অনিশ্চিত তিনটি রাত

অনিশ্চিত তিনটি রাত (১)

আজ অনেক দিন, প্রায় চৌত্রিশ বছর পরে হঠাৎ একটা ভয়ঙ্কর সুন্দর রাতের কথা আবার মনে পড়ে গেল। অনিশ্চিত, বিপৎসংকুল সেই রাতের ছবি মাঝেমাঝেই স্মৃতির পটে দেখা দেয়, বিশেষ করে যখন কারো কাছে কোন রাতের অভিজ্ঞতার গল্প শুনি। আর তখনই স্মৃতিপটে আরও, আরও অনেক রাতের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা, অভিমান, ভয়, সবাই স্মৃতির আগল খোলা পেয়ে একে একে গেট-টুগেদারে অংশ গ্রহণ করতে হাজির হয়ে যায়। ভয়ঙ্কর রাত্রিও যে কত সুন্দর হতে পারে, জানিনা আমার মতো আর কেউ উপলব্ধি করেছেন কী না। আজ সেইসব স্মৃতি থেকে তিনটি রাতের কথা বলবো।

সালটা ১৯৮০, মাসটা আগষ্ট, আমি, দিলীপ ও অমল হিমাচল প্রদেশের চাম্বায় এসে হাজির হলাম। উদ্দেশ্য, মণিমহেশ দর্শন। অন্যান্য বারের মতোই সঙ্গে তাঁবু বা অন্য কোন সরঞ্জাম বিহীন যাত্রা। চাম্বায় অবস্থিত হিমাচল টুরিজম আমাদের পরিস্কার জানিয়ে দিল, মণিমহেশের পথে কোন থাকার জায়গা বা টেন্ট পাওয়া যাবে না। মণিমহেশ যাত্রীরা পথে রাতে কোথায় আশ্রয় নেয় জানতে চাওয়ায় উত্তর পেলাম—“এপথে সাধারণ কোন টুরিষ্ট যায় না। জন্মাষ্টমী থেকে রাধাষ্টমী, এই সময়টার মধ্যে সারা দেশ থেকে অসংখ্য পূণ্যার্থী এই পথে যায়, মণিমহেশে মানত করে ত্রিশুল পুঁতে দিয়ে আসার জন্য। তারা রাতে রাস্তাতেই থাকে, ভেড়ার মাংস পুড়িয়ে খায়। আমরাও নির্দিষ্ট সময়েই এসেছি, তাই আমাদের এই পথে যাবার জন্য সাহায্য করার অনুরোধে আমাদের জানানো হ’ল, তাদের পক্ষে আমাদের কোনরকম সাহায্য করা সম্ভব নয়, এমন কী তাঁবুর পরিবর্ত হিসাবে পলিথিন শীট পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব নয়। আমার দুই সঙ্গী এই উপাদেও সংবাদটি পেয়ে একটু মুষড়ে পড়লেও আমি কাউন্টারের ভদ্রলোকটিকে জানালাম, “আমরা মণিমহেশ যাব বলে যখন এতটা পথ এসেছি, তখন আমরা যাবই। আপনি সাহায্য করলে তো যাবই, না করলেও যাব”। ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “ঐ পথে হিমালয়ান বিয়ারের ভীষণ উৎপাত। রাস্তায় ভাল্লুক দেখলে আড়ালে চলে যাবেন। পাথর ছুড়ে বা অন্য কোনভাবে তাড়াতে যাবেন না। এইপথে অনেকে ভাল্লুকের আক্রমনে চোখ নাক হারিয়েছে, রাস্তায় হয়তো দেখা হলেও হতে পারে”। আমরা আর কথা না বাড়িয়ে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে এগিয়ে গেলাম। পিছন থেকে ভদ্রলোকের সাবধান বাণী শুনলাম—“সাবধানে যাবেন, তবে এইভাবে না গেলেই ভাল করতেন”। পরদিন আমরা বিকালের শেষে, প্রায় সন্ধ্যার মুখে, ভারমোড় এসে উপস্থিত হলাম। রাতে কৃষাণ নামে একজন কুলি কাম গাইডের সাথে ভোরে রওনা হওয়ার ব্যবস্থা পাকা করা হ’ল।

সকালে আমরা চারজন মণিমহেশের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সূর্যালোকহীন এবড়ো খেবড়ো পাথুরে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় অনেক দুরে একটা কালো রঙের হৃষ্টপুষ্ট প্রাণীকে গদাই-লস্করী চালে এগিয়ে আসতে দেখে সাবধানতা অবলম্বনের জন্য দাঁড়িয়ে পড়লাম। অনেকটা কাছে আসতে বুঝতে পারলাম, সেটা আসলে একটা কুকুর। কুকুরটা আমাদের প্যান্ট, জুতো একটু শুঁকে দাঁড়িয়ে রইলো। আমরা এগিয়ে চললাম। কুকুরটাও কখনও আমাদের সামনে সামনে, কখনও আমাদের পিছন পিছন, আমাদের সাথে এগিয়ে চললো। একসময় অনেকটা দুরে দু’টো তাঁবু চোখে পড়লো। কৃষাণ জানালো আমরা ধানচৌ এসে গেছি। আরও কাছে আসতে লক্ষ্য করলাম একটা খুব ছোট তাঁবু, তার পাশেই অপেক্ষাকৃত একটু বড় আর একটা তাঁবু খাটানো আছে। বড় তাঁবুটার সামনে এক বৃদ্ধ বসে হুঁকো টানছেন। কৃষাণ জিজ্ঞাসা করলো একটা তাঁবুতে আমাদের থাকতে দেবার জন্য বৃদ্ধকে অনুরোধ করবে কী না। আমি বারণ করলাম। কারণ একবার না বললে তাঁকে রাজী করানো মুশকিল হতে পারে। এইভাবে বিকালবেলা আমরা আমাদের কুলি কৃষাণ, ও গাইড কুকুরটার সাথে ধানচৌ এসে পৌঁছলাম। এখানেই আমাদের রাতে থাকতে হবে। এখনও জানিনা বিস্তীর্ণ এই উপত্তকায় রাতে কোথায় থাকবো।

বৃদ্ধের সাথে কোন কথা না বলে, তাঁর বিনা অনুমতিতে ছোট তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করে, মালপত্র একপাশে রেখে তাঁবুর বাইরে এসে, “নমস্তে লালাজী” বলে হাতজোড় করে তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে তাঁর সাথে গল্প জুড়ে দিতে, তিনি খুব খুশী হলেন। ভদ্রলোক জানালেন এবার সারা দেশ থেকে পূণ্যার্থীর আগমন হবে, তাই রাস্তা মেরামত, মাইলস্টোনে রঙ করা ইত্যাদি কাজ হচ্ছে। তিনি সম্ভবত সুপারভাইজার, যদিও কাছেপিঠে আর কাউকে দেখলাম না। ছোট তাঁবুটার একটু ওপরে ছোট্ট একটা অস্থায়ী দোকান। আরও কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, কোনরকম অনুরোধ ছাড়াই আগের মতো আবার ছোট তাঁবুতে এসে ঢুকলাম। তাঁবুর একপাশে কিছু বস্তায় সম্ভবত চাল রাখা আছে। আমরা তাঁবুর ভিতরটা ভালভাবে পরিস্কার করে, কৃষাণকে পাইন গাছের পাতা নিয়ে আসতে বললাম। কৃষাণ পাইন গাছের ডাল সমেত অনেক পাতা এনে হাজির করলো। তাকে ডাল থেকে ছিঁড়ে শুধু পাতা এক জায়গায় জড়ো করতে বললাম। এবার তাঁবুর চারপাশে নালার মতো করে কেটে, ঢালুর দিকে অনেকটা দুর পর্যন্ত নিয়ে গেলাম। ব্যাস, অনেকটা শিবলিঙ্গ আকৃতির এই নালায়, বৃষ্টির জল আর তাঁবুতে ঢোকার কোন সম্ভাবনাই রইলো না। এবার আমরা পাইন পাতা তাঁবুর মেঝেতে বেশ মোটা করে পেতে, তার ওপরে পলিথিন শীট পেতে,তার ওপর কম্বল পেতে, খাসা বিছানা করে নিলাম। ভদ্রলোক চুপ করে বসে আমাদের কার্জকলাপ লক্ষ্য করলেওমুখে কিছু বললেন না। কুকুরটাও তাঁবুর বাইরে বসে রইলো।

আমরা সব কাজ সেরে তাঁবুর বাইরে আসলে ভদ্রলোক শুধু বললেন যে, এখানে বিচ্ছু অর্থাৎ পাহাড়ি কাঁকড়া বিছার খুব উপদ্রব, আমরা যেন তাঁবুর ভিতরটা ভালভাবে দেখে তবে বিছানায় শুই। তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে, আমরা জায়গাটা এক চক্করে ঘুরে দেখতে গেলাম। আমাদের পিছন দিকটায় উঁচু পর্বতশৃঙ্গ, লম্বা পাঁচিলের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ঐ দিকে উঁচুনীচু মাঠের মতো অনেকটা জায়গায় ইতস্তত ছোট বড় পাথর পড়ে আছে। তারই এক ধারে, ছোট্ট দোকানটা। আমরা ঐ দিকে বেশ খানিকটা দুর পর্যন্ত ঘুরে বেড়ালাম, বড় পাথরের ওপর চড়ে বসলাম, ফটো তুললাম। কিছুক্ষণ সময় ঐভাবে কাটিয়ে দোকানটায় ঢুকলাম। রাতে রুটি তরকারী পাওয়া যাবে শুনে আশ্বস্ত হলাম। দোকানটায় আর কিছু পাওয়া যাক বা না যাক, ডিম সাজানো আছে দেখলাম, আর দেখলাম লাল, নীল, সবুজ রঙের নানা আকৃতির সুদৃশ্য পেয়ালায় তরল পানীয়। হয়তো স্থানীয় কোথাও তৈরী, কিন্তু পানপাত্রে কেন ঢেলে রাখা হয়েছে, তা বোঝা গেল না। এখানে ঐ এক বৃদ্ধ লালাজী ছাড়া এতটা পথে দ্বিতীয় কোন মানুষের দেখা পাই নি। লালাজী এই রসে আসক্ত কী না জানিনা, তবে তিনি খেলেও আর কত খাবেন? তার জন্য অতগুলো পাত্রে তরল পানীয় ঢেলেই বা রাখার প্রয়োজন কী, বোঝা গেল না।

আমাদের সামনে অনেকটা নীচে সম্ভবত কোন পাহাড়ী নদী ছোট বড় পাথড়ের ওপর দিয়ে কুল কুল করে নিজের আনন্দে বয়ে যাচ্ছে। জল প্রায় নেই বললেই চলে। নদীর ওপাড়ে পর্বতশ্রেণী রক্ষীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। ডানপাশে মণিমহেশ যাবার পথ, বাঁপাশটা দিয়ে কিছুক্ষণ আগে আমরা এসেছি। চারিদিকে পাইন বা ঐ জাতীয় আকাশচুম্বি গাছের সারি। ক্রমে অন্ধকার নেমে আসলো। আমরা দোকানটায় গিয়ে ডিমের অমলেটের অর্ডার দিলাম। সুদৃশ্য পান পেয়ালায় কী আছে প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল “দারু”। সঙ্গে ব্র্যান্ডির বোতল আছে, তবু মনে হ’ল জিনিসটা চেখে দেখলে কেমন হয়? অমল বললো বিষ হতে পারে, না খাওয়াই ভালো। আমি বললাম, “পাত্রে যখন সাজিয়ে রেখেছে, তখন খদ্দেরও নিশ্চই আছে। তারা যদি খেয়ে বেঁচে থাকে, আমরাই বা মরবো কেন”? শেষে ঠিক হ’ল কৃষাণ এইসব এলাকার লোক, ওকেই প্রথমে খাওয়ানো যাক। ওর কিছু না হলে, আমরা একপাত্র করে চেখে দেখবো। দারু খাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, কৃষাণ খুব খুশী হয়ে মাথাটা কাত করে প্রায় পেটের কাছে এনে সম্মতি জানালো। পর পর দু’পাত্র গলায় ঢেলে সে ডিমের অমলেটে কামড় দিল। নতুন কোন রোগের ওষুধ আবিষ্কারের পর গিনিপিগের ওপর প্রয়োগ করে চিকিৎসক যেমন অধীর আগ্রহে গিনিপিগটিকে পর্যবেক্ষণ করেন, আমরাও সেইরকম কৃষাণের ওপর লক্ষ্য রাখতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে সে যখন আরও একপাত্র খাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলো, তখন নিশ্চিত হওয়া গেল, যে জিনিসটা ক্ষতিকারক কী না তার পরীক্ষার খরচ একটু বেশী হলেও, বিপদের কোন সম্ভাবনা নেই। তখন আমরাও ডিমের অমলেট সহযোগে দু’এক পাত্র করে পান করে তাঁবুতে ফিরে এলাম। আরও কিছু পরে দোকানে রাতের খাবার, রুটি তরকারী খেতে গেলাম। রুটির চারপাশটা গোল করে ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে আমরা দু’তিনটে করে রুটি খেলাম। কৃষাণ অনেকগুলো রুটি খেয়ে নিল। এখন আবার আমাদের সঙ্গে আমাদের অতিথি, গাইডটিও ল্যাজ নাড়তে নাড়তে রাতের খাবার খেতে এসেছেন।

তাঁবুর পাশে বসে অনেকক্ষণ গুলতানি করলাম। লালাজী বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছেন। চারিদিক হালকা জ্যোৎস্নালোকে এক মায়াবী পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। পয়সা খরচ করে দোকানে দু’এক পাত্র খেয়ে কোন নেশা না হলেও, এই পরিবেশ আমাদের নেশাগ্রস্থ করে ফেললো। নির্জন এই উপত্যকায় বেওয়ারিস্ তাঁবুর পাশে বসে হালকা চাঁদের আলোয় চতুর্দিক গাছপালা ঢাকা এক উপত্যকায় আমরা তিন বন্ধু। সঙ্গে কৃষাণ ও ভাল্লুক সাদৃশ্য এক সারমেয়। বহু নীচে জল বয়ে যাওয়ার হালকা দরবারীর সুর, তীব্র ঝিঁঝির ডাকের সঙ্গতে, ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। গলা ছেড়ে কিছুক্ষণ “আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে….” গাইলাম।

আমরা তাঁবুতে ঢুকে তাঁবুর দড়ি ভাল করে বেঁধে শুয়ে পড়লাম। অনেক রাত, ক’টা বাজে বলতে পারবো না, কিসের একটা খস্ খস্ আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। চুপ করে শুয়ে শুয়ে ভাবছি বিচ্ছু নয় তো? হিমালয়ান বিয়ারের পরিবর্তে অতি ভদ্র ও মিশুকে এক কুকুরের দেখা মিললেও, বিচ্ছুর পরিবর্তে যে তিন বাউন্ডুলে ব্যাচেলারের কাছে শুভবার্তা নিয়ে প্রজাপতি আসবে, তার গ্যারান্টি কোথায়? আরও কিছু পরে উঠে বসলাম।অমল ওপাশ থেকে জিজ্ঞাসা করলো “কিসের আওয়াজ বলতো”? বুঝলাম তার ঘুমও ভেঙ্গে গেছে। দু’জনে টর্চ জ্বেলে কোন বিচ্ছুর সন্ধান না পেলেও, একটা বেশ বড় মাকড়সা দেখতে পেলাম। ঐ রাতে তাঁবুর ভিতরে মোমবাতি জ্বেলে হিন্দুমতে তার সৎকার করা হ’ল। ইতিমধ্যে দিলীপেরও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। কৃষাণের নাসিকা গর্জনকে উপেক্ষা করে তিনজনে তাঁবুর দড়ি খুলে বাইরে রাস্তার পাশে খাদের ধারে টর্চ জ্বেলে এলাম জলবিয়োগ করতে। চাঁদের আলো বোধহয় একটু জোর হয়েছে। নদীর ওপারে বহুদুর পর্যন্ত পরিস্কার দেখা যাচ্ছে।

হঠাৎ মনে হ’ল মুখ ঘোরালেই যদি ভাল্লুকের দেখা পাই, তাই পাশের দুই বন্ধুকে বললাম, টর্চ নিভিয়ে ওয়ান টু থ্রী বললেই, ছুটে গিয়ে তাঁবুতে ঢুকবো। যেন টর্চ নিভিয়ে দিলে ভাল্লুক আর আমাদের দেখতে পারবে না। কথামতো আলো নিভিয়ে ছুটে তাঁবুতে ঢুকতে গিয়ে দেখি, দোকানের বহু উপরে সেই পাহাড়ের চুড়ায় আগুন জ্বলছে। ভালুকের ভয় ভুলে, কিসের আগুন ভাবতে বসলাম। শেষে আবার তাঁবুতে ঢুকে দড়ি বেঁধে শুয়ে পড়লাম। খুব ভোরে লালাজীর কাছেই মালপত্র রেখে, মণিমহেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। ফেরার সময় শুনেছিলাম কোন মেষপালকের ভেড়া হারিয়ে যাওয়ায়, সে তার ভেড়ার খোঁজে ওখানে গিয়ে রাতে ফিরতে না পারায় আগুন জ্বেলেছিল।

(২)

সালটা ১৯৭২, মাসটা ডিসেম্বর, আমি একা বেনারস হয়ে ওবরার পথে পাড়ি দিলাম। বাড়ির সবাই তাল তুললো দাদার বিয়ের বেনারসী, বেনারস থেকে কেনা হবে। আমার এক নিকট আত্মীয়র ভাই ওবরায় চাকরী করতেন। শুনলাম বেনারস থেকে ওবরার এরিয়াল ডিসটেন্স একশ’ কিলোমিটার। ঐ ভদ্রলোক আমার সঙ্গে বেনারস এসে, আমায় বেনারসী কেনায় সাহায্য করবেন। আমার বেনারস ও বেনারসী, উভয় ব্যাপারেই বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। যতদুর বোঝা গেল ঐ ব্যক্তিটির এই ব্যাপারে পান্ডিত্য, আমার মতোই। তখন মোবাইল ছিল না। টেলিফোন ব্যবহারকারির সংখ্যাও হাতে গোনা যেত। যোগাযোগের সহজ ও একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা ছিল, টেলিগ্রাম। আমার আত্মীয়টি জানালেন, যে তিনি তাঁর ভাইকে এক্সপ্রেস টেলিগ্রাম করে দিয়েছেন নির্দিষ্ট দিনে বেনারস রেলওয়ে স্টেশনে উপস্থিত থাকার জন্য। আমি তাঁর সাথে ওবরায় তাঁর কোয়ার্টার্সে গিয়ে দিন কয়েক কাটিয়ে, তাঁর সাথে আবার বেনারস এসে বেনারসী কিনে বাড়ি ফিরবো। আমার আত্মীয়টি যদিও কখনও ওবরায় তাঁর ভাইয়ের কাছে যান নি, তবু তিনি জানালেন যে, বেনারস স্টেশনের পাশ থেকেই ওবরা যাওয়ার বাস ছাড়ে। এর আগে দু’একবার দীঘা বা পুরলিয়ায় দাদার কাছে যাওয়া ছাড়া, একা কোথাও বেড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও আমার নেই। এত ভালো ব্যবস্থার পর, আমার একা ঐ অচেনা জায়গায় যাওয়ার মধ্যে আর কোন অসুবিধা বা বিপদের সম্ভাবনা না থাকায়, নির্দিষ্ট দিনে দুন এক্সপ্রেসে চেপে বেনারস স্টেশনে এসে নামলাম।

দীর্ঘক্ষণ ধরে বেনারস যাত্রীদের ট্রেন থেকে প্ল্যাটফর্মে নামা ও নতুন যাত্রীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে ওঠার পর্ব শেষ হয়ে ট্রেন যখন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেল, তখন গুটিকতক লোককে প্ল্যাটফর্মে দেখা গেলেও, তাদের মধ্যে আমার পরিচিত ব্যক্তিটিকে কিন্তু কোথাও দেখলাম না। আরও কিছুক্ষণ প্ল্যাটফর্মের এ্র প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পায়চারি করে, ওবরার বাসের খোঁজে প্ল্যাটফর্মের বাইরে আসলাম। কথামতো স্টেশনের বাইরে কোন বাসস্ট্যান্ডবা বাসের দেখা না পেয়ে, এক ব্যক্তিকে ওবরা যাবার বাস কোথা থেকে ছাড়ে জিজ্ঞাসা করায়, হিন্দীতে উত্তর পেলাম— “ আপনি এক কাজ করুণ, আপনি মুখার্জীর হোটেলে থেকে যান। খুব সস্তা ও ভালো হোটেল”। বুঝতে পারলাম এই ব্যক্তি ঐ হোটেলের দালাল, কিন্তু কারো কাছে ওবরা যাওয়ার বাসের সঠিক সন্ধান না পেয়ে শেষে স্টেশনের একটা কাউন্টার থেকে জানা গেল, গোধুলিয়া থেকে ওবরা যাবার বাস ছাড়ে। তাঁর কথার ওপর ভরসা করে রিক্সা করে, এই এলাকায় নতুন হওয়ার অপরাধে বেশী ভাড়া গুণে, গধুলিয়ায় এক বিশাল বাসস্ট্যান্ডে এসে হাজির হলাম। অনেক বাস, অনেক কাউন্টার, অনেক প্যাসেঞ্জার। খোঁজ করে করে নির্দিষ্ট কাউন্টারে এসে ওবরার টিকিট চাওয়ায় হিন্দীতে পরামর্শ পেলাম— “এখন ওবরা যাওয়ার কোন বাস নেই, আপনি চোপান চলে যান, ওখান থেকে ওবরা যাবার অনেক বাস পেয়ে যাবেন”। বাধ্য হয়ে শেষে চোপানের একটা টিকিট কেটে, নির্দিষ্ট বাসের খোঁজে অগ্রসর হয়ে আর এক অসুবিধার সম্মুখীন হলাম। বাসের টিকিটের ওপর ইংরাজী অক্ষরে বাস নাম্বার লেখা থাকলেও বাসস্ট্যান্ডের সমস্ত বাসের নাম্বার প্লেট হিন্দীতে লেখা, যেটার সম্বন্ধে আমার সম্যক্ ধারণার যথষ্ট অভাব ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে নিজের বিদ্যা বুদ্ধির ওপর আস্থা হারিয়ে, অন্যের সাহায্য নিয়ে নির্দিষ্ট বাসের চেয়ার সিটটার জানালার ধারে জায়গা দখল করে বসলাম। পকেটে বেনারসী কেনার জন্য কয়েকটা একশ’ টাকার নোট, খুচরো টাকা প্রায় শেষ। বাস থেকে নেমে পুরি আর কালো রঙের বেগুনের তরকারী খেয়ে বাসে ফিরে এলাম। আস্তে আস্তে বাসটায় ভিড় বাড়তে লাগলেও বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ কিন্তু চোখে পড়লো না।

আমাদের বাস নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে ছুটে চলেছে। চোপান কতদুর, কখন পৌঁছবে, সেখান থেকে ওবরা-ই বা কত দুর কিছুই জানা নেই। দুপুর শেষে, প্রায় বিকেলের দিকে একজন, আমার পিছনের কারো উদ্দেশ্যে হিন্দীতে প্রশ্ন করলেন, “কোথায় যাবে খুকী”? পিছন থেকে উত্তর আসলো “চোপান”। চোপান শুনে আমি পিছনে তাকিয়ে দেখি, পিছনের লম্বা সীটটায় বসা একটা বছর বার-তের বয়সী মেয়ে উত্তরটা দিল। আমি নিশ্চিন্ত হলাম এই ভেবে যে, এই মেয়েটি যেখানে নামবে, আমিও সেখানেই নামবো, কাজেই কোথায় নামতে হবে এই চিন্তা আর থাকলো না। মাঝেমাঝেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মেয়েটি তার সীটে আছে কী না। এইভাবে সন্ধ্যা অতিক্রান্ত হলে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, মেয়েটি বাস থেকে রাস্তায় নামছে। আমিও কোনরকম প্রস্তুতি ছাড়াই বাসের সকলকে বিষ্মিত করে, হঠাৎ ধরমর করে সীট ত্যাগ করে রাস্তায় নামলাম।

অন্ধকার আকাশে ভীষণ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। খুব হালকা দু’এক ফোঁটা বৃষ্টিও পড়ছে। আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, আজই পৃথিবীর শেষ দিন। রাস্তার পাশে পরপর দু’টো দোকান। একটা হোটেল কাম মিষ্টির দোকান, অপরটা পান, বিড়ি, সিগারেট কাম স্টেশনারী কাম মুদিখানা দোকান। রাস্তার অপর পারে দরজা জানালাহীন একটা বিশাল বিল্ডিং, বোধহয় কোন গুদামঘর। কোল্ড-স্টোরেজ হলেও হতে পারে। অ্যাসবেসটসের ঢালু ছাদ, বিল্ডিং এর দেওয়াল ছাড়িয়ে এক ইঞ্চিও এক্সট্রা রাখা হয় নি। ফলে তার নীচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির জলের হাত থেকে বাঁচা তো যায়ই না, উল্টে ছাদ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে, অনেক বেশি ভিজতে হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই গোটা পরিবেশটা কিরকম থমথমে আকার ধারণ করে অল্প হলেও বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হ’ল, সঙ্গে মারাত্বক বিদ্যুৎ চমকানো ও বজ্রপাত।

আমি কী করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে, হোটেলটার ভিতর একটু ঢুকে দাঁড়িয়ে আছি। মাঝেমাঝে এক- আধটা মোটর গাড়ি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে, হোটেল কাম মিষ্টির দোকান থেকে বা পাশের দোকান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে আবার হুস করে চলে যাচ্ছে। একটা বাসকেও এখনও পর্যন্ত আসতে দেখলাম না। দোকানের লোকেরা কোন প্রশ্ন না করলেও, তাদের দৃষ্টি আমার ওপর ঘোরাফেরা করছে। আমার পোষাক, আমার অস্থিরতা, আমার চালচলনে তারা বুঝে ফেলেছে, যে আমি এই অঞ্চলে নতুন। আকাশের অবস্থা ভাল না হলেও বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে। ক্রমে রাত বাড়ছে। ফাঁকা মোটরগাড়ি কিছু যেতে দেখলেও এখন পর্যন্ত বাস কিন্তু বেপাত্তা। এবার শুরু হ’ল দোকান বন্ধের তোড়জোড়। কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। এই দোকানটায় রাজী হলে বন্ধ দোকানের ভিতর মাটিতে বসেও রাত কাটানো যেতে পারে। পাশের দোকানটায় সেই সুযোগও নেই। দোকান দু’টো বন্ধ হয়ে গেলে, অন্ধকার দুর্যোগপূর্ণ ভীষণ শীতের রাতে রাস্তায় একা রাত কাটানো ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ খোলা থাকবে না। যা করার এখনই করতে হবে। দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছি দোকানের লোকগুলোকে আমার বিপদের কথা বলে দোকানে রাতটা থাকতে দেবার অনুরোধ করবো কী না। যদিও জানি তাদের রাজী হবার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। খিদেও যথেষ্ট পেয়েছে। সেই সকাল থেকে খানকতক পুরি পেটে পড়েছে। খুচরো টাকাও বিশেষ পকেটে নেই।

“বাঙালী বলে মনে হচ্ছে, কোথায় যাবেন”? পিছনে প্রায় ঘাড়ের কাছে কথাগুলো শুনে চমকে উঠে পিছনে তাকালাম। বছর সাতাশ-আঠাশ বয়সের একজন দাঁড়িয়ে আছেন। বাঙলা ভাষা যে এত মিষ্টি, এত আপন, এত মনোবল বর্ধক, আগে কোনদিন বুঝবার সুযোগ হয় নি। ভদ্রলোক বললেন, “আমার নাম অনিমেষ মজুমদার, রেলে চাকরী করি। সারাদিন অফিসের কাজে বাইরে বাইরে ঘুরে এখন বাসায় ফিরছি। আপনাকে দেখে মনে হ’ল বাঙালী, তাই দাঁড়িয়ে পড়লাম। কোথায় যাবেন”?

তাঁকে সকাল থেকে সমস্ত ঘটনা বলে বললাম, “এখন পর্যন্ত একটা বাসও চোখে পড়লো না। দু’চারটে মোটর গাড়ি দেখলেও দাঁড় করাবার চেষ্টা করে অবশ্য দেখি নি”। ভদ্রলোক বললেন মোটরে ওঠেন নি বেঁচে গেছেন। একটু পথ গিয়ে রাস্তাটা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। জায়গাটা খুব খারাপ। সবকিছু কেড়ে নিয়ে ওখানে আপনাকে নামিয়ে দিত, এ ঘটনা এখানে আখছার হয়। ওবরা যাবার বাস আসবে। আমি আপনাক বাসে তুলে দিয়েও যেতে পারি।কিন্তু এত রাতে আপনি ওখানে আপনার আত্মীয়র বাড়ি খুঁজে বার করে নিতে পারবেন তো”?

“হ্যাঁ পারবো”, এই দেড়খানা শব্দ কিন্তু জোর গলায় বলতে পারলাম না। অনেক যদি, কিন্তু, সামনে এসে ভিড় করলো। ওবরায় শুনেছি এশিয়ার বৃহত্তম থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট অবস্থিত। সামান্য ব্যান্ডেল থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্টে গিয়ে দেখেছি ছড়িয়ে ছিটিয়ে কত কোয়ার্টার্স, তাহলে এত রাতে সম্পূর্ণ অচেনা জায়গায় নির্দিষ্ট কোয়ার্টার্স খুঁজে বার করা, বিশেষ করে এই দুর্যোগপূর্ণ ঠান্ডা রাতে, সম্ভব হবে তো? সমস্ত বাড়িতেই তো হিন্দীতে বাড়ির নাম্বার বা ঠিকানা লেখা থাকবে? ওবরা কত বড় জায়গা তাও জানা নেই, গোধুলিয়া থেকে ছাড়া বাস আর স্টেশনের কাছ থেকে ছাড়া বাস যদি শহরের দুই প্রান্তে এসে যাত্রা শেষ করে, তাহলে তো বাড়ি খোঁজা আরও সমস্যার হবে।

ভদ্রলোক বোধহয় আমার মনের কথা পাঠ করে ফেলেছেন। তিনি বললেন, “আপনার হাতে এখন দু’টো অপশন আছে। এক, আমি আপনাকে বাসে তুলে দিয়ে যাচ্ছি আপনি ওবরা চলে যান। আর দুই, আজ রাতটা আমার কাছে থেকে গিয়ে, কাল সকালে দিনের আলোয় ওবরা চলে যাওয়া। এখন ভেবে দেখুন কী করবেন, তবে যা ঠিক করার, একটু তাড়াতাড়ি করুণ। কারণ সারাদিন ঘুরে ঘুরে আমি খুব ক্লান্ত, এবার নিজের কোয়ার্টার্সে ফিরে একটু বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন”। আমি এরকম পান্ডব বর্জিত এলাকায় রেললাইন-ই বা কোথায়, আর কোয়ার্টার্সই বা কোথায়, ভেবে না পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “এখানে রেললাইন আছে? আপনার কোয়ার্টার্সটা কত দুরে”? ভদ্রলোক বললেন, “এখানে রেল ইয়ার্ড আছে। আমার কোয়ার্টার্স সামনেই। আপনি কী ভয় পাচ্ছেন? তাহলে স্বচ্ছন্দে ওবরা চলে যেতে পারেন”।

আমি মনে মনে দ্রুত অঙ্ক কষে নিলাম। এই ভদ্রলোককে আমি চিনি না। আমার কাছে সামান্যই টাকা আছে। উনি জোর করে এই টাকা কেড়ে নিতে পারেন, কিন্তু এর জন্য খুনখারাপির কোন সম্ভাবনা নেই। কিছু হলে আজ রাতেই বা কাল সকালে চিৎকার করে লোক জড় করে ওঁর বাসস্থানটা অন্তত চিহ্নিত করতে পারবো। কিন্তু এই রাতে ওবরায় কিছু হলে, আমি কিছুই করতে পারবো না। অতএব এর কাছে থেকে যাওয়াটাই যুক্তিসঙ্গত ও নিরাপদ হবে।

ভদ্রলোক আবার বললেন, “ভয় পাচ্ছেন? যা করার তাড়াতাড়ি করুণ, আমি খুব ক্লান্ত”। ব্যাপারটা “এস এস গর্তে এস, বাস ক’রে যাও চারটি দিন, আদর ক’রে শিকেয় তুলে রাখব তোমায় রাত্রিদিন” গোছের ভয়াবহ হলেও ঝুঁকি না নিয়ে আমার উপায় নেই। তাই বললাম, “ভয় পাব কেন? আপনার এখানেই থেকে যাব, কিন্তু কিছু খাওয়া দরকার, সারাদিন কিছু খাওয়া হয় নি”। ভদ্রলোক বললেন, “এই হোটেলেই খেয়ে নিন, দেখুন কী পাওয়া যায়”। আমি জানালাম যে আমার কাছে খুচরো টাকা বিশেষ নেই, একটা একশ’ টাকার নোট আছে। ভদ্রলোক বললেন, “আপনি খেয়ে নিন, আমি এখন দাম দিয়ে দিচ্ছি। কাল সকালে বড় নোট ভাঙ্গিয়ে দেওয়া যাবে”। দোকানে ঢুকে কী পাওয়া যাবে খোঁজ করে জানা গেল— ভাত, ডাল, সবজী, আর পিঁয়াজ পাওয়া যাবে। খুব ভাল চালের ভাত, অল্প ডাল, সামান্য ঝোলের মধ্যে গোটা গোটা, ছোট ছোট দু’টো আলু, আর মস্ত এক কাঁচা পেঁয়াজ। ভাতে ডাল মেখে চামচ দিয়ে একটা আলু কাটতে গেলে, ছিটকে উড়ে গিয়ে মাটিতে আশ্রয় নিল। অগত্যা একটা ছোট্ট আলু আর সাধের মস্ত এক পেঁয়াজ দিয়ে ভাত খেয়ে, নিজের পকেট থেকেই দাম মিটিয়ে রাস্তায় এলাম। খুব ইচ্ছা করছিল পাশের দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে ধরাই, কিন্তু কিরকম একটা সঙ্কোচ বোধে কিনতে পারলাম না। ভদ্রলোকের সাথে এ গলি ও গলি ঘুরে তাঁর কোয়ার্টার্সে এসে উপস্থিত হলাম।

ছোট্ট কোয়ার্টার্স। দরজা দিয়ে ঢুকেই বাঁদিকে ছোট বাথরূম। তারপাশে রান্নাঘর। ডানপাশে একটা মাঝারি ঘর। ঘরে ঢুকেই ভদ্রলোক বললেন, “নিন্ ফ্রেস হয়ে নিন্। আমার কাছে একটা লেপ আর একটা কম্বল আছে, আপনি কোনটা নেবেন”? আমি বললাম, “আমার কোন ফ্যাশিনেশন নেই, যেটা হোক একটা হলেই চলবে। না হলেও কোন অসুবিধা নেই”। ভদ্রলোক বললেন, “এখানে ভীষণ ঠান্ডা। আমি রোজ দুটোই নি, আপনি বরং লেপটা নিন ঠান্ডা কম লাগবে। আমি ব্যাগ থেকে পায়জামা, গামছা নিয়ে বাথরূমে ঢুকলাম। আমার কাছে বেনরসী কেনার জন্য কয়েকটা একশ’ টাকার নোট ছিল। আমি ইচ্ছা করে একটা একশ’ টাকার নোট আছে বলেছিলাম। না বলে উপায়ও ছিল না। কেড়ে নিলে একটা নোটই কেড়ে নিক। এবার পায়জামার দড়ি পরানোর গর্তে অন্য নোটগুলো সরু করে ভাঁজ করে ঢুকিয়ে রেখে, পকেটে একটা মাত্র একশ’ টাকার নোট রেখে, হাত মুখ ধুয়ে, জামা প্যান্ট হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রেখে, বিছানায় এসে লেপের তলায় ঢুকলাম। একটু পরেই আমার পাশে ভদ্রলোকের মৃদু নাসিকা গর্জন শুরু হলেও আমার চোখে ঘুম নেই। সত্যিই তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন না আমায় বোকা বানাবার চেষ্টা করছেন, রাতে টাকা পয়সা কেড়ে নেওয়ার জন্য আক্রমন করলে আত্মরক্ষার্থে আমার কী করা উচিৎ, ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।

ঘুম ভাঙ্গলো চোখে সূর্যালোক পড়ায় ও গানের আওয়াজে। দেখি ভদ্রলোক কম্বল চাপা দিয়ে বসে ট্রানজিষ্টারে রেডিও সিলোন শুনছেন। আমার ঘুম ভাঙ্গা দেখে তিনি বললেন, “ঘুম ভাঙ্গলো? বাপরে কী ঘুম আপনার, নিন্ তৈরী হয়ে নিন্”। আমি লেপের তলা থেকেই পায়জামার দড়ির গর্তে চাপ দিয়ে দেখলাম, টাকাগুলো নির্দিষ্ট জায়গাতে ঠিক আছে।

বাথরূমে গিয়ে মুখ হাত ধুয়ে, জামা প্যান্ট পরে তৈরী হয়ে তাঁর সাথে গতকালের দোকানটায় এসে পেট ভরে কচুরী আর জিলিপি খেয়ে, পকেট থেকে একশ’ টাকার নোটটা দিয়ে ভাঙ্গিয়ে দিতে বললাম। ভদ্রলোক দোকান থেকে নোটটা ভাঙ্গিয়ে দশটা দশ টাকার নোট দিয়ে বললেন, “আপনি আমার গেষ্ট হয়ে জলখাবারের দাম আপনি দেবেন? ছি ছি, আমায় আপনি কী ভাবছেন বলুন তো”? প্রতিটা দশ টাকার নোট ছেঁড়া ও খবরের কাগজের টুকরো দিয়ে জোড়া। উনি জানালেন, এখানে সব এই জাতীয় নোটই পাবেন। চিন্তা করবেন না, সব নোট চলে যাবে। ফেরার আগে খরচা করে ফেলবেন। দেখতে দেখতে বাস এসে গেল। তিনি আমায় বাসে তুলে দিয়ে হাত নাড়লেন। আমিও হাত নাড়লাম।

দাদার বিয়েতে তাঁকে নিমন্ত্রণ করার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু তাঁর ঠিকানা জেনে না আসায় সম্ভব হয় নি। আজ প্রায় বিয়াল্লিশ বছর পরে তাঁর কথা লিখে তাঁকে আমার কৃতজ্ঞতা জানালাম।

(৩)

সালটা ১৯৭৯, মাসটা আগষ্ট, আমি, দিলীপ আর মাধব হেমকুন্ড সাহেব, ভ্যালি অফ্ ফ্লাওয়ার্স, বদ্রীনারায়ণ, মানা গ্রাম, বসুধারা, ত্রিযুগীনারায়ণ, কেদারনাথ ঘুরে গঙ্গোত্রী যাওয়ার উদ্দেশ্যে উত্তরকাশী এসে পৌঁছলাম। মাধবের গায়ে বেশ জ্বর। তাকে ডাক্তার দেখিয়ে টুরিষ্ট লজে রেখে, বাসের টিকিট কাউন্টারে এসে জানা গেল যে গত বছর বণ্যার পর থেকে ঐ রাস্তায় ডিরেক্ট্ বাস বা স্থানীয় ভাষায় “যাত্রাবাস” বন্ধ হয়ে গেছে। ভুখি পর্যন্ত বাসে গিয়ে, তের কিলোমিটার হাঁটা পথ পার হয়ে ডাবরানী যেতে হবে। সেখান থেকে গঙ্গোত্রী যাওয়ার লঙ্কার বাস পাওয়া যাবে। কিন্তু সকালে ভুখি যাওয়ার বাসও না থাকায়, ভাটোয়ারী পর্যন্ত বাসে গিয়ে, ওখান থেকে ভুখি যেতে হবে।

উত্তরকাশীর টুরিষ্ট লজের ক্লোকরুমে তিনটে সুটকেস ও দু’টো হোল্ড্-অল্ রেখে, তিনজনে তিনটে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ও তিনটে ওয়াটার বটল্ নিয়ে, লাঠি হাতে রাস্তায় এলাম। যাব গঙ্গোত্রী। হোটেলে খাওয়া দাওয়া সেরে, টিকিট কাউন্টারে গেলাম টিকিট কাটতে। ভাটোয়ারী পর্যন্ত তিনটে টিকিটের দাম নিল ন’টাকা ত্রিশ পয়সা। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, প্রায় পঁয়ত্রিশ কিলোমিটার মতো রাস্তা। একটু পরে বাস ছেড়ে দিল। আমাদের পাশে এক বাঙালী ভদ্রলোক বসেছিলেন। তাঁর কাছে শুনলাম, একটু এগিয়ে এক বিরাট বাঁধের কাজ চলছে। গত বৎসর বাঁধের কাজ চলা কালীন বণ্যায় গঙ্গার জল ঢুকে, সমস্ত নষ্ট হয়ে যায়। তিনি ওখানে কনট্র্যাকটারী করেন। যাহোক্, একসময় বাস এসে ভাটোয়ারী পৌঁছলো। বাসের দু’একজন মাত্র যাত্রী ভুখি যেতে চায়। আমরা তিনজন নিজেদের গরজে বাস থেকে নেমে, বাসের অফিসে গিয়ে, ভুখি পর্যন্ত বাস নিয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করলাম। প্রথমে ওরা এই প্রস্তাবে কানই দিল না। পরে আরও কিছু প্যাসেঞ্জারের অনুরোধে, ওরা জানালো কুড়ি-পঁচিশজন যাত্রী হলে, বাস ভুখি নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। ব্যাস, আর সময় নষ্ট না করে, লেগে পড়লাম প্যাসেঞ্জারের সন্ধানে। ভুখিগামী যে কোন লোককে দেখলেই আমরা তাকে ডেকে এনে, বাস এক্ষুণি ছাড়বে জানিয়ে বাসে বসতে বলছি। এইভাবে অনেক কষ্টে গোটা পনের লোক যোগাড় করা গেল। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর, ভুখি যাবার জনা কুড়ি-পঁচিশজন যাত্রী যোগাড় হ’ল। কিন্তু বাস ছাড়ার কোন লক্ষণ কিন্তু দেখা গেল না। ফলে দু’চারজন আগ্রহী যাত্রী আবার বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করলো। যাহোক্, কর্তৃপক্ষের অশেষ কৃপা, শেষ পর্যন্ত এই রাস্তাটার জন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে এক টাকা করে ভাড়া নিয়ে, বাস ছাড়লো। অল্পই রাস্তা, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস এসে ভুখি পৌঁছলো।

আকাশটা আজ আবার বেশ মেঘে ঢেকে আছে, তবে এক্ষুণি বৃষ্টি নামার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এক যুবক আমাদের সাথে এই বাসেই এসেছে। সে নিজেই আমাদের সাথে আলাপ করলো। লক্ষ্ণৌতে বাড়ি, যাবে গরমকুন্ডে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম গরমকুন্ডটা কোথায়? সে জানালো, “গাংগানী” নামক জায়গাটার গঙ্গার অপর পারটার নাম গরমকুন্ড। যুবকটি খুব সুন্দর কথাবার্তা বলে, দেখতেও বেশ সুন্দর। হাতে একটা ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে, আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে, একসাথে হেঁটে চলেছে। আমরা কিছু কলা ও আপেল নিয়ে এসেছিলাম রাস্তায় প্রয়োজন হতে পারে ভেবে। খিদেও বেশ ভালই পেয়েছে। ভাবলাম কোথাও বসে সেগুলো খাওয়া যাবে। যুবকটি জানালো, সে গরমকুন্ডে ওয়্যারলেসে কাজ করে। হাওড়া শিবপুরে রেমিংটন ব্যান্ডে, তার বাবা কাজ করতো। ফলে সে নিজেও হাওড়া কলকাতা ঘুরে এসেছে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, সে মিলিটারিতে কাজ করে কী না। সে জানালো, যে ওটা মিলিটারির আন্ডারে পড়ে না। ওদের কাজ গঙ্গার জল হ্রাসবৃদ্ধির খবর, ওয়্যারলেসে উত্তরকাশীকে জানানো, ও ঐ এলাকার ওপর লক্ষ্য রাখা। তাছাড়া রাস্তা মেরামতীর জন্য পাহাড় ব্লাষ্টিং করলেও উত্তরকাশীকে খবর পাঠানো, যাতে ঐ সময়ে কোন যাত্রীকে আসতে দেওয়া না হয়। আরও হয়তো কিছু কাজকর্ম আছে, বিশদভাবে জানতে চাইলাম না। যুবকটি সামনে একটা দোকানে আমাদের নিয়ে চা খেতে ঢুকলো। খুব হাল্কা এক পশলা বৃষ্টি শুরু হ’ল, সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া। চা খাওয়া হলে দাম দিতে গেলে, যুবকটি বাধা দিয়ে বললো “তাই কখনও হয়? আমাদের জায়গায় এসে আপনারা দাম দেবেন কী? আপনাদের ওখানে গেলে, তখন আপনারা দাম দেবেন”। বললাম, এটাও তো আপনার এলাকা নয়, লক্ষ্ণৌ গেলে আপনি দাম দেবেন। যুবকটি বললো, “ওখানে গেলে আমার খরচায় সমস্ত লক্ষ্ণৌ শহর ঘুরে দেখাবো”। বললাম, “আপনাদের লক্ষ্ণৌ শহর আমার দেখা, খুব ভাল জায়গা”। বৃষ্টি আর পড়ছে না, আমরা উঠে পড়ে দোকান থেকে রাস্তায় নামলাম। বাস থেকে নেমে যুবকটির সঙ্গে এতক্ষণ আমরা কিন্তু বাস রাস্তা ধরেই হেঁটে আসছি। এদিকে বাস কেন যে আসেনা, বুঝলাম না। আরও কিছুটা পথ হাঁটার পর কারণটা বোঝা গেল। শুধু বোঝা গেল তাই নয়, সঙ্গে গঙ্গোত্রী যাত্রার ভবিষ্যৎ নিয়েও আমাদের মনে সংশয় দেখা দিল। রাস্তা একেবারেই নেই। কোন কালে ছিল বলেও বোঝার উপায় নেই। পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরীর কাজ চলছে। বড় বড় শাবলের মতো লোহার রড দিয়ে ড্রিল করে পাহাড়ের গায়ে গর্ত করা হচ্ছে। পরে ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ভেঙ্গে, রাস্তা তৈরী হবে। তখন লোক চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। এবড়ো-খেবড়ো ভাঙ্গা পাথরের ওপর দিয়ে অনেকটা পথ পার হয়ে যেতে হ’ল। পাশেই গভীর খাদ। অনেক নীচ দিয়ে গঙ্গা আপন মনে বয়ে চলেছ। সেই গঙ্গা, যার উৎস দেখতেই আমাদের এত কষ্ট করে যাওয়া। খুব সাবধানে এই পথটুকু পার হয়ে এলাম। একটু পা হড়কালেই গঙ্গা মাইকী জয় হয়ে যাবার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এ জায়গাটায় রাস্তা বলে কিছু নেই। কখনও নীচুতে নেমে, কখনও বা বড় পাথর টপকে একটু ওপরে উঠে, এগিয়ে যেতে হয়।

বেশ কিছুটা পথ এইভাবে পার হয়ে, আবার বাস রাস্তায় পড়লাম। গল্প করতে করতে জোর কদমে এগিয়ে চলেছি। বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হল। সঙ্গে ওয়াটার প্রুফ আছে বটে, কিন্তু যুবকটি ভিজে ভিজে আমাদের সাথে যাবে, আর আমরা বর্ষাতি গায়ে দিয়ে তার সাথে যাব? তাই আমরাও ভিজে ভিজেই তার সাথে পথ চলছি। কোথাও যে একটু দাঁড়াবো, তারও উপায় নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজার থেকে, ভিজে ভিজে হাঁটাই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের জন্য যতটা না চিন্তা, তার থেকে অনেক বেশী চিন্তা মাধবকে নিয়ে। যুবকটি জানালো, আমরা প্রায় গাংগানী এসে গেছি, আর সামান্যই পথ। একটু এগিয়েই একটা ঝোলা পোর্টেবল্ ব্রীজ পার হয়ে, গঙ্গার অপর পারে এলাম। পরপর দু’টো চায়ের দোকানের একটার মাঝখান দিয়ে হেঁটে যুবকটি আমাদের একটা পাকা বড় ঘরে ছেড়ে দিয়ে বললো, “এখানে রাতটা কাটাতে পারেন। আজ আর এগবেন না, কারণ এখান থেকে আগেকার পাকা বাস রাস্তা আর নেই। বাস রাস্তা ছিল গঙ্গার অপর পার দিয়ে, যেদিক দিয়ে আমরা এতক্ষণ হেঁটে আসলাম। এই ব্রীজের ঠিক পরেই আগেকার বাস রাস্তাটা গঙ্গার সাথে মিশে গেছে”। যুবকটি জানালো, গত বছর বণ্যার পর পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ করে, এই ব্রীজটা তৈরী করা হয়েছে। গঙ্গার এপার থেকে ডাবরানী পর্যন্ত নতুন পায়ে হাঁটার পথ তৈরী করা হয়েছে। এটা একবারেই স্থানীয় লোকেদের প্রয়োজন মেটাতে, তাদের উপযুক্ত হাঁটাপথ তৈরী করা হয়েছে। এখন গঙ্গোত্রী যাবার যাত্রী নেই। তাছাড়া রাতে ঐ রাস্তায় ভাল্লুকের উৎপাত আছে। কাজেই আমাদের আজ আর এগিয়ে না গিয়ে, এখানে থেকে যাওয়াই ঠিক হবে। সামনেই একটা পাকা বাড়ি দেখিয়ে যুবকটি জানালো যে, ওটাই তাদের অফিস, এবং ওখানেই মেস্ করে তারা কয়েকজন থাকে। যুবকটি তার নিজের আস্তানায় এগিয়ে গেল।

আমাদের সর্বাঙ্গ বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। যুবকটির দেখানো বড় ঘরটায় রাত্রিবাস করার সিদ্ধান্ত পাকা করে, ঘরে ঢুকে নিজেদের সব জামাপ্যান্ট খুলে, দরজা, জানালা ও মাটিতে মেলে শুকতে দিয়ে, জাঙ্গিয়া পরে বসে রইলাম। যদিও বুঝতে পারছি শুকনো হবার কোন সম্ভাবনাই নেই, তবু যদি কিছুটা শুকনো হয় এই আশায়, ওগুলো মেলে দিলাম। এতক্ষণে কলা, আপেলগুলো যথাস্থানে স্থান পেল। খিদেটা অনেকটাই কমে গেল। ঘরটার সামনেই একটা বড় চৌবাচ্চা মতো। তার জল কিন্তু গরম। চারপাশ দিয়ে অল্প অল্প ধোঁয়াও উঠছে। ডানপাশে, উপর থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে একটা ঝরণার ধারা নেমে এসেছে। পরে শুনলাম ঐ ঝরণার জল গরম, এবং ঐ জলই এ অঞ্চলে সর্বত্র ব্যবহার করা হয়। আমাদের ঘরটার ভিতরে একপাশে মুখোমুখি দু’টো করে, মোট চারটে বাথরুম বা পায়খানা, কিছু একটা হবে। চারটের দরজাই তালা দেওয়া। কার কাছে চাবি থাকে জানিনা, তবে ওগুলোর দেওয়াল ছাদ থেকে বেশ খানিকটা নীচে শেষ হয়েছে। বন্ধুদের বললাম, প্রয়োজনে দেওয়াল টপকে ভিতরে নেমে ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু সবার আগে রাতের খাবারের একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। মাধবকে বসিয়ে রেখে, জাঙ্গিয়া পরা অবস্থায় গায়ে ওয়াটার প্রুফ চাপিয়ে দোকান দু’টোর কাছে গেলাম। নীচের দোকানটা জানালো, চা ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। ওপরের দোকানটায় দেখলাম কয়েকজন বসে চা খাচ্ছে। একপাশে পাঁচটা খাটিয়া পাতা। কিছু পাওয়া যাবে কী না জিজ্ঞাসা করায়, দোকানদার জানালেন চা পাওয়া যাবে। এই দোকানের একমাত্র খাদ্যবস্তু চা আর বিড়ি। দেশলাই পর্যন্ত নেই। আমরা জানালাম, রাতে আমরা এখানে থাকবো, আমাদের খাবার কিছু ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বৃদ্ধ দোকানদারকে লালাজী বলে সম্বোধন করায়, তিনি খুব খুশী হলেন। দোকানের বাইরে ডানপাশে, একটা নল থেকে ঐ ঝরণার গরম জল একভাবে পড়ে যাচ্ছে। তার পাশে কিছু ছোট ছোট শুকনো আলু পড়ে আছে, হয়তো বা রাখা হয়েছে। দেখে মনে হ’ল পচে গেছে, তাই দোকানের বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেখা গেল প্রত্যেকটা আলুর গা থেকে শিকড়ের মতো কল্ বার হয়েছে। এতক্ষণে লালাজী জানালেন যে, আমরা যেখানে উঠেছি, সেটা আসলে মহিলাদের গরমকুন্ডে স্নান সেরে কাপড় ছাড়ার জায়গা। ওখানে রাত্রে থাকতে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে পুরুষদের তো নয়ই। দিলীপ আর আমি পাশাপাশি বসে। হাতে এই দোকনের একমাত্র খাদ্য, চায়ের কাপ। শোচনীয় অবস্থা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বৃষ্টি পড়ছে, দারূণ শীত, চারপাশে কালো হিমালয় ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না, অনেক নীচু থেকে গঙ্গার বীভৎস আওয়াজ এক নাগাড়ে কানে বাজছে, এই অবস্থায় এখনও আমরা জানি না, রাত্রে কোথায় থাকবো, কী খাবো। এখানে কাছেপিঠে কোন মানুষ বাস করেনা, থাকা বা খাওয়ার কোন ব্যবস্থাও নেই, এখানে কোন্ মহিলা পাহাড় ভেঙ্গে রাতে কুন্ডে স্নান সেরে কাপড় ছাড়তে আসবে ভগবান জানেন। অপরদিকে একটা খাটিয়ায়, একজন পায়জামা সার্ট পরা লোক বসে আছেন। তাঁর দৃষ্টিটা কিরকম যেন সন্দেহজনক। দিলীপকে সাবধান করে দেবার জন্য বললাম, লোকটার চাউনি মোটেই সুবিধার নয়, রাতে সতর্ক থাকতে হবে। দিলীপও আমার কথায় সায় দিল। সঙ্গে এত টাকা, মাধবের ও আমার মানি ব্যাগে বেশ কিছু টাকা আছে। আর বেশীরভাগ টাকাই অবশ্য রাখা আছে খালি একটা বিস্কুটের প্যাকেটে। এমন জায়গায় এসে হাজির হয়েছি যে, চিৎকার করে আমাদের সতর্ক করে, ঢাক ঢোল পিটিয়ে আমাদের খুন করে ফেললেও, কারো জানার উপায় নেই। মাঝেমাঝে আড়চোখে তাকিয়ে দেখি লোকটা একভাবে আমাদের লক্ষ্য করছেন। আমরা যে ফাঁদে পড়েছি, তিনি বুঝে গেছেন। লালাজী বললেন, ভাত, ডাল ও সবজী পাওয়া যাবে। আমরা বললাম, ভাত না করে চাপাটি বানানো যায় না? লালাজী বললেন, বাঙালী আদমি রুটি খাবে? আমরা জানালাম যে রুটিই আমরা ভালবাসি। তিনি জানালেন যে তিনি রুটি তৈরী করে দেবেন। একটা সমস্যা মিটলো, অন্তত খালিপেটে লোকটার হাতে মরতে হবে না। আমরা বললাম রাতে তিনটে খাটিয়া চাই, সঙ্গে লেপ্ কম্বল। সামনের ঐ ঘরে আমাদের এক বন্ধু আছে, সে অসুস্থ। খাটিয়া লেপ ঐ ঘরে নিয়ে যাব। লালাজী জানালেন, সব কিছুই মিলবে, তবে ওখানে রাতে থাকতে দেওয়া হয় না, কাজেই দোকানেই থাকতে হবে। আসলে ঐ ঘরটায় থাকতে চাওয়ার একটাই উদ্দেশ্য, ঘরটায় দরজা আছে, এবং সেটা ভিতর থেকে বন্ধ করা যায়। আর এই দোকানটা একটা অতি সাধারণ চায়ের দোকান। সামনে তিনটে বাঁশের খুঁটি। সামনে ও ডানপাশটা পুরো খোলা। পিছন ও বাঁপাশটা খড়ের ও মাটির দেওয়াল মতো। খড়ের চাল। সঙ্গে এত টাকা পয়সা নিয়ে এখানে থাকা বেশ বিপজ্জনক বলেই মনে হয়। দিলীপ বললো মাধবের সাথে পরামর্শ করে, পরে এখানে আসা যাবে। আমি কিন্তু তাতে রাজী হলাম না। পাঁচটাই মাত্র খাটিয়া আছে। তার মধ্যে একটা নিশ্চই লালাজীর। বাকী রইলো চারটে। আমরা তিনজন আছি। এরমধ্যে কেউ এসে হাজির হ’লে, জায়গা পাওয়া যাবে না। তখন সারারাত বৃষ্টির মধ্যে অন্ধকারে রাস্তায় বসে কাটাতে হবে।

আগে এসে খাটিয়া দখল করে, পরে অন্য চিন্তা করা যাবে। ঘরে ফিরে এসে দলা করে সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে, দোকানে ফিরে চললাম। মাধবকে সন্দেহজনক লোকটার সম্বন্ধে সংক্ষেপে সব বললাম। দোকানে এসে তিনজনে তিনটে খাটিয়ায় সরাসরি উঠে বসে, লেপ-তোষক দিতে বললাম। পরপর তিনটে খাটিয়ায় আমরা তিনজন। আমার আর দিলীপের খাটিয়া দু’টোর মাথার দিকে, আর দু’টো খাটিয়া। স্থানাভাবে সবগুলো খাটিয়াই প্রায় গায়ে গায়ে লাগানো। লালাজী জানালেন, একটু পরেই লেপ তোষক বার করে দেবেন। বৃষ্টিটা বন্ধ হয়েছে। আমরা যে যার খাটিয়ায় চুপ করে বসে আছি। সন্দেহজনক লোকটা কিন্তু এখনও বসে আছেন, আর মাঝেমাঝেই আমাদের লক্ষ্য করছেন। ভুখি থেকে একসাথে যে যুবকটির সঙ্গে এতটা পথ হেঁটে আসলাম, তার থাকার ঘরটা যদিও এক মিনিটের পথ, তবু সে আর একবারও দেখা করতে এল না। ভেবে খুব আশ্চর্য লাগলো যে, যে লোকটা এতটা পথ একসঙ্গে এল, চায়ের দাম পর্যন্ত দিতে দিল না, সে আমাদের এই বিপদের সময়, একবারও দেখা করতেও এল না? এতক্ষণে সন্দেহজনক লোকটা উঠে চলে গেলেন। আমরাও নিশ্চিন্ত হয়ে যে যার খাটিয়ায় শুয়ে, গল্পগুজব করতে লাগলাম। লালাজী জানালেন, খাটিয়া আর লেপ তোষকের ভাড়া, মাথাপিছু চার টাকা পঞ্চাশ পয়সা করে দিতে হবে। আজ রাতে আমরা যে জায়গায়, যে অবস্থায় এসে হাজির হয়েছি, তাতে চল্লিশ টাকা বললেও দিতে হবে। আকাশ একবারে পরিস্কার হয়ে, অসংখ্য তারা ফুটে গেছে। ঘরের খড়ের ছাদ দিয়েই নানা জায়গায় আকাশ দেখা যাচ্ছে। ভাল করে খুঁজলে হয়তো কালপুরুষ, সপ্তর্ষি মন্ডল-ও দেখা যেতে পারে। ভয় হ’ল, রাতে জোরে বৃষ্টি আসলে আমাদের কী অবস্থা হবে ভেবে। হাতে কোন কাজ নেই, সময় আর কাটে না। এক বান্ডিল বিড়ি নিয়ে, তিনজনে শেষ করতে বসলাম। কী করবো, কিছু একটা তো করা চাই। লালাজী একটা থালায়, লাল, সবুজ, হলদে, কালো, নানা রঙের মেশানো ডাল নিয়ে একবার করে ফুঁ দিচ্ছেন, আর দোকান ঘরে একরাশ ধুলো উড়ে যাচ্ছে। এর থেকেও অনেক খারাপ খাবার খাওয়ার অভ্যাস আমাদের হয়ে গেছে। তাছাড়া খিদেও পেয়েছে যথেষ্ট। তাই খাবার তৈরীর আশায় বসে রইলাম। সব শান্তির অবসান ঘটিয়ে, সেই সন্দেহজনক মক্কেল, আবার এসে হাজির হলেন। দিলীপ বললো ওর সাথে কথা বলে দেখলে হয়। আমরা বললাম, যেচে ওর সাথে আলাপ করার দরকার নেই। কিন্তু লোকটাকে দেখে মনে হ’ল, সে আমাদের সাথে কথা বলতেই চায়। তাই আমরাই প্রথম জিজ্ঞাসা করলাম— তিনি কোথায় থাকেন, কী করেন ইত্যাদি। লোকটা এবার এগিয়ে এসে আমাদের সামনে একটা খাটিয়ায় বসলেন। তাঁর কাছে জানতে পারলাম যে, তিনি এখানে ইরিগেশন ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। বাড়ি মিরাটে। বছরে দু’একবার এর বেশী বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয় না। এখানে ওয়্যারলেস কর্মীদের সাথে একই মেসে থাকেন। শীতকালে এখানকার অনেকেই বাড়ি চলে যায়। তখন এখানে তিনি প্রায় একাই থাকেন। একা একা তাঁর একদম ভাল লাগে না। কথাবার্তা শুনে বুঝলাম, লোকটি ভাল। একা একা থেকে, কথা বলার অভ্যাস কমে গেছে, সুযোগও নেই। আমাদের সাথে তিনি কথা বলতেই চাইছিলেন, তবে নিজে থেকে আগে কথা বলা ঠিক হবে কী না ভেবে, এতক্ষণ কোন কথা বলেন নি। ওঁর কাছ থেকে গত বছরের বণ্যার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা শুনলাম।

গত বছর পাঁচই আগষ্ট রাত্রিবেলা, এই গাংগানীর কিছুটা আগে ডাবরানীর দিকে পাহাড়ের একটা চুড়া গঙ্গার ওপর ভেঙ্গে পড়ে। ওখানকার গঙ্গা খুব সরু, ফলে গঙ্গার জল চলাচল একবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে ওরা দেখে গাংগানীতে গঙ্গা একবারে শুকিয়ে গেছে। দু‘একটা ঝরণার জল, ও গঙ্গার যেটুকু জল লিক্ করে আসতে পারে, সেই জলই সামান্য ধারায় বয়ে যাচ্ছে। ঐ দিন, অর্থাৎ ছয় তারিখে প্রায় বিকেল নাগাদ, গঙ্গার জমে থাকা বিপুল জলের চাপে, ঐ ভেঙ্গে পড়া পাথরের একটা অংশ ঠেলে ভেঙ্গে ফেলে, প্রবল বেগে জল নীচের দিকে, অর্থাৎ গাংগানী, ভুখি, বা উত্তরকাশীর দিকে ধেয়ে আসে। বর্ষাকালের প্রায় বার-চোদ্দ ঘন্টার জমে থাকা জলের স্রোত, হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভীষণ আকার ধারণ করে সমস্ত শহর ভেঙ্গে, গুঁড়িয়ে দিয়ে বয়ে চলে যায়। এই গাংগানীতে, যেখানে আমরা এখন বসে আছি, তার অপর পারে দু’টো গেষ্ট হাউস, একটা আয়ুর্বেদিক কলেজ, একটা ইন্টার হাইস্কুল, কালীকম্বলীর ধর্মশালা ও বেশ কয়েকটা হোটেল ছিল। এক কথায় ওটা একটা বেশ বড় পাহাড়ী শহর ছিল। এখন এই মুহুর্তে আমরা যে জায়গাটায় আছি, তার নাম গরমকুন্ড। গঙ্গার অপর পারটার নাম গাংগানী। এ দিকটায় খাড়া পাহাড়, অপর দিকে প্রায় গঙ্গার লেভেলেই ছিল গাংগানী শহর, বাস রাস্তা। ফলে গঙ্গার জল ঐ বিশাল পাথর ঠেলে যেতে না পেরে, ডানদিকে বেঁকে গাংগানীর ওপর দিয়ে বয়ে গিয়ে, সমস্ত শহরটাকে ভেঙ্গে নিয়ে যায়। আসবার সময় এত ঘটনা আমরা জানতাম না। তবে আমাদের বাড়ির কাছে এক ভদ্রলোক গঙ্গোত্রী যেতে না পেরে ফিরে এসেছিলেন, তাঁর কাছে এর অনেকটাই শুনে, আমরা ইউ. পি. টুরিজম্ অফিসে জিজ্ঞাসা করে হাসির খোরাক হয়েছিলাম। দোষটা তাদের নয়, তারা এ খবর জানতো না বা জানবার চেষ্টাও করে নি। আসবার সময় দেখেছিলাম, একটা ছোট মন্দির ও একটা ভাঙ্গা বাড়ির দেওয়াল ছাড়া আর কিছুই ওদিকে নেই। ভদ্রলোক জানালেন, পাঁচজন টুরিষ্ট মারা যায়, তারা সবাই বাঙালী। স্থানীয় লোকেরা বিপদের আশঙ্কা করে আগেই বাড়িঘর, জিনিসপত্র ফেলে, ওপর দিকে পালিয়ে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে রক্ষা পায়।

যাহোক্, ভদ্রলোক এবার মেসে ফেরার জন্য উঠলেন। আমরা ডাবরানী আর কতটা রাস্তা, রাস্তায় দোকান পাব কী না, ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করায়, ভদ্রলোক জানালেন ভুখি থেকে এই গাংগানী পাঁচ কিলোমিটার পথ। আবার এখান থেকে ডাবরানী আট কিলোমিটার পথ। পথে কোন দোকান পাওয়া যাবে না। রাস্তাও খুবই কষ্টকর। এবার ভদ্রলোক বাসায় ফিরে গেলেন। যাবার সময় বলে গেলেন, কোন ভয় নেই। আপনারা ঠিক ভালভাবে পৌঁছে যাবেন, আমার শুভেচ্ছা রইলো। ফিরবার পথে অবশ্যই দেখা হবে।

এদিকে লালাজীর রান্নাও শেষ। পাশের কাপড় ছাড়ার ঘরটা থেকে, চেঁচামিচির আওয়াজ আসছে। শুনলাম একদল পুরুষ ও মহিলা ওখানে এসে উঠেছে। আগেভাগে এখানে এসে জায়গা নিয়েছি বলে, নিজেদেরকে এখন ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছে। আমরা খাবার খেতে উঠতেই, লালাজী বললেন, ওখানে বসেই প্রেমসে খানা খাও। ডাল, ছোট ছোট আলুর তরকারী, যার অধিকাংশ আলুই শক্ত এবং পচা, আর একপিঠ পোড়া অপর পিঠ কাঁচা এক উপাদেয় রুটি। আলুর তরকারীতে একটু করে মাখন দিয়ে নিয়ে, মৌজ করে খাওয়া শুরু করলাম। এরকম একটা জায়গায় এই পরিবেশে বিনা পরিশ্রমে খাটিয়ায় বসে এই খাবার পেয়ে, লালাজীর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আর সত্যি কথা বলতে, কী ভালই যে লাগলো, মনে হ’ল অমৃত খাচ্ছি। জানিনা একেই “খিদে পেলে বাঘে ধান খায়” বলে কী না। অসুস্থ মাধব তিনটে রুটি মেরে দিল। এখানকার মতো বড় বড় রুটি না হলেও, আমি বোধহয় খান ছয়-সাত উদরস্থ করে ফেললাম। আমরা দোকানের বাইরে একটু দাঁড়িয়ে, আকাশে অসংখ্য তারার মেলা ও নীচে গঙ্গার গর্জন, উপভোগ করে, খাটিয়ায় ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম। এর কাছে দিল্লীর লালকেল্লার“লাইট অ্যান্ড্ সাউন্ড্” তুচ্ছ মনে হ’ল। আকাশে একসাথে এত তারা আগে কখনও কোথাও দেখেছি বলে মনে হয় না। চারপাশে যে কী অন্ধকার বলে বোঝানো যাবে না। মনে হচ্ছে দরজা জানালা হীন একটা ঘরে, অমাবস্যার রাতে, আলো না জ্বেলে, আমরা শুয়ে আছি। মাধবের মানিব্যাগ, আমার মানিব্যাগ ও বিস্কুটের প্যাকেটটা আমার পিঠের তলায়, তোষকের ওপর রেখে, লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। উচু হয়ে থাকায় শুতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। লেপ-তোষকের সাদা রঙ বোধহয় বাইরের অন্ধকারের কালো রঙকেও হার মানাবে। তেমনি তার সুগন্ধ। ঘুম আসছে না। একটু পরেই নতুন বিপদ এসে হাজির হ’ল। অসংখ্য ছাড়পোকার মতো এক রকম পোকা, সর্বাঙ্গ জ্বালিয়ে দিল। লালাজী আশ্বাস দিয়ে জানালেন, ও কিছু না, পিসু আছে। তাঁর বলার ধরণ দেখে মনে হ’ল বাস্তু সাপের মতো, এগুলো বাস্তু পিসু। এগুলোকে একপ্রকার রক্তচোষা উকুন বলা যায়। হাওড়া-কলকাতায় এ জাতীয় এক প্রকার ছোট্ট, অতি পাতলা পোকাকে, চামউকুন বলতে শুনেছি। এরা লোমকূপে আটকে থেকে রক্ত চুষে খায়। নখ দিয়ে খুঁটেও এদের লোমকূপ থেকে তুলে ফেলা যায় না। লালাজীর মুখে পিসুর কথা শুনে মনে হচ্ছে পাহাড়ী চামউকুনের খপ্পরে পড়েছি। রাতদুপুরে খাটিয়ায় উঠে বসে খস্ খস্ করে সারা শরীর চুলকাতে শুরু করলাম। এর আবার আর একটা অন্য যন্ত্রনাও আছে। গলা, কান, মুখ বা দেহের অন্য কোন অংশের চামড়ার ওপর দিয়ে এরা হেঁটে যাবার সময় একটা অস্বস্তি হয়। হাতের তেলো দিয়ে ঘষে ফেলে দেবার চেষ্টা করলে, এরা হাঁটা বন্ধ করে দেয়। মনে হবে শরীর থেকে পড়ে গেছে বা মরে গেছে। কিন্তু একটু পরেই আবার সেই পুরানো জায়গা থেকেই শরীর ভ্রমন শুরু করে। আমরা যেমন মাংস কেনার সময়, নিজের নিজের পছন্দ মতো খাসীর শরীরের অংশ দিতে বলি, মনে হয় এরাও বোধহয় নিজেদের পছন্দের লোমকূপ খুঁজতে মানুষের শরীরে হেঁটে বেড়ায়। মাধব ও দিলীপ ঘুমিয়ে পড়েছে। হতভাগ্য আমি একা জেগে বসে গা, হাত, পা চুলকে যাচ্ছি। বন্ধুদের দেখে মনে হচ্ছে, ওরা মহানন্দে ঘুমচ্ছে। মনে হয় পিসুদের আমায় বেশী পছন্দ হয়েছে। এইভাবে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, হঠাৎ মনে হ’ল আমার মাথাটা কে যেন কিছু দিয়ে খুব জোরে ঘষে দিল। ধরমর্ করে উঠে বসে দেখি, আমার মাথার কাছের খাটিয়াটায় কখন একজন এসে রাতের আশ্রয় নিয়েছে। তার মাথাটা আমার মাথার সাথে ঘুমের ঘোরে ঐ ভাবে ঘষে গেছে। ঘুম মাথায় উঠলো। নতুন করে আবার গা চুলকাবার পালা শুরু হ’ল। লোকটাকে মনে মনে অভিশাপ দিয়ে ঘুমবার চেষ্টা করলাম। ঘরের ছাদের ফাঁক দিয়ে একটা জ্বলজ্বলে তারাকে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি। ওটা শুকতারা না মঙ্গল গ্রহ ভাবতে বসলাম। মাধব ও দিলীপ ঐ নোংরা লেপই মাথা পর্যন্ত ঢাকা দিয়ে দিব্যি ঘুমচ্ছে। আমার পেটটা আবার কেমন ব্যথা ব্যথা করতে শুরু করলো। একবার বাইরে যেতে পারলে হ’ত। আসবার সময় জায়গাটা ভালভাবে দেখবার সুযোগ হয় নি। টর্চ সঙ্গে থাকলেও, অন্ধকারে একা একা কোথায় যাব ভেবে পেলাম না। একবার ভাবলাম মাধবকে ডাকি, তারপর ওকে আর বিরক্ত না করে চুপচাপ শুয়ে থাকলাম।

ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে, এক কাপ চা পর্যন্ত না খেয়ে, লালাজীকে থাকা খাওয়া বাবদ তেইশ টাকা পঞ্চান্ন পয়সা মিটিয়ে দিয়ে, ব্যাগ নিয়ে তৈরী হয়ে, গঙ্গোত্রীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।

জীবনে বহু ক্ষেত্রে পদে পদে প্রথম দর্শনে বহু মানুষকে দেখে সন্দেহ করে, ভয় পেয়ে, সাবধানতা অবলম্বন করে, বার বার ঠোক্কর খেয়ে, বিবেক দংশনে জর্জরিত হয়ে, এটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি যে, পহেলি দর্শনধারি পিছে গুণবিচারি শুধুই কথার কথা। এর থেকে সেই ছেলেবেলায় পড়া–- “দেখিতে আপেল আর খাইতে মাকাল, সে ফল পাড়িতে যাওয়া শুধুই নাকাল” বোধহয় অনেক বড় সত্য। অসুন্দর হলেও, এইসব মানুষেরা এখনও আছেন বলেই বোধহয়, মাকালে ছেয়ে যাওয়া সমাজে আমরা এখনও টিকে আছি, ভালো আছি, নিরাপদে আছি।

-- -- -- -O- -- -- --

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.