উপেক্ষিতা

উপেক্ষিতা

ব্যাগপত্র স্টেশনে নামিয়ে অটোওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে এক বোতল জল কেনে রিক্তা। প্লাটফর্মের ঘড়িতে সময় জানাচ্ছে রাত্রি দশটা বেজে পঁচিশ মিনিট। রিক্তার ঘড়ি পাঁচ মিনিট আগে চলে। কাজের খেয়ালে সেটা অবশ্য মনেও থাকেনা বলে অনিকেত রিক্তাকে জানিয়েই ঘড়ির সময় বদলে দেয়। জলের বোতল হাতে নিয়েই ফাঁকা জায়গা দেখে বসলো, ট্রেন আসতে এখনও প্রায় আধঘণ্টা সময় আছে। রাতের ট্রেনে একা ট্র্যাভেল করা নিরাপদ নয় বলে অনিকেত কিছুতেই বাবা মায়ের কাছে যেতে দিতে চায়না অনিকেত। মাত্র পনেরো ঘণ্টার রাস্তা তাও ঘুমিয়ে, মোবাইল ঘেঁটেই কেটে যেতে পারে। তবুও ঘন ঘন ফোন করে অনিকেত। সব গুছিয়ে নিয়েছে কিনা, খেয়েছে কিনা, পর্যাপ্ত জল আছে কিনা, সেল ফোনে চার্জ আছে কিনা। আসলে অনিকেত জানতে চায় রিক্তা ঠিক ঠাক আছে কিনা। সকালের কোন একটানা ট্রেন পাওয়া যায়না, আর ব্রেক জার্নি করা রিক্তার পোষায় না বলে কোনোমতে অনিকেতকে রাজি করায়। চার বছরের টুকটুকও এখন আর মা না থাকলে কান্নাকাটি করেনা। রিক্তা ওকে বুঝিয়েছে বাবা মায়ের প্রথম সন্তান হিসেবে দাদু দিদুনের দেখাশোনা করা কত জরুরি। টুকটুক দিদাকে বলে 'দিতা'। মোবাইল ধরে বলে- 'দিতা তোমরা এখানেই চলে এসনা, মাম মামকে ছাড়া আমার ঘুম আসেনা।' টুকটুকের কথা শুনে রিক্তার মা রজনী বলেন- 'তাহলে এই বাড়িটার দেখাশোনা কে করবে বলতো টুকটুক?' চার বছরের টুকটুকের কথা ভেবে রজনী রিক্তাকে ঘন ঘন আসতে মানা করেন, মুখে বলেন- 'যা হবার হবে, এই পোড়া কপাল নিয়ে আর ভাবতে পারিনা। তুই এভাবে একা আসা যাওয়া করিস না। এবার এলে জামাইয়ের সাথেই আসিস।' রিক্তা বলে-'প্রতি মাসে ওর অত সময় হবেনা মা, আর আমি না এলে চলবে? টাকা পাঠানো বড় কথা নয়। বাবার ওষুধ প্রেসক্রিপশন এসব একা বুঝে উঠতে পারবে তুমি?'

অন্যদিনের তুলনায় ট্রেন আজ সময়েই আছে, পনের মিনিট লেট। এর মধ্যেই স্টেশনে বেশ ভিড় জমতে শুরু করেছে। এতক্ষন হাতে একটা পত্রিকা নিয়ে বসে ছিল রিক্তা, সেটা এখন হ্যান্ডব্যাগে চালান করে দিল। ভিড়ের মধ্যে পড়তে ভাললাগেনা। দুএকদিনের জন্যে আসা তাই বেশি লাগেজ নেই, কুলি ছাড়াই ট্রেনে চড়িয়ে ফেলতে পারে। করলও তাই। সংরক্ষিত সিট খুঁজতে বেশি সময় লাগলো না। অনিকেত বলেছিল মাঝের দিকে হবে, আপার বার্থ। আপার বার্থ মেয়েদের জন্যে তুলনামুলক সেফ মনে করেই প্রতিবার অনিকেত জোর করে আপার বার্থের টিকিট কাটায়।

সিটে ঠিকঠাক নিজেকে অ্যাডজাস্ট করে নিয়ে অনিকেতকে একটা মেসেজ করল। রিক্তা জানে মেসেজে কোন লাভ নেই, অনিকেত ফোন করবেই। ভাবা মাত্রই রিং বেজে উঠলো। এর মধ্যে সহযাত্রীরা ভিড় করতে শুরু করেছে।

সাধারনত রাতের ট্রেনে রিক্তার ঘুম আসেনা, কিন্তু আজ ইচ্ছে করেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো। হকারদের গলা খাঁকড়িতে যখন ঘুম ভাঙল তখন সূর্যের আলো বেশ স্পষ্ট, আটটা বেজে দু তিন মিনিট। নিচের বার্থে দুটি বাচ্ছা মেয়ে নিয়ে এক পরিবার, গতকালই দেখেছিল রিক্তা। ওদের মধ্যে পাকা পাকা কথা বলা ছোট মেয়েটাকে নিয়ে বাকি সহযাত্রীদের কৌতুক উৎসাহের অন্ত নেই। চোখে মুখে জল দিয়ে এসে চা ওয়ালাকে চা দিতে বলে মোবাইল দেখে- এখনও প্রায় ছয় ঘণ্টা বাকি। বাচ্ছা দুটির মা নিজে থেকেই রিক্তাকে জিজ্ঞেস করলেন-'আপনি কি একাই?' চায়ে চুমুক দিয়ে রিক্তা সামান্য হেসে শুধু 'হুম' টুকুই বলতে পারল। 'সাহস আছে আপনার বলতে হবে, আমি হলে পারতাম না।' ভদ্রমহিলা এদিক ওদিক বকেই চলেছেন। সামনে কেউ এক নাগাড়ে বসে কথা বললে উত্তর না করাটা অভদ্রতা মনে করে রিক্তাও দু একটা বলছে। বাক্যালাপের মধ্যে ছোট মেয়েটা এসে বায়না করছে- 'মা চিপস...' 'মা চকো...' মেয়েটার বয়েস বছর পাঁচ হবে। ভদ্রমহিলা হাঁক পেড়ে বরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন-' কি চাইছে দাও না ওকে।' বলেই আবার নিজের কাহিনীতে মগ্ন হচ্ছেন। দশ বছরের বড় মেয়েটা হাঁ করে বসে আছে, যেন ওই চকো, চিপস তার অধিকার নয়। যা কেনা হচ্ছে শুধু ছোটর জন্যে। বাবার কানে ফিসফিস করে আব্দার করলে বাবা ধমকে বলছে-'ও তো ছোট, সবটা খাবে নাকি! তুইই পাবি।' অথচ পাঁচ বছরের মেয়েটা সব শেষ করে দিদির মুখের সামনে দিয়ে জানলা দিয়ে প্যাকেট ফেলে দিচ্ছে। বাবা মায়ের ভ্রূক্ষেপ নেই। বেচারি মায়ের কাছে আবদার করতে গিয়েও মৃদু বকুনি খেয়ে শুকনো মুখে বসে আছে। উপেক্ষার কারন ভেবে পায়না রিক্তা, অথচ নিজের সন্তান নয় বলেও মনে হচ্ছেনা। রিক্তা থাকতে না পেরে বলল- 'ওদের চিপস কিনে দিই?' চিপস শুনে শুকনো মুখে হালকা হাসি ফুটল বলে প্রত্যুত্তরের আশা না করেই রিক্তা এক প্যাকেট চিপস কিনে হাতে দিল। সহজ সরল মুখে কেন জানি রিক্তার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়িয়ে দিল। কিশোরী বয়েসের ছবিতেও রিক্তার এইরকম সরলতাই ছিল। সবাই বলত কি যেন একটা গোপন আছে এই সরলতার মধ্যে। এই মেয়েটার চোখে সেই গোপনীয়তা খোঁজে রিক্তা। মেয়েটা তখন বাইরে প্রকৃতি দেখছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাঁচ বছরের বোনের আবদারে চিপ্সের প্যাকেট ছিনতাই হয়ে হস্তান্তর হয়ে যায়। বাবা মায়ের প্রতিবাদের জায়গায় সমর্থন দেখে রিক্তার মনে হয় সময় এগিয়ে যায়, পরিস্থিতি বদলায় না।

একসময় রিক্তাও এভাবেই তার পাঁচ বছরের ছোট বোনের আব্দারের কাছে নত হওয়া বাবা মায়ের দ্বারা উপক্ষা পেয়ে এসেছে। প্রতি মুহূর্তে রিক্তা কারন অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করত। নিজেকে বড় অবাঞ্ছিত মনে হত তার। পরে ভাবত অর্থনৈতিক কারনেই হয়ত তার শখের পাওনা গুলো থেকে সে বঞ্চিত। ভুল ভাঙত যখন দেখত প্রয়োজনের অতিরিক্ত আর সময়ের আগেই ছোট বোন সিক্তা সব পাচ্ছে। এমনকি বোন জন্মানর আগে থেকেই রিক্তা আলাদা ঘরে ঘুমায়। এটা বরং রিক্তাকে স্বনির্ভর করেছিল। তা বলে মায়ের ভালবাসা পাওয়ার অধিকার নেই বলে কখন বিশ্বাস করতে মন তার চাইতনা। মাঝরাতে বাবা মায়ের ঘরের দরজা ধরে নিঃশব্দে কেঁদেছে রিক্তা। প্রতিবেশিদের কাছেও মা সব সময় সিক্তার চিন্তা প্রকাশ করত, প্রশংশা করত। রিক্তার নিজের নিন্দেটুকুই শোনার জন্যে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে গল্প শুনত। না, রিক্তা নিন্দাতেও ছিলনা। উপেক্ষিতা হতে হতে একদিন অস্তিত্বহীন হয়ে যাবার আগেই রিক্তা হোস্টেলে থেকে কলেজ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এর জন্যেও প্রতিকুলতার মুখমুখি হতে হয়। কিন্তু ওই যে সবাই বলত কি যেন একটা গোপন আছে রিক্তার চোখে। গোপন ব্যাপারটা রিক্তা আবিষ্কার করে, প্রতিবাদ করে। ভীষণ প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের জেরে হয়ত পড়াশোনাই বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু ভাগ্যের শিকে ছিঁড়ল, কি মনে করে বাবা অনুমতি দিয়েছিল হোস্টেলে থেকে পড়ার। এর পর প্রায় তিন বছর বাড়ি মুখো হয়নি রিক্তা। একদিন অনিকেতের সাথে সম্পর্কের কথা জানাতে এসে সে জানতে পারে বাবার রিটায়ার করার পর পি এফ এর সমস্ত জমানো পুঁজি নিয়ে সিক্তা পালিয়ে গিয়ে নিজের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করে। বাবা মাকে জানাবার প্রয়োজন টুকুও মনে করেনি। বাবামা ততক্ষণ আব্দার আর অন্যায় আব্দার মেটানোর পার্থক্য বুঝেছিল। তারপর থেকে বাবা মায়ের সব দায়িত্ব রিক্তাই নিয়েছে। মাসে মাসে টাকা পাঠানো, অর্ধেক শরীর বিকল হয়ে যাওয়া বাবার ডাক্তার ওষুধ, ইলেকট্রিক বিল মেটানো ইত্যাদি সমস্ত দায়িত্ব প্রতিমাসে সময় মতো এসে করে যায় সে। কিন্তু অকারনে উপেক্ষিতা হওয়ার বেদনা বুকের মধ্যে কোথাও রিন রিন করে এখনও বাজে।

নিজের অতীত ভাবতে গিয়ে রিক্তা খেয়াল করেনি যে সাথের পরিবারটি নামার উপক্রম করছে। হুঁশ ফিরল যখন ভদ্রমহিলা বলছেন- 'দিদি পা টা একটু সরাবেন, ব্যাগটা নেব।' রিক্তা দেখল দশবছরের মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে বিদায়ি হাসি দিচ্ছে। সেই হাসি দেখে তার মনে হয় এই মেয়ে যেন জগতের সবচেয়ে সুখী, উপেক্ষা বোঝে না। না বুঝলেই ভালো, কম চাহিদার মানুষগুলোই সুখে থাকে। ট্রেন স্টেশনে থামল। লোকজন একে একে নামতে লাগলো। প্লাটফর্মে আইসক্রিম দেখে বড় মেয়েটি ট্রেন থেকেই বলছে-'বাবা এবার তো একটা আইসক্রিম দাও।' সঙ্গে সঙ্গে বোন বলছে-'আমিও।' ভদ্রমহিলা বললেন-'একটাই নাও, বোন খেতে পারবেনা, তখন খেও।' বড় মেয়েটির চোখ এবার জ্বলে উঠলো, প্রতিবাদের জল কান্না হয়ে গড়িয়ে এল- 'আমি আলাদা আইস্ক্রিম না পেলে ট্রেন থেকে নামবো না।' বাবা মা হতভম্ভ। হয়ত এটাই ওর প্রথম প্রতিবাদ ছিল। চড় থাপ্পরে কাজ হবেনা জেনে দুটো আইস্ক্রিম কেনা হোল। কে কার অধিকার দেয়, অধিকার তো কেড়েই নিতে হয়। রিক্তা ভাবে মেয়েতটার চোখের গোপন ভাবটা এতক্ষণ কেন দেখতে পেলনা!

========================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.