শক


শখ থাকা আর শৌখিন হওয়া এক নয়।শৌখিনতা একটা দেখনদারি অ্যাফেয়ার। আর শখ পালন একটা নেশা,একটা তাড়না।একটা দুটো উদাহরণ দিলে মোটের ওপর পরিষ্কার হয় ব্যাপারটা, হয়তো।

ধরুন সেকালের দর্জিপাড়ার সামন্ত পরিবারের সেজো তরফের ন' কত্তা বড় শৌখিন ছিলেন।জাহাজ ভর্তি করে তাঁদের পাটের বস্তা রপ্তানী হতো। রূপোর টাকা গাদাগাদি সিন্দুকে।পরিবারের প্রায় সব পুরুষরা কমবেশী নেশাশক্ত।পন্চ 'ম' কারের উপাসনায় কেউ কারো চেয়ে কম যান না।তবে ন' কত্তা এর মধ্যে সব থেকে আলাদা।অন্যরা যখন ল্যান্ডো বা ফিটন চড়ে বাঈজি বাড়ী যান ইনি মহীশুরের মসনদ হীন নবাবের ডিসপোস করা তান্জাম্ খরিদ করেন দশহাজার চাঁদি তে।সেই তান্জাম্ বহে নিয়ে যাবার জন্য চারজন খোজা অবশ্য গরুখোঁজা করেও পান নি।অন্যরা রামবাগানে নাচ দেখেন কমলি,মেহেরজান,জুগনি র। ন' কত্তা ওরিয়েন্টাল হোটেলে মিস্ চ্যাং এর 'পৈটিক নাচ 'উপভোগ করেন।

ওঁয়াদের ইস্তিরি রা গা ভরতি গয়না পরে রূপোর পানের বাটা সাজিয়ে দুকুর বেলা ছাদে গিয়ে পি.এন্.পি.সি.করেন।এনার টি তখন তার মোটকা ও নাদা পেট সম্বলিত দেহখানিতে একটি ভিক্টোরিয়ান গাউন পরে মাথায় ঝুটো কোহিনুর মুকুট এঁটে গোমড়া মুখে সিংহাসনে বসেন আর ন' কত্তা একতাড়া কবিতার খাতা নিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে ইংলন্ডেশ্বরীর রূপ ও রাজশাসনের ফলাও প্রশস্তি তাঁর নিজস্ব অবোধ্য ইংরাজীতে বলে যান।গিন্নীকে বলা থাকে মাঝেমধ্যে দু একটি গোলাপ ফুল ছুঁড়ে দিতে।ন'কত্তার দৃঢ় বিশ্বাস একদিন এমন ভাবেই রাণী ফুল ছুঁড়বেন নিদারুণ কবিতা রচনার জন্য।

আর সবাই পশু পাখি পোষেন।টিয়া,পায়রা,বিড়াল অথবা কুকুর।ন' কত্তা এক কদম এগিয়ে..উনি পুষলেন ক'টি গিরগিটি!!

মদ তো সবাই ই খায়।কেউ ফরাসি ওয়াইন,কেউ স্কটিশ মদিরা।কাট গ্লাস,রূপার টাম্বলার আর সোনার গবলেটে।ন' কত্তার পানপাত্র হোল তিব্বতি সন্ন্যাসী র দেওয়া একটি ইয়তির করোটি। তো এই সব গেলো শৌখিনতার কথা।

এবার কিছু শখের কথা বলা যাক।অনেক মানুষ তাদের শখ পুরণের জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতেও পিছ পা হন না।একজন কে চিনি যে কিনা তাস সংগ্রহ করে।তাসের পুরো প্যাকেটের ওপর তার আগ্রহ নেই,বাহান্নটি তাসের একটিকে তুলে নিয়ে পুরো পাটি কে ফোকলা করে দেয়।পৃথিবীর কতো দেশের কতো ধরনের সংগ্রহ যে তার আছে সে দেখে তাক্ লেগে যায়!

সুধীর কাকা কোনোদিন এক চামচ মদ খান নি কিন্তু তাঁর কাছে আছে পৃথিবী বিখ্যাত সব মদের বোতলের কালেকশন।হ্যাঁ, শুধুই শূণ্য বোতলের সারি।

একটি কমবয়সী মেয়ে কে চিনি যার দুর্বার আকর্ষণ স্টিলের টিফিন বক্সের প্রতি।মধ্যমগ্রাম থেকে বারুইপুর উত্তরপাড়া থেকে খড়দা এমন কোনো স্টিলের বাসনের দোকান নেই যেখানে সে হানা দেয় না।পুণে আর চেন্নাই বেড়াতে গিয়েও ব্যাগ বোঝাই টিফিন বক্স নিয়ে ফেরে সে।

আমার দূর সম্পর্কের মামা, পন্ডিত মানুষ।বিদেশে অধ্যাপনা করেছেন অনেক বছর।তার আশ্চর্য মেধার গল্প শুনেছি আত্মীয়দের কাছে।এতো লেখাপড়ার করার জন্যই বোধহয় তাঁর মাথা ভরা টাক।একগাছি চুল ও নেই।কোন অজ্ঞাত কারণে তিনি জমিয়ে চলেছেন না না কায়দার,নানা কিসিমের চিরুণী!!!

সবশেষে বলি আমার দাদু, আমার বাবা আর কাকার কথা। আমার দাদুর সংগ্রহে ছিলো প্রায় পাঁচশোটি কলম। খাগের কলম ময়ূর পাখার কলম চন্দন কাঠের হাতলওয়ালা কলম থেকে শুরু করে বিশ্বের সমস্ত বিখ্যাত কোম্পানীর পেন।বাবা ও কাকা এই সংগ্রহকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।তাঁরা সবাই আজ চলে গেছেন,আমি তাঁদের রেখে যাওয়া সেই বিপুল সম্ভার আগলে বসে আছি।


-------**-------

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.