অহম্



বাড়ী ফিরে চন্দ্রাবলী কোনদিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি দিয়ে নিজের বেডরুমে গিয়ে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণ একা থাকতে চায় সে। ফুলস্পীডে ফ্যান অন করে পার্স বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে ধপ করে সোফায় বসে পড়লো সে। গলা শুখিয়ে কাঠ। সাইড টেবিলে রাখা জাগ থেকে গ্লাসে জল ঢেলে ঢকঢক করে একনিশ্বাসে খেয়ে ফেললো। নভেম্বরের মাঝামাঝি। আবহাওয়ায় হাল্কা শীতের আমেজ। ফ্যান চালানোর আর দরকারই পড়ছে না। এমন সময় চন্দ্রাবলীর এহেন আচরন একটু অবাক করার মত। কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে লজ্জায় অপমানে। চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। মনে হচ্ছে চোখ তুললেই সামনে পাবে শুভঙ্কর দেবনাথকে।

চন্দ্রাবলী সোম। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। এখন ব্যাঙ্গালোরে এক নামী আই টি কোম্পানীতে চাকরী করে। বয়স বছর ঊনত্রিশ হবে। স্মার্ট এবং সুন্দরী। তাদের বাড়ী ইন্দোরে।দুই বোন তারা। বড় দিদির বিয়ে হয়ে গেছে, সে নিজের হ্যাসব্যান্ডের সাথে সিডনিতে সেটল্ড। ছোটমেয়ে চন্দ্রাবলী মা বাবার একটু বেশীই আদুরে। মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে চাকরীতে জয়েন করলে মা বাবা ব্যস্ত হলেন বিয়ের জন্য। দিদিও কয়েকটি ভালো পাত্রের সন্ধান পাঠালো। কিন্তু চন্দ্রাবলীর কাউকেই পছন্দ হয় না। নিজের সম্বন্ধে তার ওভার এস্টিমেটের জন্য সবাইকেই সে তুচ্ছ করে ফেলে। একদিন তার টেবিলে একগোছা ফটো ফেলে মা বলেন, " দেখ দেখি, এর মধ্যে কাউকে পছন্দ হয়?" এক এক করে তাসের পাতার মত সাজিয়ে দেখতে দেখতে ঠোঁট ওল্টায় চন্দ্রাবলী। হঠাৎ একটি ফটোতে তার চোখ আটকে যায়। ফটোটা হাতে তুলে দেখতে থাকে। তার চোখে প্রশ্রয়ের ছায়া দেখে মা এগিয়ে আসেন ছেলেটির বায়োডাটা নিয়ে, মুম্বাই তে এক নামী কোপানীতে ভালো পদে প্রতিষ্ঠিত। মন্দ নয়, এগোনো যেতে পারে, চন্দ্রাবলীর ঠোঁটে মৃদু হাসির ছোঁয়া। মিসেস সোম আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটে গেলেন স্বামীর কাছে। পাত্রের মা বাবা থাকেন কোলকাতায়। তড়িঘড়ি যোগাযোগ করে দেখাশোনার ব্যবস্থা করা হলো। ছেলেকে সাথে নিয়ে তাঁরা মেয়ে দেখতে হাজির হলেন ইন্দোর। চন্দ্রাবলী তখন ইন্দোরেই থাকে। দুইপক্ষেরই সবকিছু পছন্দ। পাত্রের নাম রবিন। রবিন মা বাবার অনুমতি নিয়ে বিয়ের আগে দুজনে দুজনকে ভালো করে জানার জন্য একটু সময় চাইলো। কোন তরফ থেকেই এতে আপত্তি নেই।

এরপর ফোনের মারফৎ দু'জনের যোগাযোগ বাড়লো। কখনো বা রবিন ইন্দোরে এসে কিছু সময় কাটিয়ে যায়। প্রথমে উচ্ছ্বাস দেখালেও চন্দ্রাবলী ধীরেধীরে পিছিয়ে যেতে লাগলো। তার মনে হতে লাগলো রবিন মোটেও তার উপযুক্ত নয়। রবিনের অকুন্ঠ ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে সে একদিন অপমান করে তাকে ফিরিয়ে দিল। শান্ত সৌম্য রবিন আহত আর অপমানিত হয়ে ফিরে গেল। চন্দ্রাবলীর মা বাবা রবিনের আচরনে খুব ভালোবেসে ফেলেছিলেন তাকে। তাঁরা ভীষণ কষ্ট পেলেন। কিন্তু আদরের জেদী আর অহংকারী মেয়েকে কিছুই বলতে পারলেন না।

ব্যাঙ্গালোরের কোম্পানীতে জয়েন করে চন্দ্রাবলী সেখানে শিফট করলো। মা বাবাকেও সাথে নিয়ে গেল। তাঁরা মনে মনে মেয়ের এই ধরনের আচরণে অত্যন্ত কষ্ট পেয়ে আর কখনও মেয়েকে বিয়ের কথা বলবেন না ঠিক করলেন। তার ইচ্ছে হলে নিজেই পছন্দ করে করুক...এই মানসিকতা নিয়ে চুপচাপ থাকলেন।

ব্যাঙ্গালোরের কোম্পানীতে জয়েন করার মাস ছয়েক পর চন্দ্রাবলীর ইমিডিয়েট বসের ট্রান্সফার হয়ে গেল। নতুন বস এলেন। নাম শুভঙ্কর দেবনাথ। ভদ্রলোক প্রায় মধ্যবয়সী, সুপুরুষ এবং আকর্ষক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল সব কাজেই তিনি চন্দ্রাবলীকে কাজে সাহায়্যের জন্য নিজের কেবিনে ডেকে নেন। যে কোন প্রজেক্টের ব্যাপারে চন্দ্রাবলীর প্রজেক্ট ফার্স্ট প্রেফারেন্স পায়। ক্রমশ চন্দ্রাবলী বসের প্রতি আকর্ষিত হতে থাকে। বসের আচরণ তাকে এ ব্যাপারে প্রশ্রয় দেয়।

সেদিন সকালে উঠেই মিস্টি নরম রোদ্দুর দেখে চন্দ্রাবলীর মন খুশীতে ভরে উঠলো। সে আজ একটু বিশেষ সাজপোষাকে তৈরী হয়ে অফিস রওনা হলো। অফিসে গিয়ে বসের আসার অপেক্ষায় সময় যেন আর কাটে না। যথাসময়ে মিস্টার শুভঙ্কর দেবনাথ তাঁর আকর্ষক ব্যক্তিত্ব নিয়ে অফিসে হাজির হলেন। নিজের কেবিনে গিয়ে আধাঘণ্টা পর এক বিশেষ প্রজেক্টের ব্যাপারে আলোচনার জন্য চন্দ্রাবলীকে কেবিনে ডেকে পাঠালেন। চন্দ্রাবলী উচ্ছ্বসিত আনন্দ নিয়ে কেবিনে ঢুকলো। তার দিকে এক নজর তাকিয়ে বস বললেন," কি ব্যাপার মিস সোম, আজ কি কোন বিশেষ দিন? খুব সুন্দর লাগছেন। " চন্দ্রাবলী লাজুক চোখ তুলে বসের দিকে তাকালো। মনের থেকে সব সংকোচ দূর করে তাঁকে বিয়ের জন্য অ্যাপ্রোচ করে বসলো। শুভঙ্কর দেবনাথ ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে বললেন, " মিস সোম, একজন সহকর্মী হিসেবে আপনাকে আমি খুবই পছন্দ করি। আপনার নীট অ্যান্ড ক্লীন কাজের আমি ভক্ত। যদিও আমি এখনও বিয়ে করি নি, তাও জীবনসঙ্গিনী হিসেবে আমি আপনাকে আমার উপযুক্ত ভাবতে পারি না। " হে ধরণী দ্বিধা হও.....চন্দ্রাবলী যেন মাটির নীচে ঢুকে যেতে পারলে বাঁচে। কোন কথা না বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দ্রুতপায়ে অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ীর দিকে রওনা হলো।


Attachments area


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.