ছাদের ধারে বসে গঙ্গার বুকে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে পবিত্র বলল -"অরূপটা এখনো এলো না। কতদিন পর এমন একটা আড্ডা দিতে এলাম, ওর যে কি এতো কাজ!!"

আমি আবার অরূপের ফোনে ফোন করলাম, নট রিচেবেল। গঙ্গার বুকে ভাসমান নৌকা গুলোর দিকে তাকিয়ে বললাম -" হয়তো ও রওনা দিয়েছে, তাই ফোন লাগছে না।"


আমি চাকরী সূত্রে পুনেতে থাকি। পবিত্র ছিল নেভিতে, আর আলম কলকাতা পুলিশের সার্জেন। অরূপের বারাসতে পৈতৃক ব‍্যবসা। বহুদিন পর কলকাতা এসে সবার সাথে যোগাযোগ করে একটা দিন সবাই একসাথে কাটাবো ঠিক করেছিলাম। আলম বলেছিল যে রবিবার সবাই মিলে ডায়মন্ড হারবারে গেলে হয়। ওদের একটা বাড়ি ছিল গঙ্গার ধারেই, কলেজ লাইফেও বহুবার গেছি ঐ বাড়ি। সেভাবেই প্ল্যান হল। কিন্তু শনিবার রাত্রে অরূপ জানালো ওর একটা কাজ পরে গেছে। ওর যেতে দেরি হবে। আমরা দুপুরেই পৌঁছে গেছিলাম। আলমদের বাড়ি যে দেখাশোনা করে হামিদ চাচা, তাকে খবর দেওয়াই ছিল। টাটকা ইলিশ দিয়ে দুপুরে জমিয়ে খেয়ে আমরা ছাদে এসে বসেছিলাম আড্ডা দিতে।

পবিত্র ওর বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলছিল। সমুদ্রে অনেক সময় ওরা অনেক অলৌকিক ঘটনার মুখোমুখি হয়, এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল।

আমি কোনোদিন এসব বিশ্বাস করি না। পুনের শনি-বারবারায় পূর্ণিমার রাত একা কাটিয়েছি,রাজস্থানের ভাণগড় ফোর্ট দু বন্ধু মিলে কেয়ারটেকার কে হাত করে রাতের বেলা ঘুরে এসেছি। এমন আরও কয়েকটা বিখ্যাত ভৌতিক জায়গা ঘোরার অভিজ্ঞতা আমার ঝুলিতে ছিল। এসব জায়গায় রাতের বেলা থাকলে মনের উপর চাপ পড়ে। তার থেকেই অনেকে অনেক কিছু কল্পনা করে নেয় । দীর্ঘ দিন জলে থাকতে থাকতে পবিত্রদের মনের ওপর যে চাপ পড়ে তার থেকেই ওরা ও সব দেখে এই ছিল আমার মত।

আলম অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল-" বহুবার নাইট ডিউটি থেকে ফেরার পথে আমিও এমন অনেক কিছুই দেখেছি। একবার বাইক নিয়ে ভিআইপি রোড ধরে যাচ্ছি, রাত দুটো, তেঘরিয়ার কাছে হঠাৎ দেখি সামনে একটা বাস উল্টে পড়ে রয়েছে। কত লোক চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে। কেউ কেউ কাৎরাচ্ছে, রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কারো হাত নেই। কোথাও কাটা পা ঝুলছে দরজার পাশে। এমন বীভৎস দুর্ঘটনা জীবনে দেখি নি। বাইক থামিয়ে ফোন করলাম অফিসে। ফোন রেখে পিছন ফিরে দেখি কোথায় কি!! ফাঁকা রাস্তা!! দুর্ঘটনার চিহ্ন নেই। চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। পেট্রল কার চলে এসেছে ততক্ষণে। সব শুনে এক বৃদ্ধ কনস্টেবল বলল যে বহু বছর আগে এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল। মাঝে মধ্যে অনেকেই এমন দেখেছে এর আগেও।"


আমি বললাম -" সেদিন তুই কয় পেগ টেনেছিলি আগে বল! আসলে দুর্ঘটনা তোরা প্রায় রোজ দেখিস। অতো রাতে ফিরিস যখন ঘুম পেয়ে যায় হয়তো। সব মিলিয়ে এসব দেখিস তখন।"


-"একবার নয় রে। " আলম আবার বলে -" এই ভিআইপিতেই দমদমপার্কের কাছে একটা মেয়ে রাত একটায় আমার কাছে লিফট চেয়েছিল। লেক টাউন ফুট ব্রিজের কাছে নাকি ওর বাইক খারাপ হয়ে গেছে। আমি বাধ্য হয়ে ওকে বসতে বললাম। বাগুইহাটির পর হঠাৎ মনে হল গাড়িটা হাল্কা লাগছে। দেখি মেয়েটা নেই!!"

আমি জোড়ে হেসে ফেললাম। বললাম -"মদ খাওয়াটা কমা এবার। নাহলে তুই নিজেই এমনি হাওয়া হয়ে যাবি।"


নীচ থেকে চিকেন পকোরার গন্ধ ভেসে আসছিল। একটু পরেই চাচা গরম পকোরা বোতল গ্লাস সব সাজিয়ে দিয়ে বলে গেল সে একটু বাজারে যাচ্ছে চিংড়ির খোঁজে। বহুদিন পর এমন সুন্দর প্রকৃতির মাঝে এভাবে খোলামেলা আড্ডা দিচ্ছি। একটা কালো বেড়াল কোথা থেকে ছাদের কার্নিশে এসে বসল। স্ট্রিট লাইট গুলোও হঠাৎ দপদপ করে নিভে গেল। হাওয়াটাও থমকে গেছে, একটা গুমোট ভাব। আমি বললাম -"এবার পরিবেশ আমাদের অনুকূলে। লোডশেডিং, কালো বেড়ালের আগমন, এখন যদি কোথাও একটা শব্দ হয় জমে ক্ষীর।"

আমার কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ছাতের দরজা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে দুলে উঠলো। সবাই চমকে তাকিয়েছি। হাওয়া তো বন্ধ, আর এতক্ষণ হাওয়াতেও দরজাটা দোলে নি!! আমিই উঠে গেলাম। অরূপ উঠে এলো ছাদে। একটা মেঘ এসে চাঁদটাকেও আড়াল করেছে হঠাৎ। আলো আধারিতে অরূপকে একটা আবছায়া মত লাগছে।

পবিত্র বলল -"ভয় পাইয়ে দিয়েছিলি মাইরি। এতো দেরি করে এলি কেনো ?"

-"আর বলিস না, সেই বিকেল তিনটায় রওনা দিয়ে এই এলাম । যা তা রাস্তা।" অরূপ বলল।

-"তোর গাড়ি কই, ঢুকতে দেখলাম না তো?" আলম জিজ্ঞেস করল।

-"এই একটু ব্রেকের সমস্যা, ঐ সামনেই একটা গ্যারেজে দিয়ে হেঁটে এলাম। " অরূপ উত্তর দিল।

আবার জমিয়ে আড্ডা শুরু হল। অরূপের আবার বরাবর ভুতের ভয়। ও বলল -"এসব ছেড়ে ভাল গল্প কর কিছু। এতদিন পর সবার সাথে দেখা। "

-"তুই তোর খবর বল। ভালই তো বাবার ব‍্যবসা চালাচ্ছিস শুনলাম। " আমি বললাম।

অরূপ একটা চিকেন পকোরা তুলে বলল -"ঐ চলে যাচ্ছে একরকম।"

আলম নিচ থেকে আরেকটা গ্লাস নিয়ে এলো। বলল -"সদর তো বন্ধ, অরূপ এলি কি করে ছাদে?"

-" আমি রান্না ঘরের পাশ দিয়ে ঢুকলাম তো। চাচার সাথে গেটের কাছে দেখা হয়েছিল সেই বলে দিল।"অরূপ নিজের গ্লাস ভরতে ভরতে বলল।

কয়েকটা বাদুর ডানা ঝটাপটিয়ে উড়ে গেল। মেঘটা ধীরে ধীরে ঘন হচ্ছে। আবার বাতাস বইতে শুরু করেছে। গঙ্গায় ছোট ছোট ঢেউ উঠেছে। ছলাৎ ছলাৎ করে জল আলমদের ঘাটের কাছে আছড়ে পরছে। জোয়ার আসছে মনে হল।

একটু পরেই রান্না ঘর থেকে চিংড়ি ভাজার গন্ধ ভেসে এলো। বুঝলাম আজ রাতের খাওয়া টাও জম্পেশ হবে।

পবিত্র বলল -"আমরা না হয় বাইরে থাকি। তোদের সাথে যোগাযোগ কম হয়।অরূপ তোর সাথে আলমের যোগাযোগ নেই কেনো রে?"

অরূপ চুপ। আলম বলল -"বাদ দে ও সব। তোরা কে কবে বিয়ে করছিস বল ?"

-"এবার মেয়ে ফাইনাল হয়েছে। ছমাস পর বিয়ে, সবাই আসবি কিন্তু।" আমি বললাম।

-"আমার আর এ জন্মে হল না রে । " পবিত্রর গলায় দীর্ঘ শ্বাস।

-"অরূপ কবে করছিস?"আলম বলে উঠল।

-"দেখি, একটু গুছিয়ে নি সব।" অরূপের গলাটা কেমন ফ‍্যাঁসফ‍্যাসে শোনালো।

-"এই মেয়েটা ভাল রে। এটাকে ছাড়িস না ।" আলম বলে উঠলো।

আমি বললাম -"কোন মেয়ে? তুই চিনিস নাকি আলম? আমাদেরও বল , শুনি !!"

অরূপ একটা রূমাল দিয়ে মুখ মুছে বলল -"করলে জানাবো।"


রাত্রের খাবার ছাদে বসেই খেলাম সবাই। আবার গল্প জমে উঠেছে। হঠাৎ মনে হল একটা মেয়ের হাসির শব্দ। আমি চমকে উঠে ঘড়িতে দেখি রাত দুটো। আবার হাসি, সাথে চুরির আওয়াজ!! এবার মনে হল এই বাড়িতেই।

অরূপ কেমন হতভম্ব।


পবিত্র বলল -" কুহু এসেছে নাকি ? " আলম মাথা নাড়ল। অরূপ দেখি ছিটকে উঠে দাঁড়িয়েছে। আমি বললাম -"কুহু !! পলাশের বোন ? ও কোথা থেকে এতো রাতে আসবে!!"

আমার কথা শেষ হতেই অরূপ বলল -" একটা কাজ আছে রে। আমায় যেতে হবে আজ।"

ও দ্রুত দরজার দিকে এগোতেই দেখি সাদা চুড়িদার পরা বেশ সুন্দর একটা মেয়ে দরজার কাছে। মেয়েটাকে দেখে অরূপ চমকে উঠল। ওর মুখের সব রক্ত কে যেন শুষে নিয়েছে। আলম বলল -" আয় কুহু। তোর অপেক্ষাতেই ছিলাম। আসতে অসুবিধা হয় নি তো?"

কুহু কিছু বলার আগেই অরূপ ছাদের ঘোরনো সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেলো। হঠাৎ একটা তীব্র চিৎকার। আমরা দৌড়ে গিয়ে ঝুঁকে দেখি দোতলার পর আর সিঁড়ির অস্তিত্ব নেই। রক্তাক্ত অরূপ এর দেহ বাঁধানো চাতালে পড়ে দুবার কেঁপে স্থির হয়ে গেল। চারজনের গলার পৈচাশিক হাসিতে চরাচর কেঁপে গেল। আলম বলল -"আজ তোর রাখী বাঁধার ঋণ শোধ হল কুহু। যে দিন তোর আত্মহত‍্যার খবর শুনেছিলাম খুব জোড়ে বাইক নিয়ে ছুটেছিলাম ভি আইপি দিয়ে। পৌঁছনোর আগেই সব শেষ। গাড়িটা পিষে দিয়েছিল রে। "

-" আমি তো জাহাজ দুর্ঘটনার পর ওপারে গিয়ে জানতে পেরেছিলাম সব। খুব বাজে করেছিল অরূপ তোর সাথে।" পবিত্রর গলায় হতাশা।

-"আলমের খবরটা শুনেছিলাম পঞ্চগনি থেকে ফেরার পথে ফোনে। গাড়িটা কন্ট্রোল হারিয়ে খাদে পড়ে গেছিল। তিন ঘণ্টা কষ্ট পেয়েছিলাম জানিস। যদি কেউ উদ্ধার করতো বেঁচেই যেতাম। বিয়েটা ঠিক হয়ে গেছিল। মেয়েটা খুব ভাল ছিল ,সরল, মিশুকে। ফোনে কথা হত। আমার বাবা মা ওকেই অপয়া বলেছিল ভাবলে খারাপ লাগে।" আমি বললাম।

-"তোমরা তিনজন আজ আমার জন্য যা করলে, বেঁচে থেকে আমার দাদাও করে নি গো ‌" কুহুর চোখে জল।

হামিদ চাচা ছাদে উঠে এসেছে। বলল -"ওটা কি পড়েই থাকবে অভাবে। নাকি গোড় দেবো। "

-"থাক না, আর খাটতে হবে না । কষ্ট পাক একটু। খানিক পরে তো আমাদের দলেই নাম লেখাবে।"

পাঁচ জন একসাথেই হেসে উঠলাম। মেঘটা কেটে আবার চাঁদ উঠছে ধীরে ধীরে। পূবদিক পরিষ্কার হবে একটু পরেই। এবার ফিরতে হবে নিজেদের দুনিয়ায়।


সমাপ্ত

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.