ষষ্ঠীর পুজো শুরু হয়ে গেছে। ঢাক আর কাঁসরের সাথে বাড়ির দুই বৌমার উলু দেওয়ার শব্দ সেনগিন্নীর কানে পৌঁছেও যেন পৌছচ্ছে না। তিনি বড় উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত। কর্তা মারা যাবার পর এমনটা একবারও হয়নি। দুর্গা পুজোয় এ বাড়িতে নবমীতে কুমারী পুজো হয়নি আজ পর্যন্ত তা কেউ শোনেনি। নবমীতে কুমারী পুজো এই বাড়ির অন্যান্য ঐতিহ্যের মধ্যে একটি। কিন্তু এই বার কেন এমন হল। কোথাও কোনো নয় বছরের কুমারী মেয়ে পাওয়া গেল না। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন কারো পরিবারের মেয়ের বয়স নয় বছর না। হয় কেউ বড়, নতুবা কেউ ছোট।

নিজের খাটে বসে এই সব চিন্তাই করছেন সেনগিন্নী। বাড়ির এতোদিনের প্রথা এইভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। পরকালে কি জবাব দেবেন তিনি তাঁর শাশুড়ী, ঠাকুমা-শাশুড়ীকে। ভাবতে ভাবতে তাঁর প্রেসারটাও আজ বেড়ে গেছে। মায়ের পুজোয় এমন বাধা কার কোন পাপে হল। তিনি কি কোনো ভুল করলেন। না, তাঁর পরিবারের কেউ। বড় ছেলে উদয়শংকর আজ ধানবাদে তাঁর বোনের মেয়ের কাছে গেছে। শশী বলেছিলো তাঁর মেয়ের ননদের মেয়ের বয়স নাকি নয়। শেষ ভরসা। এবার কেউ নিজে থেকেও আসেনি তাঁর মেয়েকে নিয়ে কুমারী পুজোর জন্য। অন্যান্য বার কত বাবা-মা এমনিই আসেন। সেনবাড়ির দুর্গা পুজোর আলাদা একটা মান আছে। সেনগিন্নী কিছুই যেন ভাবতে পারছেন না।
শাশুড়ীকে ষষ্ঠীতলায় না দেখে বড় বৌমা দোতলায় উঠে আসে। শাশুড়ীকে এই সময় তাঁর ঘরে শুয়ে থাকতে দেখে একটু অবাক হয়। আজ পর্যন্ত এই সময় শাশুড়ীকে সে শুয়ে থাকতে দেখেনি। তার উপর দুর্গা পুজোর এই কটা দিন তো নয়ই। বাড়ি ভর্তি আত্মীয়-স্বজন। পাড়ার লোকজন আসছেন, যাচ্ছেন। আর সেনগিন্নী দোতলায় তাঁর ঘরে শুয়ে আছেন। নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। শাশুড়ীর শরীরের কথা ভেবে সে নিজেই সরবতের গ্লাস নিয়ে হাজির হয়। এমনিতে সকলে সেনগিন্নীতে ভয়ই করে। এ বাড়িতে তাঁর কথা অমান্য করে চলা স্বয়ং সেনকর্তারও সাহসে কুলোয়নি কখনও। আর ছেলেরাতো মা যা বলছেন, মাতৃ বাক্য শিরোদার্য করে তাই করছে। তাতে কার খারাপ লাগল, ভালো লাগল সে দিকে কেউই তাকায় না।
- মা ......... মা ............, বড় বৌমা ইন্দ্রাণী সরবতের গ্লাস নিয়ে শাশুড়ীর ঘরে ঢোকে, ........ আপনি ষষ্ঠীতলায় না গিয়ে ঘরে শুয়ে আছেন শরীর খারাপ লাগছে ?
সেনগিন্নী বড় বৌমার কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে বলেন, পুজোর দিনে তোমার মনে হল, আমি শরীর খারাপের জন্য ঘরে শুয়ে আছি ? আজ ষষ্ঠী, দু দিন পর নবমী। এখনও নয় বছরের কোনো কুমারী মেয়ে পাওয়া গেল না, যাকে নিয়ে কুমারী পুজো হবে।
- আপনি চিন্তা করবেন না মা। আপনার বড় ছেলে তো ধানবাদ গিয়েছে তপতীর মেয়েকে আনতে। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।
- হলেই ভালো। মায়ের পুজোয় এমন ব্যাঘাত কোন বারই হয়নি। কার পাপে আজ এমন হল।
সরবতের গ্লাসটা শাশুড়ীর হাতে দিয়ে, - এ টুকু খেয়ে নিন মা, সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। প্রেসার বেড়ে যাবে।
সেনগিন্নী সরবতের গ্লাসটা নিয়ে সরবত খেতে থাকেন।
ঠিক তখন বড় ছেলে উমাশংকর মায়ের ঘরে ঢোকে। - ও তুমিও আছো এখানে, ইন্দ্রাণীকে দেখে বলে, আমাকে এক গ্লাস জল দাও।
সেনগিন্নী বড় ছেলেকে দেখে সরবতের গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে বলেন,- কি রে, তপতীরা এসেছে
- মাসীমা তোমাকে কবে বলেছিলেন যে, তপতীর মেয়ের বয়স নয় ?, উমাশংকর মায়ের কাছে বসে বলে।
- কেন ?....... এই তো সেদিন কথা হচ্ছিল, সেনগিন্নী জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকেন।
- সেটা হয়তো এক বছর আগে, তোমার মনে হয়েছে সেদিন। তপতীর মেয়ের বয়স এখন দশ, বলেই চুপ করে যায় উমাশংকর।
সেনগিন্নী হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকেন উমাশংকরের দিকে, বলেন, এবার কি হবে বাবা? কুমারী পুজো কি হবে না?এতো দিন ধরে যে পুজো চলে আসছিলো, আজ তা বন্ধ হয়ে যাবে ?
ইন্দ্রাণী ঘরে ঢুকে জলের গ্লাসটা উদয়শংকরকে দিতে ভুলে যায়। চুপ করে স্বামী আর শাশুড়ীর কথা শোনে। আর ভাবে এরপর কি হবে।
উমাশংকর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, সব রকম চেষ্টাই তো করলাম। মা হয়তো এবার কুমারী পুজো চাইছেন না।
দাদা ফিরে এসেছে এই কথা কানে যেতেই উদয়শংকরও মায়ের ঘরে আসে। দাদার মুখের শেষ কথাটা শুনে বুঝতে পারে কুমারী পজোর জন্য উপযুক্ত মেয়ে পাওয়া যায়নি। ঘরের পরিবেশটা হঠাৎ করে কেমন যেন কোনো অজানা অমঙ্গলের আশঙ্কায় ভারী হয়ে ওঠে। সবাই কোনো উপায় না ভাবতে পেরে নীরব থাকে।
শর্বানী অনেকক্ষণ এসেছে। সেনগিন্নীর ছোট বউ। ঘরে না ঢুকে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। সচরাচর সে শাশুড়ীর ঘরে ঢোকে না। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া শাশুড়ীর সামনেও আসে না। কেন কি কারণে তা বাড়ির লোক জানে না। শুধু বলাবলি করে, ছোট বউয়ের মান বেশী।
শর্বানী পর্দার আড়ালে সব শুনে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে যায়। ঢাক-কাঁসর-ঘন্টার কোনো আওয়াজই এখন তার কানে যেন ঢুকছে না। দখিনের জানালার কাছে এসে শর্বানী আকাশে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার দু চোখ দিয়ে নেয়ে আসে জল।
আজ থেকে ঠিক নয় বছর আগে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে শর্বানীর। তাঁর সে দিনের কান্না, বুকের ভেতরের অসহ্য যন্ত্রণার কথা।
শর্বানী তখন অন্তঃসত্তা। সেনগিন্নী নিজেই শর্বানীকে নিয়ম করে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান। শাশুড়ীর এই মমতাময়ী রূপ দেখে শর্বানী খুব খুশি হয়। কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় সেনগিন্নীর কথা শুনে শর্বানীর মনে হয়েছিল তিনি কি সত্যিই মা। মা হয়ে কখনো এমন কথা বলা যায়কি।
সন্ধ্যায় সেনগিন্নী ছেলেদের ও বৌমাদের নিজের ঘরে ডাকেন। সকলে একটু অবাকই হয়। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া মা যে তাদের এক সাথে ডাকে না, এটা ছেলে-বৌ সকলেই জানে।
সকলে সেনগিন্নীর ঘরে এলে, তিনি নীরবে একটা রিপোর্ট বড় ছেলের হাতে তুলে দেন।
উমাশংকর রিপোর্ট দেখে বিস্ময়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বিশ্বাস হয় না তার মা এই কাজ করতে পারে।
সেনগিন্নী বড় ছেলেকে চুপ করে থাকতে দেখে বলেন, অবাক হবার কিছু নেই, বড় বৌমার সময়েও আমি একই কাজ করেছি। কিন্তু তোমাদের জানাইনি।
উমাশংকর আস্তে করে বলে, কিন্তু কেন মা, আজ ছোটবৌমার ক্ষেত্রে জানাচ্ছো কেন কেনই বা এটা করলে এই পরীক্ষা করা আইনত অপরাধ
- দেখ্ উমা আমাকে আইন শেখাতে আসিস না। বড় বৌমার সময়েও আমি এই পরীক্ষা করিয়েছিলাম। আজও করেছি। তোর ছেলে হবে জানতে পেরে তখন আর কাউকে এই বিষয়ে বলিনি। কিন্তু আজ বলতে হচ্ছে .........
- মা, থামো ........তুমি কি বলতে চাইছো ...........
- বলতে চাইছি, এই রিপোর্টে স্পষ্ট করে বলা আছে, ছোট বৌমার গর্ভে যে সন্তান আছে, সেটি কন্যা সন্তান। আর সেনবাড়ির কোনো পুত্রবধূ আজ পর্যন্ত কোনো কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়নি। এবারও দেবে না। ........ অতন্ত দৃঢ় ও কঠিন ভাবে কথা গুলো বলেন সেনগিন্নী।
শর্বানী পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকে। শাশুড়ীর কথা শুনে সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখে উদয়শংকর মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
- মা ......... এটা অন্যায় ........ এটা পাপ ......... , উমাশংকর বলে।
সেনগিন্নী উদয়শংকরের দিকে তাকিয়ে বলেন, উদয় ....... কাল সকালে ডাক্তার মুখার্জীর কাছে ছোট বৌমাকে নিয়ে যাবি। আমি সব ব্যবস্থা করে এসেছি। অ্যাবর্সনটা কালই হয়ে যাবে। এরপর বড় দেরি হয়ে যাবে। কথা গুলো বলে সেনগিন্নী রিপোর্টটা নিয়ে নিজের আলমারীতে তুলে রাখেন।
উদয়শংকর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আর একবার ভেবে দেখলে হত না, মা ...........
- না ........ কথাটা বেশ জোড় দিয়েই বলেন সেনগিন্নী, এ বাড়ির পুত্রবধূরা কখনো মেয়ের মা হয়নি আর ছেলেরাও মেয়ের বাবা হয়নি। এটাই আমার শেষ কথা। এখন যাও। কাল ছোট বৌমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।
শর্বানী শাশুড়ীর কথা শুনে দৌড়ে নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে কাঁদতে থাকে। শুধুই ভাবে অন্তঃসত্তা হবার পর থেকে তাকে সঙ্গে করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কারণ একমাত্র এটাই যে, সে পুত্রের মা হতে চলেছে না কন্যা সন্তানের মা হতে চলেছে। শুধুমাত্র এটা জানার জন্য। মা হয়ে তিনি কি করে এক মায়ের কোল শূন্য করতে পারেন।
সেদিন উমাশংকর, উদয়শংকর – কেউই সেনগিন্নীর কথার অবাধ্য হয়নি। শুধুমাত্র শর্বানীর কোল শূ্ণ্য হয়েছিল। কিছু সময়ের অস্ত্রপাচারে তার গর্ভের কন্যা ভ্রূণটিকে হত্যা করেছিল তারই মত একজন মা। সেদিন বাড়ি ফিরে সে সমস্ত দিন কেঁদেছিল। সন্তানহারানোর যন্ত্রণায়।
আজ ঠিক ন বছর বাদে কুমারী পুজোর জন্য নয় বছরের কোনো কন্যা সন্তান না পাবার কারণ কি, সেদিনের সেনগিন্নীর তার মেয়েটিকে হত্যা করা। ভাবতে ভাবতে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে শর্বানী। আজ ন বছর হয়ে গেছে সে আর মা হতে পারেনি। সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ, যন্ত্রণা, ব্যথা আজ এতোদিন পরে চিন্ময়ী মা শুনেছেন। তাই আজ শত চেষ্টা করেও সেনগিন্নী কুমারী পুজোর জন্য নয় বছরের কোনো মেয়েকে তিনি খুঁজে পেলেন না।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.