গল্প হলেও সত্যি



একটি মধ্যবিত্ত ঘরে বেড়ে উঠেছি ! ক্লাস তখন সিক্স কি সেভেন হবে ,স্কুলের বাৎসরিক ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশিত হল আমার লেখা একটি ছোট্ট কবিতা "জীবন্মৃত" ! বাংলার সোনালী দিদিমনি পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল শাবাস ! সেদিন থেকেই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি একদিন আমার নামডাক হবে, আমার লেখা বিজ্ঞজনেদের মাঝে সমাদর পাবে , পড়তে বসে অলীক কল্পনায় ডুবে থাকতাম ,মাথায় ঘুড়ত গল্পের নায়িকা কেমন করে ধীরে ধীরে তসলিমা হয়ে উঠছে,, ভাবতে ভাবতে শিউড়ে উঠতাম . কতশত পাঠক আমার লেখা পড়ছে, সাহিত্যিক সম্বেলনে এখানে-ওখানে ছুটোছুটি করছি ! সম্মানের উত্তরীয় , পুরষ্কার, ভাবছি আমি কেবলই দিবাস্বপ্ন দেখে চলেছি ! এমন করেই বছর ষোলো পেরতেই মা-বাবা বিয়ে দেবার তোর-জোড় করতে শুরু করে ! মধ্যবিত্ত পরিবারে এটাই স্বাভাবিক রীতি ! কিন্তু বাবা ঠারে-ঠুরে জানিয়ে দিল আজীবন ঘরে বসিয়ে রাখতে পারবে না !


কিন্তু আমি বিয়ে করবো না লেখিকা হবো ,তাই পড়াশোনাটাও চালাতে হবে এই ভেবে দিদির বাড়ি আশ্রয় চাইলাম , মোটামুটি স্বচ্ছল দিদির যুক্ত পরিবারের এককোণে আমার জায়গাও করে নিলাম ,সকাল হলেই রান্নার শোরগোল, জায়েদের তু তু ম্যায় ম্যায়, পাঁচ-ছয়জন বাচ্চার ক্যাচর-ম্যাচর সব মিলিয়ে সংসারের ঘানি চালাচ্ছে দিদি, তার মাঝে আমি উপদ্রবের মত ঘরের কোণে হয় কবিতা লিখছি, নয়তো গল্পের নায়িকা হয় ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছি সাহিত্য সম্বেলন ,বা কলকাতা বইমেলায় সাহিত্যিকদের ভিড়ে ! এমনি করেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্সটাও হয়ে গেল কালে কালে ! বয়সটাও প্রায় পচিঁশ ছুঁয়ে গেল ! এবার দিদিও বিয়ের জন্য চেষ্টা করতে শুরু করল, আজ মামাতো দেওর তো কাল পিশতুত দেওর, মোটকথা সংসারে জুতে দিতে চাইল !কিন্তু আমার কাউকেই পছন্দ হয় না দেখে দিদি কিছুক্ষণ ভবিষ্যৎ বাণী শুনিয়ে মা-বাবার মতই বাড়িতে কে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে বলে বক্ বক্ করতে থাকল!


আমি দিদির মেজরের মত মেজাজি শ্বশুর, ফানুশের মত শ্বাশুড়ি,ধানী লঙ্কার মত ননদ -জা ,আর পেরেকের মত স্বামী দেখে এতদিনে বিয়ে করার ইচ্ছাটাই জলাঞ্জলী দিয়েছি ! দিদিকে সরাসরি বললাম তোর মত যদিদং-মদিদং বলে যার -তার হাত ধরে সংসারে ঢুকে ওগো-হ্যাগো ,বছর ঘুড়তেই ট্যাঁ ভ্যাঁ নিয়ে জীবনটা উৎসর্গ করতে পারবো না ! এইসব বলে দিদিকে চুপ করিয়ে রাখলাম আর তলে তলে কয়েকজন সম্পাদকের কাছে ছুটোছুটি করতে লাগলাম ! কিন্তু ফলাফল তেমন কিছুই হয় না ! কয়েকটা লিটল ম্যাগাজিন ছাড়া কিছুই ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারলাম না ! দু-একজন বড় সম্পাদক আশা দিলেও শেষ অবধি কেউ কথা রাখে নি ! এমনি করেই হঠাৎ ই একদিন এক চিত্র-পরিচালকের সাথে দেখা হয়ে যায় ! দীপ্ত চোখ,খাড়া নাক,গৌড় বর্ণ এক আর্য পুত্রের দিকে দুটি চোখ আটকে যায় ! লাভ অ্যাট ফাস্ট সাইট বুঝি একেই বলে !প্রথম দেখাতেই আমি প্রেমে পড়লাম ! আমার ভাষণে সেও আকৃষ্ট হল ,কথায় কথায় ঘণিষ্ঠ হতে হতে প্রেম প্রকাশ ও পেল দুজনার মাঝে ,সে আমার খোঁপায় গোলাপ গুঁজে দিল , তার চৈতন্যের দৃষ্টি আমার ওপর নিবন্ধ রেখে বলল " তুমি আমার হৃদয়,তুমি আমার আকাশ,তুমি আমার কাব্য,তুমি আমার জীবন " তার সুমধুর ভাষণে আমি দীঘির মত তরল হয় গেলাম ! বুঁদ হয়ে রইলাম তার ভালোবাসায় ! নিজেকে সম্পুর্ণ সমর্পণ করে দিলাম ! প্রেম হল নেশা ! সেই নেশার চকমকি পাথরে ঘষাঘষি লাগতেই স্ফুলিঙ্গ বেয়ে দাবানল নেমে এল শরীরে ! মনের সতীত্ব আর শরীরের কৌমার্য্য আমার প্রথম পুরুষকে নিবেদন করলাম !


কিন্তু মাস তিন যেতেই সে অবহেলার সুরে দুরে সরতে থাকল ! জানতে পেলাম সে দুই সন্তানের পিতা ! তবুও প্রেম কি মানে সমাজের ভাষা ?? আমি যত তাকে আকঁড়ে ধরতে চাইলাম সে তত অবৈধ ,অযাচিত পরগাছার মত নিজের থেকে আমাকে ছুঁড়ে ফেলতে থাকল ! আমি আর তাকে ছুঁতে পারছি না সে ক্রমশ অধরা হয়ে যেতে থাকল ! আমার ফোন নম্বর তার মোবাইলের ব্লকলিস্টে মুখ থুবড়ে পড়ে রইল ! তার ভাড়া বাড়ির ঠিকানা বদলে গেল ! আমি ঘৃণায় দীঘির তরল থেকে ক্রমশ পাথর হতে থাকলাম !


আমার মানসিক অবস্হার বাড়ির কারোর কাছেই গোপণ থাকল না ! তাই দিদি খুব তাড়াতাড়ি পাত্রের সন্ধান করতে থাকল , এর মধ্যেই দিদির দেওরের পত্নীবিয়োগ হল তার ছোটছোট দুটো বাচ্চা রেখে ! ফুটফুটে দুটো বাচ্চা মা-হারা হল দেখে খুব মায়া হল ! আমি আমার সমস্ত প্রেম বাচ্চাদুটিকে দিতে থাকলাম ! যে ভালোবাসা একবার হৃদয় ফুঁড়ে বেড়িয়েছে তাকে আর কখনই উলটোমুখে উৎসস্হানে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না তাই চলার পথে বাঁধা পড়লে ভালোবাসার স্রোত ঠিক অন্য খাত খুঁজে নেয় ! আমিও বাচ্চাদুটির মাঝে বিলিয়ে দিলাম নিজেকে ! সকলে এরূপ দেখে দিদির দেওরের সাথে আমার বিয়ের কথা তুলল ! আমার মতামত দিদি জানতে চাইতে এলে ভাবলাম ক্ষতি কি দুটো বাচ্চা মা পেলে ! রাজী হয়ে গেলাম বিয়েতে ! আমার প্রথম পুরুষকে ভুলতে আমি সম্পুর্ণ এক পুরুষকে আপন করে নিলাম !


কিন্তু ফুলসজ্জায় কই সে তো আমার খোঁপায় গোলাপ গুঁজে দিল না ? কই তার শরীর থেকে তো আমার প্রথমপুরুষের শরীরের মত মহুয়ার গন্ধ পেলাম না ? সম্পূর্ণ সহবাসের পরও তো নেশায় বুঁদ হয়ে রইলাম না ?? হল না , ফাঁকে ফাঁক মিলল না ,সোমে সোম পড়ল না ! তাল কেটে গেল,সুর কেটে গেল ! মন খুঁজে মরল প্রথম পুরুষকে ! এভাবেই তালহীন সংসার জোড়াতালিতে চলতে থাকল ! মনে আবার লেখিকা হবার ইচ্ছাটা নাড়া দিয়ে উঠল ! বাড়িতে কমপিউটার থাকায় স্বামীই আমাকে ফেসবুক আ্যকাউন্ট খুলে দিল ! আমি ওয়ালে ওয়ালে লেখা শুরু করলাম ! আমার পরিচয় একটু একটু করে অনলাইন জগতে বাড়তে থাকল ! এমনই একদিনে হঠাৎ আবার অনলাইনে আমার প্রথম পুরুষের মুখ ভেসে উঠল ! আমি অবশ হয়ে গেলাম ! তাকে এস.এম,এস করলাম ,সে রিপ্লাই দিল ! তার সাথে দেখা করতে চাইলাম কিন্তু প্রেমিক সায় দেয় না আমার আহ্বাণে ! সে এড়িয়ে যেতে থাকে আমাকে , আমার বোধ হয় বিড়ালের স্বভাব ! প্রথমে পাওয়ার আশায় ম্যাও ম্যাও করি না পেলে বরাতের দোষ দিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকি ! কিন্তু হতাশা আমাকে ঠেসে ধরে ! কাংখিত তৃপ্তি স্বামীর কাছেও পাই না ! কোথাও একটা দুরত্ব থেকেই যায় ! আর এই অতৃপ্তি বার বার আমার প্রথম পুরুষের দিকে ঠেলে দেয় ! আমার সামাজিক প্রেমিক ইচ্ছামত আমায় নিয়ে পুতুল খেলে , ইচ্ছা হলে কাছে টানে ,ইচ্ছামত দুরে ঠ্যালে ! এমনি করেই এক দুর্বল মুহুর্তে প্রেমিক আমার আহ্বাণে সারা দেয় , আবারও সুখের দিন ফিরে এল বুঝি ! আমার ভাগ্য হল প্রেমিকের ইচ্ছা ! আমার প্রত্যাশা প্রেম ! কিছুদিন ঠোঁটে গোঁফ, কাঁধে হাত , ইনবক্সে না পাওয়ার হাহাকার , উঠতে,বসতে,চলতে,শোবার ঘরে,স্নানঘরে একাত্ম হয়ে রইলাম ! জীবনে সুখ বুঝি এরই নাম !


কিন্তু আগেই বলেছি বিড়াল ভাগ্য আমার ! গৃহিনীর দয়ায় আমার মাছ জোটে ! কিছুদিন যেতেই প্রেমের চেয়ে ঝগড়া বেশী , এ- তার দোষত্রুটি ধরিয়ে দিতে তৎপর হয়ে উঠি ! প্রেমিক মানুষ, তার প্রেমিকার অভাব নেই ! ফেবু বান্ধবীরা কখন কে স্নানঘরে যায় এ তার নখদর্পণ ! আমিও তাদের অন্যতম একজন বৈ তো গুরুতর কেউ নই ! ধীরে ধীরে প্রতিশোধ মনোভাব তৈরী হতে থাকে মনের অন্তরালে ! ভাবতে থাকি কেইবা আমার ? আমিই বা কার ? ভালোবাসা একটা লাগসই কল্পনামাত্র ! ফেবু তে আমারও বন্ধুসংখ্যা কম নয় , এর ভেতর অনেকেই আমার অনুগ্রাহী ! কেন তাদের মাঝে সুখ খুজেঁ নেব না ? শুরু হয় নতুন জীবন ! ফোন নম্বর বিনিময় করি অনেকের সঙ্গেই ! কথা বলি ,বলতে বলতে কথার মাধ্যমেই বিছানায় পাশাপাশি হই ! একসাথে স্নানঘরে ঝরণার তালে তালে নেচে উঠি ! কারো কারো মাঝে পাই আমার প্রথম পুরুষ, কেউবা অতি সাধারণ তবু কাউকেই ফিরিয়ে দেই না ! আমার অসীম প্রেমে তাদের ডুবিয়ে রাখি ! তাদের হাতের পুতুল হবার আগেই সম্পর্কের দড়িটা ছিঁড়ে ফেলি ! খেলাটা এখন বেশ রপ্ত করে ফেলেছি !


আমি আমার প্রতিটা প্রেমকে উপন্যাসের পাতায় জায়গা দিয়ে আজীবন বন্দী করে রাখি আমার অনুগ্রাহী পাঠকের চোখে !

ইচ্ছামত প্রেমিকদের দিয়ে আমার সেবা করাই, ঘেমে গেলে তাদের রুমালে আমার মুখ মুছিয়ে নেই, শীত করলে তাদের গরম পোশাকে নিজেকে গরম করে নেই, যৌনমিলনে তাদের শিৎকার তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করি ! আর এইসব প্রেমকাহিণী ধীরে ধীরে সাফল্যের দড়জায় আমাকে দরজা দেখিয়ে দিল ! আমার লেখা পাঠকের ঘরে ঘরে সেল্ফে গুনী-জ্ঞানীদের মাঝে জায়গা করে নিয়েছে ! সামাজিক ভাবে আমি সব থেকে সুখী ! স্বামী-সন্তান-সাফল্য-অর্থ আমার মুষ্ঠিবদ্ধ ! তবুও আমার কামনা,বাসনা যা মানুষের আদি স্বভাব যা আয়ত্তের বাইরে তার পেছনেই ছোটে মানুষ ! আমিও সূর্য ডুবে গেলে খুঁজি আমার প্রথম পুরুষ !!


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.