অপরিচিত

খবরের কাগজটা মেলে ধরলেও কানের কাছে এক ভিখিরির গান এতোটাই অসহ্য লাগছিল যে এক বর্ণ পড়তে পারছিল না প্রীতম। প্রীতম সান্যাল, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি,অবিন্যস্ত চুল আর পোশাকও ময়লা ,সঙ্গে একটা ঢাউস ব্যাগ। ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছুঁতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল । সমস্ত লোক ট্রেন থেকে নেমে গেলে আস্তে আস্তে বাইরে থেকে একটা ফাঁকা কামরা দেখে ট্রেনে উঠে পড়ল সে । অন্যদিন হলে প্রীতমের মনটা ফুরফুরে থাকে শান্তিনিকেতন যাওয়ার সময় । 'শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ' তাঁর প্রিয় ট্রেনের একটা । আজ কিছুতেই কিছু ভালো লাগছে না ওর । কোচের ওপরে উঠতেই অপরদিকের দরজার সামনে বসে থাকা বুট-পালিশের ছেলেটা সমানে জোরে জোরে আওয়াজ ঠুকে জানান দিতে থাকে যে প্রীতমের বুট-জোড়ার অবস্থা শোচনীয় ।
তা হোক, প্রীতমের তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই । সোজা গিয়ে নিরিবিলি একটা জানলার ধারে গিয়ে বসে পড়ে ।
কিছুক্ষণ পরে ট্রেন চলার প্রথম দুলুনি শুরু হতেই প্রীতম খেয়াল করে এক ব্যক্তি ওর পিছনের গেট দিয়ে উঠে আসে । প্রীতম মনে-প্রানে চায় যেন ভদ্রলোক ধারেকাছে না ঘেঁষে বসে । দূরে,যত দূরে বসে ততই মঙ্গল । এমনিতেই ট্রেনের গায়ে পড়া, আলাপী লোকজন ও পছন্দ করে না,তার ওপরে আজ মুডটাও অফ । প্রীতমের আশঙ্কা সত্যি করে ভদ্রলোক এসে বসলেন ঠিক প্রীতমের উল্টোদিকের জানলার ধারে । লোকটার দিকে এক নজর ভালো করে তাকালো প্রীতম , ভদ্রলোকের মুখটা ভীষণ চেনা লাগছে। কিন্তু কোথায় দেখেছে কিছুতেই মনে করতে পারছে না ।এক নজর দেখে প্রীতম বুঝতে পারে লোকটা কিছু বলবার জন্য তৈরি হচ্ছে , ও খবরের কাগজটা মুখের সামনে মেলে ধরে ।
- আজকে এই ট্রেনটা একটু বেশিই ফাঁকা । আমার আবার এতোটা ভাল লাগে না । তাই এইদিকে আপনার কাছেই এসে বসলাম ।
প্রীতম যা ভেবেছে ঠিক তাই । ভদ্রলোক তাঁর খেজুরে আলাপ জুড়ে দিয়েছে । প্রীতম তাঁর কথা যেন শুনলোই না । নির্বিকার হয়ে পেপার দেখতে লাগল ।
- অনেকদিনের ট্যুরে বেরিয়েছেন মনে হয় ?
এবারে বিরক্ত লাগে প্রীতমের ।
- মানে? কি বলতে চাইছেন ?
- না মানে আপনি যে পেল্লাই সাইজের ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছেন ,সেই সাইজের ব্যাগে চার-পাঁচ দিনের দুজনের পুরী,দার্জিলিং ট্যুর হয়ে যায় ।
-আমার একটু বেশী দিন থাকার প্ল্যান আছে তাই ।
প্রীতম এবারে পেপারের ফাঁক দিয়ে লক্ষ্য করল যে ভদ্রলোক কিছু একটা খাবার বের করে ওকে অফার করে ।
-এই নিন্ একটা টিফিন কেক খান ।

-না । থ্যাংক ইউ । আমি খেয়ে এসেছি ।

- কি যে বলেন! ভাল করে ভেবে দেখুন আপনি মনেহয় ভুল করছেন ।

- মানে ?

-না মানে আপনাকে দেখেই মনে হচ্ছে আপনি দীর্ঘক্ষণ কিছু না খেয়ে আছেন ।

প্রীতম সন্দেহ করে, লোকটা কি ওর পিছু করছে নাকি ?
প্রীতম সত্যিই কাল রাত থেকে অভুক্ত । কিন্তু, লোকটার তো জানার কথা নয় ।প্রীতম আরো সাবধানী হয়ে যায় - আপনি ভুল ধরেছেন । আমি সকালে খেয়েই বাড়ি থেকে বেড়িয়েছি ।
- কে করে দিল ? আপনি নিজেই ..
-না , আমার মিসেস ।
এবারে প্রীতমের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল, বিরক্ত হয়ে বলল
- আপনার মনে হচ্ছে না যে আপনার কৌতূহল সীমারেখা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ?
- না । তবে আপনার মিথ্যে কথা সীমা ছাড়িয়েছে এটা সিওর । যে পেশেন্ট গত ছ-মাস ধরে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছে না, সে আপনাকে ব্রেকফাস্ট বানিয়ে খাইয়েছে ! হাসালেন মশাই !
থতমত খেয়ে প্রীতম সামলে নিয়ে বলল - আপনি কে বলুন তো ? আপনার মুখটা খুব চেনা চেনা লাগছে ।
- তা ভেলোরের টিকিটটা কি করলেন ?

- ভেলোরের টিকিট কাটতে যাব কেন ?

- কাল সকালে যে আপনি পাড়া- প্রতিবেশীদের বললেন, রাতে ভেলোরের ট্রেন ধরবেন ,আর এখন শান্তিনিকেতনের ট্রেনে বসে আছেন ।

- আপনি কি পাশের বাড়ির দত্তদের কেউ হন্ ?

- আপনার স্ত্রীর চিকিৎসার কি ব্যবস্থা করলেন ?
একা তুলে দিলেন নাকি ট্রেনে ?
প্রবল টেনশনে সারা শরীরে উত্তেজনা অনুভব করে প্রীতম । কি বলবে আর কি বলবে না সব গুলোতে থাকে ভেতরে ,চরম উত্তেজনায় সিট ছেড়ে উঠে পড়ে ।ঘড়িতে সময় প্রায় এগারোটা ,তার মানে বর্ধমান আসতে আরো কুড়ি- পঁচিশ মিনিট । লাগেজ নিয়ে ততক্ষণ গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াবে ঠিক করে প্রীতম । তারপর না হয় অন্য কামরায় গিয়ে বসা যাবে । আড়চোখে দেখে সহযাত্রী লোকটাও উঠে পড়ে ওর পেছন পেছন আসছেন ।
- কি চললেন কোথায় ? পালাচ্ছেন নাকি ?

তারপর প্রীতমের অনেকটা কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে - স্ত্রীকে কটা ইন্জেকশান দিয়ে চিরঘুমে শোয়ালেন ?
প্রীতমের মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে এবারে । মনে করতে থাকে বাড়ির কোনো দরজা ভুলবশত খুলে আসেনি তো ? পকেটে হাত দিয়ে চাবিটাও দেখে নেয় ।

- আপনি ! শেষে আপনি এই কাজ করতে পারলেন ?
প্রীতম মনে করতে থাকে, প্রথমে ইন্জেকশান দিয়ে তাঁর স্ত্রী পল্লবীকে চিরঘুমে শোয়ায়, তারপর এমবামিং ক্যামিকাল সারা শরীরে সঞ্চালন করে, তারপর টেপ দিয়ে সারা শরীর মুড়ে দিয়ে কাঠের বড় কার্টনটাতে ...
ঢুকিয়েছিল কিনা মনে করতে পারে না । মনে পড়ে, হ্যাঁ ঢুকিয়ে সেটা আবার খাটের তলায় ঢুকিয়ে দিয়ে এসেছে । তারপর পেছনের গেটে তালা ...হ্যাঁ দিয়েছে । তবে এই লোকটা কে? সে এতোসব জানলো কিকরে ? নাকি পুরোটাই আন্দাজ ?
- কি হলো । উত্তর দিন । আপনার মনে হলো না যে ওকে মেরে ফেলার আগে আমার পারমিশন নেওয়া উচিত ছিল ?

- কি বলছেন কি যা তা তখন থেকে !!

- যা তা ? তোকে এখনই ট্রেনের বাইরে ছুড়ে ফেলে দেবো । দেখবি ?

প্রীতম দেখে হঠাৎ তাকে গেটের সঙ্গে ঠেসে ধরে লোকটা ।
- আঃ! আমার কলার ছাড়ুন,পড়ে যাবো। আআআ... আমিইইই....আমার কিছু করার ছিল না,বিশ্বাস করুন ।
প্রীতম এবারে কান্নায় ভেঙে পড়ে ।
- একবছর ধরে ও এভাবে যন্ত্রণা নিতে নিতে আর পারছিল না । বার বার আমাকে বলতো ওকে মেরে ফেলে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে । আমি পারতাম না,দুজনে মিলে কাঁদতাম। ডাক্তার বলেই দিয়েছিল এইরকম বোন্ ক্যান্সারে যন্ত্রণা আরো বাড়বে । শেষের দিকে ও খাবার খেতে চাইতো না, বলতো তাতে যদি তাড়াতাড়ি মারা যাই, সেটাই ভালো । একবছর ওর মুখে কোনো হাসি দেখিনি, দু-দিন আগে যখন আমি রাজি হলাম ওকে মুক্তি দেবার জন্য, অনেকদিন পর ওর মুখে একটা অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি দেখলাম । ও বলতো , ভগবান না চাইছে তো কি, তোমাকেই তো আমার ভগবান মেনেছি, তুমি পারবে না এই যন্ত্রণার থেকে আমাকে রেহাই দিতে? তাই আমি পেরেছি । কার থেকে পারমিশন নিতাম? ওর তো বাবা- মা কেউ আর বেঁচে নেই । আপনাকে আমি তো এর আগে কোনদিন দেখিই নি, ওর যদি আপনি এতো কাছের লোক হন তাহলে কোথায় ছিলেন যখন ও প্রতিদিন অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিল?
- কি! আবার বড় বড় কথা ! ভুল করেছিস তুই। তোর মনের ভেতরেও ওকে মেরে একটা সন্তুষ্টি এসেছিল । তুই ও আর পারছিলি না চব্বিশ ঘণ্টা ওকে সেবা করতে ,কই সেগুলো তো বলছিস না? ওকে যখন মেরেছিস তুই ও মর ।
একটা ট্রেন আসছে উল্টোদিক থেকে , চারপাশে হাতড়ে নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা কাজে লাগল না ।লোকটার থেকে এমন একটা ধাক্কা সে পেল যে টাল সামলাতে না পেরে ট্রেনের সামনে গিয়ে পড়ল।
ট্রেন চলে যাওয়ার পর, প্রীতমের ছিন্নভিন্ন দেহ উদ্ধার হয় । ঐ দেহাবশেষের মধ্যে প্রীতমের পরিচয়পত্র আর গতকালের ভেলোরের ট্রেনের দুখানা টিকিট উদ্ধার হয় । কামরার ঐ দিকটায় কোনো লোক ছিল না বলে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে কমবয়সী বুট- পালিশের ছেলেটাকে এক জি.আর.পি.এফ অফিসার জিজ্ঞাসাবাদ করতে ছেলেটা নিম্নরূপ বয়ান দেয়-
ও বাবুতো কামরায় উঠেই কি সব আপনার থেকে বকতে থাকলো । তার পরে খুব জোরে জোরে চেঁচালো ,আমি উঠে দেখলাম কেউ নেই,একা একাই বকে যাচ্ছিল । পুরো পাগল ছিল । তারপর নিজের কলার ধরে নিজেই ঘষ্টে ঘষ্টে গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল । আমি তো বলছি, বাবু পড়ে যাবে ,সইরে আসো । শুনলই না, সামনে ট্রেন দেখে ঝুপ করে লাপ মারলো । তারপর আমিই ঐদিকে বাবুদের ডেকে চেন টানতে বললাম । এর বেশি কিছু জানি নে ।

জি.আর .পি .এফ অফিসার সব নোট করে পাশের অফিসারকে বলল - নে, আরও একটা সুইসাইড কেস্ । এই সপ্তাহে এই নিয়ে তিনটে হলো ।

~ সমাপ্ত ~

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.