আজ আমার সত্যিকারের কর্মজীবন আরম্ভের ঠিক এক মাস পূর্ণ হল।

অবশ্য এর আগে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এম বি বি এস, তারপর দিল্লীর এইমস থেকে এম ডি, এই সবের ফাঁকে ফাঁকে হাউজস্টাফশিপ বা মাসকয়েকের জন্য প্রাইভেট নার্সিং হোমে পার্ট টাইম প্র্যাকটিস কিংবা টুকটাক পেশেন্ট দেখা, এইসবই করেছি।

তবু পুরোদস্তুর সরকারী চাকরিতে যোগ দিয়েছি এক মাস আগে।

সকাল থেকে এই নিয়ে মনটা বেশ উৎফুল্ল ছিল, কিন্তু অফিসে এসে যে পরিস্থিতির সন্মুখিন হতে হল, তাতে খুশি থাকা তো দূর, টেনশনে, চিন্তায় পুরো মেজাজটাই তেতো হয়ে গেল।

আমার প্রথম পোস্টিং হয়েছে কলকাতা পুলিশের মর্গে। কাঁটাপুকুর অঞ্চলে। আমার সব বন্ধুবান্ধবরা যখন গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বাধ্যতামূলক রুরাল কোটা ফুলফিল করতে গিয়ে তাদের ভালমন্দ মেশানো, বইপড়া জ্ঞানের সম্পূর্ণ উল্টো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা তুলে ধরছে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকের বন্ধুদের গ্রুপে, আমি তখন খাস কলকাতায় বসে পা দোলাচ্ছি, কলেজ ষ্ট্রীট, মেডিকেল কলেজ করে বেড়াচ্ছি। সপ্তাহে একদিন ছুটি মিলেই যায়, সেদিনটা নন্দন, অ্যাকাডেমি চষে ফেলি। কাজেই বন্ধুরা আমায় এখন বেশ ঈর্ষার চোখে দেখে। আমি তখন হাসি, “খুব যে কার্ডিও নিউরো গাইনো করে তখন লাফাচ্ছিলি, ফরেন্সিক নিয়ে স্পেশালাইজেশনটা করলেই তো পুলিশ লুফে নিতো রে পাগলা!”

কথাটা মিথ্যে নয়। ফরেন্সিক এর ডাক্তার এখনো আমাদের দেশে ভীষণ কম। বিদেশের মত আমাদের দেশে অটোপসি করার স্পেশালিষ্ট ডাক্তার প্রায় পাওয়াই যায়না। ডাক্তারির প্রথম বছর থেকেই আমি ঠিক করে রেখেছিলাম হায়ার স্টাডি করতে হলে তাই ফরেনসিকেই করবো।

এই মর্গে আছি আমি আর ডঃ সরখেল। ডঃ সরখেল মাঝবয়সী অভিজ্ঞ ডাক্তার, এই কয়েকদিনে বেশ ভালোই মনে হয়েছে। এক সপ্তাহ ডঃ সরখেলের ডিউটি থাকে, অন্যটায় আমার। অল্টারনেট সপ্তাহগুলো আমরা লালবাজারের মেডিকেল রুমে বসি। এখানে কাজের চাপ মোটামুটি কমই থাকে, তবে মাঝেমধ্যে দুর্গাপুজোর সময় বা কোনো মিটিং মিছিল থাকলে হঠাৎ করেই অনেক ক’টা বডি চলে আসে অটোপসি, মানে সাধারণ ভাষায় যাকে বলা হয়ে পোষ্ট মর্টেম, সেই জন্য। তখন বেশ চাপ পড়ে যায়। এখানে আমার সহকারী বলতে লাল্টু আর ইরফান, দুজন ডোম, অটোপসি করে সেই স্পেসিমেন রিপোর্ট আমরা পাঠিয়ে দিই মেডিক্যাল কলেজের প্যাথলজি ডিপার্টমেন্টে, সেখান থেকে চলে যায় পুলিশের কাছে।

আমাদের দেশে অটোপসি, মানে পোষ্ট মর্টেম মূলত করে ডোমরাই, আমরা শুধু সুপারভাইজ করি, ক্রিটিকাল কেস হলে তখন হাত লাগাতে হয়।

লাল্টু, ইরফান, আমি আর ডঃ সরখেল ছাড়া আছে ক্লার্ক ষষ্ঠীদা, রান্নার মালতিমাসি আর দুজন সিকিউরিটি গার্ড। আমি আর ডঃ সরখেল অল্টারনেট সপ্তাহে আসি, কিন্তু বাকিদের এখানেই ফুল টাইম ডিউটি।

ষষ্ঠীদার বয়স সত্তরের উপর হয়ে গেলেও জয়েনিং এর সময় তার বয়স এতটাই কমানো ছিল যে সে মনে হয় আশি বছর বয়সে রিটায়ার করবে। আগে ছিল লালবাজারের হাবিলদার, বছর দশেক হল বয়সের ভারে ওই ঝক্কির কাজ সামলাতে পারছিল না বলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এখানে। ওর কাজ মূলত মেডিকো লিগ্যাল ইনভেস্টিগেশনের জন্য কোন ডেডবডি আসছে, তার কেস হিষ্ট্রি, কবে পোষ্ট মর্টেম হচ্ছে, এইসব ট্র্যাক করার রেজিস্টার মেনটেন করা।

বাইরের গেটে আছে যোগিন্দর আর ভূপতি, ওরা এখানকার সিকিউরিটি গার্ড। একমাত্র ওরাই অল্টারনেট করে চব্বিশ ঘণ্টা মোতায়েন থাকে মর্গের দরজায়। ওরা থাকে একটু দূরে পুলিশ কোয়ার্টারে। বাকি আমরা সবাই সকাল দশটা থেকে বিকেল ছ’টা অবধি থাকি। ডাক্তার হিসেবে এরকম বাঁধাধরা ডিউটি পাওয়াটাও ভাগ্যের ব্যাপার বৈকি! এমনিতে নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয়ের আগে আর সূর্যাস্তের পরে কোনো পোষ্ট মর্টেম করা হয়না।, তাই আমাদেরও থাকার কোনো অর্থ নেই।

আমাদের রান্না করে মালতী মাসি। মালতী মাসিকে আমরা মাসি বলি ঠিকই কিন্তু তার বয়স পঁয়ত্রিশ মত হবে বড়জোর। একটু মোটার দিকে গড়ন, হাসিখুশি, বেশ মা-মা টাইপ।মালতী মাসি পুলিশের কর্মচারী নয়, এই মর্গের স্টাফরাই নিজেদের খাওয়ার সুবিধার জন্য মাসিকে ঠিক করেছিল চার-পাঁচ বছর আগে, সরকার থেকে গ্যাস সিলিন্ডার, রান্নার সরঞ্জাম বাবদ কিছু টাকা মাসে দেওয়া হয়, আর বাকি খরচ, মালতী মাসির মাইনে, সব স্টাফেরাই ভাগাভাগি করে দেয়। মাসি এমনিতে খুব ভাল, কিন্তু মুখে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় শ্বেতীর দাগ থাকায় গৃহস্থবাড়িতে রান্নার কাজ পেতোনা, এই কারণেই হয়ত মাসির বিয়েও হয়নি। কিন্তু আমাদের ওইসব ছুঁৎমার্গ নেই। মাসির রান্নার হাত চমৎকার। তাছাড়াও মাসি প্রোফেশনাল ধরণের নয়, নিজে থেকেই এটা ওটা করে দেয়। এই তো সেদিন আমার পেটটা একটু খারাপ হয়েছিল অফিসে এসে, বারবার ও আর এস এর জল করে দিচ্ছিল, তারপর একদিন বৃষ্টিতে পুরো কাকভিজে হয়ে অফিসে এসেছিলাম, আমার শার্টটা কেচে দিয়েছিল যত্ন করে। তাছাড়া সকালবেলাটা মাসি আনাজ বিক্রি করে বাজারে, কাজেই আমাদের বাজারে যাওয়ার ঝক্কিটুকুও সামলাতে হয়না। মাসিই সব নিয়ে আসে।

আমরা এইটুকুতেই খুশি।

বহু পুরনো এই বাড়িটা, ধূলিধূসরিত আলমারি, তার মোটা ধুলোর আস্তরণে মোড়া সাবেক আমলের কাঁচ, কড়িবরগার ছাদ আর ঝুলে ভরা বড় বড় ঘর। একপাশে বিশাল কোল্ড স্টোরেজ রুম, তাতে সারসার ভল্ট, যার একেকটায় রয়েছে প্রিজার্ভ করা বডি, কোনোটা এসেছে কয়েকদিনের জন্য, অটোপসি হবে, আবার চলে যাবে। কোনোটার আবার অ্যাকসিডেন্টে মারা গিয়ে কোনো পরিচয়ই পাওয়া যায়নি, অজ্ঞাতকুলশীল হয়ে সেই হতভাগ্য ঘুমিয়ে রয়েছে বরফশীতল ঠাণ্ডা ঘরে। আমাদের এখানে এইরকম গোটাপনেরো আনআইডেন্টিফায়েড বডি আছে যারা এখানকার লং টার্ম রেসিডেন্ট। বেশ কয়েকমাস তারা এখানে থাকে, পুলিশি ক্লিয়ারেন্স পেয়ে গেলে চলে যায় মেডিক্যাল কলেজের স্টুডেন্টদের অ্যানাটমি ক্লাসে।

এছাড়া আছে দুটো পোষ্ট মর্টেম করার অপারেশন থিয়েটার আদলের ঘর, যার একটা অব্যবহারে প্রায় বন্ধই পড়ে থাকে। আর কিছু অফিস রুম।

আর আছে লম্বা লম্বা অন্ধকার জমাট বাঁধা ফাঁকা করিডর, যেখানে পা রাখলেই প্রতিধ্বনি মনে করিয়ে দেয়, এখানে আমরা ছাড়াও হয়ত আরো কেউ আছে।

অন্ধকার নৈঃশব্দও যেন তাদের উপস্থিতির জানান দেয় ফিসফিস করে।

মাঝে মাঝে মেডিক্যাল কলেজের স্টুডেন্টরা আসে পোষ্ট মর্টেম করা দেখতে, তখন এই শতাব্দীপ্রাচীন বাড়িটা প্রাণ ফিরে পেয়ে একটু হলেও যেন গমগম করে ওঠে, তারপর ওরা চলে গেলে আবার ফিরে যায় মৃত্যুরাজ্যে।

আমরা এই ক’জন শুধু থাকি জীবন্তসমাজের প্রতিভূ হয়ে।

আজও তেমনই এসে সবে বসেছিলাম নিজের কেবিনে, পেন্ডিং কাজ বলতে কাল একটা বডি এসেছিল বিকেলবেলা, সুইসাইড কেস, তার পোষ্ট মর্টেম করতে হবে আজ। তাড়াহুড়োর কিছু নেই, চা-টা খেয়ে শুরু করা যাবে’খন। আমরা যে তিন-চারটে ঘর ব্যবহার করি, সেগুলোকে ঝেড়েমুছে সাফসুতরো করে রাখে মালতিমাসি, বিশেষ করে আমার ঘরটা তো সবসময় ঝকঝকে হয়ে থাকে। বাকি সব ঘর অবশ্য খোলাই হয়না।

চেয়ারে বসেই রুটিন মাফিক সঞ্চয়িতাকে ফোনটা করেছিলাম, “এই পৌঁছলাম, তুমি কোথায়? হসপিট্যালে পৌঁছে গেছ?”

বাস-অটোর আওয়াজের মধ্যে সঞ্চয়িতার হাঁপানো ব্যস্ত গলা পেলাম, “এই ঢুকছি, রাস্তায় খুব জ্যাম, পরে করছি, কেমন?”

সঞ্চয়িতা আমার প্রেমিকা কাম মেডিক্যাল কলেজের ক্লাসমেট, আমি দিল্লীর এইমসে যখন ফরেন্সিক সায়েন্স নিয়ে এম ডি করতে গিয়েছিলাম, ও তখন সায়কিয়াট্রি নিয়ে কলকাতাতেই এম ডিতে ভর্তি হয়েছিল। এখন ওর পোস্টিং বর্ধমানে। হসপিট্যালের কাছেই বাড়ি ভাড়া করে থাকে। দুই বাড়িতেই মোটামুটি ঠিক হয়ে আছে আর বছরদুয়েকের মধ্যে আমরা বিয়ে করে নেবো। সারা সপ্তাহ কাজের ফাঁকে টুকটাক কথা হয় আমাদের, উইক এন্ডে ও এলে তখন দেখা হয়।

আমি ফোনটা রেখে সকালের মিঠে রোদে বসে আজকের কাগজটা তুলতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই ঘরে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল ইরফান, “পবিত্রদা, একবার চলুন শিগগিরই কোল্ড স্টোরেজে।”

এরা সবাই প্রথমে আমায় স্যার বলা শুরু করলেও, আমিই সবাইকে জোর করে দাদা বলিয়েছি, স্যার ট্যার শুনতে আমার ভাল লাগেনা। তাছাড়া মর্গের ডাক্তার হয়ে কাজ করতে গেলে যে ডোমেদের হাতে রাখতেই হবে, সেটা আমার ছাত্রাবস্থা থেকেই জানি, তাই এসেই দাদাগিরি চালু করে দিতে এরাও আমাকে বেশ আপন করে নিয়েছে।

ইরফানের মুখ দেখে আমি বুঝতে পারলাম, সিরিয়াস কোনো ব্যাপারেই ও ডাকছে আমায়। আমি জলদি উঠে দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে।

মালতিমাসি আমার চা নিয়ে ঘরে ঢুকছিল, আমি বললাম একটু ঢাকা দিয়ে টেবিলে রাখতে।

লম্বা করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললাম, “কি হয়েছে? আবার ইঁদুরের উৎপাত নাকি?”

আমি জয়েন করার আগে আগেই এই মর্গ কাগজের শিরোনামে এসেছিল, তাও কয়েকমাস আগে। মুখ্যমন্ত্রীর আচমকা পরিদর্শনে সেবার ধরা পড়েছিল কোল্ড স্টোরেজে ইঁদুরের ভয়ানক উৎপাত। অনেক আনআইডেন্টিফায়েড বডিও মিউটিলেটেড কন্ডিশনে পাওয়া গিয়েছিল, যাদের বিভিন্ন অরগ্যান ইঁদুরে খুবলে খেয়েছে। আমার আগে এখানে যিনি ছিলেন, সেই ভারপ্রাপ্ত ডঃ বটব্যালকে তারপরেই সরিয়ে দেওয়া হয় এখান থেকে। আমি সে’কথা ভেবে বেশ টেন্সড হয়ে পড়লাম, এরকম কিছু আবার হলে তো বেশ চাপের ব্যাপার।

ইরফান মাথা নাড়ল, “না ওসব কিছু নয়।”

আমি বললাম, “তবে? রেফ্রিজারেটর কাজ করছে না ঠিকমত?”

ততক্ষণে আমরা পৌঁছে গেছি কোল্ড স্টোরেজে। লম্বা বিশাল একটেরে ঘর, তার দুপাশে মোট একশোটা ভল্ট। টিউব লাইট জ্বলছে গমগম করে, দূরে একটা স্ট্যান্ড ফ্যানও রয়েছে, তার সামনে দেখলাম আমাদের আরেকজন ডোম লাল্টু দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ভেতরে ঢুকতেই সেই ভ্যাপসা অদ্ভুত গন্ধটা এসে নাকে লাগল, যেটা এই ঘরের ট্রেডমার্ক গন্ধ।

লাল্টু ছেলেটা এমনি বেশ হাসিখুশি, আমাদের এই ক’জনের নির্জন অফিসে ও সারাক্ষণই হইহুল্লোড় করে মাতিয়ে রাখে, আমাদেরও সময় কেটে যায়। কিন্তু এখন ও কেমন প্রচণ্ড ভয় পাওয়া গরুর মত চোখে আমাদের দিকে তাকালো।

আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ইরফান লাল্টু কেউই খোলসা করে কিছু বলছে না।

আমি এবার একটু জোরেই বললাম, “আরে কি হয়েছে বলো। চুপ করে আছ কেন!”

আমার ধাতানিতে এবার কিছুটা কাজ হল। ইরফান দেখলাম আমার পাশ থেকে এগিয়ে গেল পায়ে পায়ে, উনিশ নম্বর ভল্টটার দিকে, ভল্টের সামনের হাতলটা ধরে টান মারল।

উনিশ নম্বর ভল্টে তো কালকের কেসটা রয়েছে, যেটার আজ পোষ্ট মর্টেম করার কথা। আমি ভ্রূ কুঁচকে এগিয়ে গিয়ে ভল্টের দিকে তাকালাম আর সঙ্গে সঙ্গে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমস্রোত নেমে গেল।

ঠাণ্ডা লাশঘরের উনিশ নম্বর ভোল্টের মধ্যের ট্রে’টা ফাঁকা।

ভেতরে লাশের কোনো চিহ্ন পর্যন্ত নেই! সেই বিশ্রী গন্ধটা যেন জোরে এসে নাকে ঝাপটা মারল আরও একবার।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.