" মা গো শোন্ , কাঁচা আম আর একটা আলু নিবি , সরু সরু করে কাটবি, একশ গ্রাম মৌরলা বেছে ভালো করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে তেল হলুদ নুন মাখিয়ে নিবি। কড়ায় তেল গরম করে মৌরলাগুলো ছেঁকে ভেজে তুলে ঐ তেলেই কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে আলু আম দিয়ে ভালো করে ভেজে হলুদ নুন দিয়ে নেড়ে সামান্য জল দিয়ে সেদ্ধ করবি, মৌরলা মাছভাজাটা দিয়ে তাপটা কমিয়ে রান্না করবি। জল কমে এলে কাঁচালঙ্কা চেরি সরষেবাটা দিয়ে নেড়ে চেড়ে শুকনো করে নামিয়ে নিলেই হয়ে গেল আম মৌরলার চচ্চরি " - পড়ন্ত বিকেল, নির্মলা দেবী উবু হয়ে বসে আউড়ে যাচ্ছেন একটার পর একটা রান্নার পদ, তাঁর মুখোমুখি সুতনুকা খাতায় পরপর লিখে যাচ্ছে।

এক অজ পাড়া গাঁয়ে তখন সন্ধ্যা নামছে। গাঁ জুড়ে শাঁখের পুঁ পুঁ, তুলসী তলায় প্রদীপের আলো... নির্মলা দেবী উঠলেন, শাড়ি ছেড়ে তুলসী তলায় ধূপ দিয়ে অভ্যাস বশেই বোধহয় দরজার কাছে দাঁড়ালেন কিছুক্ষণ। দরজাটা বন্ধ করে খিল দিয়ে আবার বারান্দায় উঠে এলেন যেখানে সুতনুকা আর তিনি বসে গল্প করছিলেন। মেয়েটা এখনো লিখেই যাচ্ছে পদগুলো, নিঃশব্দে দেখতে দেখতে রান্না ঘর থেকে কুরুনী, নারকোল নিয়ে এলেন। নারকোল কুড়তে কুড়তে জিজ্ঞেস করলেন " ও মেয়ে তুই কোথা থেকে আসছিস ? " উত্তর এল " বহু দূর সেই কলকাতা "।

মেয়েটা কাল এসেছে এ গাঁয়ে, বাংলার রান্নার উপর নাকি গবেষণা করছে। গ্রামের আর সবাই তাকে এ বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেছে। নির্মলা দেবী এখানকার ভালো রাঁধিয়ে বলে বিখ্যাত। আজও কারুর বাড়ি জামাই, কুটুম এলে তার কাছে রান্নার পদ জেনে জেনে যায়। নির্মলা দেবী নেহাত মূর্খ নন, ক্লাস টেন অবধি পড়েছিলেন, তারপর সায়নের বাবার সাথে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। চলে আসতে হয় লেখাপড়া ছেড়ে এই সুদূর গ্রামে শ্বশুরের পৈতৃক ভিটেতে। নয় নয় করে হয়ে গেল আঠাশ ত্রিশ বছর। সায়নের বাবা মারা গেল যখন তিনি বছর কুড়ি, সায়ন তিন বছরের। দোকান থেকে ফেরার পথে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলেন আর ওঠেন নি। সারা রাত অপেক্ষা করতে করতে ভোরের দিকে চোখ লেগে গিয়েছিল, হইহই করে গাঁয়ের লোক ও লোকটার ঠান্ডা শরীর উঠোনে নামাল। সায়নকে বুকে জড়িয়ে দিশাহারা হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর সময়ের খাতে অনেক জল গড়ালো। জ্ঞাতিরা দোকান অধিগ্রহণ করল, না খেতে পাওয়ার দশা থেকে বাধ্য হয়ে গ্রাম প্রধানের বাড়ি রান্নার কাজ নেন, ছেলেটাকে মানুষ করতে থাকেন। পড়াশোনা করান, ছেলেটি তাঁর বড় লক্ষী ছিল, কিছু চাইত না, বৃত্তি পেয়ে সেই টাকায় পড়াশোনা করত। একদিন কলকাতা চলে গেল একটা চিঠি দেখিয়ে, বলল অনেক টাকার চাকরী পেয়েছে। মাঝে মাঝে আসত ঘর মেরামত করাত, কারেন্ট আনল, টিউকল বসাল, গ্রীষ্ম কালে এখানে খুব জলের কষ্ট বলে। একবার এসে বেশ কিছু টাকা ফিক্স করে দিল এখানকার পোষ্টাপিসে। বলে গেল " মা , এইটা থেকেই তোমার চলে যাবে, যদি আমি নাও থাকি ! " ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন, তাঁর বাবুসোনা এ কি বলছে ! মোড়া থেকে উঠে এসে ছোটোবেলার মত করেই তাঁকে জড়িয়ে চোখের জল দু হাতের তালুতে মুছে দিয়েছিল। সেবার সায়ন বার বার পিছু ফিরে তাঁকে দেখতে দেখতে কলকাতা রওনা দিয়েছিল।

" ও মা , আপনার হাত ছুলে যাবে, কি ভাবছেন ? " মেয়েটা উঠে এসে তাঁর হাত থেকে নারকোলমালা নিয়ে উপুড় করে রাখল। হাত ধরে সেই বাবুর মতই চোখের জল মুছিয়ে দিল, সেই স্পর্শে তাঁর হু হু করে জমানো কান্নার বাঁধ ভাঙল। সায়নকে তিনি অনেকদিন দেখেন নি, প্রায় পাঁচবছর।

সুতনুকার কথা -

সায়নের সবুজ ডায়েরির পাতায় পাতায় মায়ের বর্ণনা, গ্রামের বর্ণনা খুব আকর্ষণ করেছিল। সায়নের শেষের দিনগুলো মনে পড়লে সে অসহায় ভাবে ছটফট করে। আজ সায়নের মায়ের সামনে বসে যে তার বুকে কি ঝড় উঠেছে তা যদি প্রকাশ করতে পেত, অনেক হালকা লাগত। কিন্তু উপায় নেই, সুতনুকা সায়নকে কথা দিয়েছে যতদিন না তাদের সন্তান এ পৃথিবীতে আসছে ততদিন মা-কে কিছু বলবে না। সুতনুকা তার দিদার কাছে মানুষ, কর্পোরেট মা বাবা বহুদিন আলাদা। ছোটো থেকে দিদার কাছে গল্প শুনত বৃষ্টি ভেজা সোঁদা মাটির গন্ধ মাখা রাখাল ছেলে রাজকন্যাকে প্রাণভরে ভালোবাসা দিতে পারে, রাজকুমার তো যুদ্ধে ব্যস্ত থাকে। ছোট্ট মেয়েটার চোখে ভেসে উঠেছিল বাবার ব্যস্ততা, ফোনে চিৎকার। বোধহয় ঠিক করে নিয়েছিল অমন একটাই খুঁজবে। কলেজস্ট্রিটে বইয়ের দোকানগুলোতে বইয়ের গন্ধ শুঁকে উদ্দেশ্যহীন হয়ে ঘুরজ বেড়ানো অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। সেদিন গ্রিম ভাইদের রুপকথা বইটা নিয়ে পার্কে ঢুকতে গিয়ে এক পাঞ্জাবী পরা ছেলের সাথে ধাক্কা খায়। রাগের বদলে দুজনেই মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে হেসে ফেলে। প্রথমে মুচকি হাসি, শেষে হা হা হাসি। হাত মিলিয়ে ছেলেটা বলেছিল আমি সায়ন, যাদবপুরে পড়ছি মাস কম্যুনিজম নিয়ে, সুতনুকা বলেছিল আমি পড়তে ভালোইবাসিনা তাও পড়তে হয়, সুরেন্দ্রনাথে সোশিওলজি নিয়ে। অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়েছিল, তারপর দুজনে নাম্বার বিনিময় করে এগরোল খেতে খেতে বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। শান্ত শিষ্ট ছেলেটা যখন মায়ের রান্নার গল্প করত কিংবা মায়ের কাছ থেকে ঘুরে এসে নারকোল চিনির পাক খাওয়াতো, বড্ড হিংসে হত।

ভিক্টোরিয়ায় সবুজ ঘাসের উপর বসে গল্পে গল্পে কবে যে সায়নের মাকে মা করে নিয়েছে আজও মনে পড়েনা সঠিক দিন সময় তারিখ। কালীঘাটে শাঁখা পলায় হাত দিয়ে একসাথে একটা স্বপ্নই বোধহয় দেখেছিল, নইলে সেদিন সায়নের আঙুলে হাত লেগে যাওয়ায় শিউরে উঠেছিল কেন ? তারপর সায়ন পড়া শেষ করে ভালো পদে চাকরি পেয়ে গেল। মায়ের কাছে যাওয়ার বায়না ধরেছিল সুতনুকা, থামিয়েছিল সায়ন, বলেছিল " দাঁড়াও মাকে একটু ভালো রাখি " , মাকে দেখার উত্তেজনায় ফুটত, ওদিকে ওর দিদাও বয়সের ভারে অশক্ত হয়ে পড়ছেন শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে , সায়নকে নাতজামাই ডাকার ইচ্ছা প্রবল। ওরাও এক সত্তায় মিলেমিশে যাচ্ছে , শরীরে জোয়ার আসছে এমন সময় সায়ন অসুস্থ হয়ে পড়ল। অবহেলা করে ডাক্তার দেখাচ্ছিল না, এই শেষের দিকে জোর করে সুতনুকা ডাক্তার দেখাতেই লিউকোমিয়া লাস্ট স্টেজ। হাউহাউ করে কেঁদেছিল সেটা, পাগলের মত সায়নকে আলিঙ্গন করছিল, সায়ন ওর মাথা বুকে চেপে সিঁথিতে কপালে আলতো চুম্বনে ওকে সামলাতে চেষ্টা করছিল। একদিন পোষ্টে একটা খাম এল সুতনুকার কাছে, তাতে সায়নের প্রিয় সবুজ ডায়েরি আর দুটো চিঠি। একটা তার নামে অন্যটা অনাগত সন্তানের।


সুতনুকার কথা -
অনাগত সন্তানের চিঠিটা সায়নের হাতে তৈরি খামের মধ্যে , খামটা অদ্ভুত সুন্দর, আকাশ নীল দুই ভাগ, বাকি দুই ভাগ গোলাপী। উপরে লেখা, আমাদের অ্যাঞ্জেলঠিকানা - মায়ের কোল যোগাযোগ - মনেমনে।
সুতনুকার চিঠিটা রোল করে পাকিয়ে একটি মঙ্গলসূত্র জড়ানো ছিল। চটপট চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করেছিল একবুক ভয় নিয়ে -
মনপাখি , চিঠি পেলে এতক্ষণে ? এই শোনো, আমি একটু বেড়াতে চললাম, তুমি যখন আমার খোঁজে আমাদের এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে আসবে আমি ততক্ষণে ধাঁ। তোমাকে বলা হয়নি এই ফ্ল্যাটটা রেন্ট নয়, কিনেছি তোমার আর মায়ের জন্য। এর দলিলটা তোমার প্রিয় কাবার্ডেই পাবে। চিকিৎসা করানোর সুযোগ দিলাম না, যাতে অর্থ ক্ষয় হয়, ছোটোবেলা থেকে আর কিছু না বুঝি অর্থকষ্ট ভালো বুঝেছি।
এই একটা সাজেশন নেবে ?? আগে জলটা মোছো পাগলি, মায়ের কাছে যাও, তোমার পরিচয় দিও না, আদি বাংলার রান্না লিখে শিখে এস, ব্লগ লেখো, তোমার পরিচিতি হবে, হাতখরচার টাকাও। তোমায় তো বহুবার গল্প করেইছি যে মা আমায় বড় করেছেন গ্রামপ্রধানের বাড়ি রান্না করে। জেঠীমা প্রত্যেকদিন একটা দুটো পদ একটা বাটিতে করে মায়ের হাতে তুলে দিতেন। আমরা ঐ দিয়েই খেতাম, বড়ি দিয়ে থোড় ঘন্ট , চাপড় ঘন্ট, ডাল ফেলা। আর কয়েকটা রান্না মা বাড়িতে করত কিন্তু কম , আম মৌরলা চচ্চড়ি, মটর ডাল পোড়া। এত ভালো খেতে যে জিভে লেগে আছে। এই তুমি ওগুলো শিখে নিও প্লিজ, যদি ফিরি কোনোদিন রেঁধে খাইয়ো মনপাখি।
এই লক্ষ্মীটি জল খেয়ে নাও গলা ধরে যাবে, আর লিখব না বুঝলে, পাগলের মত ভাবনা আসছে লিখলে এখন দুটো খেরোর খাতা! তবে জানো আমি এত কথা কোনোদিন বলিনি, তোমার সাথে মাথা ঠুকে আমার বোধহয় মাথার জ্যাম খুলে গেছে, যা গোঁত্তা দিয়েছিলে গ্রিমভাইদের রূপকথা পড়বে বলে, বাপস্!
এই না এবার কাজের কথায় আসি, মাকে তুমি এখনই জানাবে না আমার কথা , আমি জানি রোজ মা সন্ধ্যা দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে আমার জন্য একটুক্ষণ অপেক্ষা করে, এখন মাকে জানালে মা সহ্য করতে পারবে না, যখন অ্যাঞ্জেল জন্মাবে মায়ের কোলে দিয়ে বলবে " মাগো তোমার ছেলে বলে গেছে নাতি/নাতনিটাকে মানুষ করতে " , সব বলে দিও মাকে তখন। উহ দেখ এ পোড়া চোখের জল আমার চোখকেও আক্রমণ করেছে। অ্যাঞ্জেলের চিঠিটা তুমি কিন্তু খুলো না, যতই কৌতুহল হোক, অন্যের চিঠি পড়তে নেই কিন্তু ... আর হ্যাঁ মাকে দিয়ে, ফ্ল্যাটটা কিনে খুব অল্পই হাতে রইল, তোমার নামে এম. আই. এস করে গেলাম।
অনেক ভালোবাসা মনপাখি , আমার দুনিয়া জোড়া দুইটি মানুষে, জানোই ।
ইতি শিং গজানো বাছুর।
হারটা পরে নিয়েছিল সুতনুকা, চিঠি পড়েই দৌড়ে গিয়েছিল সেই ফ্ল্যাটে, তার গন্ধ যেন বন্ধ ঘরের আনাচে কানাচে। হাঁটু গেড়ে বসে নিঃশব্দে কেঁদেছিল প্রাণ ভরে। চোখ মুছে নিয়ে সায়নের কথা রাখতে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করল, তাও চোখের জল বাঁধ মানে না..
এই তিনমাস আগের কথা, এখন সুতনুকা সত্যিই ব্লগ লেখে, আদি বাংলার রান্না সম্পর্কে পড়াশোনা করে, টিউশন পড়ায়, শয্যাশায়ী ঠাকুমাকে কাছে এনে রেখে একজন গভর্নেস রেখেছে। এবার এসেছে সায়নের গ্রামের বাড়িতে। ট্রেনে যখন আসছিল সোনা হলুদ ধানগুলোর মধ্যে দিয়ে সায়ন যেন হাত নাড়ছে মনে হচ্ছিল, খুব ভালো লাগছিল। না, আর সায়নের খোঁজ পায়নি কর্পুরের মত উবে গেছে। আজও মা বাবা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত একদিকে ভালোই হয়েছে , হাজার কৈফিয়ত দিতে হত..
ওর শ্বশুরবাড়িতে ঢুকে মন জুড়িয়ে গিয়েছিল , একেই বলে লক্ষ্মীশ্রী। ঝকঝক তকতকে উঠোন, একতলা দালানবাড়ি, ঠিক মাঝখানে একটা বাঁধানো তুলসীতলা। সঙ্গের লোকগুলো ও খুড়ি, ও খুড়ি করে ডাকতে একজন বেরিয়ে এসেছিলেন হাত মুছতে মুছতে। লোকগুলো বলেছিল এই দিদি রান্না শিখতে এসেছেন, এটাই এখন সুতনুকার পরিচয়ের অঙ্গ। ভারী আপন করে তিনি নেমে এসে ওর হাতদুটো নিজের হাতে নিয়ে দালানে এনে মোড়ায় বসতে দিয়ে গল্প করছিলেন। সন্ধ্যা নামতে ঘর থেকে শাড়ি ছেড়ে তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বেলে দরজার কাছে একটু দাঁড়িয়েছিলেন, সায়নের চিঠির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল, কান্নাগুলো গলার কাছে জট পাকাচ্ছিল, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। অনেক কষ্টে মুছে নিয়েছে।
রান্না গুলো গল্পের ফাঁকে ফাঁকেই লিখছিল সুতনুকা, হঠাৎ নজরে পড়ল উনি একদিকেই নারকোল মালা কুড়েই চলেছেন, হাত থেকে কেড়ে নিতেই ওনার চোখ থেকে জল গড়িয়ে এল গালে, দুহাতে মুছিয়ে দিতেই আকুল হয়ে কেঁদে উঠলেন। কি করে সামলায় সে? নিজেকেই সামলাতে শেখেনি, তাও পৌঢ়াকে বুকের মধ্যে চেপে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, ইচ্ছে করছিল বলেই দেয় ও কে , কিন্তু না সায়নের কথা রাখতেই হবে....
নির্মলা দেবীর কথা -
আজ যে মেয়েটাকে দেখে কেন যে মনটা এত আকুল হচ্ছে বুঝতেই পারছেন না, কি হচ্ছে, তবে কি তিনি বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন ছেলের উপর ভরসা হারাচ্ছেন?? আশেপাশে লোকের কাছে শোনেন অমুক তার বাবা মাকে দেখছে না সেরকম কিছু তাঁর মনে চাপছে না তো ?? না না তেমন কিছু নয় নিশ্চয়ই বাবু নিশ্চয়ই কাজে ব্যস্ত। কুড়ুনি ঝেড়ে, কৌটো থেকে মুড়ি বাড়েন, কালকে ঘি করেছিলেন, তার একটু কাঁকড়ি আছে, নারকোল, চিনি দিয়ে মুড়ি মেখে দুটো জামবাটিতে ভাগ করে দালানে এলেন, মেয়েটা পা ছড়িয়ে তুলসীতলার দিকে তাকিয়ে আছে, এতক্ষণে তাঁর নজরে পড়ল মেয়েটার পেটের উপর। দেখে তো গর্ভবতী বলে মনে হল তাঁর, কিন্তু অপরকে প্রশ্নে বিব্রত করা তাঁর স্বভাব নয়। " মা গো, তোর মুড়ি " - কেন জানি না, এই মেয়েটাকে তুমি বলতে মন করছে না, একদমই ছোটো বোধহয় তাঁর সায়নের থেকেও ছোটো। এমন একটি শান্ত শিষ্ট মেয়ে পেলে সায়নের সাথে বিয়ে দেবেন। নিজের হাতে রান্না করে লোক খাওয়াবেন, খুব সাধ। নাহ্, দাঁড়িয়ে থাকলে হবে না, খেয়ে ভাত রাঁধতে হবে। মেয়েটা মুড়ি মুখে দিয়ে কি তৃপ্তি ভরে খাচ্ছে, তিনিও খেতে বসলেন ওর পাশে। গল্প শুরু হল বাপের বাড়ির গল্প, তাঁর পড়াশোনার গল্প, রান্না শেখার গল্প। কখনো দুজনেই হাসতে হাসতে লুটোচ্ছেন কখনো দুজনেই মলিন হাসছেন। এক সন্ধ্যেতেই মেয়েটা যেন বড় আপন হয়ে উঠছে তাঁর। যখন চলে যাবে মেয়েটা সেই ভেবে এখন থেকেই মন খারাপ করছে তাঁর।
মেয়েটা আজ তাঁকে বেশি রাঁধতে দিল না, চাট্টি শিম ছিল, সর্ষে পোস্ত দিয়ে ঝাল হল, মুসুর ডাল ভাতে পেঁয়াজ লঙ্কা কুঁচি দিয়ে মেখে। দুজনে খেয়ে ঘরে শীতলপাটি পেতে শুয়ে পড়লেন। আহাগো কাদের মেয়ে, স্বামীটাই বা কেমন একলা ছেড়ে দিয়েছে এতটা পথ, কোনো ফোন আসতেও দেখলেন না। বড় আপন করে ফেলছেন মেয়েটাকে, কেমন যেন আত্মিক টান।
সুতনুকার চুপ কথা -
" খুব মা ডাকতে ইচ্ছে করছে জানো শিং ভাঙা বাছুর ? তোমার মায়ের সব আপন করা গুন তোমার মধ্যে ছিল এখন বুঝতে পারছি, এই দেখো আমি কেমন মায়ের পাশের শীতলপাটিতে শুয়ে তোমার সাথে কথা বলছি, তোমার সাথে বড্ড ঝগড়াচ্ছে জাগছে জানলে, কি ক্ষতি হত আগে পরিচয় করালে ? কি মিষ্টি মা তোমার। জানো মুড়ি নারকোল মাখা খেলাম, কি যে খেতে, কাল আবার খাব তোমায় দেখিয়ে দেখিয়ে, তুমি কাঁচকলা ভাতে খেয়ো। এমন মা সবার কেন হয় না বলো তো ?? ও ও বুঝতে পেরেছি আগে কেন পরিচয় করাওনি , তোমার আদর যদি ভাগ করে নিই?? এবাবা তুমি না আমায় ভালোবাসো ? এসব শত্তুরের কর্ম। খুব রেগেছি তোমার উপর, তোমার সাথে কি আর দেখা হবে না গো ??
জানো আজ মা খুব কাঁদছিলেন আমি জানি তোমার কথা ভেবে, তাই বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম, পেটের পুতুলটাও ওর ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরেছিল ওর মত করে। নিজেকে সামলাতে খুব কষ্ট হচ্ছিল তোমার মনপাখির, তুমি কি টের পেয়েছিলে ???
এই আমি শুকতারাকে বলে রাখলাম তোমায় জানাতে আজ ঘুমোই, পাশে মা আছে তো। "

নির্মলা দেবীর চুপকথা - " শুনছ বাবুসোনার বাবা, আজ একটু দেরি হয়ে গেল জানলে! বাড়িতে অতিথি মানুষ এসেছে , একটা ভারী মিষ্টি মেয়ে , আমাদের বাবুর থেকে ছোটোই হবে, কত কথাই জানে। কত গল্প করছিল, অনেক রান্নার গল্প হল জানো, বলল ও নাকি কম্পিউটারে রান্নার ছবি দিয়ে উপকরণ, রান্নার পদ্ধতি এইসব দেয়। আমিও ওকে বললাম আমার রান্নার খুব শখ ছিল, আমার উনি থাকতে অল্প অল্প নতুন নতুন রান্না করতাম, কাগজ দেখে, ও পাড়ার সান্যাল বাড়ির বড়পিসিমার রান্না দেখে দেখে শিখে নিয়ে তোমাদের খাওয়াতাম, তারপর তো তুমি আমাদের জীবন থেকেই নিরুদ্দেশে চলে গেলে, শুরু হল এই রাতে শুয়ে তোমার সাথে গল্প। এই জানো ওই অতিথি মেয়েটা আমার থেকে একটু দূরেই শুয়ে আছে, আমি হাতে মাথা দিয়ে শুয়ে তোমার সাথে গল্প করছি। কাদের এই এত্তটুকুনি মেয়ে ! খুব ইচ্ছে করছে জানো একটু গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিই যেমন তোমাকে, বাবুকে দিতাম, তোমরা বলতে আহ্, তোমার হাত গায়ে পড়লেই ঘুম পায়। কাদের মেয়ে, এই পাটিতে শুতে পারে কিনা জানা হল না, কাল সকালে বাবুর তক্তপোষে ভালো চাদর পেতে দেব। তুমি রাগ মাগ কোরো না, বলতে পারো বাবু এখন কেমন করে ঘুমোয় আমায় ছেড়ে ? শহর থেকে এসে আমাকে জড়িয়ে বলত এই মা মা গন্ধ শুঁকে নিলাম একমাসের জন্য । মাসের পর মাস করে তো পাঁচমাস কেটেই গেল কই বাবু এল না তো, তুমি জানো ওর কথা ?? জানলে আমাকে একটু জানিও তো, বিয়ে টিয়ে করবে তো নাকি ?? নাতি নাতনী কোলে নিয়ে চাঁদমামা দেখাতে দেখাতে কালো টিইইপ দেব!! আরে চোখের জল না, চোখে কি পড়ল পোকা বোধহয় এই দেখো আঁচল পাকিয়ে মুছে নিলাম, হয়েছে হয়েছে হ্যাঁহ, যখন চলে গেলে তখন তো ভাবোনি আজ একদম বুঝতে আসবে না , কি বললে কার বাপের কি?? তুমি আমার বাপ তুললে , আমার না হোক যার বাপ হোক কারুর বাপ মা তোলা উচিৎ নয় এত বয়স হল তাও জানো না, এই শোনো না কাল কথা হবে, মেয়েটা এপাশ ওপাশ করছে একটু হাত বুলিয়ে দিই "
পরিস্থিতি - নির্মলা দেবী উঠলেন, মেয়েটার পাশে বসে দোনামোনা করতে করতেই হাত দিলেন, ও বোধহয় জেগেছিল নইলে এমন চমকে উঠল কেন ? মেয়েটা ও়ঁর হাত চেপে ধরে আস্তে আস্তে উঠে বসল, দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল নির্বাক , যেন অদৃশ্য দেওয়ালের এপার আর ওপার , ও পাশের জানলাটা থেকে আধখানা চাঁদের চেহারাটা সময়কে থামাতে চাইছে। দুজনের মুঠি ঘামছে , মুখ কেন জানি চুপ করে আছে , মন নিরলস কথা বলেই যাচ্ছে একরাশ গোপন কথাদের পাঁচিল টপকে দিতে চাইছে। টিকটিকটিক, নিস্তব্ধ রাতে দেওয়াল ঘড়িটাই যা একা টিকটিকটিক করেই যাচ্ছে। নিজের বালিশটা টানলেন, সুতনুকার বালিশের পাশে পেতে ওকে শোওয়ার জন্য ইঙ্গিত করলেন। বালিশে মাথা দিতেই নির্মলা দেবী গায়ে হাতে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন, একসময় মনে হল বাবু শুয়ে আছে নাকি ? না না। খানিকক্ষণ পর নিঃশ্বাসের শব্দে বুঝলেন ঘুমিয়ে পড়েছে, তিনিও চোখ বুজলেন।
টিউবওয়েলের শব্দে ঘুম ভাঙল সুতনুকার, পাশ ফিরে দেখল উনি কখন উঠে গেছেন, বালিশ শীতলপাটি সব গুছিয়ে রাখা.. আস্তে আস্তে উঠল, অনভ্যস্ত হাতে গোল গোল করে গোটালো একটু বেশ মজাও লাগল, রোলের মত করে ঐ শীতলপাটিটার পাশে দাঁড় করিয়ে নিজের ছেলেমানুষিতেই একটু হাসল, চুল গুটিয়ে ব্যাগ থেকে ব্রাশ টুথপেষ্ট বের করে বাইরে এসে দেখল, নির্মলা দেবী একটা ছোটো ঘটি নিয়ে বাইরের দরজা ঠেলে বেরোতে যাচ্ছেন । একগাল হেসে " এই উঠলে ? তোমাকে কি বলে ডাকি বলতো?? ও মেয়ে কি বলা যায় সারাক্ষণ, দাঁড়াও আসছি একটু " বলে দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে গেলেন। টিউওয়েল টিপে জলে ভিজিয়ে মুখে পুরে উঠোনে নেমে এল সুতনুকা, এই রকম ছোটো সবুজ গাছ বাঁধা ওয়ালকে নাকি বেড়া বলে, সায়ন বলত, ওর কথায় শুধু ছবি ভাসত, হাঁটুর উপর মুখ রেখে শুনলেই মনে হত ওখানেই তো সব দেখছি। আচ্ছা ও প্রফেসর হল না কেন ? খুব ভালো পড়াতে পারত, যাহ্ জিজ্ঞেস করা হল না। দরজার শব্দে পিছু ফিরে দেখল, উনি ফিরে এসেছেন ঘটি নিয়ে, আঁচল চাপা দিয়ে।
মুখ ধুয়ে রান্নাঘরের বাইরের দেওয়ালে হেলান দিয়ে খাতা পেন নিয়ে বসল সুতনুকা, দুধ জ্বাল দিচ্ছেন নির্মলা দেবী, " চা করে দিচ্ছি একটু বস, তোকে তুই বলছি কইটুকুনি মেয়ে তো, তোকে সতু বলব, হ্যাঁ রে ? " সুতনুকা মুখ টিপে হ্যাঁ বলে। সর পড়ছে দেখে দুধের আঁচ কমিয়ে অন্য উনুনে চা বসালেন, টোস্ট বিস্কুট বার করে একটা স্টিলের থালায় চারটে বিস্কুট আর চাট্টি মুড়ি বাড়লেন। চা ছেঁকে দুটো কাপে দিয়ে থালাটা নিয়ে বাইরে আসার আগে ডাবুটা ডুবিয়ে দিলেন " জানিস এমন করলে দুধ উথলে যায় না, উথলে জানিস ভুরভুরি কেটে দুধ ফুলে উঠে উপছে পড়ে " , খাতায় লিখে নেয় সুতনুকা, থালা নিয়ে এসে তার পাশে বসে পড়েন। " আমি সকালে চা মুড়ি খাই, আজ টোস্ট খা পরে বিস্কুট আনব, একা মানুষ তো তাই জোগাড় রাখি না " , হাত নেড়ে বারণ করে সুতনুকা টোস্ট চায়ে ডুবোয়, তুলে ফুঁ দিতে দিতে কামড় দেয়, হাসে, নির্মলা দেবীও মুড়ি মুখে দিয়ে কুড়মুড় করে চিবোয়।
দরজা ঠেলে ঢোকে গ্রামপ্রধানের বউ, আরেকজন লোক সাইকেলে হাঁড়ি বেঁধে জলে হাত ডুবিয়ে। শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ান নির্মলা দেবী " আরে দিদি আসুন, আমি ওবেলাই যেতাম ওকে নিয়ে " , দিদি খুব সাবলীল ভাবেই জুতো ছেড়ে দালানে ওঠেন, সুতনুকা বসে থেকে মুখ উঁচু করে দেখতে থাকে।
নির্মলা দেবী চেয়ার টেনে দিদিকে বসতে বলে চা করতে যান, সুতনুকা সাবলীল ভাবেই ওনার সাথে কথা বলতে থাকে, জমে ওঠে সকালটা, কুমড়ো কেটে বেসন ডুবিয়ে ভেজে মুড়ি দিয়ে সকালের টিফিন সারেন তিনজনে। গল্পে গল্পে সায়নের ছোটোবেলা, কৈশোরবেলা, অল্প যৌবনের কথা উঠতে থাকে, সুতনুকার পক্ষে কান্না সম্বরণ করা মহা বিপদ হয়ে দাঁড়ায়, সায়নের মিষ্টি হাসি ভরা মুখটা যেন মনের গোপন দরজা খুলে বেরিয়ে ছুটে বেড়াতে চাইছে। দাঁতে ঠোঁট কেটে চেপে থাকে সুতনুকা, কান্নাটা আটকাতেই হবে , তাকে সফল স্ত্রী হতেই হবে। বাবার বাড়িতে ছিল এলোমেলো মেয়ে হয়ে, দিদার পাগলী নাতনী হয়ে , রূপকথার বইতে পড়ে স্বপ্ন রাজ্যের রানী হয়ে। তারপর একদিন স্বপ্নের রাখাল ছেলের সাথে মাথা ঠুকে দেখা হল, বন্ধুত্ব হয়ে বান্ধবী , দেখা হতে হতে অধিকার ফলাতে ফলাতে প্রেমিকা, মন শরীর মিশে গেল কয়েক রাত্রি... অস্ফুটে স্বামী স্ত্রী সম্বোধনে, আলিঙ্গনে, উষ্ণ দ্রুত নিঃশ্বাসে।
হঠাৎ কালবৈশাখীর মত বিপর্যয়, সায়ন ওকে তিন রূপে বিকাশিত করতে একলা ছেড়ে দিল। এই যে এখন সে স্ত্রীর ভূমিকা পালন করছে, এরপর পুত্রবধূ ও মা হতে হবে। " সায়ন তুমি আর নিয়তি খুব স্বার্থপর , আমায় একলা করে দিলে কোনোদিন ক্ষমা করবনা তোমাদের" , " ও সতু আয়, রান্না করছি এখানে আয় লিখে নে আজকের পদগুলো , শরীর ঠিক আছে তো?? না থাকলে ঐ ঘরে তক্তোপোষে শুস" , চোখের জল মুছে দেখল গ্রামপ্রধানের স্ত্রী কখন চলে গেছেন টের পায় নি, চোখ বুজে নিজের ভাবনাতেই মগ্ন হয়ে গিয়েছিল। " যাই মা" অজান্তেই প্রিয় সম্বোধনটা মুখ থেকে ছুটে যায়, পেটে হাত বুলিয়ে মোড়া টেনে রান্না ঘরের ভেতর গিয়ে বসে নির্মলা দেবীর সতু।

সময় - সাড়ে চারমাস পর এক সন্ধ্যাস্থান - নার্সিংহোম
এইমাত্র সুতনুকাকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। লেবার পেন শুরু হয়েছে। ওটির বাইরে সুতনুকার সর্বদা ব্যস্ত মা, নির্মলা দেবী, গভর্নেস। ঠাকুমা মারা গেছেন, কিন্তু গভর্নেস দিদিকে ছেড়ে দেয়নি সুতনুকা। সবাই টেনশন করছেন।
সুতনুকা ওটির টেবিলে, কোথায় যেন শুনেছিল এ যন্ত্রণা শরীরে দুশ সাতটি হাড় ভাঙার সমান। উহহ আজ কি ওর শেষ দিন ? ভেতর থেকে কান্নারা বেরিয়ে আসছে, হাঁফিয়ে যাচ্ছে... নার্সরা শান্ত করার চেষ্টা করছে, হঠাৎ তাদের ফাঁক দিয়ে চোখ চলে গেল। ডাক্তারদের সাথে কে ও এগিয়ে আসছে সবুজ কাপড়ে মুখ ঢেকে, চকচকে চোখে দুষ্টু হাসি , শিং গজানো বাছুর না ? নার্সরা দেখল সুতনুকার মুখে আশ্চর্য এক হাসি !
ওটির বাইরে তিনজন মহিলাই কমবেশি টেনশন করছেন। নির্মলা দেবী যেন একটু বেশিই, বার বার ওটির দরজার সামনে যাচ্ছেন আসছেন। এমন সময় একজন নার্স বেরিয়ে এল, হাতে একটা চৌকো কাগজ, " আপনারা পেশেন্টের বাড়ির লোক ?? এই ছবিটা পেশেন্টের জামার তলায় ছিল, এটা রাখুন।" গভর্নেস দিদি ছবিটা হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন, দেখতে লাগলেন, চোখ মুছতে লাগলেন। নির্মলা দেবী পাশে বসে এমনি কৌতুহল বশেই উঁকি দিলেন ছবিতে। এক মুহূর্ত বুঝি সময়টা থমকে গেল !! স্টিলের চেয়ারের ধার দৃঢ় মুষ্টিতে চেপে ধরলেন, কাকে দেখছেন তিনি ?? এ কে ?? গভর্নেস দিদি ছবির দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলে চলেছেন ফটোর গল্প, নির্মলা দেবীর কানে কিছুই ঢুকছে না , তাঁর সায়ন এই ছবিতে সুতনুকার সাথে এক থালায় খেতে খেতে ওর কপালে স্নেহচুম্বন দিচ্ছে । সুতনুকা তাঁর বাবুসোনার বউ ??? এত গোপনতা করল সুতনুকা, তিনি তো আপন করে নিয়েছিলেন তার দাম এই দিল মেয়েটা ?? বড়লোকের মেয়েরা এত ছলা কলা জানে !! আচ্ছা বাবুসোনা কোথায় গেল ?? আজ এখানে তো তার থাকার কথা , তবে কি সে মায়ের মত বউকেও আজ ভুলে গেছে ??
আকাশ পাতাল এক হয়ে যাচ্ছিল তাঁর ভাবনায়, রগ টিপে ধরেছিলেন, সুতনুকার কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছিল, ইচ্ছে করছিল ওকে জিজ্ঞেস করতে সায়ন কোথায়। নির্মলা দেবীর ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠছিল, একবার মনে হচ্ছিল এখান থেকে চলে যাই, আরেকবার মনে হচ্ছে অপেক্ষা করি। হঠাৎ ঠিক করলেন চলে যাবেন, মিথ্যাচার অসহ্য লাগছে, ওটির দিকে মুখ ফিরিয়ে সবে হাঁটা দেবেন, শিশুর কান্নার আওয়াজ। সেই আওয়াজ সুতীব্র ভাবে তাঁর পা মাটির সাথে আটকে দিল। ওটি থেকে নার্স বেরিয়ে জানালেন যমজ পুত্র কন্যা জন্মেছে। মা ও সন্তানেরা পুরোপুরি সুস্থ। কেবিনে একটু পরেই দেওয়া হবে। নার্স আবার ওটিতে ঢুকে গেলেন।
সুতনুকার মা ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, গভর্নেস রাধা কৃষ্ণের মূর্তির কাছে হাত জোড় করে প্রণাম জানাতে থাকলেন। শুধু নির্মলা দেবী চেয়ারে স্থবির।
রাত কাটল।
কেবিনে দেওয়া হয়েছে সুতনুকাকে। নির্মলা দেবী সুতনুকার চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছেন সেই তখন থেকে। সুতনুকা কিছু বলার চেষ্টা করেও পারছে না, ভেবেছিল সন্তানদের নির্মলা দেবীর কোলে দিয়ে বলবে তোমার ছেলের রক্ত বইছে মা, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এত কঠিন পরিস্থিতি কোনোদিন যেন শত্রুরও না আসে....
নির্মলা দেবী মুখ ফিরিয়ে নিলেন, চোখে পড়ল না তাঁর সতু দুর্বল হাতদুটো জড় করে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে, তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে আছে, জল অবিশ্রাম গড়িয়ে পড়ছে। " মা " সুতনুকার ক্লান্ত ডাকে ওর দিকে তাকালেন " মা , ব্লাড ক্যান্সার ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, আজ তুমিও যদি মুখ ঘুরিয়ে থাকো, আমি বড় অসহায়। একবার এটাও ভাবো মা আমার কাছে খুশির ভাঁড়ার অনেক কম তোমার থেকে। তুমি নাতি নাতনী দের কোলে নেবে না মা?? আমি তোমার ছেলের কথাই রাখতে চেষ্টা করেছি, আমার তোমাকে অনেকদিন আগেই মা ডাকার ইচ্ছে ছিল। " নির্মলা দেবী অগ্রাহ্য করে দরজার দিকে এগোতে যান, এই সময় একটা বাচ্ছা কেঁদে ওঠে, ছুটে এসে তাকে সযত্নে বুকে নিয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকেন, সুতনুকার তখন চোখে জল মুখে হাসি।
নির্মলা দেবী সুতনুকার বিছানার পাশেই নাতনী কোলে বসে পড়েন। সুতনুকা হাত বাড়িয়ে তাঁর কনুই চেপে ধরে বলে " চলো না মা আমি আর তুমি মিলে ওদের মানুষ করে তুলি ? " । নির্মলা দেবী জলভরা চোখে তাকিয়ে থাকেন নাতনীর মুখের দিকে। বউমার দিকে তাকিয়ে বলেন " তোর বরের মতই দেখতে হয়েছে না রে ?? " , সুতনুকা শাশুড়ির হাতের তলায় হাত রেখে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। সবার মুখেই নিশ্চিন্তের হাসি ছড়িয়ে যায়।
এই মুহুর্তে সব সুখ নার্সিংহোমের কেবিনে বুঝি জড় হয়েছে।
সমাপ্ত


bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.