শিরিন আজ তিন দিন হল, নতুন একটা চাকরি তে জয়েন করেছে... বেশ কিছু দিন ঘরে বসেছিল। ছেলে কে.জি স্কুল ছেড়ে এখন হাইস্কুলে পড়ছে ক্লাস ফাইব... সরকারি স্কুল, শিরুন ভাবছে সরকারি স্কুল ছেড়ে ভাল প্রাইভেট স্কুলে দেবে... তার জন্যে খরচা অনেক.. তারপর তার টিউশন... একটা চাকরির খুব দরকার ছিল খুব... সেটা পেয়েও গেল, পেপারে এড দেখে, এপ্লাই করে দিয়েছিল..তারপর ইন্টার্ভিউ.. অবশেষে.. এই বই পাবলিশার্স কোম্পানিতে..
অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল... "আমার ভিতর ও বাহিরে..." টোনে ফোন টা বেজে উঠল....
-হ্যালো... কে?
-(কাঁপা,কাঁপা গলায়) ক্যা... কেমন আছো? রিজ? সে, সে কেমন আছে?
- তুমি! এতদিন পর! কি মনে করে! ভুলে গেছো যে আমাদের আর কোন সম্পর্ক নেই? কেন ফোন করেছ! নাম্বার কে দিল?!
- রাজীব দিয়েছে। ও তো তোমাদের ওখানেই চাকরি করে...
- আচ্ছা,আমি ফোন রাখছি। এখন অনেক কাজ বাকি আছে..আমায় বেরোতে হবে...
- হ্যা...
এই হ্যা শোনার আগেই শিরিন ফোনটা,কেটে দিল...
শিরিন তখন ফার্স্ট ইয়ার.. সবুজ কলেজের শেষ বছর.. পড়াশুনায় ভাল.. গ্রামের ছেলে, ইউনিয়নের কালচারাল সেক্রেটারি... ভাষনে দিন বদলের স্বপ্ন... অংকের ছাত্র হলেও রাজনীতেও কি দারুন জ্ঞান.. কথা বললে সবাই হা করে শুনত... সারাটা দিন চায়ের দোকান আর ইউনিয়ন রুমে পড়ে থাকলেও বরাবর ফার্স্ট ক্লাস ই পেত... সব দিক থেকেই আকর্ষণীয়...
ডিপার্টমেন্টাল নবীন বরণ অনুষ্ঠান... নাচ গান আলাপচারীতা...ইত্যাদির পর শুরু হল কিছু মজার খেলা... শিরিনের ভার পড়ে গোলাপ হাতে সিনিয়ার দের কাউকে প্রোপোজ করতে হবে... নিছক ই খেলার ছলে... অনেক ইতস্তত করে... সবুজ কেই দিয়েছিল সে...সে দিন আরও দুই মেয়ে সবুজ কে প্রোপোজ করে.... তা নিয়ে আবার অনেক আড্ডা - মজা - লেগ-পুলিং হয়...
-রাজীবদা,তুমি সবুজ কে আমার কন্ট্যাক্ট নম্বর দিয়েছ?
-হ্যা.. দিয়েছি... ওকে তোর এখানে জয়েনের কথা বলতে ও খুব খুশি হল... ওই চাইল..তাই দিয়ে দিলাম...
-কেমন আছে ও এখন?? বিয়ে করেছে?
-এখনও প্রচুর টিউশন করে। আর একটা স্কুলে পড়ায়... সারাদিন বাইরে বাইরেই থাকে... সকালে বেরোয়.. রাতে ফেরে... তোকে খুব মিস করে,আবার ফিরে আয়না তুই...
- না.. তা আর হয়না... আর.. আমি ওকে ছাড়িনি...
শিরিনের মজার ছলে প্রোপজাল, সবুজ কে কেমন যেন সেদিন দোলা দিয়েছিল... কবে তারা সত্যি সত্যি প্রেমে পড়েছিল বুঝতে পারেনি... তারপর যেমনি হঠাত করে একদিন তারা বিয়ে করে তেমনি হঠাত করেই একদিন বিচ্ছেদ... সুখস্মৃতি সে বিচ্ছেদ আটকাতে পারেনি... শিরিনের বাড়িতে কেউ বিয়েতে রাজি ছিল না...তাই তাদের অমতেই বিয়ে হয়... বেশ ভালই চলছিল... হঠাত একদিন তুমুল ঝামেলা বাধল... অল্পতেই মাথা গরম করে ফেলা সবুজ... সাত পাঁচ না,ভেবেই 'তালাক তালাক তালাক'...আশ পাশের বাড়ির লোকজন কান উঁচিয়ে..আঘাতে লজ্জায় কস্টে, আট বছরের রিজ কে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শশুরবাড়ি ছাড়ে শিরিন... বাপের বাড়িই বা,কোন মুখ নিয়ে যাবে....কিছুই মাথায় আসছিল না সেদিন..
অনেক দিন পর সবুজের গলার আওয়াজ পেয়ে...শিরিনে কেমন যেন লাগছিল আজ, কাজে মন বসছিল না.. সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়..। আর টান? আজ দুবছর পর আবার সব পুরনো কথা বড্ড বেশি মনে পড়ছিল তার... কলেজ দিন... প্রেমে পড়ার পর বাড়িতে মিথ্যে কথা বলে ঘুরতে যাওয়া...বাড়ির অমতে বিয়ের পর তাকে আগলে রাখা... হাসপাতালে রিজ হওয়ার দিন... সারাদিন সবুজের উতকন্ঠা... সব সব...তারপর একদিন কেমন সব পাল্টে গেল... যাই হোক তাকে শক্ত হতে হবে এসব ভাবলে চলবে না.... তাই আবার কাজে মন দেওয়ার চেস্টা করল....
শিরিন বাড়ি ফিরে দেখল, রিজ ফিরে ঘুমাচ্ছে... আজ সারাদিন সে অনেক ভেবেছে... তাই ক্লান্তিও বেশি। ভাবছে একটু ঘুমিয়ে নেবে... ওকে কি একবার ফোন করবে!কথা বলতে আজ আবার ইচ্ছে করছে। না করবে না।কেন করবে!
শেষ দুবছরে কি একবার ও খবর নেওয়ার চেস্টা করেছে ও! সেদিন বেরিয়ে এসে আমি কি করলাম, কোথায় গেলাম।খেতে পারছি কি না, রিজ কে খাওয়াতে পারছি কিনা! বেঁচে আছি কি নেই.. কেমন করে আছি... কিচ্ছু খবর নিয়েছে!! ফোন করবে না সে...এসব ভাবতে ভাবতে ফোন এল...
সেই নাম্বার থেকেই...
-তখন রেখে দিলে..
-হ্যা দিলাম।কি কথা থাকতে পারে এখনও..!
বিয়ে করোনি কেন এখনও?
-তোমার মত কাউকে পাইনি...
-কথা এখনও আগের মতই বল....
-কিন্তু তুমি একদমই আগের মত বলোনা...
-হতে পারে... আগের আর এখনের মধ্যে তো অনেক তফাৎ...
শুনলাম এখনও প্রচুর টিউশন করো.. কি দরকার এত?
- তখন এর জন্যে তোমাকে সময় দিতে পারতাম না... আর এখন সময় কাকে দেব! তাই পড়াই....
রিজ তো ফাইব না? একদিন দেখা করাবে ওর সাথে? ও নিশ্চই আমাকে পছন্দ করেনা একদম...!
-হ্যা ফাইব। এখন কেন ওর কথা জিজ্ঞেস করছ? সেদিনের পর ওকে নিয়ে কি করলাম কোথায় গেলাম একবার ও জানতে চেয়েছো কখনো??
-ভুল করেছি।তাই সাহস হয়নি।
আজ চাইছি বলবে?
-আবার আব্বুর কাছে যাওয়ার মুখ ছিলনা... এক বান্ধবীর কাছে গেলাম.. কদিন এভাবে একজনের বাড়ি থাকা যেত... একটা কে.জি স্কুলে কাজ নিলাম আর একটা বাড়ি ভাড়া... সেখানে বাড়ি মালিকের ছেলে মেয়ে আর আরও কয়েকজন কে পড়িয়ে কিছু টাকা পেতাম... সেই সব দিয়ে রিজ এর পড়াশুনা টা চলছে... জানো এখন আর আমার কান্না পায়না... প্রথম প্রথম পেত... একা মেয়ে...
তারপর এই... তা এতদিন পর মনে পড়ল কেন?
- রোজ ই পড়ে। সেদিন কেন এত রাগ হয়ে গেছিল বুঝিনি। তুমিই বা কেন চলে গেছিলে! আমি কি মনে মনে তোমায় বলেছিলাম চলে যেতে! ভেবেছিলাম তুমি চলে আসবে.. রোজ ই ভেবেছি তারপর থেকে... আজও ভাবি... তুমি তো জানতে এরকম তিন তালাকে আমি বিশ্বাস করিনা... ও তো এমনি ই বলা.. ওই মুহুর্তে তোমাকে কস্ট দিতে...রাগের মাথায়...
আবার এক হওয়া যায়না শিরিন?
শিরিন সবুজ হয়ত কখনোই আলাদা হয়নি... ধর্মিয় জাঁতাকল, অদ্ভুতুড়ে ইললজিক্যাল সেপারেসন এর নিয়ম, আর নিজের ঘরের বাইরে মুখ দেখানোর লজ্জা, তাদের আলাদা যায়গায় রেখেছে.. আবার এই আলাদা হওয়াটাই সাইলেন্ট শিরিন কে অনেক লড়াকু করেছে... নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখিয়েছে,স্বনির্ভর করেছে... একাই রিজ এর সব দায়িত্ব পালন করেছে.. করছে...
-শিরিন ফোন টা কেটে দিল। হ্যা,না কি বলবে জানেনা... রিজ ততক্ষণে ঘুম থেকে উঠে বসেছে....
-মা... কে ফোন করেছিল?? আব্বু?...
-হুমম... তারপর খানিকক্ষণ দু'জনই চুপ করে বসে রইল...

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.