প্রকৃত তৃপ্তি



মাঝ আকাশে তখন চাঁদ ঠিক মেঘের মাঝে উঁকি দিচ্ছে, চাঁদের স্বচ্ছ, শুভ্র আলোয় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। পূর্ণিমা বলেই বোধহয়। চাঁদের দীপ্তিময় উজ্জ্বল আলোকরাশীর মেলা দেখে আরো উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে মেহুলের মন। নিচে এখনও লোকজনের ভিড়, শেষ batch খাচ্ছে মনেহয় এখন। শান্ত পদে সুসজ্জিত কক্ষে প্রবেশ করলো মেহুল। ঘরে ঢুকতেই নানারকমের ফুলের মিশ্রিত সুগন্ধে মাতোয়ারা হয়ে উঠলো তার মন। বিছানায় বসে তার স্বপ্নের রাজকন্যা মেনকা। আজকে তাদের দুজনের প্রথম রাত, ফুলসজ্জা আজ তাদের। মেহুল সত্যিই নিজের আনন্দকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা। ধীরে ধীরে বিছানার কাছে গেলো সে। মেনকা একটা লাল রঙের শাড়ি পড়ে আছে। ঘরের আলো আঁধারীতে যেন আরো মোহময়ী লাগছে তাকে। মেহুল তার পান্ঞ্জাবীর পকেট থেকে মেনকার জন্যে কেনা আংটিটা বের করলো। সেটা পড়াবে ভেবে মেনকার হাতটা সাহস করে ধরতেই অভাবনীয় ভাবেই বাধাপ্রাপ্ত হলো। মেনকা এক ঝটকায় সরিয়ে নিলো নিজের হাতটা, একটা বড়ো হাই তুলে বললো, " খুব ক্লান্ত আমি, ঘুম পেয়েছে ভীষন। good night।" বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করেই পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল সে। মেহুল কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু সুযোগ পেলোনা, মনটা নিজের অজান্তেই বিমর্ষ হতেই সে নিজের মনকে সজাগ করে তুললো সে, সত্যিই কি স্বার্থপরই না সে, সারাদিন এতো অনুষ্ঠানের পরে ক্লান্ত হওয়াটাই তো স্বাভাবিক, একেতো নতুন বাড়িতে, নতুন লোকের মাঝে এসেছে তার উপর মন খারাপ। একটু স্নেহের চোখেই মেনকার দিকে তাকায় সে। " আহারে!" নিজের অজান্তেই মনটা স্নেহে ভরে যায় তার। " আজ থেকে মেনকার জীবন রঙিন আলোয় ভরে দেবো আমি, সবসময় ওকে খুশি রাখবো, দুঃখের ছায়া, চোখের কোণে এক ফোঁটা জলও আসতে দেবোনা কখনও।" নিজের মনের কাছেই যেন নিজে শপথ নেয় মেহুল। আজকে সারারাত এমনিতেই ঘুম হবেনা তার,মেনকা তার স্ত্রী, তার সারাজীবনের সাথি, ভাবতেই যেন মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠেছে তার।তার সাথে মেনকার বিয়েটা পুরোপুরি সম্বন্ধ করে।

মেহুলের বয়স প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি, দেখতে খুব সাধারণ, একটা প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি এবং বাবার দোকান, এই তার bio data, অপরপক্ষে মেনকার বয়স পঁচিশের কাছাকাছি, সুন্দরী এবং গ্র্যাজুয়েট এইরকম মেনকাকে এক দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেছিলো মেহুল এবং তার বাড়ির লোকের কিন্তু মেনকা তাকে পছন্দ করবে বা বিয়েতে রাজী হবে এমনটা নিজের স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি মেহুল। তাই আজ যখন মেনকাকে স্ত্রী হিসেবে পাশে দেখল সে নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মনে হলো তার। মেনকা ঘুমিয়ে গেছে দেখলো মেহুল। সে চাদরটা গায়ে দিয়ে দিলো মেনকার। এইভাবেই তার নতুন জীবনে প্রথম দিনটি কাটলো।

পরেরদিন সকালে বৌদিদের রঙ্গ রসিকতা, টিপ্পনী এড়িয়ে তার নজর যেন শুধুই খুঁজে বেরাচ্ছে মেনকাকে। মেনকাও সারাদিন বাড়ির বাচ্চাদের সঙ্গে, কখনও আবার অন্যান্য কাজে মেহুলের ধারে কাছেও এলোনা, সারাদিন অপেক্ষার পর যখন একটু সুযোগ পেলো কিছুটা জোর করেই মেহুল মেনকাকে আড়ালে নিয়ে গেলো, মেনকা বিরক্তির সঙ্গে কিছু বলতে যাবে এমনসময় তার জন্যে কিনে আনা আংটিটা হাতে পড়িয়ে দিলো মেহুল। মেনকার চোখ ঝিকমিক করে উঠলো, দামী পাথর বসানো সোনার আংটিটার থেকেও বেশি চকচক করছে তার চোখ তখন। আংটিটা নিয়ে গদগদ স্বরে সে বললো, " আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো ভুলে গেছো, এই আংটিটা ভালো কিন্তু হিরের আংটি আমার বেশি প্রিয়।" মেহুলের মুখে হাসি ফুটতে গিয়েও মিলিয়ে গেলো, সে তাও হেসে বললো, " ঠিক আছে মেনকা, এখন এইটা পড়ো, আমাদের বিবাহবার্ষিকীতে আমি হিরের আংটি বানিয়ে দেবো তোমাকে।" মেনকা মুখটা একটু বেকালো, " সে এখনও অনেক দেরি।" আংটিটা ঘোরাতে ঘোরাতে চলে গেলো। মেহুল চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো, মেনকার ব্যবহারে একটু হলেও কষ্ট হলো তার কিন্তু পরমুহুর্তেই তার মায়া হলো, ভালোবেসে আবদার করেছে মেনকা আর সে নিজের কাছেই তো প্রতিজ্ঞা করেছে মেনকার সব ইচ্ছা পূরণ করবে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে মেহুল বুঝে ওঠার আগেই মেনকার আবদার চাহিদায়, চাহিদা জেদে এবং জেদ বলপূর্বক অধিকারে পরিণত হলো। মেনকার কাছে মেহুল তখন শুধুমাত্র সবকিছু পাওয়ার password, নিজের কর্তব্য, দায়িত্ব পালন না করে কিভাবে সবকিছু আদায় করতে হয় তা জানতে বেশীদিন সময় লাগলোনা মেনকার। আর মেহুল? সে মেনকার মুখের হাসি ফোটাতে সবসময়ই তৈরী।মেনকার কিন্তু মেহুলের প্রতি এতোটুকু খেয়াল নেই, যত্ন করা তো দূরের কথা, রাতে তার খাবার আগে খেয়ে নিতেও একবার ভাবতোনা সে। মেহুল যখন বুঝলো তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে, মেনকার ভালোবাসায় তখন সে দ্রবীভূত। কিছু পাওয়ার প্রত্যাশায় নয়, নিজের ভালোবাসার জন্যে ত্যাগে সে সবরকমভাবে প্রস্তুত। মেনকার খাওয়া, ঘুম, তার ভালোলাগা, তার খারাপ লাগা সবকিছুর প্রতি সজাগ দৃষ্টি তার। ক্রমে সকলের চোখেই পড়লো মেহুল আর মেনকার সম্পর্কের অবস্হা। যেখানে একজন সবকিছু উজার করে দিচ্ছে আর আরেকজন শুধুমাত্র গ্রহণ করে যাচ্ছে। মেহুলের মা একদিন আর থাকতে না পেরে মেহুলকে বললেন, " এই সম্পর্কের দায়বদ্ধতা কি শুধুই তোর?" মেহুল বোঝে মা এর খোঁচা তবুও সে হাসে, বলে, " তা কেনো মা, মেনকা তো ওর যথাসাধ্য করে তবে কি বলতো বয়সটা কম তো তাই একটু অবুঝ। আর কিছুনা।" চুপ করে যায় মেহুলের মা। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা তিনি শুনেছিলেন বটে কিন্তু তা যে এতোটা যন্ত্রণাদায়ক তা নিজের ছেলেকে দেখে বুঝলেন। মেহুল যতোই স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করুক না কেন মায়ের মন কিন্তু ছেলের মন পড়ে নিলো। এইভাবে দেখতে দেখতে দুবছর কেটে গেছে, মেহুলের যৌথ পরিবার এখন বিভক্ত, বাড়ির সকলের সঙ্গেই মেনকার বিবাদ, শুধু শ্বশুর শাশুড়ি আর মেহুল এই তিনজনকে নিয়ে আছে সে তবে শ্বশুর শাশুড়ির ওপরে দয়া দেখানোর কারণ মানবিকতা নয়, শাশুড়ি ঘরের সব কাজ সামলাবে আর নিজে সে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবে এই তার মতলব। মেহুল সব বোঝে কিন্তু তবুও সে নির্বাক। কোন কথা বলতে গেলেই মেনকা রুদ্রমূর্তি ধারণ করে আর মেহুল তার নিজের ঘরে ঢোকার সুযোগ টুকুও পায়না। ছোট থেকেই পাড়ায় শান্ত, ভদ্র, নির্বিবাদী বলে পরিচিত মেহুলের চরিত্রই যেন সবচেয়ে বড়ো শত্রু হয়ে উঠেছে তার। সমাজের ভয়ে, লোকলজ্জার ভয়ে, অশান্তির ভয়ে চুপ করে সব সহ্য করে সে। আর সহ্য করে মেনকার প্রতি ভালোবাসার জন্যে, মেনকার এতো অবহেলাও যাতে এতোটুকু ক্ষুন্ন করতে পারেনি। এইভাবেই হয়তো জীবনটা কাটবে ভেবেছিলো মেহুল কিন্তু হঠাৎই তার জীবনে খুশির এলোমেলো বাতাসের মতো হয়ে এলো মেনকার মা হবার খবরটা। মেহুল যেন বিশ্বাস করতে পারছিলোনা। আশায় বুক বাঁধলো তার হৃদয়। যেই ভালোবাসা, যেই আবেগ এতদিন হাতরে এসেছে সে এবারে হয়তো সব পূর্ণ হবে, সে ভাবলো মাতৃত্ব হয়তো বদলে দেবে মেনকাকে, প্রসারিত করবে মেনকার মনকে, সন্তানের জন্মের সঙ্গে নতুন রূপে জন্ম হবে তারও। নিজের সর্বশেষটুকু ভালোবাসা, যত্ন দিয়ে ভরিয়ে দিলো সে মেনকাকে। নতুন শাড়ি, গয়না, আসবাব সবকিছু দিয়ে মুড়ে দিলো মেনকাকে, যাতে সে খুশি থাকে। রাতের পর রাত জে�গে সেবা করলো মেনকার। অবাক হয়ে গেলো সকলে, মেনকা যেন শুধু গর্ভেই ধারণ করেছে সন্তান, বাকি সব কষ্ট যেন সহ্য করছে মেহুল। ন'মাস পরে যখন ফুটফুটে এক পুত্রসন্তান জন্মালো মেহুল সমস্ত কষ্ট ভুলে গেলো। মেনকার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তখন তার কিন্তু মেহুলের সব অনুমান ভুল প্রতিপন্ন হলো, মেনকার মধ্যে পরিবর্তন তো দূরের কথা সামান্য বদলটুকুও দেখা গেলোনা, সে আরো ছন্নছাড়া হয়ে উঠলো যেন। মৈনাক, তাদের একমাত্র ছেলের জন্মের পর থেকেই অদ্ভুত পরিবর্তন হলো তার মধ্যে। ছোটো ছেলেকে বাড়িতে রেখেই সে যখন তখন বেরিয়ে যেতে লাগলো। মেহুলকে বললো সে নতুন চাকরি করছে কিন্তু কি বা কিসের চাকরি সেটা অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারলোনা মেহুল। কিন্তু মেনকা কারোর কথার পরোয়া করেনা যখন তখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সে, বাপের বাড়ি যাচ্ছে বলে রাতের বেলাতেও ফেরেনা কখনো। বাড়ির লোক নানারকম কথা বলে ,মেহুল কিন্তু কান দেয়না সে কথায়, মেনকার উপর তার অগাধ বিশ্বাস। সে একগুঁয়ে হতে পারে, খামখেয়ালী হতে পারে, বদমেজাজী হতে পারে কিন্তু সে অসৎ নয়, সে জানে মেহুল তাকে কতটা ভালোবাসে।


এইভাবে আরো বছর তিন কাটলো, মেহুলের জীবন তখনও একভাবেই রয়ে গেছে। মৈনাকও এইবছর স্কুলে ভর্তি হয়েছে, যাকে ঘিরে মেহুল নিজের জীবনটা সাজাবে ভেবেছিলো সেই মৈনাকও যেন তার হয়েও তার না। মেনকা অফিসের যাবার জন্যে সকাল সকাল বেরিয়ে যায় আর তাও মৈনাককে সঙ্গে নিয়ে। সে স্কুলে যায় আর মেনকা কাজে এমনটাই ভাবে মেহুল। কয়েকদিন পরে মেনকা বাপের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে দীঘা যাবে বলে বাড়ি থেকে বেরোলো, মৈনাক কেও সঙ্গে নিলো তার। মেহুলকে একটিবার জিজ্ঞেস টুকুও করলোনা যাবার জন্যে কিন্তু মেহুলের এসব আর খারাপ লাগেনা, এরকম আগেও হয়েছে। কিন্তু এবারে ব্যাপার আলাদা হলো। মেনকার সেদিনই ফেরার কথা, মেহুল ঘরে বসে TV দেখছে এমনসময়ে মেহুলের ছোটবেলার বন্ধু আকাশ এসে হাজির। সে ঘরে ঢুকতেই মেহুলের মন আনন্দে ভরে উঠলো, কতদিন পরে বন্ধুর সঙ্গে দেখা। কিন্তু আকাশ খানিকটা উদবিঘ্ন, দু'এক কথার পরে সে বললো, " আচ্ছা মেহুল, মেনকা বৌদি কি আমায় ঠিকভাবে চেনেনা? মানে ভুলে গেছে এরকম কি?" মেহুল খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে উঠলো, সে গম্ভীর হয়ে বললো, " সেকি তোকে কেন চিনতে পারবেনা? তুই তো বিয়ের পরে অনেকবার এসেছিস আমাদের বাড়িতে, কেন কি হয়েছে রে? কোথায় চিনতে পারেনি ও তোকে?" আকাশ খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে বললো, "আরে মন্দারমনিতে আমি আর আমার বৌ জয়া গেছিলাম, আজকেই ফিরলাম, সমুদ্রের ধারে দেখলাম বৌদিকে, তোর ছেলেও ছিলো সাথে, আমি ডাকলাম কথা বলার জন্যে, কিন্তু বৌদি তো আমায় চিনতেই পারলোনা আমায় উল্টে বলে আমায় কোনদিন দেখেইনি। বিশ্বাস কর ভাই খুব prestige এ লেগেছে, আমি তো অবাক কিন্তু ব্যাপারটা বুঝলামনা, তাই তোর কাছে এলাম সত্যিই বৌদি ছিলোতো।" একটু তাছ্যিল্লের হাসি হাসে আকাশ। মেহুলের তখন রাগে অপমানে চোখে জল আসার মতো অবস্হা তবুও সে সামলে নিয়ে বললো, " মন্দারমনি যাবে আমাকে বলেনি রে, তবে দীঘা থেকে তো কাছেই তাই গেছে হয়তো, আমি আসলে জিজ্ঞেস করবো।" আকাশ চলে যায়। মেহুল স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। সমস্ত হতাশা, যন্ত্রণা, অভিমান বুকে চেপে রাখতে রাখতে সে পাথরের মতো হয়ে গেছে যেন। অনেক চেষ্টা করেও নিজের চোখের জলকে বাঁধ মানাতে পারলোনা সে....


মেনকা যখন ফিরলো তখন প্রায় রাত হয়ে গেছে। তার মুখে নির্লিপ্ত ভাব যেন। মৈনাকও ঘুমিয়ে পড়েছে তখন। মেনকা তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখে ক্রিম লাগাচ্ছে, মেহুল তার পেছনে দাঁড়িয়ে প্রথমবার প্রশ্ন করলো তাকে, " তুমি মন্দারমনি গেছিলে?আকাশের সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছিলো তুমি তাকে চেনোনা বলে অস্বীকার করেছো?" জীবনে প্রথমবার মেহুল তাকে প্রশ্ন করছ, প্রথমটা সে থতমত খেয়ে গেলো পরমুহুর্তেই সামলে নিয়ে বললো, " কে আকাশ? আমার অতো মনে নেই, আর কাকে কোথায় দেখেছি মনে থাকে নাকি।" সে ঘরের আলো বন্ধ করে বিছানায় যেতে চায় তাড়াতাড়ি। মেহুল আবার প্রশ্ন করে, " তুমি তো দীঘা যাবে বলেছিলে তাহলে মন্দারমনি কেনো?" মেনকা বিছানায় উঠতে গিয়ে থমকে যায়, কিছুটা আটকেই বলে, " হঠাৎই plan হয়েছিল। তোমার আর কোন জেরা করার আছে না এবারে ঘুমাতে পারি ?" শেষের কথাগুলো বলে শ্লেষ্মাত্মকভাবে। মেহুল কোন উত্তর দেয়না। তার চোখে তখন জল, সে স্পষ্ট বোঝে মেনকা মিথ্যা বলছে। এতোদিনের তার আঁকড়ে ধরে থাকা বিশ্বাসের ডিঙিটাও যেন আজ মেনকার মিথ্যার তুফানে নড়বড় করছে, যে কোন মুহূর্তেই ডুবে যাবে।


সারাটা রাত চোখ বুজতে পারলোনা সে, পরদিন সারাদিন মেনকা বাড়ি থেকে বেরোলোনা। ঘরের কাজ, রান্না করলো সকলের জন্যে। মেহুল সারাদিন চুপ হয়ে থাকলো, মনে তার চরম উদবেগ।


সেদিন তাড়াতাড়ি খেয়ে রাতে শুয়ে পড়লো মেহুল। একেতো মানসিক শান্তি নেই তার উপর শরীরটাও ভালো নেই তার। মৈনাকও ঘুমিয়ে পড়েছে। অন্যদিনের মতো মেনকা কখন এসে শুয়েছে সে জানেওনা। ডিসেম্বরের রাত, এমনিতেই রাত বড়ো, তার উপরে ঠান্ডাও পড়ছে, মেহুল গায়ে চাদরটা দিতে গিয়ে দেখে মেনকা বিছানায় নেই। মেহুল ভাবলো হয়তো বাথরুমে গেছে কিন্তু নাঃ, দশ মিনিট পরে যখন সে বিছানা ছেড়ে উঠলো মেনকা তখনও আসেনি। ঘড়িতে প্রায় রাত দুটো। বাথরুমে দেখতে যাবে এমনসময় দেখে ঘরের দরজা খোলা। মেহুল খানিকটা অবাক হয়েই বাইরে সতর্ক ভাবে উঁকি মারলো, হ্যাঁ, মেনকা বাইরে, হাতে ফোন তার। কথা বলেছে কারোর সাথে। মেহুল সন্তর্পণে দরজাটা আরেকটু ফাঁক করলো এবারে কথা তার কানে এলো, একেতো নিশুতি রাত, চারদিক নিস্তব্ধ তাই মেনকা এবং অপর পক্ষের ব্যক্তির কথা স্পষ্ট শোনা গেলো। খুব নিচু স্বরে কথা বলছে মেনকা এবং খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যক্তিটির সঙ্গে কারণ বেশিরভাগ কথাই যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, মেহুলের সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে তখন, দুঃখে ক্ষোভে ঐ ঠান্ডাতেও কপালে ঘাম দেখা দিচ্ছে। মেনকা আগামীকাল ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে একটি হোটেলের নাম বললো, মেনকা নিজেই address বলে দিচ্ছে ব্যক্তিটিকে। মেহুল আর সহ্য করতে পারেনা। টলতে টলতে বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে। প্রত্যাখ্যান, বিশ্বাসভঙ্গের আগুনে তখন দাউদাউ করে জ্বলছে তার মন, চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে বালিশ। মেনকাকে জিজ্ঞেস করবে ভাবছে এমনসময়ই তার মাথায় চিন্তা অন্য দিকে মোড় নেয়। মেনকার এতদিনের অবহেলার কারণটা এক নিমেষে তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। মেনকা কোনদিন তাকে ভালোবাসেইনি, এমনকি স্বামীর স্হানটুকুও দেয়নি, কারণ সে তো শুধু ঐ ব্যক্তিকেই ভালোবেসেছে, জোর করেই মেনকা এই সম্পর্কে বাঁধা পড়ে আছে। আর সত্যিই তো মেনকার পাশে মেহুল সত্যিই বেমানান যে, শুধু দেখতে নয়, যোগ্যতাতেও বড্ড পিছিয়ে আর তাই মেনকা কোনদিন ধরা দেয়নি তার ভালোবাসার বাঁধনে। মেহুল সামলাতে পারেনা নিজেকে। এতো ভালোবেসেও সে মেনকার মনে এতটুকু জায়গা করতে পারলোনা....নাঃ, আর না, সে সিদ্ধান্ত নেয়, একটা অনেক বড়ো সিদ্ধান্ত.....।


পরেরদিন যথারীতি দশটার পরে ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো মেনকা। মৈনাক স্কুলে যাবে জানে মেহুল। মেহুল কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়লো। সারারাত ধরে নিজের মনকে বুঝিয়ে নিয়েছে সে, ভালোবাসা মানেই ত্যাগ। তার সাথে থেকে মেনকা সুখী নেই, এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি দেওয়াই মেনকার প্রতি সবচেয়ে বড়ো উপহার হবে তার জন্যে। মেহুল মেনকাকে অপরিসীম ভালোবাসে কিন্তু মেনকার খুশি তার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মেনকার অপর্যাপ্ত স্মৃতির সাহায্যেই সে কাটিয়ে দিতে পারবে বাকি জীবনটা। বাসে বসে থাকতে থাকতে এইকথাই ভাবছিলো সে, মেনকার কালকে ফোনে বলা ঠিকানা ধরে সে পৌঁছালো একটা হোটেলের সামনে। একটি গলির মধ্যে ঘিন্ঞ্চিপ্রস্তরযুক্ত হোটেলটি দেখে বেশ অবাক হলো মেহুল। সে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলো হোটেলে। reception এ একটা register copy রাখা, receptionist মেহুলকে দেখে এগিয়ে এলো, বললো, " আপনার কার সাথে appointment আছে বলুন এদের মধ্যে?" Receptionist আঙুল নির্দেশ করলো কোণায় বসে থাকা কয়েকটা মেয়ের দিকে। মেহুল এতোক্ষণ খেয়াল করেনি এএবারে দেখলো চেয়ারে বসে কয়কটি মেয়ে। তাদের চেহারা দেখলেই তাদের সম্পর্কে ধারণা করা যায়। মেহুল অবাক হয়ে দেখলো মেয়েগুলো উঠে এলো এবং তাদের সঙ্গে যাবার জন্যে আমন্ত্রণ জানাতে লাগলো, তাদের স্পর্শে, অশ্লীল ইঙ্গিতে গা গুলিয়ে উঠলো মেহুলের। সে কোনরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে receptionist এর কাছে গেলো দ্রুত, সে বুঝে গেছে তার মেনকা বিপদে পড়েছে। এই হোটেল কি এবং এখানে কি হয় বুঝতে পেরেই মেনকার চিন্তায় উন্মত্ত হয়ে উঠলো, মেনকাকে কোথায় নিয়ে গেছে বারকয়েক জিজ্ঞেস করতে উত্তর পেলোনা অবশেষে হাতে টাকা দিতেই দোতলায় নির্দেশ করলো receptionist কিছু বলতে যাবে কিন্তু মেহুলের শোনার সময় নেই, সে উর্ধশ্বাসে ছুটলো দোতলায়। সেখানে বারান্দায় অনেকগুলি ঘর কিন্তু সবগুলো প্রায় খোলা। মেহুল দেখতে পেলো একটি ঘর কেবল বন্ধ। মেহুল দরজায় ধাক্কা দিতে শুরু করলো, ভেতরে কোন শব্দ নেই, প্রায় বারচারেক ধাক্কার পরে দরজা খোলার শব্দ হলো। মেহুল উত্তেজিতভাবে ঘরে ঢুকতে গিয়েই থমকে গেল, ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে তার শরীরের সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠলো, তার বুদ্ধি বিবেচনা সব স্তব্ধ হয়ে গেলো। সে অবাক দৃষ্টিতে দেখলো যে ব্যক্তিটি দরজা খুলেছে তার উর্ধাঙ্গ উন্মুক্ত, পড়নে শুধু একটি towel আর হোটেলের ঐ ছোট্ট ঘরের বিছানায় শোয়া মেনকা এবং আরো এক পুরুষ । মেনকা এবং ঐ ব্যক্তি দুজনেরই উন্মুক্ত শরীরে শুধু একটি চাদর দেওয়া। ওরা ভেবেছে হোটেলের কেউ দরজা ধাক্কা দিচ্ছে নইলে খুলতোনা কখনোই। মেনকা মেহুলকে দেখে এতোটা বিষ্মিত হয়েছে যে তার মুখ ব্লটিং পেপারের মতো সাদা হয়ে গেছে। মেহুলের সামনে সব দিনের আলোর মতো স্পষ্ট তখন। সে আর পারলোনা দাঁড়িয়ে থাকতে, নিজের শরীরটা কোনক্রমে টেনে নিয়ে বেরোলো হোটেল থেকে। সবকিছু তখন তার কাছে ধোঁয়ার মতো। বসলো সে একটি নির্জন স্হানে।


যখন বাড়ি ফিরলো তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাড়িতে ঢুকেই দেখলো মেনকা রান্নাঘরে কাজ করছে, সে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরেই সারা পাড়া কাঁপিয়ে একটা পুলিশের গাড়ি এলো। পাড়ার নিঃস্তব্ধতাকে খান খান করে। মেনকা রান্নাঘরেই ছিলো, একজন lady constable তাকে টানতে টানতে বের করলেন। চিৎকার চেঁচামেচিতে তখন বাড়ি মুখরিত। মেনকা চিৎকার করে বলতে থাকলো "আমি কি করেছি, আমাকে কেন ধরছেন? শুনছো আমাকে বাঁচাও।" সারা বাড়ীর লোক অবাক দৃষ্টিতে দেখছে সবকিছু। তারা কিছুই বুঝতে পারছেনা। মেহুল উপরের বারান্দায় এসে দাঁড়ালো, তার কোলে মৈনাক। মেনকা জানতো সে যাই করুক না কেনো, মেহুল তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে, সে তার গায়ে একটি আঁচড়ও আসতে দেবেনা। সে আরো জোরে মেহুলকে সাহায্যের জন্যে ডাকতে থাকলো। কিন্তু সবাই অবাক হয়ে দেখলো মেহুল ধীরে ধীরে মৈনাককে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো, কেউ একটু খেয়াল করলে এটাও দেখতে পেতো যে মেহুলের মুখে তখন ছিলো এক টুকরো হাসি, যা প্রকৃতই তৃপ্তির.....।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.