-“ আজ আবার এসেছে।” স্টাফরুমে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে বললেন অসীমদা।

-“আবার!” বিস্ময় ঝরে পড়ল শুভ্রাদির কথায়।

-“সে তো আসবেই। নাহলে ওর পেট চলবে কিভাবে?” এবার বনানীদির পালা।

-“হেডস্যার তো ওকে বারণ করতে পারেন! অন্তত এই স্কুল শুরুর সময়টায় যাতে না আসে! এইট-নাইনের ছেলেমেয়েগুলো হাসাহাসি করে ওকে দেখে!” দৃশ্যতই বিরক্ত আবীরদা।

-“আরে আবীর! তুমি ব্যাপারটা বুঝছ না! ও যদি না আসে গোবিন্দ তো আর নিজে যাবে না রে ভাই।”

-“কিন্তু সুষমাদি, এতে তো স্কুলের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে! স্যার ওকে...”

-“কোনো স্যার-ফ্যার নয় – প্রেয়ারের ঘন্টা পড়ে গেছে, চল চল” আসীমদা একরকম জোর করেই আবীরদাকে টেনে নিয়ে গেলেন। বাকিরাও সবাই হাঁটা লাগালেন মাঠের দিকে। বাধ্য হয়ে আদৃতাও!

আদৃতা এই দিন পনেরো হল এই স্কুলে চাকরি পেয়েছে। স্কুলটা কো-এডুকেশন, খুবই নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়ে। পড়াশোনার মানও খুব একটা ভালো না। এই কদিনেই ছেলেমেয়েদের মুখের ভাষা আদৃতাকে অবাক করেছে। ফাইভ-সিক্সের বাচ্চারাও কি অবলীলাক্রমে গালাগাল দিচ্ছে একে অপরকে! ভালো-খারাপ কোনো বোধই তৈরী হয়নি এদের! বারণ করলে পাছে তাকেই দু-চারটে শুনিয়ে দেয় সেই ভয়ে ওদের কিছুই বলেনি আদৃতা। তাছাড়া প্রথমদিনই তনিমাদি বলে দিয়েছিলেন- “এই স্কুলে গান্ধীজীর বাঁদর হয়ে থাকাই ভালো নাহলেই ঝামেলায় পড়বে।” সবচেয়ে সিনিয়র মানুষটির কথা কতটা সত্যি তা এই কদিনেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে আদৃতা। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ও কিছুই বোঝেনি। কে এসেছে? কাকে নিয়ে এত কথা? প্রার্থনা শেষ হতেই তনিমাদিকে পাকড়াও করল আদৃতা – “কি ব্যাপার তনিমাদি? কাকে নিয়ে কথা হচ্ছিল গো স্টাফরুমে?”

-“ওমা! তুমি কিছু জানোনা?”

-“না তো!”

-“কিছুই শোননি এই কদিনে? কেউ তোমায় গোবিন্দদার কীর্তি শোনায়নি? ঠিক আছে আজ ফেরার পথে বলব।”

গোবিন্দদার কীর্তি! গোবিন্দদা তাদের গ্রুপ-ডি স্টাফ। সবাইকেই বেশ সন্মান দিয়ে কথা বলেন। কে জানে তাঁর আবার কি কীর্তি আছে! অবশ্য ফেরার পথে তনিমাদির কথাগুলো শুনে আদৃতার মনে হল এ তো শুধু কীর্তি নয় অবিস্মরণীয় কীর্তি! গোবিন্দদার দুটি বিয়ে! প্রথমটা মাত্র কুড়ি বছর বয়সে চাকরি পাওয়ার পরপরই। ওর বউয়ের বয়স তখন ষোলো। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ছেলে – সে ছেলের বয়স এখন কুড়ি, কলেজে পড়ে। এই অবস্থায় গোবিন্দদা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে প্রথমজন অর্থাৎ বন্দনাকে তাড়িয়ে দিয়ে। ফলস্বরূপ বন্দনা রোজ স্কুলগেটে তার ও তার ছেলের ভরণপোষণের দাবি নিয়ে হাজিরা দেয়।

-“তো গোবিন্দদা দুটো বউ নিয়ে সরকারি চাকরি করছে! এটা তো আইনত অপরাধ!” বলে ওঠে আদৃতা।

-“আরে ছাড় তো! ওদের আবার আইনকানুন! ছোটোলোকেদের কারবার... বোঝোই তো সব! তা যাকগে, কাল আসছ তো?” তনিমাদি জিজ্ঞাসা করেন।

-“হ্যাঁ নিশ্চয়ই! অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম স্বাধীনতা দিবস! সেটাতে উপস্থিত থাকব না!” – হেসে ওঠে দুজনেই!

আর ওই স্বাধীনতা দিবসেই আদৃতা সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রথম সুযোগেই সে অন্য স্কুলে চলে যাবে। ১৫ই আগস্ট সমস্ত অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর যখন সবাই মিলে স্টাফরুমে বসে গল্প করছে হঠাৎ ক্লাস ফাইভের কজন ছুটে এসে খবর দেয়

– “স্যার! ওরা মারপিট করছে!”

-“ কারা রে? কোন ক্লাস? আজ এইটুকু সময়ের মধ্যেও মারপিট বাঁধিয়ে ফেললি বাবারা!” – হেসে বলেন হেডস্যার।

-“ না স্যার! দাদা-দিদিরা নয়! গোবিন্দ স্যার আর ওই বউটা!”

-“অ্যাঁ! কি সর্বনাশ!” সবাই স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে গেটের দিকে ছুটল।

গেটের কাছে গিয়ে সবার চক্ষু চড়কগাছ! গোবিন্দদা স্কুলের গোরু তাড়ানোর লাঠিটা দিয়ে বন্দনাকে পেটাচ্ছে। সেও ছাড়নেওয়ালী নয়! মারতে না পারলেও যা বাণীবর্ষণ করছে গোবিন্দদা ও তার দ্বিতীয় পক্ষের উদ্দেশ্যে যে গোরুমোষেও লজ্জা পাবে! কোনোরকমে গোবিন্দদাকে স্যারেরা স্কুলের ভেতরে নিয়ে গেলেন। আদৃতা লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। ছিঃ! এটা একটা স্কুল! ফেরার পথে আদৃতা দেখল বন্দনা তখনও গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে! কি মনে হল আদৃতা ওর হাতে একশটা টাকা গুঁজে দিল। নাঃ! এই স্কুলে সে আজীবন পড়াতে পারবে না।

ওই ঘটনার পর আজ আট বছর কেটে গেছে। আদৃতা এখন অন্য স্কুলে পড়ায়। স্কুলটা এলাকার নামকরা গার্লস স্কুল। ভদ্র, শিক্ষিত পরিবারের মেয়েরাই এখানে পড়ে, পরিবেশও খুব ভালো। আজ আবার স্বাধীনতা দিবস। আর সেই উপলক্ষ্যে স্কুলের তরফ থেকে স্টেশনের পিছনের বস্তির কিছু বাচ্চাকে আজ বইখাতা দেওয়া হবে। আয়োজনটা মূলত ক্লাস ১১-১২ এর মেয়েরাই করেছে তবে আদৃতার তত্বাবধানে। কিন্তু বাচ্চাগুলো সব এখনো এসে পৌঁছায়নি। ওরা ওদের গানদিদাকে আনতে গেছে! গানদিদা ওদের বস্তিতেই থাকে। ভালো গান করে। আদৃতা তাকে দেখেনি। তবে শুনেছে যে স্কুল থেকে বাচ্চাগুলোকে বই দেওয়া হবে শুনে সে বলেছে তোরা এমনি এমনি বই নিবি সেটা ভালো দেখায় না – ওরা বই দেবে আর তোরা বদলে গান শোনাবি। তারাও নাকি এইকদিন খুব কষে রিহার্সাল দিয়েছে! হঠাৎ গেটের কাছে ক্যাঁচরম্যাঁচর শুনে আদৃতা বুঝল আর্টিস্টরা সব এসে গেছে। ওই তো বাচ্চাগুলো আর সাথে

– এ কি! এতো বন্দনা! বন্দনাও তাকে দেখে এগিয়ে এল – “চিনতে পারছেন দিদি?”

-“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি এখানে?”

-“আমি তো ওই বস্তিতেই থাকি দিদি। ট্রেনে গান গেয়ে ভিক্ষে করি। ভালো ঘরের মেয়ে ছিলাম গো দিদি! বাবা-মা, নাচ-গান সবই শিখিয়েছিল! কি মরতে যে ওই লোকের সাথে পালিয়েছিলাম!”

-“তোমার ছেলে?” আদৃতা জিজ্ঞাসা না করে পারল না।

-“ছেলে! হুঃ! বাপেরই তো রক্ত গায়ে! কলেজে ফেল করল আর করেই কিনা বিয়ে করে ফেলল! কিন্তু বাবু তো কুটোটি নাড়বেন না! টাকাও কামাব আমি, রাঁধব–বাড়বও আমি! একদিন বউয়ের সামনে আমার গায়ে হাত তুলল টাকার জন্য! ব্যস্‌! সেদিনই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। আগে বালি স্টেশনে থাকতাম। এই বাচ্চাগুলোই ভালোবেসে বস্তিতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বদলে ওদের গান শোনাই, লজেন্স দেই! তবে দিদি, এখন কিন্তু আমি স্বাধীন!"

-“এই আদৃতা! চল চল! অনুষ্ঠান শুরু করো!” – বড়দি এসে তাড়া দিলেন।

-“হ্যাঁ! চলুন বড়দি!” – বলে বন্দনা আর বাচ্চাগুলোকে নিয়ে পা বাড়ায় বিস্মিত আদৃতা।

পতাকা উত্তোলনের পর বিস্মিত আদৃতাকে হতবাক করে দিয়ে কচি কচি কটা গলা বন্দনার সাথে গেয়ে ওঠে –

“ভারত আমার ভারতবর্ষ

স্বদেশ আমার স্বপ্ন গো

তোমাতে আমরা লভিয়া জনম

ধন্য হয়েছি ধন্য গো!”

আস্তে আস্তে গলা মেলায় সবাই!

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.