওঠে ঘর ৷ কিন্তু এবার আর সে দাঁড়ায় না ৷ ঘূর্ণির মত পাক দিয়ে হাসতে হাসতে সে বেরিয়ে যায় ! হাসির রেখা মিলিয়ে যায় দূরে ৷ বুড়ি ঘূর্ণিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে যায় দৌড়ে ছুটে, কিন্তু পারে না ! এদিকে এক লহমায় আলোময় কক্ষ বদলে যায় অন্ধকার, ভাঙা, গুপ্তকক্ষের ধ্বংসস্তূপে যেখানে সোনা বা গহণার চিহ্নমাত্র নেই ! বদলে ঘর ভর্তি খসে পড়া ইঁট চুন বালি শ্যাওলা মাকড়সার ঝুল আর ধূলোর স্তূপে ! বুড়ি অন্ধকারে সিঁড়ি খুঁজে ছুটে বেড়ায় চিৎকার করে, দেওয়ালে সজোরে ধাক্কা দেয় , কিন্তু নাহ্ ! পথ কোথাও নেই বরং পাথর মাটি খসে প্রবেশপথ একেবারে রূদ্ধ হয়ে যায় ! বুড়ি উন্মাদের মত মুক্তির জন্যে বিলাপ করে চিৎকার করে ৷ আর তার মন থেকে ধীরে ধীরে বিস্মৃতির কালো পর্দা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ৷ সবকিছু তার মনে পড়ে ৷ যত মনে পড়ে তত কান্নায় লুটিয়ে পড়ে সে ৷

ঠাকুরদা আর একবার থামলেন ! আমরা তখন পাথর হয়ে শুনছি ! গল্প থেমে যেতে খেয়াল করলাম পিয়াল একহাতে ওড়না দিয়ে মুখ চেপে রেখেছে আর অন্যহাতে আমার জামার আস্তিন টা বেখেয়ালে খামচে টেনে ধরে আছে উত্তেজনায় ! পলাশ অস্ফুট গলায় শুধু বলল – তারপর ?

- তারপর তার সদ্য মেঘমুক্ত মনের আকাশে ভেসে উঠল তার সম্পূর্ণ জীবন ইতিহাস ! তার মনে পড়ল সে ছিল লক্ষণপুরের নায়েব চক্কত্তি মশাই এর একমাত্র মেয়ে ক্ষ্যান্তরাণি ৷ আদরের দুলালি ক্ষেন্তির ধ্যানজ্ঞ৷ন ছিল কেবল সোনা ৷ তার জীবন বোধহয় গয়নাগাটির মধ্যেই ব্যাপৃত ছিল ৷ চক্কত্তি মশাইও মেয়ের বাতিক বুঝে যাতে মেয়ে খুশি হয় সেইমত তাঁর সমস্ত সঞ্চয়ের প্রায় সবটা একবাক্স গয়নায় বন্দী ক’রে সেটা সহ মেয়ের বিয়ে দেন দশহাটি গাঁয়ের এমন এক বিধবার একমাত্র ছেলের সাথে, যাঁর নিজের ছিল আর এক রাশি সোনার গহনা ৷ কাজেই ক্ষ্যান্তরাণির আয়ত্তে কার্যত বিপুল পরিমাণ সোনাদানা থাকার কথা এবং ফলস্বরূপ ক্ষেন্তির জীবনে অসন্তোষের কোন কারণ বর্তমান থাকার কথা নয় ৷ কিন্তু উপরওয়ালার নাট্যরসের তেষ্টা এত সহজে মেটবার নয় ! ক্ষেন্তির স্বামী পুরুষ হিসেবে চরিত্রে, ব্যক্তিত্ত্বে ও দেহে একেবারেই ক্ষীণবল ছিল ৷ স্বাভাবিক নিয়মেই শাশুড়ির সাথে নিঃসন্তান ক্ষেন্তির বনল না ৷ কাজেই শাশুড়ির গয়নার বাক্স ক্ষেন্তির হাতে আসা সহজে সম্ভবপর ছিল না ৷ অথচ সোনার টান ক্ষেন্তির কমবে ছেড়ে বেড়েই চলে ৷ বিধবার সাথে দ্বৈরথ যতই বাড়ে বিধবার সোনার বাক্স হস্তগত করার সংকল্প ক্ষেন্তির ততই জোরদার হয় ৷ তারপর দিন বদলাল ৷ গ্রাম ছেয়ে গেল কলেরায় ৷ গাঁ উজার হবার যোগাড় ৷ প্রায় সবাই গাঁ ছেড়ে পালানোর রাস্তা দেখলে ৷ মহামারী ক্ষেন্তির শাশুড়ি ও স্বামীরও হাত টেনে বসল ৷ ক্ষেন্তি সেদিন বিবেকের দোর বন্ধ রেখে অসুস্থ হীনবল স্বামী আর বিধবা বুড়িকে ফেলে পালিয়ে এল ৷ সঙ্গে নিয়ে এল নিজের ও শাশুড়ির দুই বাক্স গয়নাগাটি একখানা তোরঙ্গে ভরে ৷ যদিও বাপের ঘরে বাপ-মা কেউ বেঁচে ছিল না, তবুও স্থির করেছিল সমস্ত সোনাদানা নিয়ে সে গ্রামেই উঠবে ৷ সে সমস্ত স্মৃতি আজ ফিরে এসে ভেসে উঠছে তার মনে ৷ সে দেখতে পাচ্ছে সেদিন কেমন ক’রে কাতরাচ্ছিল দু’জন আর জল চেয়ে হা-হা-কার করছিল ! আর সে গয়নার বাক্স গোছাচ্ছিল মরিয়া হয়ে ৷ আসার সময়েও বুড়ি শাশুড়ি ককিয়ে ককিয়ে বললে – একটু জল দে যা বৌ ! নাহ্ সে দেয়নি ! চরম নির্মম হয়ে কুঁজো উল্টে ছুটে পালিয়ে এসেছিল তোরঙ্গ নিয়ে ! যেতে যেতে শুনেছে মরণাপন্ন শাশুড়ি গালমন্দ করছে ভীষণ – গয়নার মধ্যে ডুবে মরবি তুই ৷ মরবি মরবি শয়তানি পচে মরবি তুই !

মনে পড়ছে সব ৷ চিৎকার ক’রে উঠছে সে কান্নায় কিন্তু শোনার যে কেউ নেই ! কিন্তু তারপর বাপের গাঁয়ে ফেরা তার হয়ে ওঠেনি ৷ পথে নির্জন এক জায়গায় কালবোশেখি ঝড়ে চারদিক অন্ধকার ৷ এরই মাঝে জনা তিনচার কারা যেন তার পিছু নিয়েছে ! হ্যাঁ ঠিক, ওরা ঠ্যাঙাড়ে ডাকাত ! পারেনি সে বাঁচাতে সোনা ৷ চেষ্টা করেছে অনেক ৷ কিন্তু টানা-হ্যাঁচড়া, শেষ পর্যন্ত মাথায় দা এর ঘা ! সব নিয়ে গেছিল ওরা ৷ কতক্ষণ অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল সে জানে না ৷ মাথাময় রক্ত ! বাঁচিয়েছিল এক গোয়ালা ৷ গঞ্জে দই বেচে ফেরার পথে তাকে উদ্ধার ক’রে এনে তুলেছিল সে গাঁয়ের রায়বাড়িতে ৷ আজ নতুন ক’রে মনে পড়ছে তার, রায়বাবু আর গিন্নি মানুষ ছিলেন না, ছিলেন দেবতা, নইলে তার মত কালসাপকে কী বলে ঘরে ঠাঁই দিয়ে শুশ্রূষার ব্যবস্থা ক’রে নতুন জীবন দিলেন ! সেও অবিশ্যি প্রথমে করেছিল অনেক ৷ দু-মুঠো অন্ন, বস্ত্র আর মাথার ছাদের বদলে গিন্নিমার হেন কোন কাজ নেই সে করেনি ! ওতবড় বাড়ির ওতখানি কাজ একাহাতে সামলেছে ৷ আর বিনি ? একফোঁটা অথচ দামাল মেয়েটাকে সেই তো সামলেছে ৷ মায়া পড়ে গিয়েছিল তার উপর ৷ ভালবেসেছিল তাকে ৷ কিন্তু নাহ্ ! এসব তাকে ভোলাতে পারেনি একরাশি সোনা হারানোর দুর্বিষহ শোক, আফশোষ আর আবার ফিরে পাওয়ার বাসনা ! অথচ সে নিরুপায় ৷ বুকের মধ্যে কি যেন লকলকিয়ে জ্বলে উঠত, যখন পুজো -পাব্বনে রায়গিন্নি তাঁর গয়নার বাক্স খুলে বসে সাজতেন, তারই সামনে, হ্যাঁ তাকেই কিনা যখন বলতেন – দেখেছিস্ বামুন বৌ ? এই দ্যাখ সীতে হার ৷ কেমন ? ষোলো ভরী ! এমন টা দেখেছিস আগে ? আমায় কেমন দেখায় বল্ দেখি পড়লে ? বলে হেসে উঠতেন খিলখিলিয়ে ৷ পারত না সে পারত না, চুপ করে বসে আর দেখে যেতে পারত না ! উঠে চলে আসত আর মনের মধ্যে ফুঁসিয়ে উঠত – ভারি তোর একবাক্স গয়না ! নিয়তির স্রোতে ভেসে না গেলে আজ অমনি চার-পাঁচটা রায়গিন্নি সাজবার সাধ্যি ছিল আমার ৷

কিন্তু এটুকুতে স্তিমিত হয়নি তার বুকের লেলিহান শিখা ৷ তাই সেরাতে যখন রায়গিন্নির জ্বর অথচ রায়বাবুকে যেতে হ’ল সদরে জরুরী কাজে, বিশ্বাসের মানুষ, ভালবাসার মানুষ বামুন-বৌ এই ক্ষেন্তিকেই গিন্নির ঘরের মেঝেয় শুতে বলেছিলেন রায়গিন্নি ৷ সেই রাতে আর একবার জেগে উঠেছিল তার লোভাতুর সর্বগ্রাসী সোনা-তৃষ্ণা ! সোনার মোহের লোলুপ আগুন মায়া, মমতা, ভালবাসা, কৃতজ্ঞতার সবটা পুড়িয়ে দিয়েছিল ৷ বিনিকে পাশে নিয়ে ঘুমন্ত রায়গিন্নির আঁচলের খুঁট থেকে চাবিটা খুলেওছিল অতি সন্তর্পনে ! তারপর আলমারী খুলে গয়নার বাক্সখানি হাতে তুলে নিয়েছিল ৷ বাধ সেধেছিল তাকের কোন্ ফাঁকে রাখা বিনির কাঠের পুতুল একখানা ৷ ঠক্ শব্দে কখন অলক্ষ্যে পড়েছিল মেঝের উপর ৷ তাতে যা হবার তাই হ’ল ৷ ঘুম ভেঙে রায়গিন্নি ঘোরের চোখে বলে উঠলেন – ওকি ? কে ওখানে ? বামুন-বৌ ! দেরাজ খুলে কী করছ তুমি ...

আর বেশি কথা বলতে হয়নি তাকে ৷ ক্ষেন্তির পুরুষ্ট হাতে ধরা বালিশের চাপে মিনিটখানেক ছটফট করেই খেলা সাঙ্গ করলেন রায়বধূ ! তাতেও ছুটি নেই ৷ জেগে উঠে ডুকরে কেঁদে উঠতে গিয়েছিল বিনি ৷ আর ফেরার পথ নেই মোহমত্ততার চরমে ওঠা ক্ষেন্তির ! দুধের বাচ্চাটির গলার কাছে সজোরে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে ক্ষেন্তি বেরিয়ে আসে আঁচলে ঢাকা গয়নার বাক্স নিয়ে খিড়কি দরজা দিয়ে ৷ বিনি মরল কি বাঁচল সে জানে না, শুধু চুপ করেছিল, আর কাঁদেনি ৷ গভীর মেঘলা রাতের অন্ধকারে সে এসেছিল ঘাটে ৷ ঘাটে নোটোন মাঝি ক্ষেন্তির বশ ৷ তার রূপের কাঙাল মাঝি তার পরশ পেলেই ধন্য হ’ত, তার উপর আবার একজোড়া বালার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাঁটে রেখেছিল নোটন কে ৷ পার ক’রে দিত সে শ্যামনগর গঞ্জ পর্যন্ত ৷ কিন্তু নাহ্ শেষরক্ষা এবারেও হ’ল না ৷ আকাশের মেঘ তার ভাগ্যপটে নেমে এসে গর্জাল ৷ নদীতে তুফান ! নৌকা ডুবু ডুবু ৷ একসময় প্রবল জলোচ্ছ্বাসে বিধ্বস্তপ্রায় ক্ষেন্তির হাত থেকে গয়নার বাক্স খসে পড়ার উপক্রম, ঠিক এমন সময় কিসের ধাক্কায় সে নদীতে গেল পড়ে ! বাক্স হ’ল হাতছাড়া ! তখন ভয়াল ভয়ঙ্কর নদীর ঘূর্ণির গ্রাসে তলিয়ে যাচ্ছে সে ৷ ওই শেষ ৷ আর কিছু মনে নেই ৷ জেগেছে সেই মোড়লদের উঠোনে ৷

আজ সবটুকু মনে পড়েছে তার ! কিন্তু সে আজ ধংসস্তূপের নিচে সমাধিস্থ ! কান্নারও শক্তি বোধহয় ফুরিয়ে আসবে শিগগির ! শুধু একঝলক ভাবনা এসেছিল নদীর তুফানে ঠেলা যেটা দিয়েছিল, সেটাকি নোটনমাঝিরই হাত ? কিন্তু উত্তর দেওয়ার কেউ নেই ৷ বাইরে বনে ফুটছে তখন ভোরের প্রথম আলোর রেখা, সে আলো পৌঁছালো না আর বনকোঠার ধ্বংসস্তূপের নিচে যেখানে ঘটনাবহুল সোনালি মোহের গভীরে ডুবে যাওয়া মুমূর্ষু এক ইতিহাস তখনও হয়ত গোঙাচ্ছে , পুরোটা মরে যায় নি !

গল্প শেষ করলেন ঠাকুরদা ৷ আমাদের অনুভূতি তখন কী বলা বাহুল্য ৷ এটুকু বলতে পারি শরীরের রক্তের স্রোতগুলোও বুঝি থমকে দাঁড়িয়ে গল্প শুনেছিল কিছুক্ষণ ৷ আমি সে রাতে বহুক্ষণ ভালো ক’রে ঘুমাতে পারিনি পরদিন সত্যিকার বনকোঠার মাঠে পা রাখব ভেবে ! জানি না সে অনুভূতি কেমন হবে ৷ ঢিবির উপর মাটিতে কান পেতে শুনব কি একবার ?

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.