" জানিস ঋষি , আমার বাবা না আবার বিয়ে করছে! "

" কাকে বিয়ে করছে ? "

" ওই তো , লীনা আন্টিকে ! "

" হুম ! " গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল ক্লাস থ্রির ঋষি।

" লীনা আন্টিকে আমার এক্কেবারেই ভালো লাগে না ! সবসময় সেজেগুজে কেমন জোকারের মত হয়ে থাকে। আমাকে দেখলেই চোখ বড় বড় করে বলবে, মন দিয়ে পড়াশোনা করছ তো নিকিতা সোনা ! তোমাকে কিন্তু অনেক বড় হতে হবে। কেন ও এমন বলবে! ও কি আমার মা! আমার মা বলত এমন। কেন যে মা চলে গেল! এই ঋষি, আমার মাটা কেন চলে গেল রে আমায় ছেড়ে ? "

নিকিতার গলায় হাহাকার। ওর প্রিয় বন্ধু ঋষির কাছে এই প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। মায়েরা কেন ছেড়ে চলে যায় , জানে না সে। মা ছেড়ে চলে যাবে ভাবলেই ঋষির ভয় করে। মাকে ছেড়ে থাকা যায় নাকি!

নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড কে সান্ত্বনা দিতে ঋষি বলল ,
" বোধহয় তোর বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে চলে গেছে। আবার ফিরে আসবে , দেখিস! "

" না রে! আর আসবে না। জানি আমি। "

উদাস নিকিতার মনে ভেসে উঠলো প্রতি রাতে মা বাবার তুমুল ঝগড়ার ছবি।তাদের তীব্র চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে যেত নিকিতার।ওদের অর্ধেক কথারই মানে বুঝত না নিকিতা, তবে ভয়ে কুঁকড়ে যেত সে।ওর চোখের জলে বালিশ ভিজে যেত। কিন্তু মা বাবার ঝগড়া তাতে থেমে যেত না। নিকিতার ছোট্ট বুকের কষ্টের খবর কেউ রাখত না।

তারপর একদিন এল সেই ভয়ঙ্কর রাত। এখনও নিকিতার স্পষ্ট মনে আছে।বাবা খুব চিৎকার করে মাকে বলছিল,
" বেরিয়ে যাও এই বাড়ি ছেড়ে ! আমার বাড়িতে কোনো বেশ্যার জায়গা হবে না ! "
" ছোটলোকদের মুখের ভাষাও ছোটই হয়। কত নোংরা মন তোমার , মুখের ভাষাতেই সেটা প্রমাণ হয়। এই বাড়িতে আমারও থাকবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। " মাও পাল্টা চিৎকার করেছিল।

" তা থাকবে কেন? পেয়ারের অরুণের বাড়িতে উঠতে হলে তো এই বাড়ি ছাড়তেই হবে! "

" যাবোই তো অরুণের বাড়িতে , তোমার মত অমানুষের সঙ্গে আর থাকব নাকি ! "
খিক খিক করে হাসল বাবা,

" নিজে বুঝি মহা মানবী ! "

" ঠিক আছে , আর একটাও কথা বলব না আমি। তুমি যা ভাবার ভাবতে পারো। "
" আমি যা ভাবার , ঠিকই ভেবেছি। এক্ষুনি বাড়ি ছেড়ে বেরও তুমি! "

" হ্যাঁ , আমি বেরিয়ে গেলেই তো লীনাকে ঘরে তুলতে তোমার সুবিধে হয়! "

" কি বললি তুই ! এক থাপ্পড়ে তোকে তোর জায়গা দেখিয়ে দেব , বুঝতে পেরেছিস! শয়তান মেয়েছেলে কোথাকার! বেরো আমার বাড়ি ছেড়ে! " মাকে তুই তুই করে কথা বলছিল বাবা।

" এক্ষুনি যাচ্ছি , তবে একা নয়, নিকিতাকে নিয়ে যাবো আমি! "

" খবরদার বলছি , নিকিতা আমার মেয়ে, শুধু আমার মেয়ে! তোর মত নষ্ট মেয়েমানুষের সঙ্গে আমার মেয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। "

তবুও মা দৌড়ে নিকিতার ঘরে ঢুকেছিল , তারপরেই দরজার পাশে ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকা নিকিতাকে কোলে তুলে নিয়ে বলেছিল,

" চল মা! আমরা চলে যাই এই বাড়ি ছেড়ে ! "

বাবা কেড়ে নিয়েছিল নিকিতাকে মায়ের কোল থেকে।
" নিকিতা আমার মেয়ে, ও আমার কাছেই থাকবে। তুই নিকিতাকে পাবি না। "

" আমিও দেখে নেব , নিকিতা কি করে তোমার থাকে! "
বলেই কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেছিল মা। নিকিতা অনেক কেঁদেও মাকে আটকাতে পারে নি।

তারপর কত যে কাণ্ড হল, মা আর বাবার মধ্যে ডিভোর্স নামের একটা দৈত্য ঢুকে পড়লো। আর মা শুধুই দূর থেকে আরও দূরে সরে গেল। নিকিতা বাবার কাছেই রয়ে গেল। আর মাকে দেখতেই পায় না নিকিতা। কোথায় গেল মা নিকিতাকে ছেড়ে !

বাবাকে একবার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেছিল নিকিতা,
" বাবা! মা কবে আসবে? মা আসছে না কেন? "

উত্তরে বাবা বলেছিল,
" তোর মা আর কখনও আসবে না। ভুলে যা মাকে। "

" না, আমি মায়ের কাছে যাবো! ও বাবা, মায়ের কাছে নিয়ে চল আমাকে! "

" বলছি না, তোমার মা চলে গেছে! যাও পড়তে বস গিয়ে ! "

" ও বাবা! মা কোথায় , বল না! মা কোথায় গেছে বাবা! "

" চুপ কর শয়তান মেয়ে! কথায় কথায় শুধু মা , মা মা ! কেন, বাবা বুঝি তোকে ভালোবাসে না ! তোর মা কোথায় গেছে জানি না আমি ! "

বাবার ভয়ে চোখের জল চেপে রেখে পড়ার টেবিলে গিয়ে বসেছিল নিকিতা। বই খুলে বুঝতে পারল , সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সব কিছু ঝাপসা দেখাচ্ছে। মা কোথায় ? মাকে ছাড়া কি করে থাকবে নিকিতা! বাবা ঠিক জানে, মা কোথায় গেছে। তাহলে কেন নিয়ে যাচ্ছে না নিকিতাকে! বাবা কি বুঝতে পারছে না, নিকিতার কত কষ্ট হচ্ছে ! বড়রা কি ছোটদের কষ্ট বুঝতেই পারে না !

পড়ার টেবিলে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদছিল নিকিতা। পাছে কান্না দেখলে বাবা রেগে যায় ! ওর ছোট্ট মনের সমস্ত যন্ত্রণা চোখের জল হয়ে বইয়ের পাতা ভিজিয়ে দিচ্ছিল ।

হঠাত বাবা এসে কোলে তুলে নিল নিকিতাকে।
" আরে ! আমার মামনি কাঁদছে কেন ? বাবা বকেছে বলে কষ্ট হয়েছে ? ওলে ওলে ! তুমি না আমার ছোট্ট রাজকন্যা ! রাজকন্যারা কি কাঁদে ! চলো , তোমাকে আইসক্রিম কিনে দেবো , চকলেটও দেব , আর কাঁদে না সোনা ! "

বাবা জানেই না , বাবা বকেছে বলে নিকিতা কাঁদছে না , নিকিতা কাঁদছে মায়ের জন্য।
" আমার আইসক্রিম চাই না বাবা ! চকলেটও চাই না। তুমি শুধু আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে চলো ! "

সঙ্গে সঙ্গে বাবা নিকিতাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছিল। কঠিন গলায় বলেছিল ,
" মায়ের কাছে আর কখনও যাওয়া হবে না তোমার , বুঝেছ ! "

বা রে ! তা কি করে হয় ! ছোট্ট নিকিতা বুঝতেই পারছিল না , কেন সে মায়ের কাছে যেতে পারবে না।

এতকিছু ভাবতে ভাবতেই নিকিতার দু গাল বেয়ে জল নেমে এলো অঝোর ধারে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো । ছোট্ট ঋষি বুঝতে পারছিল না , এই অবস্থায় ওর কি করা উচিত। প্রিয় বন্ধুকে কাঁদতে দেখে ওর চোখেও নেমে এল কান্না । ছোট্ট দু হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল সে নিকিতাকে।

" কাঁদিস না নিকি ! কাঁদিস না ! আমার মাকেই তুই মা বলে ডাকিস , কেমন ! আর কাঁদিস না ! "

দুটো ছোট্ট শিশুর অসহায় কান্না , একজনের কান্না মাকে হারানোর যন্ত্রণায় , আরেকজনের কান্না বন্ধুকে কি ভাষায় সান্ত্বনা দেবে , সেটা বুঝতে না পারার অসহায়তায় , ওদের কারোর কান্নাতেই বড়দের কঠিন হৃদয়ে কোনো প্রভাব পড়ে না। তাই পৃথিবী যেমন চলছিল , তেমনই চলতে থাকে, নিকিতা মায়ের কাছে যেতে পারে না আর।

আজ স্কুল থেকে ফিরেই নিকিতা দেখল , ড্রইং রুমে লীনা আন্টি বসে আছে। নিকিতাকে দেখেই সে বলল ,
" কেমন আছো নিকি সোনা ! পড়াশোনা কেমন চলছে ? "

একে দেখলেই নিকিতার এমন রাগ ধরে , তাই সে কোনো জবাব না দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলল। কিন্তু তাতেও কি রক্ষা আছে? লীনা আন্টি দুহাত দিয়ে জাপটে ধরল নিকিতাকে,

" কি হল নিকি সোনা ! কথা বলছ না কেন? রাগ হয়েছে? "

নিকিতা যতই ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য, আন্টি ততই জোরে জাপটে ধরে। শেষে আর থাকতে না পেরে নিকিতা চেঁচিয়ে উঠলো ,

" ছাড়ো , ছাড়ো আমাকে ! তুমি পচা , একটুও ভালো নও তুমি ! তোমার জন্যই মা চলে গেছে ! খুব দুষ্টু তুমি !আর আসবে না আমাদের বাড়ি , কখনও আসবে না। "

লীনা আন্টির মুখ বিবর্ণ । সঙ্গে সঙ্গে সে ছেড়ে দিয়েছে নিকিতাকে। নিকিতাও দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেছে। বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে , যখনই সে একটু বড় হয়ে যাবে , তখনি দৌড়ে মায়ের কাছে চলে যাবে । আর বাবাকেও নিয়ে যাবে জোর করে। আবার তারা একসাথে থাকবে ।

" নিকি ! তুমি এত অসভ্য কবে থেকে হলে ! "

বাবার কড়া গলার আওয়াজে ভয়ে ভয়ে উঠে বসলো নিকিতা। ওর ভিজে যাওয়া চোখ দুটো দেখেও বাবার মন এতোটুকুও নরম হল না।

" বল ! এমন অসভ্য ব্যবহার কেন করলে লীনা আন্টির সাথে ! "

নিকিতা চুপ।

" জবাব দাও ! চুপ করে আছ কেন ! লীনা আন্টি তোমাকে কত ভালোবাসে , জানো ! যাও স্যরি বল গিয়ে ! "

" যাবো না , বলব না স্যরি ! " ঘাড় বেঁকিয়ে বলল নিকিতা।

মেয়ের এই আচরণে হতভম্ব বাবা ,
" কি !! এত বড় সাহস তোমার ! মায়ের মতই অসভ্য তৈরি হয়েছ তুমি ! যাবে না মানে , কান ধরে টেনে নিয়ে যাবো আমি । "

ফুঁসে উঠলো নিকিতা ,
" আমি স্যরি বলব না ওই পচা আন্টিকে । ও চলে যাক , চলে যাক ও ! কেন তুমি ওকে বিয়ে করবে! আমিও চলে যাবো মায়ের কাছে ! দাঁড়াও , একটু বড় হতে দাও আমায় ! তারপর বুঝবে মজা ! "

" ওহ ! মায়ের কাছে যাবে ! " বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলে ওর বাবা ।
" তোমার মা বুঝি তোমার জন্য বসে আছে ! তোমার মাও তো অরুণ আঙ্কেলকে বিয়ে করছে ! "

এত বড় সত্যিটা এই ছোট্ট মেয়ের সামনে বলার সময়েও ওর বাবার বুক কাঁপে না এতোটুকুও । মায়ের প্রতি মেয়ের টান কমাতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে বাবা । নিকিতার ভেঙ্গে যাওয়া ছোট্ট হৃদয়ের যন্ত্রণা স্পর্শও করে না ওর বাবাকে।

একটু বড় হয়েই মায়ের কাছে চলে যাবে , এতদিন বয়ে চলা এই স্বপ্ন টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙ্গে পড়তে থাকে নিকিতার চোখের সামনে। মাও আর নিকিতার থাকবে না ! মাও অরুণ আঙ্কেলকে বিয়ে করছে! নিকিতা কার কাছে যাবে তবে ! কে বুঝবে নিকিতার কষ্ট ! আজ থেকেই বুঝি শুরু হল নিকিতার একলা চলার পালা !






bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.