অভিনয়


ফোনটা ধরবে ধরবে করেও হাতটা সরিয়ে নিল শিবান্যা। প্রোডিউসর কাকার ফোন - এই নিয়ে দশ - বারোবার ফোন এল। রিং শুনে ঘরে আসতে আসতেই শাশুড়িমা-র চাপা গলা কানে এল - "চললেন অভিনয়ের দরবার করতে। স্বামী যে খেয়ে বেরোবে সেদিকে অভিনেত্রীর খেয়াল নেই। মুখে রং মেখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েই যেন মুক্তি।কেমন মেয়ে বিয়ে করেছিস দেখ এবার। " পাশ থেকে একদা ছয় বছরের প্রেমিক - স্বামী গর্জে ওঠে - "অসভ্য মেয়েছেলে। এমন জানলে বিয়ে করতাম না। সব সময় বাইরে মন। মেয়ে, মেয়ের মা দুই সমান। ঐ প্রোডিউসর তরুণ ব্যানার্জি না কি যেন, তার সাথে তো মাখামাখি। ঐ জন্যই তো আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে। আমার কপালেই জুটল....."

বেডরুমের দরজার সামনে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল শিবান্যা, নর্থ কলকাতার বনেদি চৌধুরী পরিবারের বড় বৌমা। ঈশানের কথাগুলো কানে বিঁধতে থাকে - এ সেই ঈশান যে কলেজে মেয়েদের অধিকার নিয়ে গলা তুলত,"নারীকল্যাণ "-এন.জি.ও এর সাথে যে যুক্ত। ছয় বছর ধরে এই সাজানো ঈশানকেই চিনেছে শিবান্যা, যে ঈশান নিজে স্টুডিও পাড়ায় নিয়ে যেত শিবান্যাকে তরুণকাকার কাছে প্রথম সুযোগ পাবার পর। বিয়ের আগে মা বারবার শাশুড়িমা-কে বলেছিল -"শিবের ঐ একটাই শখ - অভিনয়। আপনাদের আপত্তি..."মাঝপথে মা-কে থামিয়ে শাশুড়িমা বলেছিলেন - "আামাদের কোনো আপত্তি নেই। আমারা খুব আপডেটেড ফ্যামিলি। জানেন তো বাবু নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে। আর অভিনয় শিবান্যার শখ, ওর প্যাশন - এতো ভালো কথা। তাছাড়া নিজের বৌমা-কে টিভি-তে দেখব, এতো গর্বের কথা। "শিবান্যা মা-এর চোখে জল দেখেছিল। নিজের অভিনয়ের শখ পূরণ করার জেদে মা আর সংসার করেনি, আলাদা থাকে।মেয়ের কপালে এত ভালো পরিবার আছে ভেবেই মা -র চোখে জল।
বিয়ের এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই ফোন আসে তরুণকাকার-"টেলিফিল্মের কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে। কো-স্টার আর ডেট দিতে পারছেন না।" কথাটা জানার পর থেকেই যা-তা বলছে ঈশান আর শাশুড়িমা। প্রায় সোজাসাপটা বলেছেন -"অভিনয় আর করা যাবে না। মন দিয়ে সংসার করতে হবে। এসব ফালতু শখের ইতি টানতে হবে।" অবাক শিবান্যা অঙ্ক মেলাতে পারে না - বিয়ের আগের আর পরের চরিত্র-দের।

ভাবনার তালটা কেটে যায় শিবান্যার - ঈশানের পোষা টিয়া গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে -"পালা..পালা..পালা.."।পোষ মানাতে বড়ো ভালোবাসে তার স্বামী। বারান্দায় এসে পাশের বাড়ির বেড়ালটাকে দেখে সে। এইজন্যেই এত চিৎকার টিয়ারানীর। শিবান্যাকে আসতে দেখে ধাঁ করে পালালো বেড়ালটা। টিয়া তখন ঘাড় বাঁকিয়ে বলে চলেছে -"পালা..পালা..পালা.." খাঁচা একটু দোলা দিয়ে শিবান্যা ফিসফিস করে -"পালাব..পালাব..পালাব.."

একমাস ধরে সহ্য করে ক্লান্ত শিবান্যা আজ এক বুক জোর নিয়ে তরুণকাকাকে ফোন করেই ফেলে-কালই তবে সে যাচ্ছে। রাতটা কাটতে যেন এক যুগ লেগে গেল। বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গেল মুক্তির রোদ শরীরে মাখতে। খাঁচাটা ফাঁকা দেখে সামনে এগোলো সে। আশেপাশে রক্ত আর পালকের ছড়াছড়ি-বেড়ালটার কাজ তবে। একটা পালক গ্রিলের ফাঁক দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে শিবান্যা বলে ওঠে -"পালা..পালা..পালা.."।

দুপুরে সুটকেসটা একপাশে সরিয়ে সে রেডি হতে লাগল। ডোরবেলটা বেজে উঠল -"গিভ্ মি সাম্ সানসাইন, গিভ্ মি সাম্ রেইন।"আহ্, মুক্তি তবে। দরজা খুলতেই ঈশান হুড়মুড়্ করে ঘরে ঢুকে বলল -"এসব কী ন্যাকামো। ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছো আমায়। বন্ধ করো নাটকগুলো।" সুটকেসটা নিয়া বেরিয়ে যেতে যেতে শিবান্যা চোখ তুলে জবাব দেয় -"নিজের শখের ঠিকানায় ফিরে যাচ্ছি। "

ট্যাক্সিটা সোজা এসে থামে স্টুডিও পাড়া। অনেক কষ্টে তরুণকাকা টেলিফিল্মের ডেটটা পিছোতে পেরেছিল। আলো ঝলকে ওঠে শিবান্যার চোখের সামনে।তার ডায়লগ এবার,
লাইট -ক্যামেরা -অ্যাকশন
-"এই তো আমার শখের ভেলায় সুখের বাসা।তাই শেষে মরতে মরতে তোমার কাছে বেঁচে ফেরা।শখ যে পোষ মানে না।"

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.