গৃহপাশ


গৃহপাশ

এক


মানুষের জীবন রহস্যময়। প্রতি নিয়তই চারপাশে দেখা মেলে নানান অজানা রহস্যের, তা সে আনন্দবাজারের দয়াই হোক বা নিজের চোখের। কিছু মেলে ফেলুদা-ব্যোমকেশের সাথে, আবার কিছু মেলে না। এই তো কয়েকদিন আগে পেপারে দিয়েছিল, ঝাড়খন্ডে একটা লোকের প্রাণ আশ্চর্যভাবে বেঁচে গিয়েছে। তার বুকের বাম দিকে গুলি লাগে। কিন্তু লোকটার মৃত্যু হয় না। চিকিৎসার সময় জানা যায় তার হার্টটাই নাকি ডানদিকে। এ তো অবিকল ব্যোমকেশের সেই “সজারুর কাঁটা” গল্পটা! এমনই নানান অজানা রহস্য ছড়াচ্ছে চারপাশে, যার কিছুর জট খোলে আবার কিছুর বন্ধই থেকে যায়।

কিন্তু জীবনে এমন হঠাৎ করে এমন এক রহস্য উদঘাটনী ব্যক্তির সাথে পরিচয় হয়ে যাবে, তা ভাবতে পারিনি। পরিচয়টা হয়েছিল আশ্চর্য্য এবং অপ্রত্যাশিত ভাবেই। তখন সবে শীতটা গেছে। বিকেলের দিকে সাইকেলটা নিয়ে একটু ঘুরতে বেরোই। এমনই একদিন, বিকেলবেলা সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে একটা দোকানে ঢুকেছি পেন কিনবো বলে। এমন সময় দূর থেকে কয়েকজনের চিৎকারের আওয়াজ কানে এল। রাস্তার দিকে ঘুরতেই দেখি চল্লিশ—পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের একজন লোক দৌড়ে চলে গেলেন, আর তার পেছনে আমার থেকে তিন-চার বছরের বড়ো হবে একটি ছেলে দৌড়ে আসছে। ছেলেটি আমার সাইকেলের কাছে আসামাত্রই হঠাৎ আমার সাইকেলটা নিয়ে লোকটির পিছু ধাওয়া করল। আমি তো ঘটনা দেখে পুরো হতবাক। পড়ি কি মরি করে সাইকেলের পেছনে দৌড়তে শুরু করলাম। তিন নম্বর রেল গেটের কাছে আসামাত্রই লোকটি গেট পেরিয়ে দৌড় লাগালেন। কিন্তু গেট নামানো ছিল, তাই ওকে ধাওয়া করছিলো যে ছেলেটি সে আর পেরোতে পারলোনা। আমিও পেছন পেছন দৌড়োচ্ছিলাম, গেটের কাছে এসে সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ধরে ছেলেটিকে বললাম, কি লাভ হল সাইকেলটা নিয়ে?

ও বাবা! তিনি দেখি আমাকেই উল্টে দোষারোপ করতে শুরু করলেন। আমার জন্যই নাকি উনি লোকটাকে ধরতে পারেননি।

আমি ঝাঁঝিয়ে উঠে বললাম, আমার জন্য মানে? আমি বলেছিলাম, সাইকেলটা নিতে? বরং তোমার জন্য আমাকে এতটা দৌড়ে আসতে হল।

ছেলেটি প্যান্টের পকেট থেকে একটা গোল্ড ফ্লেক সিগারেট বার করে ধরালো। তারপর একটা লম্বা ধোঁয়া ছেড়ে বলল, হ্যাঁ, আমারই ভুল হয়েছে। তোর সাইকেলটা না নিলে, আজ বেটাকে টের পাওয়াতাম, অতীন্দ্রিয় সোমকে কাঠি করার ফলাফলটা।

-অতীন্দ্রিয় সোমটি কে?

ছেলেটি আমার দিকে তাকিয়ে তাছিল্যের সুরে বলল, কেউ না। তোর নাম কি?

-ধ্রীয়মান ঘটক।

-ঘট?

-ঘট না ঘটক-

-ওই ঘট আর ঘটক একই হল।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি পৌনে ছ’টা। আট’টা থেকে পড়তে যাওয়া আছে, বাড়িতে গিয়ে পড়তে হবে। তাই এইসব অপ্রয়োজনীয় কথার ইতি টেনে বললাম, ঠিক আছে। আমি আসি, আমার তাড়া আছে।

ছেলেটি কোনো উত্তর না দিয়ে সিগারেট টানতে টানতে পাশের একটা গলিতে ঢুকে গেল।

বাড়িতে এসে জামা-প্যান্ট ছেড়ে হাত-পা ধুতে গেলাম। এসে প্যান্টটা আলনায় রাখবো বলে ঝাড়তেই দেখি প্যান্টের পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা চিরকুট মাটিতে পড়ল। কাগজটা খুলে দেখলাম ভেতরে দুটো লাইন লেখা, আর লেখাটা দেখামাত্রই বিস্ময়ের সাথে চমকে উঠলাম। লেখা রয়েছে- ‘নিজের চড়কায় তেল দাও। আমার পেছনে লাগলে তাঁর পরিণাম ভোগ করতে হবে।’

মনে মনে ভাবলাম, আমি আবার কার পেছনে লাগলাম? টুকটাক বন্ধু-বান্ধবদের পেছনে লাগি, কিন্তু তাই বলে তারা এরকম লিখে পাঠাবে এমনতো নয়। এটা এলই বা কোথা থেকে? বেরোনোর পর তো শুধু সেই ছেলেটির সাথেই দেখা হয়েছে। তাহলে কি সেই আমার অজান্তে পকেটে কাগজটা ঢুকিয়ে দিয়েছে? কিন্তু আমি তো ওকে চিনিইনা। পেছনে লাগতে যাবো কেন? থাক, এ নিয়ে বেশি চিন্তা করলে মাথা গুলিয়ে যাবে। প্রথমে ভাবলাম ছিঁড়ে ফেলে দিই। তারপর মনে হল, আবার যদি দেখা হয় তখন জিজ্ঞেস করব, এর কারণ কি? তাই কাগজটাকে ভাঁজ করে মানিব্যাগে রেখে দিলাম।


প্রত্যেক শুক্রবার আট’টা থেকে চ্যাটার্জী-পাড়ার বিখ্যাত শ্যাম চৌধুরী বাড়িতে আমার পড়া থাকে। অবশ্য সেটাকে বাড়ি না বলে অট্টালিকা বলাই ভালো, পুরো জমিদারীর ছাঁচে বানানো দোতলা অট্টালিকা। সামনে বাগান, বাগানের মাঝখানে একটা ফোয়ারা এবং সেটাও যেমন তেমন নয়, একটা পরী প্রনামের ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে আগে হয়তো চলত, এখন বন্ধ। রাস্তা থেকে বাড়ির বারান্দা পর্যন্ত নুড়ি বেছানো পথ। বারান্দার বাঁদিকে আর ডান দিকে পরপর তিনটে করে ঘর। মাঝখান দিয়ে ভেতরে যাওয়ার রাস্তা। বাড়ির চারপাশ বাগান দিয়ে ঘেরা। আর তারপর উঁচু পাঁচিল, পাঁচিলের ওপর কাঁটাতারের বেড়া। তাতে সার বেঁধে কাগজি ফুলের গাছ লাগানো।

বাবা একবার বলেছিলেন এঁদের পূর্বপুরুষ নাকি এককালে এখানকার জমিদারের নায়েব ছিলেন। আর শ্যাম চৌধুরী পরিবারের মূল কর্তা, অর্থাৎ ত্রিদেব শ্যাম চৌধুরী, তিনি প্রায় সারা ভারতবর্ষে বিখ্যাত। ত্রিদেব বাবু একজন বৈজ্ঞানিক, এই কয়েকমাস আগেই তাঁর কি যেন একটা আবিষ্কার গোটা পৃথিবীতে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। আমি পড়তে যাই ত্রিদেব বাবুর ভাইপো পৃথ্বীশদা’র কাছে।

সেদিন সন্ধ্যেবেলাও যথারীতি পড়তে গেছি। এমন সময় গোটা বাড়ি অন্ধকার হয়ে গেল। আমি পৃথ্বীশ দা’র ঘরেই ছিলাম। প্রথমে ভাবলাম হয়তো কারেন্ট গেছে। কিন্তু জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি পাশের বাড়িতে আলো জ্বলছে। পৃথ্বীশদা বলল, একটু বোস, দেখে আসছি কি হয়েছে।

প্রায় পনেরো-কুড়ি মিনিট পর কারেন্ট এল। কারেন্ট আসার পর পৃথ্বীশদাও চলে এল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছিল?

-ওই মেন সুইচটা খুব গড়বড় করে। পরশু থেকেই হচ্ছে। নে খাতা বের কর।

আমি ব্যাগ থেকে খাতা বের করে ঝাঁপ দিলাম কেমিষ্ট্রির দূর্বোধ্য সাগরে।




দুই


সকালবেলা আমি আর আমার কাকা হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। তখন ঘড়িতে ছ’টা কি সাড়ে ছ’টা হবে। শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় বাড়ির সামনে দেখি খুব ভিড়।

কাকা বলল, কি ব্যাপার? চলতো।

দুজন গেলাম ভেতরে। আমাদের পাড়ার শিবুদাকেও দেখলাম রয়েছে। কাকা জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে?

শিবুদা বলল, ত্রিদেব বাবু গতরাতে মারা গেছেন।

কাকা আশ্চর্য হয়ে বলল, সেকি? কখন?

-সাড়ে আটটা নাগাদ।

কথাটা শুনে আমি চমকে উঠলাম। এটা কি করে সম্ভব! আমি তো কাল রাত্রে ন’টার সময় এখান থেকে পড়ে বেরিয়েছি, তখন তো সব ঠিকই ছিল। ত্রিদেব বাবুর বড়ো ছেলে বিজয় বাবু কাকার বন্ধু। আমি আর কাকা ভেতরে গেলাম। পিতার মৃত্যুশোকে বিজয় বাবু অবসন্নভাবে বাড়ির উঠোনের একটা থামে হেলান দিয়ে মাথায় হাত রেখে বসেছিলেন, চোখের জল গালে শুকিয়ে রয়েছে। কাকাকে দেখে ভারি গলায় বললেন, আয় হীরু (কাকা’র পুরো নাম হীরন্ময়, ডাক নাম হীরু)। কাল রাত্রে দিব্যি কথা বলে এলাম...

কাকা জিজ্ঞেস করল, কিভাবে?

-বাড়ির পেছন দিকে যে সিঁড়িটা আছে, কাল রাত্রে হয়তো কোনো কাজে ওদিকে গেছিলেন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে......, বিজয় বাবু এটুকু বলে থেমে গেলেন।

আমি বললাম, ডাক্তার আসেনি?

-ড. তরফদার এসেছিলেন। ডেথ সার্টফিকেট দিয়ে গেছেন।

কাকা বলল, কখন হয়েছে?

-বাবা রাত্রে একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নেন। আমি খাওয়ার দিয়ে এসে ঘরে বসেছি, আর ঠিক সেই সময় গেল গিয়ে কারেন্টটা।

কথাটা শুনে আমার গায়ে কেমন একটা কাঁটা দিয়ে উঠল। কাল রাত্রে তো কোনো আওয়াজ বা সেই রকম কিছু টের পাইনি। আমি বললাম, তখন তো আমি এখানে ছিলাম! কিছু টের পাইনি তো!

-আমরাও টের পাইনি তখন। রাত্রে অপরাজিতা ওইদিকে গিয়েছিল। তখনই...

আমার কেমন খটকা লাগল। একজন ব্যক্তি সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলেন আর বাড়ির কেউ টের পেলেন না?

এমন সময় দেখি সামনে একটা ঘর থেকে পৃথ্বীশদার সাথে গতকালের সেই ছেলেটি বেরিয়ে এল। দুজনের কপালেই লম্বা ভাঁজ এবং কিছু একটা কথায় রত। আমি বিজয় বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, পৃথ্বীশদার সাথে ওই ছেলেটি কে?

বিজয় বাবু মাথা তুলে দেখে বললেন, ও অতীন, পৃথ্বীশের বন্ধু।

আমি ছোট্ট একটা ‘ও’ বলে থেমে গেলাম।

পৃথ্বীশ’দা বিজয় বাবুকে বলল, দাদা ও তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চায়।

বিজয় বাবু বললেন, হ্যাঁ বল?

অতীনদা বলল, এটা স্বাভাবিক নয়-খুন, আপনি পুলিশে খবর দিন।

বিজয় বাবু বিষ্ফারিত নেত্রে অতীনদার দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ? খুন? কিন্তু বাবাকে... কেন?

অতীনদা বলল, কারণটা জানিনা। তবে ত্রিদেব বাবুর দেহ দেখে আমার এটাই মনে হল, হাত দুটো দড়ি দিয়ে বেঁধে তারপর মাথায় বাড়ি মারা হয়েছে। সিঁড়িতে যে রক্তের দাগ রয়েছে তা পরে ঘটানো হয়েছে।

বিজয়বাবুর মুখ শোকে ফ্যাকাশে হয়ে রয়েছে, শুকনো ধরা গলায় বললেন, তুমি কি করে বুঝলে এতকিছু?

-আপনাদের কথা মত কাল রাত্রে পেছনের সিঁড়ির দিক থেকে কোনো আওয়াজ আপনারা পাননি। কিন্তু ত্রিদেব বাবু সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। সিঁড়ি থেকে পা পিছলে গেলে কোনোরকম একটা আওয়াজ তো মুখ থেকে বেরোবেই, আর তাছাড়াও পঁচাত্তর কেজি ওজনের একটা মানুষ গড়িয়ে পড়লে তার আওয়াজও পাওয়া যাবে। অর্থাৎ আগে খুন তারপর দেহ সিঁড়ির নীচে এমন ভাবে রাখা হয়েছে যাতে মনে হয় তিনি সিঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়েছেন।

বিজয়বাবু বললেন, আশ্চর্য, এটা তো আমার মাথাতে আসেনি! আমি এখনই থানায় ফোন করছি। বলে বিজয় বাবু ভেতরে চলে গেলেন।

আমি অভিভূত হয়ে অতীনদার কথাগুলো শুনছিলাম। বুঝতে পারছিলাম মনের ভেতর একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করতে শুরু করেছে। অতীনদা আমাকে দেখে বলল, আরে ঘট? এখানে কি ব্যাপার?

কাকা শুনে বলল, ঘট মানে?

আমি বললাম, কিছু না।

কাকা বলল, বাড়ি চল, দাদা আবার চিন্তা করবে।

আমি বললাম, তুমি বাড়ি যাও। আমি পরে আসছি।

আমি অতীনদাকে একপাশে এনে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি গোয়েন্দা?

-না, কেন?

-যেভাবে বললে কথাগুলো। শুনে গোয়েন্দাই মনে হল।

-এখনও হইনি, কথাটা বলে তারপর হঠাৎ ছাদের কড়িকাঠে চোখ রেখে জামার কাঁধের কাছটা দুহাতের দুটো আঙ্গুল দিয়ে তুলে বলল, তবে খুব শীঘ্রই হয়ে যাবো।

আমি মনে মনে ভাবলাম এমন একটা সুযোগ যখন এসছে আর হাত ছাড়া করা যাবে না। বহুদিন ধরেই মনের মধ্যে একটা শুপ্ত কামনা ছিল, আমিও তোপশে অজিতের মতো জমজমাট রহস্যের সম্মুখীন হব। কিন্তু কিছুতেই তা সম্ভবপর হচ্ছিলনা। এতদিনে মনে হয় ভগবান মুখ তুলে চেয়েছে। অতীনদাকে বললাম, আমারও এইসব বিষয়ে খুব উৎসাহ রয়েছে। আমি ছোটবেলা থেকেই ফেলুদা-ব্যোমকেশের অন্ধভক্ত।

অতীনদা বলল, তোপশে অথবা অজিতের চিন্তা মাথায় এলে সরিয়ে ফেল। আমি ওইরকম লেজুড় নিয়ে কাজ করতে পারবোনা।

কথাটা শুনে বেশ রাগ হল। মনে মনে ভাবলাম, এখনও কিছুই হয়নি, তার আবার বড়ো বড়ো কথা।

এমন সময় হঠাৎ গতকালের চিরকুটটার কথা মাথায় আসতেই জিজ্ঞেস করলাম এরকম করার কারণটা কি?

অতীনদা বলল, সেটা তো চিরকুটেই লেখা ছিল-

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, আমি তোমার পেছনে কবে লাগলাম? কালকের আগে আমি তো তোমাকে চিনতামও না।

-এখন চিনেছিস। এরপর ঘুর-ঘুর শুরু করবি...তাই আগে থেকেই সাবধান করে দিয়েছিলাম।

চিরকুটটা সম্বন্ধে কোনো সদুত্তর না পাওয়াতে আর বেশি প্রশ্ন করলাম না। অতীনদার হাবভাবে একটা গোয়েন্দা গোয়েন্দা ছাপ রয়েছে। তবে ব্যক্তিত্বটা যেন বড্ড বেশি খেলো। কোনো কিছুতেই কোনো গুরুত্ব নেই যেন।

আমি অতীনদাকে বললাম, তুমি কি ত্রিদেব বাবুর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্ত করবে?

-ইচ্ছা তো আছে!

আমি বললাম, খুনির সন্ধান কিছু পেয়েছ?

-খুনির সন্ধান মানে? এখনও তো কারোর সাথে কথাই হল না।

-মানে কে খুন করতে পারে কিছু বুঝতে পেরেছ?

-খুনটা বাড়ির লোকই করেছে। এখন কে করেছে সেটাই হল মূল ব্যাপার। কারণ সবাই ত্রিদেব বাবুর আপনজন।

-খুনটা যে বাড়ির লোকই করেছে, তার কি প্রমান আছে? বাইরের লোকও তো হতে পারে।

-হ্যাঁ। তার জন্য সেই বাইরের লোকটাকে বাড়ির ভেতর থাকতে হবে। আর বাড়ির পেছন দিকের সিঁড়িটা সেইসব বাইরের লোকের পক্ষেই অতিপরিচিত হবে, যারা এই বাড়িতে প্রায়সয়ী যাতায়াত করে। অবশ্য সেই তালিকায় তুইও পড়িস, কারণ গতকাল রাত্রে কারেন্ট যাওয়ার সময় তুইও এবাড়িতেই ছিলি।

এটা আমি আগে থেকেই জানতাম, কেউ না কেউ আমাকে এই কথাটা বলবেই। তাই একটুও আশ্চর্য না হয়ে বললাম, তুমি তো এখনও স্ট্যাবলিশড হও নি। তোমাকে দেবে-মানে এই...

কেমন যেন একটা মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কি? তদন্ত করতে?

তারপর পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তাতে অগ্নুৎপাত করে মুখে ঠেকিয়ে বলল, ও নিয়ে আমি চিন্তা করিনা! পৃথ্বীশ আছে তো! কিছু একটা গলদ আছে এটা আমি নিশ্চিৎ! তারপর পুলিশ যদি কিছু না করতে পারে, তখন আমি দেখব।

কিছুক্ষন পর গেট দিয়ে একটা পুলিশের গাড়ি ঢুকল। গাড়ি থেকে বেলঘরিয়া থানার সাব ইন্সপেক্টর মি. রঞ্জন দেশমুখ আর দুজন কন্সটেবল নামলেন। বাড়ির সামনে একটু ভিড় ছিল। নেমেই ‘দেখি-সরুন-সরুন’ করতে করতে বাড়ির ভেতর ঢুকলেন। আমি আর অতীনদাও গেলাম বাড়ির ভেতর।

ত্রিদেব বাবুর মৃতদেহ যে ঘরে ছিল, বিজয় বাবু ইন্সপেক্টর দেশমুখকে সেই ঘরে নিয়ে গেলেন। আমি আর অতীনদা বাইরেই দাঁড়ালাম। স্বাভাবিক ভাবে কিছুক্ষণ পর অতীনদার ডাক পড়ল। কারণ পুলিশের প্রথম প্রশ্নই এটা হয় যে, কে প্রথম এটা বুঝতে পারেন?

আমি আর অতীনদা ভেতরে গেলাম। ত্রিদেব বাবুর নিথর দেহ খাটের ওপর শোয়ানো। শরীরে কোনো রক্তের দাগ নেই। সম্ভবত ড্রেসিং করিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাতের কব্জির কাছে লক্ষ্য করলাম একটা চাপা দাগ রয়েছে।

ইন্সপেক্টর দেশমুখ অতীনদাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি দেখেছ প্রথম?

ইন্সপেক্টর দেশমুখের উচ্চতা প্রায় ছ’ ফুটের কাছাকাছি এবং বলিষ্ঠ দেহ। গলা শুনে বুঝলাম দেহের সাথে মানানসয়ী একটা গাম্ভীর্যপুর্ণ ভাব আছে।

অতীনদা বলল, প্রথম আমি দেখিনি, দেখেছেন বিজয় বাবুর স্ত্রী অপরাজিতা দেবী। বাড়ির লোকের কথাবার্তা শুনে আমার যেটা মনে হয়েছে সেই হিসাবে আপনাকে তলব।

ইন্সপেক্টর দেশমুখ বললেন, নাম কি তোমার?

-অতীন্দ্রিয় সোম।

-কি কর?

অতীনদা বলল, আপাতত কিছুই না। পুরোপুরি ঘরে বসা।

মি. দেশমুখ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আর তুমি কে?

-আমার নাম ধ্রীয়মান ঘটক।

বিজয় বাবু বললেন, ও আমার ছোটো ভাইয়ের কাছে পড়তে আসে।

মি. দেশমুখ বিজয় বাবুকে বললেন, একবার ত্রিদেব বাবুর ঘরটা দেখতে হবে। আর বাড়ির সব লোকের সাথে কথাও বলতে হবে। তারপর অতীনদাকে বললেন, তুমি কিন্তু থাকবে, যেও না কোথাও।

অতীনদা ঘাড় নেড়ে সায় দিল। এদিকে আমার মনটা মুসড়ে পড়ল। আমাকে যদি থাকতে না দেয়। করুনভাবে অতীনদার মুখের দিকে তাকালাম। অতীনদা দেখে মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে মি. দেশমুখকে বলল, স্যার ও থাকলে কোনো অসুবিধা হবে?

মি. দেশমুখ আমার দিকে আকিয়ে বললেন, কেন? ওর আবার থাকার কি দরকার?

আমি মিনতি করে বললাম, স্যার...প্লীস থাকিনা? আমি কথা দিচ্ছি, কোনো ডিস্টার্ব করবোনা।

তিনি ‘ঠিক আছে’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।


বিজয় বাবুর সাথে আমি, অতীনদা আর মি. দেশমুখ দোতলায় ত্রিদেব বাবুর ঘরে উপস্থিত হলাম। ত্রিদেব বাবুর ঘরে ঢুকতেই ডেটলের একটা বিকট গন্ধ নাকে এল। ত্রিদেব বাবুর দেহ হয়তো ডেটল দিয়েই ড্রেসিং করানো হয়েছে। তবে ঘরে ঢুকে চোখ ধাঁদিয়ে গেল। এবাড়িতে এসেছি বহুবার, কিন্তু এর আগে কোনোদিন ত্রিদেব বাবুর ঘরে ঢুকিনি। ঘর তো নয় পুরো একটা আস্তো লাইব্রেরী। ঘরের চারপাশ মিলিয়ে সাতটা আলমারি এবং প্রত্যেক আলমারিতে থরে থরে বই সাজানো। ঘরের মাঝখানে পুরানোদিনের পালঙ্ক, তারপাশে একটা ছোটো টুল। খাটের পাশে জানলার সামনে একটা ইজি চেয়ার। আর উত্তরদিকে জানলার সামনে একটা কাচের টেবিল আর চেয়ার। টেবিলের ওপর দুটো ডায়েরী আর একটা ফাউন্টেন পেন; তার পাশে নাইট ল্যাম্প। ঘরের পশ্চিমদিকে দুটো বইয়ের আলমারির মাঝে একটা নীচু শোকেশ, তারওপর একটা এল.সি.ডি. টিভি রয়েছে।

মি. দেশমুখ ঘরে ঢুকে বিভিন্ন জিনিসপত্র নেড়ে-চেড়ে দেখতে লাগলেন। অতীনদাও ঘুরে ঘুরে দেখছিল, তবে কিছু না ছুঁয়ে। অতীনদা বিজয় বাবুকে জিজ্ঞেস করল, কাট-অফ টা গতকালই হয়েছিল নাকি কয়েকদিন ধরে হচ্ছে?

-পরশুদিন, তার আগের দিন থেকেই শুরু হয়েছে এটা। ঠিক আটটা বাজলেই যায়।

আমি বললাম, হ্যাঁ, কাল তো পৃথ্বীশদা গিয়ে ঠিক করে এল।

বিজয় বাবু বললেন, ও রোজই ঠিক করছে, আর রোজই হচ্ছে।

অতীনদা বলল, ত্রিদেব বাবু খাওয়ার পর কি করেন? আটটার সময়ই কি ঘুমিয়ে পড়েন?

বিজয় বাবু বললেন, না। খাওয়ার পর বাবা ওই জানলার ধারের ইজি চেয়ারে বসে রেডিয়ো শোনেন। তারপর দশ’টা নাগাদ ঘুমিয়ে পড়েন।

অতীনদা বলল, রোজই কি তাই করেন?

-হ্যাঁ।

অতীনদা হঠাৎ টিভির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর দৃষ্টি টিভির নীচের শোকেশের দিকে আটকে রয়েছে। শোকেশের ভেতর বিভিন্ন রকমের মাটির আর চিনামাটির শো-পিস রয়েছে। তবে অতীনদা তাকিয়ে রয়েছে একটা ট্রের দিকে। শোকেশের ভেতর এক কোনায় একটা কাচের গোল ট্রেতে একটা লেন্স সলিউশনে ডোবানো।

অতীনদা বিজয় বাবুকে বলল, ত্রিদেব বাবুর চোখে পাওয়ার ছিল নাকি?

বিজয় বাবু বললেন, বাবার-? নাতো। বাবার চোখ সম্পূর্ন সুস্থ ছিল।

মি. দেশমুখ জানালার পাশে টেবিলের ড্রয়ার খুলে দেখলেন ভেতরে কি কি আছে। মাথা বাড়িয়ে দেখলাম একটা মানি ব্যাগ, দু-তিনটে পেন, কালির দোয়াত আর একটা প্যাড। প্যাডটা বার করতেই দেখলাম তার নীচে শঙ্কর রচিত ‘আমি বিবেকানন্দ বলছি’-এর একটি বই। মি. দেশমুখ প্যাডটা খুলে দেখলেন, তাতে কিছুই লেখা নেই। তবে প্রথমের দিকের প্রায় ন-দশটা পৃষ্ঠা যেন ভিজিয়ে আবার শুকিয়ে রাখা হয়েছে। মি. দেশমুখ প্যাডটা রেখে দিতে যাচ্ছিলেন। অতীনদা বলল, ওটা রাখুন, দরকার পড়তে পারে। তারপর ডায়েরীগুলো দেখলেন, দুটো ডায়েরীই ফাঁকা, কিছুই লেখা নেই। তারপর মানি ব্যাগটা খোলা হল। ভেতরে দুটো পাঁচশো টাকার নোট আর তিনটে একশো টাকার নোট, এছাড়া কিছু খুচরো পয়সা রয়েছে। পার্সের আর একটা চেন থেকে দুটো কাগজের টুকরো পাওয়া গেল। একটাতে লেখা-

মনোতোষ কয়াল

১২/বি, জয় ভট্টাচার্য লেন, কুমোরটুলি, কোলকাতা—০৫.

মি. দেশমুখ বিজয় বাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, মনোতোষ কয়াল কে?

-বাবার অ্যাসিস্ট্যান্ট। প্রায় দেড় বছর ধরে রয়েছে।

মি. দেশমুখ বললেন, ইনি রয়েছেন তো নীচে?

-না। গত বুধবার থেকে আসছেনা।

-আসেন কটায়?

-সকাল আট’টায়।

-যান ক’টায়?

-সন্ধ্যা ছ’টায়।

মি. দেশমুখ বললেন, মানুষ হিসাবে কেমন?

-এমনি খারাপ না, সভ্য-মার্জিত স্বভাব।

-প্রতি মাসে ত্রিদেব বাবুর কাছ থেকে বেতন হিসাবে কত টাকা করে পান কিছু জানেন?

-দশ হাজার। বাবাকে একবার বলেছিলাম এই সামান্য কাজের জন্য অতগুলো টাকা না দিতে।

-ত্রিদেব বাবু কি বললেন?

-বাবা কোনোদিন আমার কোনো কথাতেই কোনো গুরুত্ব দেননি।

-ইদানীং ত্রিদেব বাবুর সাথে কারোর ঝামেলা-টামেলা কিছু হয়েছে?

-না। বাবা বরাবরই শান্ত স্বভাবের। কিন্তু কারোর ওপর মাথা গরম হলে সঙ্গে সঙ্গে উগড়ে দেন। তাই বলে ঝামেলা, টামেলা... না-

-উনি ইদানীং কোনো রিসার্চ করছিলেন?

-তা তো ঠিক বলতে পারবো না। তবে ঐ কাগজ পত্র গুলো ঘাটলে পেতে পারেন-

পার্সের আরেকটা কাগজে লেখা- ‘অ্যাডভোকেট শ্রীনিবাস নিয়োগী’ আর তার নিচে ফোন নম্বর।

মি. দেশমুখ বললেন, ত্রিদেব বাবুর হঠাৎ উকিলের কি দরকার পড়েছিল-কিছু জানেন?

বিজয় বাবুর মুখের ভাব দেখেই বোঝা গেল তিনি এ সম্বন্ধে কিছুই জানেন না। বললেন, উকিল...? জানিনা তো।

এমন সময় অতীনদা মাঝখান থেকে বলে উঠল, আচ্ছা-আপনার এক ভাই, মানে প্রীতিশ বাবু তো ডাক্তার। বাড়িতে ডাক্তার থাকতেও আপনি ড. তরফদারকে ডাকলেন?

বিজয় বাবু বললেন, অজয় মারা যাওয়ার কয়েকদিন পর থেকে বাবা কেন জানিনা প্রীতিশের ওপর কেমন যেন রেগে থাকতেন। আমার মনে হয় ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য বাবা হয়ত ওকেই দায়ী ভাবতেন।

-আপনার ভাইকে কি প্রীতিশ বাবুই দেখতেন?

-হ্যাঁ। আর তাই উনি প্রীতিশকে... আর বাবার কোনোদিন কিছু হলে বরাবর ড. তরফদারই এসে দেখে গেছেন।

মি. দেশমুখ বললেন, আপনি কাউকে সন্দেহ করেন?

বিজয় বাবুর ঠোঁটে একটা ফ্যাকাশে হাঁসি ফুটে উঠল, কার ওপর সন্দেহ করব? কি যে হয়ে গেল সেটাই এখনও বোধগম্য হয়ে উঠলনা।

এমন সময় ঘরের উঠোনের দিকের জানলা থেকে ঝুন ঝুন করে একটা শব্দ এল। আমি আর অতীনদা তৎক্ষণাৎ বাইরে ছুটে এলাম। বাইরে এসে দেখি জানলার তাকে একটা ছোট্ট অ্যালোভেরা গাছের টব। অতীনদা গাছটার খুব কাছে গিয়ে কি যেন দেখল, আমিও সেই সাথে ঝুঁকে দেখলাম। গাছের একটা পাতার কাঁটায় সামান্য একটু রক্ত লেগে আছে। তার মানে কি এখানে দাঁড়িয়ে কেউ আমাদের কথা শুনছিল?

অতীনদাকে বললাম, কে?

-বিরহিনী রাধা।

আশ্চর্য হয়ে বললাম, মানে?

-ছায়াটা সিঁড়ির দিকে ওইভাবেই মিলিয়ে গেল।




তিন


ত্রিদেব বাবু ছিলেন পরিবারের মূল কর্তা। পেশায় একজন বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক, এবং পদার্থবিদ্যার একজন স্বনামধন্য লেকচারার। ত্রিদেব বাবুর ছোটো ভাই রাজদেব বাবু পেশায় স্বর্ণ ব্যবসায়ী। ত্রিদেব বাবুর দুই ছেলে— বিজয় শ্যাম চৌধুরী এবং অজয় শ্যাম চৌধুরী। বিজয় বাবু পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বিজয় বাবুর দশ বছরের এক পুত্র সন্তান রয়েছে, ডাক নাম বিল্টু। ত্রিদেব বাবুর ছোটো ছেলে অজয় বাবু দূর্ভাগ্যবশত মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ক্যান্সারে মারা যান। অজয় বাবুর স্ত্রী আত্রেয়ী দেবী এ বাড়িতেই থাকেন। রাজদেব বাবুরও দুই ছেলে। বড়ো ছেলে প্রীতিশ শ্যাম চৌধুরী অবিবাহিত, পেশায় ডাক্তার আর ছোটো ছেলে পৃথ্বীশ শ্যাম চৌধুরী পেশায় স্কুল শিক্ষক এবং বিবাহিত, স্ত্রী ত্রিপর্ণা শ্যাম চৌধুরী। এছাড়া থাকেন চাকর বিধু।

নীচে এসে দেখলাম, ত্রিদেব বাবুর দেহ পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অতীনদা মি. দেশমুখকে জিজ্ঞেস করল, পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট কদিনে আসবে?

-রিপোর্ট কালকের মধ্যেই চলে আসবে।

মি. দেশমুখ বিজয় বাবুকে বললেন, চলুন আপনার কাকার সাথে কথা বলতে হবে। অতীন্দ্রিয়, তুমিও এসো।

আমিও ঢুকলাম সামনের একটা ঘরে, বিজয় বাবু বাইরেই দাঁড়ালেন। রাজদেব বাবু বিছানায় শুয়ে ছিলেন, আমাদের দেখে উঠে বসলেন, আসুন, তারপর সামনের একটা সোফা দেখিয়ে বললেন, বসুন।

মি. দেশমুখ নমস্কার জানিয়ে বললেন, দাদার সাথে আপনার সখ্যতা কেমন ছিল?

-দাদার সাথে তেমন কথা আমার হত না। আমি সারাদিন প্রায় দোকানেই থাকি, বাড়িতে যখন ফিরি দাদা ততক্ষনে ঘুমিয়ে পড়ে, দেখা তেমন হয় না।

অতীনদা বলল, আপনার বাবা মারা যাওয়ার সময় আপনাদের সম্পত্তি ভাগ নিয়ে কি একটা ঝামেলা হয়েছিল না?

-সেই ঝামেলা এখন আর নেই, তা অনেকদিন আগেই মিটে গেছে।

মি. দেশমুখ বললেন, কি ঝামেলা?

রাজদেব বাবুকে দেখে মনে হল খানিক অস্বস্তিতে পড়ে গেছেন হয়তো। একটু নড়ে চড়ে বসে বললেন, বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাদের দুই ভাইকে সম্পত্তি ভাগ করে দেন। আমাদের মোট সম্পত্তি ছিল আড়াই বিঘা, তার মধ্যে দেড় বিঘা পেল দাদা, আর বাকি আমি।

মি. দেশমুখ বললেন, এরকম ভাগ কেন?

-বাবা মারা যান যক্ষায়। শেষ জীবনে পুরোপুরি বিছানাশয্যায় ছিলেন, তখন দাদাই সব কিছু দেখাশোনা করেছিল।

-আর আপনি?

-আমি দোকানের কাজে ব্যস্ত থাকতাম, তাই আর হয়ে ওঠেনি।

-আজ দোকানে যাননি?

রাজদেব বাবু ইতস্তত করে বললেন, আজ এই অবস্থায় আর দোকান যাওয়াটা ভালো দেখায়?

মি. দেশমুখ বললেন, তা ঝামেলাটা মিটল কিভাবে?

-আমি আর দাদা ঠিক করেছিলাম, সম্পত্তি ভাগ হলেও সংসার ভাগ করব না। একসাথেই থাকব। কিন্তু ছেলেপুলেদের বিয়ে দেওয়ার পর দেখছি সে সিদ্ধান্ত শিকেয়ে উঠল।

-এইরকম ভাগের জন্য কোনোদিন রাগ হয় নি?

রাজদেব বাবু হাতে একটা পেন নিয়ে দুই আঙুলে নাচাচ্ছিলেন, কথাটা শুনেই সম্ভবত সেটা থেমে গেল। বললেন, রাগ? কেন হবে? হয়ে কোনো লাভ আছে?

-কাল আপনি ত্রিদেব বাবুকে শেষবার কখন দেখেন?

-কাল দুপুরে। নীচের উঠোনে হাঁটছিল।

মি. দেশমুখ বললেন, ত্রিদেব বাবুর মৃত্যুর জন্য কাউকে সন্দেহ করেন?

-সন্দেহ কাকে করব? কথাটা বলে রাজদেব বাবু ভুরুদুটোকে এতটাই ওপরে তুললেন যে চোখের চশমাটাও হালকা ওপরে উঠে এল।


রাজদেব বাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মি. দেশমুখ বিজয় বাবুকে বললেন, আপনার স্ত্রীকে ডাকুন...

বিজয় বাবু উঠোনের দিকে তাকিয়ে হাঁক দিলেন, অপু...?

উঠোনের একধারে অপরাজিতা দেবী আত্রেয়ী দেবীর সাথে কথা বলছিলেন, বিজয় বাবুর ডাক শুনে এগিয়ে এলেন। বিজয় বাবু মি. দেশমুখকে দেখিয়ে বললেন, তোমার সাথে কিছু কথা বলবেন।

অপরাজিতা দেবী বললেন, হ্যাঁ বলুন?

-আপনি গতকাল কখন গেছিলেন পেছনের সিঁড়ির দিকে?

-এই সাড়ে ন’টা নাগাদ।

এমন সময় দেখলাম আত্রেয়ী দেবী বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় চলে গেলেন। ঘটনাটি স্বাভাবিক ঠেকতো যদি না উনি একটু তাড়াহুড়ো করে যেতেন। আমি অতীনদার কাঁধে চাপ দিয়ে বললাম, দেখলে ওনাকে?

অতীনদা বলল, চলত ওপরে।

মি. দেশমুখকে বলে আমি আর অতীনদা দোতলায় গেলাম। আমরা দোতলায় পৌছোতেই বারান্দার শেষের দিকে একটা ঘরের দরজা দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। অতীনদা গিয়ে দরজায় ধাক্কা মারল, দরজাটা খুলুন আত্রেয়ী দেবী।

ভেতর থেকে কোমল নারীকন্ঠ ভেসে এল, এটা তোমার ড্রয়িং রুম নয়। আমি এখন ব্যস্ত আছি।

অতীনদা গম্ভীর গলায় বলল, পুলিশ কিন্তু এখনও যায়নি।

হঠাৎ দরজার পাল্লা স্বশব্দে খুলে গেল, আত্রেয়ী দেবী রনরঙ্গিনীর মতো দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। খোলা চুল বাঁধতে বাঁধতে বললেন, তোমার সাহস দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। আমাকে পুলিশের ভয় দেখাচ্ছো?

-আপনাকে কেউ ভয় দেখায়নি। সবাই নীচে রয়েছেন, আপনি হঠাৎ ওপরে চলে এলেন?

-সকালে গয়নাগুলো নামিয়ে লকারটা পরিস্কার করছিলাম। তারপর বাবার এরকম হল, তাই নীচে গেছিলাম, হঠাৎ খেয়াল পড়াতে ওপরে এসেছি।

-আপনার ঘরটা দেখা যেতে পারে?

আত্রেয়ী দেবীর চোখে হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলক খেলে গেল, নিজেকে খানিক সামলে নিয়ে বললেন, তুমি হতে পারো ছোটো ঠাকুরপোর বন্ধু, তাই বলে এই প্রশ্রয়টা আশা কোরো না!

অতীনদা একটু বাঁকা ভাবে বলল, তা মি. দেশমুখ সাথে এলে আশাটা পূরণ হবে-তো?

আত্রেয়ী দেবী বললেন, পথ ছাড়ো, আমার কাজ আছে...বলে আত্রেয়ী দেবী পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।

আলাপচারিতাটা শুনে বেশ অস্বস্তি হচ্ছিল। অতীনদাকে কুনুই মেরে ফিসফিস করে বললাম, চল না? মি. দেশমুখকে নিয়ে না হয় আসা যাবে!

একতলায় এসে দেখলাম মি. দেশমুখ উঠোনের একধারে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। অতীনদা বলল, কি বললেন অপরাজিতা দেবী?

-তেমন কিছু নয়। ওই একই— নতুন কিছু পাওয়া গেল না। তা তুমি কাউকে বুঝলে...?

অতীনদা বলল, সন্দেহ ঠিক নয়। তবে কিছু কিছু ব্যাপার চোখে পড়েছে—

মি. দেশমুখ সোৎসাহে বললেন, কি?

-ত্রিদেব বাবুর ঘরের সোকেসের ঐ ট্রেতে লেন্স একটাই, কেন? ত্রিদেব বাবুর চোখ তো সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। তারপর ত্রিদেব বাবু প্রীতিশ বাবুকে পছন্দ করতেন না কেন? শুধুই কি ছেলের মৃত্যু, নাকি অন্য কিছু? ত্রিদেব বাবুর ঘরের বাইরে কোন মহিলা দাঁড়িয়ে আমাদের কথা শুনছিলেন?-

আমি বললাম, সেটা তো রক্তের ফরেন্সিক টেস্ট করলেই পাওয়া যাবে।

-হ্যাঁ সেটা তো পাওয়া যাবে। তারপর মি. দেশমুখকে বললেন, প্রীতিশ বাবুর সাথে কথা বলেছেন?

-না। চল-

প্রীতিশ বাবুর ঘরটা একতলার একটু কোনার দিকে। প্রীতিশ বাবু তার নিজের ঘরেই ছিলেন, সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। আমাদের পায়ের শব্দ পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আসুন মি. দেশমুখ।

প্রীতিশ বাবুর সারা ঘরে জিনিসপত্র চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো। বিছানায় তোয়ালে, বই, স্টেথোস্কোপ আগোছালোভাবে পড়ে রয়েছে। আলমারির লক হ্যান্ডেল থেকে টাই ঝুলছে। ঘরটা দেখে মনে হচ্ছে যেন হঠাৎ করে একটা ঝড় বয়ে গেছে।

মি. দেশমুখ বললেন, আপনার সাথে কটা কথা ছিল-

-হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। বলুন-

-আপনি গতকাল রাত্রে আট’টা থেকে সাড়ে দশ’টা পর্যন্ত কোথায় ছিলেন?

-আমি ডিস্পেন্সরিতে ছিলাম। আমার বাড়ি ফিরতে ফিরতে এগারোটা মতো বাজে।

-আপনার ডিস্পেন্সরিটি কোথায়?

-রথতলায়।

-কাল শেষবার ত্রিদেব বাবুকে আপনি কখন দেখেছেন?

-জ্যাঠামশাই জানিনা কেন, আমাকে অতটা পছন্দ করেন না। তাই আমি ওনার সামনে বেশি আসতাম না। এমনিতে আমি সারাদিন প্রায় বাইরে বাইরেই থাকি। আর তাছাড়া কাল আমি জ্যাঠামশাইকে দেখিনি একবারও।

অতীনদা বলল, আপনার ভাই-এর বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু আপনি এখন বিয়ে করেননি?

প্রীতিশ বাবু বললেন, এইসব সংসার-টংসার আমার দ্বারা হবে না। ঘরের অবস্থা দেখেই আশা করি বুঝতে পারছো, আমি লোকটা বড়ো আগোছালো। তার ওপর আবার বিরাট দ্বায়িত্ব-

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, এই আছি, বেশ আছি। বাবা অনেকবার বলেছিল, আমিই না করে দিয়েছি।

অতীনদা বলল, আপনাদের জমি ভাগের ব্যাপারটা নিয়ে কোনোদিন কিছু মনে হয় নি?

প্রীতিশ বাবু স্বাভাবিক ভাবে বললেন, কি আর মনে হবে? বাবা কোনোদিন দাদামশাইকে দেখেন নি, সে হিসাবে বাবা তাঁর প্রাপ্যটাই পেয়েছেন। আর আমার ওসব সম্পত্তি-টম্পত্তির প্রতি কোনোদিনই কোনো আকর্ষণ নেই। আমি মারা যাওয়ার আগে সবই পৃথ্বীশের সন্তানকে দিয়ে যাবো।

মি. দেশমুখ বললেন, ত্রিদেব বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে কাউকে সন্দেহ হয়?

-আপনাদের কথা শুনে তো মনে হল, বাড়ির লোকই দায়ী। সে ক্ষেত্রে কাকে সন্দেহ করব? সবাই তো আপন—

মি. দেশমুখ ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়লেন, সাথে আমি আর অতীনদাও। প্রীতিশ বাবুর ঘর থেকে বেরোতেই মনে হল যেন, সামনের দেওয়ালের আড়ালে একটা ছায়ামূর্ত্তি সরে গেল। আমি বিরক্ত হয়ে অতীনদা’কে বললাম, কে বলতো এটা? অশান্ত প্রেতাত্মার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে?

অতীনদা বলল, ভালোই বলেছিস। অশান্ত প্রেতাত্মাই বটে...

মি. দেশমুখ বিজয় বাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, আর কে আছে?

বিজয় বাবু বললেন, অজয়ের স্ত্রীর সাথে কথা বলেছেন?

কথাটা শুনেই আত্রেয়ী দেবীর ভয়ঙ্কর মূর্ত্তিটা চোখের সামনে ভেসে উঠল, তার সঙ্গে শরীরটাও কেমন যেমন শিউরে উঠল। আর সাথে সাথে মুখ দিয়ে অস্ফূটে বেরিয়ে এল, বাপরে!

অতীনদা পিঠে চাপড় মেরে বলল, উদ্বেগ নিবারণ করো বৎস।

আত্রেয়ী দেবী দরজার সামনে আমাদের দেখে একটু ভীত-স্বন্ত্রস্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তবে সেটা ত্রিদেব বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে নয়, ঘরের সূচীতা ভঙ্গের ভয়ে।

অতীনদা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটা বিকৃত হাঁসি দিয়ে বলল, আসতে পারি?

আত্রেয়ী দেবী বললেন, হ্যাঁ আসুন-

সম্মান প্রদর্শনটি অবশ্য মি. দেশমুখের প্রতি। তবে এখন আত্রেয়ী দেবীর মুখ নিঃসৃত শব্দ শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। ইনিই কি কিছুক্ষন আগের সেই মহিলা! কথাবার্তায় আর সেই তীক্ষ্ণতা নেই, সম্পূর্ণ পরিমার্জিত ভাষা। হঠাৎ করে যেন জ্বলন্ত সূর্যে গ্রহন লেগেছে। আত্রেয়ী দেবীর ঘরে ঢুকতেই একটা অতি মিষ্ট সুগন্ধ নাকে এল। ঘরে আসবাবপত্র বলতে একটা খাট, তাঁর পাশে একটা আলমারি। খাটের বিপরীতে একটা টেবিলে টিভি। আর তার সামনে একটা নীচু টেবিলের তিনদিকে তিনটে সোফা। ঘরটা সুন্দর পরিপাটি করে গোছানো, তবে দেখে একটু আতিশয্যের বাড়াবাড়ি মনে হল।

মি. দেশমুখ বললেন, আপনি গতকাল রাত্রে আট’টা নাগাদ কি করছিলেন?

-আমি আমার ঘরেই ছিলাম, সিরিয়াল দেখছিলাম আর তখনই কারেন্টটা গেল।

-কারেন্ট যাওয়ার পর কি করলেন?

-ওই আলমারির মাথা থেকে এমার্জেন্সি লাইটটা বের করে জ্বালালাম। তারপর এখানেই বসেছিলাম। কিছুক্ষন বাদেই কারেন্ট চলে এল।

-আপনি সন্ধ্যেবেলা ঘরেই থাকেন?

-আর কি করব? পোড়া কপাল আমার, না জুটল সংসার করার সৌভাগ্য, না হল কোনো সন্তান। জীবনটা নরক হয়ে গেল আমার... এইভাবে বলতে বলতে আত্রেয়ী দেবী একগুচ্ছ কথা বলে গেলেন, যার বেশির ভাগটাই অপ্রাসঙ্গিক, তাই আর উল্লেখ করলাম না।

মি. দেশমুখ বললেন, বিয়ের কয়বছর মাথায় মারা যান অজয় বাবু?

-দেড় বছর— ওই চেয়ারটাতে বসেছিল, গ্লাসে জল এনে দিলাম, ব্যাস... এটুকু বলে মুখে আঁচল চাপা দিয়ে তিনি কাঁদতে লাগলেন। মি. দেশমুখ বললেন, আপনি শান্ত হন, কাঁদবেননা। তারপর অতীনদাকে বললেন, তোমার কিছু জিজ্ঞাসা করার আছে?

অতীনদার যেন এদিকে কোনো হুঁশই নেই, খাটের নীচের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। খাটের নীচে পায়ার কাছে একটা জামার বোতাম মনে হল যেন পড়ে আছে। আমি অতীনদাকে হালকা একটা ধাক্কা মেরে ডাকলাম, অতীনদা?

অতীনদা ঘোর ভাঙ্গার মতো চমকে উঠে বলল, হ্যাঁ?

মি. দেশমুখ বললেন, কিছু জিজ্ঞেস করবে?

অতীনদা হঠাৎ উঠে গিয়ে বোতামটা নিয়ে এল। এখন দেখলাম বোতামের সাইজটা মোটামুটি একটু বড়ো, তবে বোতামের মুখগুলি সব ভেঙে গেছে। অতীনদা আত্রেয়ী দেবীকে বলল, এটা কার জামার বোতাম?

আত্রেয়ী দেবী বোতামটা দেখে বললেন, ও, এটা বিল্টুর জামার।

-আপনার কি সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল?

-হ্যাঁ।

-বিয়ের আগে কি করতেন?

-নার্স ছিলাম— এন.আর.এস. হসপিটালে।

অতীনদা বলল, অজয় বাবুও তো ওখানেই প্রাক্টিস করতেন! সেই সুত্রেই কি সম্বন্ধ?

-হ্যাঁ। বিয়ের আগে ওর একবার টাইফয়েড হয়েছিল, এন.আর.এস.-এ ভর্তি হয়। সেজ ঠাকুরপোই ওর চিকিৎসা করছিলেন। আমি ওই বেডের নার্স ছিলাম তখন।

অতীনদা বলল, অজয় বাবু কোথায় চাকরি করতেন?

-ও বেঙ্গল কেমিক্যাল-এ কাজ করত।

-ওনার ক্যানসার ধরা পড়ে কবে?

-বিয়ের আট মাস বাদে। তারপর চিকিৎসা চলছিল, সেজ ঠাকুরপোই দেখতেন।

অতীনদা বলল, বিজয় বাবুর টাইফয়েডের আর ক্যান্সারের সমস্ত রিপোর্ট গুলো দেবেন, ওগুলো লাগবে।

আত্রেয়ী দেবী বললেন, সেসব কোথায় আছে খুঁজতে হবে।

-হ্যাঁ, খুঁজে রাখবেন। আমি যাওয়ার সময় নিয়ে যাবো। আর একটা কথা জানার ছিল, যদি কিছু মনে না করেন—

আত্রেয়ী দেবী বললেন, হ্যাঁ বল?

-অজয় বাবুর পেনশনের যা টাকা পান তাতে চলে সারা মাস?

-ঐ কটা টাকায় কি আর হয় বল? বাবা দিতেন প্রতি মাসে কিছু কিছু করে! বাবা ছিলেন, যাই করে হোক চলে যাচ্ছিল—এবার কি হবে যানিনা...

মি. দেশমুখ বললেন, আপনি নার্সিংটা আবার শুরু করুন। সামনে এখনও গোটা জীবন পড়ে রয়েছে।

আত্রেয়ী দেবী বললেন, নার্সিং আর করব না। দাদা ফোন করেছিল, এদিককার ঝামেলা মিটলে এসে নিয়ে যাবে বলেছে।

অতীনদা বলল, আপনার দাদা কোথায় থাকেন?

-ভবানীপুরে—আমাদের পৈতৃক বাড়িতে।

অতীনদা বলল, এখানে আর থাকবেন না কেন?

-এখানে থাকলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসবে। এখন যে করে হোক চলে যাচ্ছে, কিন্তু বয়স হলে কি হবে? কে দেখবে তখন?


শ্যাম চৌধুরী পরিবারের আর কারোর সাথে কথা বলা গেল না। অবশ্য বাকি বলতে ছিলেন, পৃথ্বীশদার স্ত্রী, আর বিজয় বাবুর পুত্র বিল্টু আর চাকর বিধুদা। অজয় বাবুর পুত্রের স্কুল ছুটি থাকায় সে এক মাস মত হয়ে গেল, চন্দননগরে মামার বাড়িতে বেড়াতে গেছে। পৃথ্বীশদা’র স্ত্রী ত্রিপর্ণা দেবী পাঁচ মাসের অন্তঃসত্বা ছিলেন, তাই এই অবস্থায় এখানে থাকা অস্বাস্থ্যকর বলে(লোক মতে) আজ সকালে তাঁর দাদা এসে তাকে বাপের বাড়ি নিয়ে গেছেন। তাঁর সাথে বিধুদাও গেছেন। আর পৃথ্বীশদা’র সাথে কথা বলার ব্যাপারে অতীনদা বলল, ওর সম্বন্ধে আমার নতুন ভাবে জানার মতো তেমন কিছু নেই, স্কুল বয়সের বন্ধু।

আমি বললাম, কলেজেও কি একসাথেই পড়তে?

-না। আমি বেলেঘাটা আর.সি.সি.আই.টি আর পৃথ্বীশ বি. এইচ. ইউ.-তে।

-তুমি ইঞ্জিনিয়ার?

-হুম—ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন-

- আর বি. এইচ. ইউ. কোন কলেজ?

-বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি।

-কেমিষ্ট্রি অনার্স?

-হুম- আবার এখানে এসে তিন বছর ইঞ্জিনিয়ারিং ও পড়েছে- তারপর হেঁসে বলল- আমারই ট্রেড-

তারপর মি. দেশমুখকে বলল, শ্রীনিবাস নিয়োগীর নম্বরে একবার ফোন করা দরকার।

মি. দেশমুখ মোবাইল বের করে শ্রীনিবাস নিয়োগীর ফোন নম্বরটা ডায়াল করলেন। দু-তিন বার রিং হওয়ার পর ফোন তুললেন,

-হ্যালো?

-হ্যালো—মি. নিয়োগী স্পিকিং?

বেশ সাহেবী কায়দায় উত্তর এল, ইয়েস, স্পিকিং।

-বেলঘরিয়া থানা থেকে সাব ইন্সপেক্টর রঞ্জন দেশমুখ বলছি। আপনার ত্রিদেব শ্যাম চৌধুরী নামের কোনো ব্যক্তির সাথে পরিচয় রয়েছে?

-হ্যাঁ—উনি তো আমার ক্লায়েন্ট। কিন্তু পুলিশ হঠাৎ—?

মি. দেশমুখ বললেন, ত্রিদেব বাবু গতকাল রাত্রে রহস্যজনকভাবে মারা গেছেন। আর ওনার পার্স থেকে আপনার ফোন নম্বরটি পাওয়া গেছে। তাই এই ব্যাপারে কিছু কথা বলার ছিল আপনার সাথে।

মি. নিয়োগী বললেন, ওকে, তবে এখন আমি একটু বাইরে আছি। আপনি আমার ঠিকানাটা নিয়ে নিন। আমার বাড়িতে এসেও কথা বলতে পারেন।

-হ্যাঁ, বলুন?

-৭, ঠাকুরদাস ব্যানার্জী রোড।

-বেলঘরিয়া?

-হ্যাঁ। আপনি সাড়ে এগারোটা নাগাদ আসুন। আমি ততক্ষনে পৌঁছে যাবো।

-ঠিক আছে, ধন্যবাদ। বলে মি. দেশমুখ ফোনটা কেটে দিলেন।

অতীনদা বলল, একবার বাড়ির চারপাশটা ঘুরে দেখা দরকার, যদি কিছু পাওয়া যায়!

মি. দেশমুখ বললেন, হ্যাঁ ঠিক বলেছ।

আমি, অতীনদা, মি. দেশমুখ আর পৃথ্বীশদা বাড়ির চারপাশের বাগানে চিরুনি তল্লাশি শুরু করলাম। অতীনদা বিভিন্ন জায়গায় কখনো ঝুঁকে, কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে অজানা সুত্র খুঁজে চলল, সাথে আমরা তিনজনও। কিছুক্ষন খোজার পর বাগানের একটা দিকে চোখ পড়ল। বাগানের এক কোনায় পাঁচিল ঘেঁষা একটি জবা গাছের তলা থেকে পৃথ্বীশদা কি যেন একটা তুলল, অতীনদা আর আমি কাছে গিয়ে দেখলাম- একটি প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ, তবে সেটি ফাঁকা নয়, ভেতরে কোনো একটি ওষুধের ছোট্টো বাক্স আর একটি খয়েরী লেন্স। প্লাস্টিকটা খুলে বাক্সটা বার করলাম, লম্বা-চৌকো নীল রঙের একটা বাক্স, সামনে কোম্পানীর নাম লেখা—‘ইকুএট’, আর তার নীচে—‘কন্ট্যাক্ট লেন্স কন্ডিশনিং শলিউশন’। পড়ার পর বুঝলাম এটি লেন্স পরিষ্কারের সলিউশন। কিন্তু কার এটা? অতীনদা দেখে বলল, ত্রিদেব বাবুর ঘরের লেন্সটি যার, এটিও তার।

জবা গাছের নীচটায় আবার চোখ গেল, আর তখনই দেখলাম একটা চাবিও পড়ে আছে। অতীনদাকে চাবিটা তুলে দিলাম।

অতীনদা বলল, এটা তোদের বাড়ির কারোর?

-না। আমদের বাড়ির সব তালার চাবি চ্যাপ্টা।

আসলে চাবিটা সাধারন চাবির মতো নয়, লকের জায়গাটা গোল এবং চাবির আকার দেখে স্পষ্ট আন্দাজ করা যাচ্ছে যে এর তালাটিও বেশ বড়ো মাপের। তারপর আরো কিছুক্ষন খোঁজা হল, তবে আশানুরূপ আর কিছু পাওয়া গেলনা।

অতীনদা পৃথ্বীশদাকে বলল, তোদের বাড়িতে ঢোকার ক’টা দরজা?

-ওই একটাই। আর কোনো গেট নেই।

বেরোনোর সময় মি. দেশমুখ বিজয় বাবুকে বললেন, আমি আগামীকাল পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা নিয়ে আসবো। আর আপাতত কেউ বাড়ি থেকে দূরে কোথাও যাবেন না, এটা আপনাদের পক্ষেই সুবিধাজনক হবে। তারপর অতীনদার থেকে ওর ফোন নম্বরটা নিয়ে নিলেন এবং নিজেরটাও দিলেন এবং বললেন, দরকার পড়লে ফোন কোরো আর সাড়ে এগারোটায় আমি ঠাকুরদাস ব্যানার্জী রোডে পৌছে যাবো-

মি. দেশমুখ গুড বাই জানিয়ে জিপে উঠলেন, গাড়িটা গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল। অতীনদা হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলল, নাহ দশটা বাজে। চল- শেষেরটা অবশ্য আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা।

বেরোনোর সময় বিজয় বাবু অতীনদাকে বললেন, কাউকে বুঝছ?

অতীনদা বলল, আপাতত এই মনোতোষ কয়ালের পেছনেই ছুটতে হবে। কারণ সে-ই এখন পর্যন্ত নিরুদ্দেশ। দেখি তারপর কি করা যায়-

পৃথ্বীশদা অতীনদাকে বলল, শ্রীনিবাস নিয়োগীর কাছে যখন যাবি, আমাকে একটা ডাক দিস। আমি বাড়িতেই থাকবো। তোর হাবভাব দেখে যা বুঝতে পারছি যমকালো একটা রহস্য তৈরি হয়েছে। সো আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু মিস আ লিটল বিট অফ ইট-

অতীনদা বলল, ঠিক আছে, তৈরি থাকিস।

শ্যাম চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরোনোর পর মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছিল। একসাথে এতগুলো ঘটনা সকাল থেকে চোখের সামনে ঘটতে দেখে কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা লাগছে। অতীনদাকে বললাম, এখন তো সবার সাথে কথা বলা হয়ে গেছে। কিছু পেলে?

অতীনদা পকেট থেকে গোল্ড ফ্লেক বার করে আমার দিকে বাড়িয়ে বলল, চলে?

আমি ধূমপান করি। জানি ছাত্রাবস্থায় এটা করাটা অপরাধ, যদিও আমার এখন কলেজে তৃতীয় বর্ষ চলছে। প্রথমে শকে ধরেছিলাম কিন্তু এখন এটা নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। সিগারেটটা দেখে লোভ সংবরণ করতে পারছিলাম না, কিন্তু তাই বলে বয়সে বড়ো দাদার কাছ থেকে সিগারেট খাওয়াটা উচিৎ নয়। তাই জোর করেই বললাম, না না, ঠিক আছে, আমি খাই না।

অতীনদা বলল, আমার কাছে ঢপ দিয়ে লাভ নেই চাঁদবদন। তুমি যে এই বিষয়ে অনেক পুরোনো খেলোয়াড় তা তোমার ঠোঁটের রঙ বলে দিচ্ছে। নে ধর, ন্যাকামো করিস না।

কি আর করি, অগত্যা হ্যাঁ বলতে হল, কিন্তু সিগারেটটা নিলাম না কারণ এখানে আমাকে অনেকে চেনেন। বললাম, দিনের বেলা এখানে খাবো না, অনেক পরিচিত থাকেন এখানে। তারপর ব্যস্ত হয়ে বললাম, আর বল না—কিছু বুঝলে?

-বুঝেছি মানে আন্দাজ করেছি। প্রমাণটা পাই নি, হয়তো পেয়েছি—দেখতে পাচ্ছি না।

বললাম, কি আন্দাজ করেছো?

অতীনদা বলল, তুইও তো ওখানে ছিলিস। সবই তো দেখলি। আগে তুই বল তুই কি বুঝলি?

আমি বললাম, এতকিছু দেখেছি, এখন মনে হচ্ছে সব যেন ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে।

ও মুখে একটা যাচ্ছেতাই রকম ‘ধ্যুর’—করে বলল, এই ধ্রীয়মান নামটা কে রেখেছেন রে?

-জানিনা।

-নামের সাথে একদমই মিল নেই। ঘট দেখছি সত্যিই ফাঁকা-

আমি বললাম, ঠিক আছে-তুমিই না হয় বল তাহলে, খুনটা কে করেছে?

অতীনদা উল্টে আমাকেই প্রশ্ন করল, আগে তুই বলত, একটা লোক আরেকটা লোককে খুন কেন করে?

উদ্ভট প্রশ্ন! আমতা আমতা করে বললাম, আ— কোনো কারণে রাগ থাকলে খুন করতে পারে...

-রাগ থাকলে ক্ষতিটা মানা যায়। তাই বলে খুন?

-তাছাড়া কিছু একটা দরকার থাকলে, সেটা যদি না পায় তো সেক্ষেত্রেও তো খুন হতে পারে?

অতীনদা বলল, কিছু নেওয়ার থাকলে তো সে চুরি করেও নিতে পারে, খুন করার তো দরকার পড়ে না!

প্রশ্নের ওপর প্রশ্ন! মাথাটা গরম হয়ে যাচ্ছিল। বললাম, আমি আর ভাবতে পারছিনা। কিন্তু একটা বিষয় মাথায় আসছেনা, খুনটা যদি মাথায় বাড়ি মেরে করা হয়, তো সে ক্ষেত্রে করতে হয়েছে অন্ধকারে। ত্রিদেব বাবুর ঘরে ইজি চেয়ারটা রয়েছে খাটের পাশে, ঘরের দরজা থেকে বেশ খানিকটা দূরে। অন্ধকারে ওখানে পৌছনোটা অতই সহজ? আর ঘরের মধ্যে কোথাও কোনো রক্তের দাগ দেখলাম না তো?

অতীনদা বলল, সহজ- কারণ তিনি এ বাড়িরই লোক। আর ওই ঘরে যদি প্রায়সয়ী যাতায়াত থাকে, তো সে ক্ষেত্রে আলো আসার পরেও গিয়ে ঘর পরিস্কার করে দিয়ে আসা যায়। ঘরে ডেটলের গন্ধটা পেয়েছিস আশা করি?

-হ্যাঁ তা পেয়েছি। কিন্তু তোমার কাউকে এখনো সন্দেহ হয়নি?

-সন্দেহ মানে কতগুলো প্রশ্ন-

উৎসাহিত হয়ে বললাম, কি প্রশ্ন?

-ত্রিদেব বাবুর চোখে পাওয়ার ছিল না। তবে ওই লেন্স কার? কোন মহিলা আমাদের কথা শুনছিলেন? ত্রিদেব বাবু প্রীতিশ বাবুকে পছন্দ করতেন না কেন? ড্রয়ারে সাদা কাগজ ভিজিয়ে আবার শুকিয়ে রাখা কেন? উকিলের দরকারটা এখন গেলেই বুঝতে পারবো। আর সর্বশেষ রহস্য হল, আত্রেয়ী দেবীর প্রেমিকটি কে?



চার


আমি, অতীনদা, পৃথ্বীশদা আর মি. দেশমুখ ঠিক সাড়ে এগারোটার সময় ঠাকুরদাস ব্যানার্জী রোডে পৌঁছলাম। অ্যাডভোকেট শ্রীনিবাস নিয়োগীর বাড়িটি বেলঘরিয়া হাই স্কুলের ঠিক পেছনের গলিতে। রাস্তা ওপর আধুনিক কায়দায় তৈরি দোতলা বাড়ি।

মি. দেশমুখ কলিং বেল টিপলেন। একজন আমারই বয়সী তরুনী দরজা খুলল, হ্যাঁ বলুন?

মি. দেশমুখ বললেন, শ্রীনিবাস বাবু রয়েছেন?

-হ্যাঁ রয়েছেন। আপনিই কি কিছুক্ষন আগে ফোন করেছিলেন?

-হ্যাঁ-

-ভেতরে আসুন। তারপর একটা ঘরে নিয়ে এসে সোফার দিকে উদ্দেশ্য করে বলল, আপনারা বসুন। আমি বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।

মেয়েটি সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে গেল। কিছুক্ষন পর একজন ভদ্রলোক নেমে এলেন। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। পরনে একটা ভায়োলেট কালারের ড্রেসিং গাউন। তিনি আসতেই আমরা চারজন উঠে দাঁড়ালাম।

মি. দেশমুখ বললেন, নমস্কার। আমিই আপনাকে ফোন করেছিলাম।

-নমস্কার। বসুন- আর এনারা?

মি. দেশমুখ শ্রীনিবাস বাবুর সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন। শ্রীনিবাস বাবু যখন শুনলেন যে অতীনদা এই ব্যাপারে তদন্ত করছে, অতীনদাকে বললেন, আমিও কিন্তু একপ্রকার তদন্তই করি। তুমি শুধু সত্য প্রকাশের জন্যই সত্য খোঁজো আর আমি কখনো সত্যকে চাপা দেওয়ার জন্য মিথ্যা খুঁজি আবার কখনো মিথ্যাকে চাপা দেওয়ার জন্য সত্য খুঁজি। এই যা পার্থক্য।

কথাটা শুনলাম ঠিকই- কিন্তু কিছুই মাথায় ঢুকলনা। হাঁ করে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

মি. দেশমুখ বললেন, আপনার সাথে ত্রিদেব বাবুর পরিচয় হয় কিভাবে?

-উনি প্রথম আমাকে একদিন ফোন করেন। তারপর আমার বাড়িতে আসেন, কিছু আইনি কাজকর্মের জন্য আমাকে দরকার পড়েছিল ওনার।

মি দেশমুখ বললেন, কি কাজ?

-উনি ওনার সম্পত্তি তিন ভাগ করার জন্য উইল করতে চেয়েছিলেন।

মি. দেশমুখ বললেন, ওনার ওয়ারিশ তো দুজন, মানে দুই ছেলে। তাহলে সম্পত্তি তিনভাগ করতে চেয়েছেন কেন?

শ্রীনিবাস বাবু বললেন, আর একজন ওনার অ্যাসিস্টেন্ট মনোতোষ কয়াল।

কথাটা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলাম। অ্যাসিস্টেন্টকে কিনা সম্পত্তির ভাগ দিতে চেয়েছেন?

মি. দেশমুখ বললেন, অ্যাসিস্টেন্টকে সম্পত্তির ভাগ দেবেন কেন?

শ্রীনিবাস বাবু বললেন, আমাকে বলেছিলেন একবার নাকি বিরাট এক দূর্ঘটনার হাত থেকে মনোতোষ কয়াল ওনাকে রক্ষা করেছিলেন। সেই সূত্রে হতে পারে।

অতীনদা বলল, উইলটি কোথায় আছে জানেন?

-উইল তো ত্রিদেব বাবু নিয়ে গেছেন। তবে এখানে একটা আশ্চর্য ব্যাপার আছে। উইলটি কিন্তু কোর্ট থেকে এখনও অ্যাপ্রুভড হয়নি।

মি. দেশমুখ বললেন, তাহলে সেটা ওনার কাছে কেন?

শ্রীনিবাস বাবু বললেন, আমি উইলের সমস্ত কাগজপত্র তৈরি করে রেখেছিলাম। যেদিন কোর্টে নিয়ে যাবো, তার আগের দিন রাত্রিবেলা উনি আমার বাড়িতে এলেন। বললেন কাগজপত্রগুলো নিয়ে যাবেন, পরের দিন কোর্টে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। আমি ভাবলাম হয়তো কোর্টের স্ট্যাম্প পেপারে লিখিত কাগজপত্র চেক করবেন হয়তো, তাই নিতে চাইছেন। কিন্তু পরের দিন বেরোনোর সময় তিনি ফোন করলেন যে তিনি উইল করবেন না। তবে আমার সমস্ত ফিস উনি মিটিয়ে দিয়েছিলেন।

অতীনদা বলল, আপনাকে উনি কবে বললেন, যে তিনি উইল করবেন না?

-গত বুধবার।

মি. দেশমুখ বললেন, তবে ত্রিদেব বাবুর ঘরে তো, তেমন কোনো কাগজ পেলাম না?

অতীনদা বলল, ওটা খুনীই সরিয়েছে।

এরই মধ্যে দেখি শ্রীনিবাস বাবুর কন্যা আমাদের জন্য চারটি গ্লাসে সরবত নিয়ে এসেছেন। শ্রীনিবাস বাবু মেয়েকে বললেন সেগুলি সামনে টেবিলের ওপর রাখতে। মি. দেশমুখ বললেন, আবার এসব কেন?

শ্রীনিবাস বাবু বললেন, এই রোদে এসেছেন। সামান্যই... নিন-

আমরা চারজন একটি করে গ্লাস তুলে নিলাম।


শ্রীনিবাস বাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে অতীনদা পৃথ্বীশদাকে বলল, তোর শ্বশুরবাড়িটা কোথায় যেন?

পৃথ্বীশদা বলল, শঙ্কর বোস রোড, চেতলা।

অতীনদা বলল, ত্রিপর্ণার সাথেও কিছু কথা আছে। এখন যাওয়া যাবে?

-হ্যাঁ স্বচ্ছন্দে। আমাকেও যেতে হত। ওর কিছু জিনিস আছে, সেগুলোও দিয়ে আসতে হবে।

আমরা শ্রীনিবাস বাবুর বাড়ি থেকে আবার শ্যাম চৌধুরী বাড়িতে এলাম, কারণ পৃথ্বীশদার জিনিসগুলো নেওয়ার ছিল। প্রবল দূর্যোগের পর পরিবেশ যেমন থমথমে হয়ে যায়, সমগ্র শ্যাম চৌধুরী বাড়িটাও যেন সেরকম থমথম করছে। কাল এইসময় এই বাড়ির লোকেরা হয়তো আশাও করেননি তাঁদের ওপর দিয়ে এতবড়ো একটা দূর্যোগ বয়ে যেতে চলেছে।

পৃথ্বীশদা কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে এল। বেলঘরিয়া থেকে একঘন্টার মধ্যেই চেতলা-শঙ্কর বোস রোডে পৌঁছে গেলাম। পৃথ্বীশদাই সর্বাগ্রে রইল, কারণ তাঁর শ্বশুরবাড়ি বলে কথা। বাড়ির বেল বাজাতেই ত্রিপর্ণা দেবী এসে দরজা খুলে দিলেন। পৃথ্বীশদাকে দেখে অবাক হয়ে গেছেন হয়তো, বড়ো বড়ো চোখ করে বললেন, কি ব্যাপার, তুমি?

পৃথ্বীশদা বলল, ওবাড়িতে অনেক কান্ড ঘটেছে। ভেতরে চল বলছি।

আমরা চারজন একটা ঘরে গিয়ে খাটের ওপর বসলাম। বেশ ঝকঝকে সাজানো ঘর। পৃথ্বীশদা বলল, বিধুদা কোথায়?

ত্রিপর্ণা দেবী বললেন, দাদার ঘরে শুয়ে আছে। ওঁর তো গতকাল রাত থেকেই ভীষন জ্বর। তাও দাদা আমার সাথে পাঠিয়ে দিলেন।

পৃথ্বীশদা বলল, সেটা দাদা তোমার সুবিধার্থেই করেছেন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিলে?

-হ্যাঁ, ডাক্তার বললেন, কোনোকিছুতে খুব ভয় পেয়ে গেছেন, তাই থেকে জ্বর আসছে। দুটো ট্যাবলেট লিখে দিয়েছেন, বলেছেন আজ রাতের মধ্যেই কমে যাবে।

পৃথ্বীশদা মি. দেশমুখের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল, তারপর সম্পূর্ণ ঘটনাটা ত্রিপর্ণা দেবীকে বলল। পুরো ঘটনাটা শোণার পর আত্রেয়ী দেবীর চোখ মুখের একটা আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।

অতীনদা ত্রিপর্ণা দেবীকে প্রশ্ন করল, গতকাল রাত্রে এই আটটা নাগাদ তুমি কি করছিলে?

-আমি আমাদের ঘরেই শুয়েছিলাম। সাড়ে নটা নাগাদ খাওয়ার গরম করতে উঠেই বড়দির কান্নার আওয়াজ পেলাম। তারপর গিয়ে দেখি জ্যাঠামশাই-এর এইরকম হয়েছে।

অতীনদা বলল, বিধুদার সাথে কথা বলা যাবে এখন?

ত্রিপর্ণা দেবী বললেন, জাগাই আছে হয়তো। চলো—

আমরা ত্রিপর্ণা দেবীর সাথে সামনের একটা ঘরে ঢুকলাম। বিধুদা গায়ে চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে ছিলেন। আমাদের দেখে উঠে বসলেন।

অতীনদা খাটের পাশে গিয়ে বলল, এখনও জ্বর রয়েছে?

বিধুদা হতাশভাবে বললেন, আর জ্বর! ভগবান মাথার ওপর ছাদ আর পায়ের তলার মাটি একসাথে কেড়ে নিল। আর আপনি বলছেন জ্বরের কথা।

অতীনদা বলল, বিধুদা তোমার কাছে কিছু জানার আছে?

বিধুদা বললেন, আমি কাল রাত্রেই সবাইকে বলেছিলাম, বড়ো কর্তাকে খুন করা হয়েছে। আমি দেখেছি একজনকে বড়ো কর্তার ঘরের দিকে যেতে।

অতীনদা বলল, তুমি চিনতে পেরেছো তাকে?

-না। এমনিতেই তখন কারেন্ট চলে গেছিল। তার মধ্যে আবার পুরো কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল লোকটা।

-লোকটার উচ্চতাটা বলতে পারবে?

বিধুদা বললেন, তা তো আমি ঠিক খেয়াল করিনি! তবে আপনার মত হবে।

অতীনদা বলল, তুমি তখন কাউকে ডাকোনি?

-কারেন্ট চলে যাওয়াতে বাড়িতে হইচই পড়ে গেছিল। আমি কয়েকবার বিজয় দাদাবাবুকে ডাকলাম, কিন্তু তার কোনো সাড়া পেলাম না।

অতীনদা বলল, কারেন্ট যাওয়ার সময় তুমি কোথায় ছিল?

বিধুদা বললেন, আমি আমার ঘরের সামনে বারান্দায় বসে বিজয় দাদাবাবুর জুতো পালিশ করছিলাম, তখন কারেন্ট চলে গেল। কিছুক্ষন পর দেখি অন্ধকারে সিঁড়ি কাছে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। তারপর সিঁড়ি দিয়ে লোকটা দোতলায় উঠে গেল।

অতীনদা বলল, কখন নেমেছে?

-লোকটাকে আর নামতে দেখিনি। তারপর কারেন্ট চলে আসতেই আমি ঘরে চলে গেছিলাম।

-কোন দিক দিয়ে ঢুকেছিল?

-সেটা দেখিনি।

খাটের পাশে একটা স্কুলের ব্যাগ টেবিলে হেলান দিয়ে রাখা ছিল। অতীনদা বলল, ত্রিপর্ণা তোমাদের বাড়িতে কোনো বাচ্চা আছে নাকি?

ত্রিপর্ণা দেবী বললেন, না। কেন?

ব্যাগটা দেখিয়ে অতীনদা বলল, ওই ব্যাগটা কার?

বিধুদা একগাল হেঁসে বলল, ওটা বিল্টু বাবুর ব্যাগ। আজ সকালে তাড়াহুড়োয় আর ব্যাগ খুঁজে পাচ্ছিলাম না, তাই বিজয় দাদাবাবু এই ব্যাগটাই দিয়ে গেল।

আরো কিছুক্ষন কথা বলার পর আমরা চেতলা থেকে চলে এলাম। ত্রিপর্ণা দেবী অনেকবার দুপুরের খাওয়ারটা ওখানেই করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমাদের পক্ষে সম্ভব হল না।




সকাল থেকে এত কান্ডের পর দুপুরে আর ঘরে বসে থাকতে ভালো লাগছিল না, আর বাইরে যা গরম বেরোনোও যাবে না। চেতলা থেকে বাড়িই ফিরেছি এই কিছুক্ষন আগে, আর দুপুরবেলার সহজাত ভাত-ঘুমটা আমার ঠিক আসে না। তাই বসে শরৎচন্দ্র-এর চরিত্রহীন পড়ছিলাম, সেই অভাবনীয় ভালোবাসার টানে কিরণময়ী নীচের ঘরে নিরুদ্বেগে ঘুমাচ্ছিলেন আর উপেন্দ্রর অনেক কথা, অনেক উত্তেজনা জীবন-দ্বীপের শেষ তৈলকণাটুকু পর্যন্ত পুড়ে নিঃশেষ করে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল মুখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে, নিঃশ্বাস আছে কিনা সন্দেহ। উপন্যাসটা শেষ করে যখন উঠলাম, ঘড়িতে দেখি ছ’টা বাজতে দশ মিনিট বাকি। একবার ভাবলাম অতীনদাকে ফোন করি, মনোতোষ কয়ালের ওই ঠিকানাটায় যাবে বলছিল, যদি যায়। পরক্ষনেই ওর সেই কথাটা মনে পড়ে গেল- ‘তোপশে অথবা অজিতের চিন্তা মাথায় এলে সরিয়ে ফেল। আমি ওইরকম লেজুড় নিয়ে কাজ করতে পারবোনা’। তারপর মনে হল, পরে তো অনেক ভালোভাবেই কথা বলল, এমনকি সিগারেটও অফার করেছিল। শেষ পর্যন্ত বুকে অনেক সাহস যুগিয়ে ফোণ করলাম, হ্যালো, অতীনদা?

-ধীমান নাকি?

-হ্যাঁ। তুমি মনোতোষ কয়ালের ঠিকানায় যাবে বলছিলে, তাই আমি যদি যাই......?

অতীনদা বলল, তা তো আর সম্ভব না। আমি তো মি. দেশমুখের সাথে রওনা দিয়ে দিয়েছি।

কথাটা শুনে খুব হতাশ হয়ে পড়লাম, জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় আছো এখন?

-এখন টালা ব্রীজের ওপর।

-ঠিক আছে, আমি আসছি।

-ঠিকানাটা খেয়াল আছে?

-হ্যাঁ খেয়াল আছে-

কিন্তু ফোনটা কাটার পর ঠিকানাটা মনে করতে গিয়ে দেখি আর কিছুতেই মনে করতে পারছিনা। শুধু এইটুকু মনে আসছে—জয় ভট্টাচার্য লেন, কুমোরটুলি; কিন্তু বাড়ির নম্বরটা আর খেয়ালই পড়ছেনা। অতীনদাকে ফোন করতে গিয়ে কেটে দিলাম। যদি বুঝতে পারে একটা সামান্য ঠিকানা মনে রাখার মতো সাধ্যও আমার নেই তবে হয়ত আর সাথে রাখবেই না। তাই আর না ভেবে শার্ট-প্যান্টটা গলিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। জয় ভট্টাচার্য লেন-এ গিয়ে ঠিক খুঁজে নেব। পঞ্চাননতলা মন্দিরের সামনে দেখি পৃথ্বীশদা আসছে।

আমাকে দেখে বলল, কিরে কোথায় যাচ্ছিস?

-ঐ মনোতোষ কয়ালের বাড়িতে।

পৃথ্বীশদা আশ্চর্য হয়ে বলল, মনোতোষ কয়ালের বাড়িতে? তুই একা যাচ্ছিস নাকি?

-না অতীনদা আর মি. দেশমুখ চলে গেছে। আমি ফোন করেছিলাম, এখন যাচ্ছি।

-আমি অতীনের বাড়িতেই যাচ্ছিলাম, চল তাহলে তোর সাথেই যাওয়া যাক। ওর সাথে দেখাও হয়ে যাবে, জ্যাঠার খুনিরও সন্ধান পাওয়া যাবে।

আমি বললাম, মনোতোষ কয়ালই খুন করেছে?

-নয়তো আর কে করবে? বুধবার থেকে তো কই কাজেও আসছেনা? নিশ্চই জ্যাঠা কোনো রিসার্চ করেছিলেন, তাঁর কাগজপত্র নিয়ে চম্পট দিয়েছে-

বাস ধরব বলে নীলগঞ্জ রোডে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এমন সময় পাশের একটা বাড়ি থেকে একটা বাচ্চার পড়ার আওয়াজ কানে এল, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়ছে—‘বারো হাঁড়ি রাবড়ি বড়ো বাড়াবাড়ি’। আর এটা শুনেই হঠাৎ করে আমার বাড়ির নম্বরটা মনে পড়ে গেল, ১২/বি, জয় ভট্টাচার্য লেন-

কে-এইট বাস ধরে শ্যামবাজারে নামলাম, বাগবাজার দিয়ে হাঁটবো, কুমোরটুলি পৌঁছুতে পনেরো মিনিট মতো লাগবে। পৃথ্বীশদা রাস্তার একটা চায়ের দোকানে ঢুকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনল। আমি বললাম, গিরিশ মঞ্চের সামনে দিয়ে যাবে তো?

-হ্যাঁ চল। তারপর প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে সামনের আর একটা দোকান থেকে সিগারেটটা ধরিয়ে হাঁটতে শুরু করল, সাথে আমিও। কাশী মিত্র ঘাট স্ট্রিট থেকে ডানদিকে জয় ভট্টাচার্য লেন-এ এসে পৃথ্বীশদা বলল, অ্যাড্রেসটা খেয়াল আছে?

-হ্যাঁ— ১২/বি—

দুটো দোতলা বাড়ির মাঝখান দিয়ে সরু গলি, পাশাপাশি বড়োজোর তিনজন মানুষ হেঁটে যেতে পারবে। আমার কাছে এই ব্যাপারটা উত্তর কোলকাতার একটা ঐতিহ্য এবং উপভোগ্য বিষয়। দারুন অ্যাডভ্যাঞ্চারাস লাগে এই ধরনের গলিগুলো দিয়ে যাওয়ার সময়। বড়ো রাস্তার গাড়ির আওয়াজ-লোকজনের ভিড়-জীবন প্রবাহ যেন গলির মুখে এসে হঠাৎ করে থেমে যায়, গলির ভেতর এসে পৌছয়না, একটা ঘোর লাগানো নিস্তব্ধতা রয়েছে। রাস্তার একদিকে কিছুদুর অন্তর অন্তর লাইটপোস্ট এবং তাঁর আলোয় গলিটা যেন আরো মায়াবী লাগছে। কাছের কোনো একটা বাড়ি থেকে সন্ধ্যার শাঁখের আওয়াজ শুনতে পেলাম, একটা বাড়িতে রেডিয়োয় খবর হচ্ছে। আমি বাড়ির নম্বর প্লেট মেলাতে মেলাতে যাচ্ছিলাম, কিছুদুর হাঁটতেই রাস্তার ডানদিকে ১২/বি, নম্বরের বাড়িটা চোখে পড়ল। অনেকদিনের পুরোনো বাড়ি, দেওয়ালের ইট বেরিয়ে এসেছে। একটা সরু করিডর পার হয়ে ভেতরে গেলাম। মাঝখানে চৌকো ছাদখোলা উঠোন, সেটা ঘিরে বারান্দা, তারপর সার বেঁধে ঘর।

একজন ভদ্রমহিলাকে দেখলাম উঠোনের এক কোনায় হাত-পা ধুচ্ছিলেন, আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন, কাকে চাই?

মহিলার কথার মধ্যে পুরানো উত্তর কলকাতার একটা ছাপ রয়েছে।

আমি বললাম, মনোতোষ কয়াল এই বাড়িতেই থাকেন?

তিনি কটমট চোখ করে পৃথ্বীশদার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনিও কি পুলিশের লোক?

পৃথ্বীশদা বলল, আমরা ঠিক পুলিশের লোক নই। তবে আমাদের এক বন্ধু পুলিশ এবং তিনি এ বাড়িতেই এসেছেন।

ভদ্রমহিলা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের একটা ঘরের দিকে দেখলেন, তারপর বললেন, অ। ওই ঘরে এয়েচে, গিয়ে দেক। বুজি না বাপু এ ছেলে কোথায় যে কি করে বেড়ায়! কি করতে যে মরতে ঘরটা দিলুম..., বলতে বলতে তিনি সামনের একটা ঘরে ঢুকে গেলেন।

আমি আর পৃথ্বীশদা ভদ্রমহিলার নির্দেশিত ঘরে ঢুকলাম। ঘরের দরজার কড়াটা ভাঙা, বুঝতে পারলাম অতীনদা আর মি. দেশমুখ তালা ভেঙে ঢুকেছেন। ঘরে আসবাব বলতে একটা চৌকি, একটা টেবিল আর একটা চেয়ার। টেবিলের ওপর পাঁচ-ছ’টা মনোতোষ বাবুর পাওয়া সার্টিফিকেট-রেজাল্ট রাখা রয়েছে। তাঁর মধ্যে দুটো বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার আর সেকেন্ড ইয়ার-এর পাস আউট সারটিফিকেট। আর টেবিলের পাশে মেঝেতে একটা ট্রাঙ্ক, যেটা এখন ঢাকনা খুলে হাঁ করে রয়েছে। ট্রাঙ্কের ভেতর কয়েকটা জামা-প্যান্ট ভাঁজ করে রাখা। অতীনদা আমাদের দেখে বলল, ঠিক চিনে চলে এসছিস?

ঘরে অতীনদা আর মি. দেশমুখ ছাড়াও আরো চারজন ভদ্রলোক রয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে বয়সের পার্থক্যটা তাঁদের মুখাবরণ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

পৃথ্বীশদা বলল, মনোতোষ কয়াল কোথায়?

অতীনদা বলল, তিনি সপ্তাহে রবিবারটা শুধু এখানে আসেন।

আমি বললাম, কিন্তু ওখানে তো আট’টা থেকে ছ’টা-

কথাটা শেষ করতে পারলাম না, অতীনদা আমার হাতে একটা চাপ দিল। বুঝলাম এটা এখানে বলাটা ঠিক হবে না। জিজ্ঞেস করলাম, এমনি কিছু পেলে?

-হুম, একটা চিঠি, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া।

পৃথ্বীশদা বললেন, ওনার মা কোথায় থাকতেন?

-এই চিঠির পেছনে রয়েছে।

পৃথ্বীশদা’র কাছ থেকে চিঠিটা নিয়ে উল্টে দেখলাম, ২৫, মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীট, শোভাবাজার-

আশ্চর্য হয়ে বললাম, এখান থেকে এইখানে চিঠিতে কথা হত?

-না। এই চিঠিটা লেখা হয়েছে মনোতোষ কয়াল যখন বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন তখন।

আমার হাতে যে চিঠিটা ছিল সেটা জহরলাল নেহেরুর স্ট্যাম্প লাগানো ১৯৯৭ সালের পোস্টকার্ড। মনোতোষ কয়ালকে তাঁর মা শ্রীমতি ননীবালা দেবী লিখেছেন—


স্নেহের মনু,

ভগবানের কৃপায় আশা করি কুশলে রয়েছো। গতমাসে তোমার পত্রের উত্তর শুনে আমি বড়ো চিন্তিত হয়ে পড়েছি। ত্রিদেব বাবু তোমার পিতা স্বরূপ। তিনি তোমাকে ভালোবেসে প্রতি মাসে যে টাকা দেন, তাঁর কিয়দংশ ভাগই আমি তোমাকে পাঠাই। এখন তুমি যদি সেই টাকা নিতে দ্বিধাবোধ কর, তাহলে চলবে কিভাবে? তুমি ভালোভাবেই জানো বারানসীর ঐ কলেজে তোমাকে পড়ানো আমার পক্ষে কতটা কষ্টকর। তাই তোমার কাছে অনুরোধ করছি এই টাকা নিতে দ্বিধাবোধ কোরো না। তিনি বলেছেন তুমি ফিরে এলে তোমাকে উনি নিজের দ্বায়িত্বে চাকুরি জোগাড় করে দেবেন। তাই এসব ভাবনা ছেড়ে দিয়ে ভালো করে লেখাপড়া কর।

আমি ভালো আছি, আমাকে নিয়ে বৃথা চিন্তা কোরো না। শরীরের যত্ন নিয়ো। ঠিকভাবে খাওয়া-দাওয়া কোরো। অনিয়ম করে শরীরের কোনো ক্ষতি কোরো না। ভালো থেকো। তোমার পত্রের অপেক্ষা করব।

ইতি-

আশির্বাদক

তোমার মা


চিঠিটা পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। ত্রিদেব বাবু মনোতোষ কয়ালকে আগে থেকেই চিনতেন! কিন্তু টাকা দেওয়ার কারণটা ঠিক বোধগম্য হল না। আর মনোতোষ কয়াল যদি ত্রিদেব বাবুর কাছ থেকে এত সাহায্য পেয়ে থাকেন, তবে তিনি ত্রিদেব বাবুকেই খুন করবেন কেন? অতীনদাকে চিঠিটা ফেরত দিয়ে মনের শঙ্কাটা জাহির করলাম। এমন সময় লোডসেডিং, এটা অবশ্য পুরোপুরি। কারণ রাস্তার আলোগুলোও নিভে গেছে। একজন ভদ্রলোক বেশ কষ্টেশিষ্টে একটা লম্ফ জোগাড় করলেন, পৃথ্বীশদা দেশলাই দিয়ে লম্ফটা জ্বালিয়ে দিল। এখন ঘরের মধ্যে একটা চাপা আলো-আঁধারির খেলা চলছে। ঘরের প্রত্যেকের ছাওয়া বিপরীত দিকে দেওয়ালে পড়ে কতকগুল দানবাকৃতি ছায়া মানুষের সৃষ্টি করেছে। এরই মধ্যে বাগবাজার লঞ্চ ঘাট থেকে লঞ্চের ভোঁ...ভোঁ... শব্দ ভেসে এল। ঐ অন্ধকারের মধ্যে আওয়াজটা শুনে শরীরটা কেমন শিউরে উঠল।

অতীনদা মি. দেশমুখকে বলল, একেবারে মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীটটা ঘুরে যাবেন?

মি. দেশমুখ বললেন, হ্যাঁ, সেটাই ভালো। চলো, একেবারে কথা বলেই না হয়ে ফেরা যাবে-

আমরা চারজন অন্ধকারের মধ্যেই ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। গলির ভেতর থেকে কাশীমিত্র ঘাট স্ট্রীটের আলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন দূরবীনে চোখ রেখে দেখছি- পুরো অন্ধকার, মাথার কাছটায় আলো দেখা যাচ্ছে।

রবীন্দ্র সরনী-তে মি. দেশমুখের জিপ দাঁড় করানো ছিল, উঠলাম। মি. দেশমুখ গাড়িতে উঠতে গিয়েও উঠলেন না দেখে অতীনদা বলল, কি হল?

মি. দেশমুখ খানিক ইতস্তত করে বললেন, অতীন্দ্রিয় এই শোভাবাজারের মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীট কি যেতেই হবে?

অতীনদা বলল, যাওয়াটা তো দরকার। না হলে এই মনোতোষ কয়াল আসলে কে, সেটা তো জানা যাবে না।

কথাটা শুনে মি. দেশমুখ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, না, আসলে ধ্রীয়মান আছে তো- তাই বলছিলাম ওঁকে নিয়ে যাওয়াটা কি ঠিক হবে।

অতীনদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি সাথে আছেন তো! আর তাছাড়াও ওর একুশ বছর হয়ে গেছে। নিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে কিনা যানি না, তবে ভুল কিছু হবে বলে আমার মনে হয় না।

পৃথ্বীশদা হাত-ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তাহলে বেরোই।

অতীনদা বলল, তুই যাবি না?

-না। ওই এলাকাটা আমার ঠিক পছন্দের নয়। আর আমার আবার স্কুলের পরীক্ষার খাতা দেখার আছে।

অতীনদা বলল, ঠিক আছে, আয় তাহলে—

গাড়িতে যেতে যেতে আমি অতীনদাকে বললাম, মনোতোষ কয়াল কোথায় আছে জানতে পারলে?

-মেসের সবাই বলছে, ত্রিদেব বাবুর বাড়িতেই নাকি সারা সপ্তাহ থাকে। আর ওদিকে ত্রিদেব বাবুর কাছে ওর আট’টা-ছ’টার ডিউটি—তবে এই গোটা সপ্তাহ সন্ধ্যা ছ’টা থেকে সকাল আট’টা পর্যন্ত মনোতোষ কয়াল কোথায় থাকে?

আমি বললাম, এমনি মানুষ হিসাবে কেমন?

-ভালোই, সবার সাথে মিলে মিশে থাকে, হাসিখুশি মানুষ। কিন্তু লিভারের রুগী, মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সেই বেশির ভাগ চুল পেকে গেছে। তবে ওর দিকে তাকালে যেটা প্রথম লক্ষ্য করার বিষয় সেটা হল, ওর চোখের মনি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

-খয়েরী রঙের। আর ত্রিদেব বাবুর চোখের মনির রঙও খয়েরী রঙের।

কথাটা শুনে মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করল। প্রতি মাসে ত্রিদেব বাবু মনোতোষ কয়ালের মাতাকে টাকা পাঠাতেন, নিজের কাছে কাজ দিয়েছেন, সম্পত্তির ভাগ দিতে চেয়েছেন। মনোতোষ কয়াল ত্রিদেব বাবুর এত আপন কিভাবে হলেন?

অতীনদাকে বললাম কথাগুলো। অতীনদা শুনে বলল, আমারও মনে হয়েছে। আর এর উত্তর খুঁজতেই মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীটে যাওয়া—তবে গিয়ে হয়তো মনোতোষ কয়ালের সম্বন্ধে অনেক কিছু জানা যাবে, কিন্তু তাঁর খোঁজ পাওয়া যাবে না।

মি. দেশমুখ বললেন, কেন?

অতীনদা গাড়ির কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, মনোতোষ কয়াল এখন শুধুমাত্র একটা সাত অক্ষরের নাম, যার শুধু ছায়াটাই রয়েছে, আর কিছু নেই। আর আমরা সেই ছায়ার পেছনেই ছুটে বেড়াচ্ছি।

আমি অবাক হয়ে বললাম, তাহলে মনোতোষ কয়াল খুন করেনি?

অতীনদা করুনাভরা হাঁসি হেঁসে বলল, মনোতোষ কয়াল? ভদ্রলোক আদৌ জীবিত আছেন তো?






পাঁচ


মি. দেশমুখ যে কি কারণে আমাকে মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীটে না নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নটা তুলেছিলেন তখন কিছুই বুঝে উঠিনি। ভেবেছিলাম মি. দেশমুখের হয়তো কোনো প্রবলেম হচ্ছে, সাথে এমন একটা লোক যে কোনো কাজে কর্মে লাগে না, তাকে বয়ে বেড়ানোটা হয়তো ওনার কাছে অসুবিধার কারণ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু না নিয়ে যেতে চাওয়ার আসল কারণটা বুঝলাম যখন গাড়িটা রবীন্দ্র সরনীতে মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীটের মুখে এসে দাড়ালো। গাড়ির ভেতর থেকেই রাস্তার বামদিকে কিছুক্ষন ধরে লক্ষ্য করছিলাম বেশ কিছু মহিলা পুলিশের গাড়ি দেখে গলির ভেতর কর্পূরের মতো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। এই মহিলাদের আসল পরিচয়টা এই শহর এক বিশেষ নামে খ্যাত করলেও, এই খ্যাতিটা এই শহরের নির্লজ্জতার চিহ্ন হিসাবেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। আসলে মানুষ আঁধারে যা ঘটায়, আলো ফুটলে সেটাই অস্বীকার করে বেড়ায়। হয়তো এটাই সভ্য সমাজে মান আর হুঁশের পরিভাষা।

আমরা তিনজন মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীটের সামনে গাড়ি থেকে নামলাম। মি. দেশমুখ বললেন, অতীন্দ্রিয় তুমি আগে চল, আর ধ্রীয়মান তুমি ওর সাথেই থাকবে, আমি তোমাদের পেছনেই রয়েছি। মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীট দিয়ে কিছুটা এগোতে সামনে একটা পানের দোকান থেকে একজন ‘ভদ্র’-লোক এগিয়ে এসে মি. দেশমুখকে বললেন, কি হয়েছে স্যার?

মি. দেশমুখ বেশ গম্ভীরভাবে বললেন, কি হয়েছে মানে? কি হবে?

মুখে অতিরিক্ত ভদ্রতার খাতির দেখিয়ে বললেন, না স্যার, এই গলিতে পুলিশ তো সচরাচর ঢোকেনা...তাই...

মি. দেশমুখ হঠাৎ গলা চড়িয়ে বললেন, সে কৈফিয়ত তোকে দিতে হবে? চল ভাগ-

লোকটা আর কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ পাশের একটা গলিতে মিলিয়ে গেল। যখন থেকে এই গলিতে ঢুকেছি বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করেছে, আর সেটা উৎসাহে নয় অজানা কোনো একটা ভয়ে। মাথা থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরতে শুরু করেছে। চারপাশের লোকজনগুলোকে কেমন যেন ভয় লাগছে, গলাটাও ধরে আসছে বুঝতে পারলাম।

গলা খাঁকরে অতীনদার জামার হাতায় একটা টান মেরে বললাম, আরও কতটা অতীনদা?

মি. দেশমুখ মনে হয় শুনতে পেয়েছেন। বললেন, দাড়াও, ওই দোকানটায় জিজ্ঞেস করি। বলে সামনের একটা দোকানের দিকে এগিয়ে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, ডানদিকে সামনে ওই তিনটে বাড়ি পরে-

সামনের তিনটে বাড়ির পরের বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই ভেতরে ঢোকার ইচ্ছেটা চলে গেল। রাস্তার ওপরেই পাচিলের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনতলা বাড়িটা। দরজার সামনে দুজন মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন। মি. দেশমুখ তাঁদের বললেন, এখানে ননীবালা দেবী নামের কেউ থাকেন?

মহিলা দুজন আমাদের আপাদমস্তক ভালোভাবে নিরীক্ষন করলেন, তারপর পানভর্তি মুখে একজন দন্তবিকশিত করে বললেন, কি হয়েছে স্যার? ননীদি তো-

আরেকজন মহিলা তাকে কনুই মেরে থামিয়ে দিয়ে বললেন, দাঁড়ান ডাকছি। তারপর দরজার ভেতরে মুখ বাড়িয়ে ডাক দিলেন, কমলা মাসি...

ভেতর থেকে সাড়া এল, কি......?

-দেখো দেখি, পুলিশ এসেছে- ননীদির সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে।

বাড়ির ভেতর থেকে চল্লিশোর্দ্ধ একজন মহিলা বেরিয়ে এলেন। মি. দেশমুখ তাকে বললেন, এখানে ননীবালা দেবী নামে কেউ থাকেন?

-থাকেন মানে থাকতেন... কি হয়েছে বাবু?

মি. দেশমুখ বললেন, গতকাল ত্রিদেব বাবু মারা গেছেন, আর ওনার কাছে—

কমলা দেবী মি. দেশমুখকে তাঁর কথা শেষ করতে দিলেন না, বললেন, কি...? কর্তা মারা গেছেন? তারপর তড়িঘড়ি করে বললেন, আপনারা ভেতরে আসুন।

কমলা দেবী যে ঘরটিতে নিয়ে এলেন, ঘরটি খুব সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো। ঘরের মেঝে পুরো ভেলভেটের সামিয়ানায় ঢাকা। ঘরে ঢোকার দরজার বিপরীত দিকের দেওয়ালের কাছে একটা নীচু টেবিলের ওপর একজন মহিলার বাঁধানো ছবি রজনীগন্ধার মালা দিয়ে সাজানো। পাশে ধূপদানীর চারটে কাঠি থেকে নির্গত অক্লান্ত সুগন্ধি ধোঁয়া ঘর জুড়ে তাঁর অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। ঘরের আর এক পাশে একটা ড্রেসিং টেবিল, তবে তা সম্পূর্ণ রিক্ত। সামিয়ানার একদিকে পাশাপাশি কিছু বালিশ আর তাঁর পাশে একটা পানের সাঁজা, মাথার ওপর বিরাট এক ঝাড়লন্ঠন বাতাসের ধাক্কায় মাঝে মাঝে টুং টাং আওয়াজ করে কর্ণক্লান্তি দূর করছে। আমরা মেঝেয়ে সামিয়ানার ওপরই বসলাম। মি. দেশমুখ ত্রিদেব বাবুর মৃত্যুর ব্যাপারটা সম্পুর্ন বললেন। মি. দেশমুখের কথা শুনতে শুনতে কমলা দেবীর চোখ থেকে অশ্রুধারা বইতে শুরু করল।

কমলা দেবী শাড়ীর আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, খুব ভালোমানুষ ছিলেন। ওনার মতো মানুষকে কে মারতে চাইবে?

অতীনদা বলল, আমরাও তাকেই খোজার চেষ্টা করছি। আপনার সাথে ত্রিদেব বাবুর পরিচয় হয় কিভাবে?

কমলা দেবী আবেগপ্রবণ হয়ে অনেক কথাই বললেন, কখনো পুরোনো কথা বলে গেলেন, কখনো মনোতোষ কয়ালের কথা বললেন। এলোমেলো ভাবে অতীতের স্মৃতি বিজড়িত প্রচুর কথা বললেন। নীচে প্রয়োজন মতো সাজিয়ে লিখছি।

ত্রিদেব বাবু বিবাহের পূর্ব থেকেই মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীটের এই বাড়িতে আসতেন। ধীরে ধীরে ননীবালা দেবীর সাথে পরিচয় এবং তা থেকে সম্পর্ক স্থাপন হয়। তারপর এদিকে ত্রিদেব বাবুর বাড়ি থেকে বিবাহের জন্য চাপ সৃষ্টি হতে শুরু হয়েছিল। ত্রিদেব বাবু তখন ননীবালা দেবীকে তাঁর পিতার কাছে নিয়ে যান বিবাহের জন্য। কিন্তু ত্রিদেব বাবুর পিতা রাজী হলেননা। আর ছেলের এরূপ দুষ্কর্মের কারণে শীঘ্রই সম্বন্ধ ঠিক করে ওনার বিবাহ অন্য জায়গায় করিয়ে দিলেন। বিবাহ হল ঠিকই, কিন্তু মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীটে ত্রিদেব বাবুর আসা যাওয়া বন্ধ হল না। ফলে সময়ের স্বাভাবিক নিয়মে কিছুদিন পর ননীবালা দেবী এবং ত্রিদেব বাবুর স্ত্রী দুজনেই অন্তঃসত্ত্বা হলেন। বাড়িতে ত্রিদেব বাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বিজয় বাবু জন্ম নিলেন, আর এদিকে দেড় মাস পর মনোতোষ কয়াল পৃথিবীর আলো দেখলেন। বিজয় বাবু হওয়ার পর ত্রিদেব বাবুর মসজিদ বাড়ি ষ্ট্রীটে আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিল। তবে মনোতোষ কয়ালকে উনি নিজের পুত্র স্নেহেই দেখতেন। প্রতি মাসে একবার করে আসতেন এবং ননীবালা দেবীর হাতে কিছু টাকা দিয়ে যেতেন। তারপর ধীরে ধীরে আসা যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। প্রতি মাসে একটি করে চিঠি আর তার সাথে আট হাজার টাকা করে পাঠাতেন। মনোতোষ কয়াল সেই টাকাতেই বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করতেন।

কথাগুলো বলতে বলতে কমলা দেবী অনবরত অশ্রুপাত করে যাচ্ছিলেন। মোটামুটি এতটা বলে ঘরের উত্তরদিকে যে ছবিটি ছিল সেইদিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলেন। তারপর নিজের মনেই আবার বলতে আরম্ভ করলেন, গোটা জীবন ধরে কি পেল ননী? আমি আর ও একসাথেই বড়ো হলাম, ছোটো থেকে চারপাশে এই নরক দেখে বড়ো হওয়া, তারপর একসময় নিজেরাও সেই অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দিলাম, কারণ এছাড়া তো আর উপায় নেই। আপনারা মুখে যতই বলুন, আমাদের সম্মান দেওয়ার কথা; সে সম্মান যে আমাদের প্রাপ্য নয়, তা আমি বুঝে গেছিলাম ননী যেদিন ত্রিদেব বাবুর বাড়ি থেকে খালি হাতে ফিরে এসেছিল। কিন্তু ননী আর সেই অগ্নিকুন্ডে ফিরে যায়নি, তবু জীবনটা তো সেই নরকই হয়ে উঠল। যে ছেলেকে ভর করে বেঁচে ছিল, সেও তো ফাকি দিয়ে চলে গেল-

অতীনদা বলল, মনোতোষ বাবু এখন কোথায় আছেন?

কমলা দেবী হয়তো অতীনদার কথাটা শুনতে পাননি। নিজের মনেই বলে চললেন, কলেজে ভর্তি হল, লেখা পড়ায় বরাবরই খুব ভালো ছিল। কিন্তু সবই বৃথা হয়ে গেল। দেড় বছর পর কলেজ থেকে কোথায় ঘোরাতে নিয়ে গেছিল, সেখানে একটা গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে...মনোতোষ মারা গেল।

কথাটা শুনে আমি আর মি. দেশমুখ দুজনেই চমকে উঠলাম এবং নিজেদের অজান্তেই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, কি...?

কিন্তু অতীনদা স্বাভাবিক ভাবেই বলল, কিন্তু আপনারা আর ত্রিদেব বাবুকে এই সম্বন্ধে কিছু বলেন নি। পাছে প্রতি মাসে যে টাকা আসে, সেটা যদি বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে ত্রিদেব বাবু প্রতি মাসে টাকা পাঠিয়ে যেতেন, তারপর একদিন এলেন, এসে দেখলেন ননীবালা দেবী মারা গেছেন। তারপর আর আসেননি, আর আপনিও তাকে মনোতোষ কয়ালের কথাটা বলেননি। কি তাই তো?

কমলা দেবী স্তম্ভিত চোখে অতীনদার মুখের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নাড়লেন।

-কিন্তু গত দেড় বছর ধরে সেই সুজোগের সদ্ব্যবহার করে একজন ত্রিদেব বাবুর ক্ষতি করে যাচ্ছিল, এটা কি আপনি যানেন? আপনার ত্রিদেব বাবুকে তখনই জানিয়ে দেওয়া উচিৎ ছিল!

কমলা দেবী বললেন, ত্রিদেব বাবু মনোতোষকে খুব ভালোবাসতেন। আর এদিকে ননীও তখন মারা গেছে। সেই অবস্থায় আমার দ্বারা আর বলা হয়ে ওঠেনি।

অতীনদা বলল, মনোতোষ বাবুর কলেজের রেজাল্ট-কাগজপত্র এখন কোথায় আছে?

কমলা দেবী বললেন, সেসব তো নেই! প্রায় দেড় বছর আগে মনুর কলেজ থেকে একজন এসে সে সব নিয়ে গেছেন।

অতীনদা উত্তেজিত হয়ে বলল, আর সেগুলো আপনি দিয়ে দিলেন?

কমলা দেবী বললেন, আমি মুখ্যু মানুষ। লেখা পড়ার কিছুই বুঝি না। তবে ঐ ভদ্রলোক কলেজের কার্ড দেখিয়েছিলেন।

অতীনদা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, বুঝতে পেরেছি।

একটা মানুষ তার গোটা জীবন ধরে একের পর এক বিষ্ময় ঘটিয়ে গেছেন সমাজের সামনে। আর সেই বিস্ময়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানুষটাকেও যেন আজ নতুন করে চিনলাম। বুঝে উঠতে পারলাম না ত্রিদেব বাবুকে সম্মান জানাবো নাকি ধিক্কার। পর্যালোচনার উর্দ্ধে উঠে তিনি যেন এক অসামান্য স্থান অর্জন করেছেন, যা হয়তো কোনোদিন কেউ জানবে না।

সেদিন রাত্রে সাড়ে দশটার সময় মি. দেশমুখ আমাদের শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সামনে নামিয়ে দিলেন। বাড়ির সামনে দুজন কনস্টেবল নিযুক্ত ছিলেন, তাঁরা মি. দেশমুখকে দেখে শ্যালুট করলেন। মি. দেশমুখ বললেন, কি—সব ঠিক ঠাক আছে তো?

একজন বললেন, প্রীতিশ বাবু সাতটার সময় বেরিয়েছিলেন। দাস গেছিল সঙ্গে-

অতীনদা বলল, কোথায় গেছিলেন?

-বেলঘরিয়া স্টেশনের কাছে একটা সাইবার ক্যাফেতে—ব্যাঙ্গালুরুর ফ্লাইটের টিকিট রিজার্ভেশনের জন্য।

অতীনদা অস্ফূট স্বরে বলল, ব্যাঙ্গালুরু—?

-আর পৃথ্বীশ বাবুও বেরিয়েছিলেন, ন’টা নাগাদ চলে এসেছেন। তবে কোথায় গেছিলেন—

মি. দেশমুখ বললেন, হ্যাঁ—তিনি আমাদের সাথেই ছিলেন।

তারপর অতীনদা বলল, আজকে আট’টা নাগাদ কারেন্ট গেছিল?

একজন কন্সটেবল বললেন, হ্যাঁ গেছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চলে এসেছে।

পৃথ্বীশদা বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল, আমাদের দেখে গেটের কাছে এগিয়ে এল।

অতীনদা বলল, ঠিক আছে, বাড়ির সবার ওপর ভালোভাবে লক্ষ্য রাখবে, তারপর পৃথ্বীশদাকে দেখিয়ে হালকা হেঁসে ঠাট্টাচ্ছলে বলল, এর ওপর বেশি করে লক্ষ্য রাখবে, এর এক পাও যেন এদিক ওদিক না হয়।

পৃথ্বীশদা হেঁসে বলল, তুইই তাহলে পাহাড়ায় থাক।

অতীনদা বলল, সেটা হলে তো, আরও ভালো হত। কিন্তু তুই তো জানিস, আমি আবার খুব ঘুম কাতুরে।

মি. দেশমুখ বললেন, ঠিক আছে, এখন চলি—গুড নাইট। কাল সকালে পোস্টমর্টেম আর ফরেন্সিক রিপোর্টটা নিয়ে একেবারে আসবো।

আমি আর অতীনদা বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালাম। অতীনদা পকেট থেকে একটা গোল্ড ফ্লেক-এর প্যাকেট বার করে তা থেকে একটা আমায় দিল, আর একটা নিজে ধরালো। কিছুক্ষন বেশ নীরবেই হাঁটছিলাম। অতীনদা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে প্রচুর ধোঁয়া বার করে মাথাটাকে অদ্ভূতভাবে ঝাঁকিয়ে বলল, তুই বাড়ি থেকে বেরোনোর পর কুমোরটুলির ওই বাড়ি পৌঁছনো পর্যন্ত যা যা দেখেছিস-করেছিস-শুনেছিস-বলেছিস সব বল। কিচ্ছু বাদ দিবি না- রাস্তায় যদি নো স্প্লিটিং জোনে একবার থুতুও ফেলে থাকিস, তো সেটাও যেন বাদ না যায়।

হঠাৎ এরকম আচরণে খানিক ঘাবড়ে গেলাম, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, ভুল কিছু করে ফেলেছি নাকি? যাওয়াটা উচিৎ হয় নি—না?

অতীনদা বলল, আলবাত হয়েছে। তুই শুধু বলে যা—

অতীনদাকে এরকম উত্তেজিত দেখে সত্যিই ঘাবড়ে গেলাম। বাড়ি থেকে বেরোনোর পর ওখানে পৌঁছনো পর্যন্ত যা যা হয়েছে সমস্তটাই বললাম। অতীনদা সমস্তটা শুনে উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল, তারপর আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, পেয়েছি- তারপর আমার কাঁধের ওপর হাত রেখে বলল, ধীমান, এই রহস্যটা যদি আমি ভেদ করতে পারি, তবে তাতে আমার ঠিক যতটা কৃতিত্ব থাকবে ঠিক ততটাই কৃতিত্ব তোরও থাকবে। তুই না থাকলে হয়তো এই রহস্যটা উদ্ঘাটন করা আমার পক্ষে আরো কষ্টকর হত।

কথাগুলো আমার কাছে খানিক প্রলাপের মতো ঠেকল। কি করে যে কি কৃতিত্ব অর্জন করলাম কিছুই বুঝে উঠলাম না। কিন্তু অতীনদার শেষ কথাটা আমাকে আগ্রহী করে তুলল, উৎসাহিত হয়ে বললাম, রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে গেছে?

অতীনদা একটা বুদ্ধীদিপ্ত হাঁসি দিয়ে বলল, সবে তো একটা পর্দা উন্মোচন হল, আশা করছি আস্তে আস্তে সবকটাই খুলবে। আচ্ছা ধীমান তোকে একটা প্রশ্ন করছি, ভেবে-চিন্তে জবাব দিবি।

আমি বললাম, কি?

-যদি কোনো মহিলা জানতে পারেন যে, তাঁর সাথে যে লোকটির বিবাহ হতে চলেছে, তাঁর দু-এক বছরের মধ্যেই মৃত্যু ঘটবে! মহিলাটি কি তাকে বিয়ে করবেন?

আমি বললাম, অবশ্যই না। এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। কে নিজের জীবন এভাবে ধ্বংস করতে চাইবে?

অতীনদা বলল, করেছেন একজন। তবে তিনি নিজের জীবন ধ্বংস করেননি?

আমি বললাম, তুমি কি আত্রেয়ী দেবীর কথা ভাবছো?

-হ্যাঁ।

-কিন্তু অজয় বাবুর ক্যানসার তো বিয়ের আট-ন মাস পর ধরা পড়েছিল।

অতীনদা বলল, না। আমি আজ অজয় বাবুর সমস্ত রিপোর্ট নিয়ে একজন ডাক্তারের গেছিলাম। আর সেখান থেকেই জানতে পারলাম, অজয় বাবুর টাইফয়েডের সময় করা ব্লাড টেস্টের রিপোর্টেই ক্যানসার ধরা পড়েছিল। আর আত্রেয়ী দেবী অজয়বাবুরই নার্স ছিলেন, সুতরাং তাঁর পক্ষে এটা জানাটা খুবই স্বাভাবিক। তবে এটা জানা সত্ত্বেও কেন আত্রেয়ী দেবী এই পদক্ষেপটা নিলেন?




ছয়


রবিবার ছুটির দিন বলে, ঘুমটা একটু দেরি করেই ভাঙত, কিন্তু আজ হঠাৎ আচমকা চোখ খুলে দেখি সকাল সাতটা। হয়তো কালকের রসদটার চিন্তাতেই তাড়াতাড়ি ঘুমটা ভেঙে গেছে। উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজছিলাম, কাকা দেখে বলল, কিরে আজ সূর্য কি পশ্চিম দিক থেকে উঠল নাকি? এত সকালে আপনার দর্শণ- তাও আবার রবিবারে?

আমি ঘুম জড়ানো চোখেই বললাম, রবিবার বলে কি তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙতে নেই নাকি?

কাকা আরো ব্যঙ্গ করে বলল, না-আপনার তো আজ পর্যন্ত কোনোদিন ভাঙেনি, তাই এই উদ্বেগ বৎস—

বড়মা (সম্পর্কে আমার ঠাকুরমা, কিন্তু আমি ছোটো থেকে বড়মা ডাকি) তুলসী মঞ্চে জল দিচ্ছিলেন। প্রনাম সেরে কাকাকে বললেন, এই ধীরু—তোর আর কোনো কাজ নেই? সকাল বেলা উঠে ওর পেছনে লেগেছিস?

তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করে নিয়ে অতীনদাকে ফোন করলাম। কারণ এই ঘটনার একটা মূহুর্তও আমি হাতছাড়া করতে রাজি নই। প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল—ফোন তুললনা। আমি আবার ফোন করলাম, চার-পাঁচ বার রিং হওয়ার পর তুলল, হ্যালো-?

আমি বললাম, হ্যালো অতীনদা? আমি ধীমান বলছি-

ফোনের ওপার থেকে বিরাট একটা হাই তোলার আওয়াজ এল, তারপর বলল, দেশমুখ সাড়ে ন’টায় আসবে তখন যাবো। এখন ঘুমোতে দে ভাই—কাল অনেক রাত্রে ঘুমিয়েছি। যখন বেরোবো তোকে ফোন করে দেবো।

আমি ‘ঠিক আছে’ বলে ফোনটা কেটে দিলাম। ফোনটা কাটার পর মনে হল, আমি যে শ্যাম চৌধুরী বাড়িতে যাওয়ার জন্য ফোন করেছিলাম, ও বুঝল কি করে!

ন’টা দশে অতীনদার ফোন এল, শ্যাম চৌধুরী বাড়িতে চলে আয়, আমি পৌঁছচ্ছি।

তাড়াতাড়ি একটা শার্ট গলিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সামনে মি. দেশমুখের জিপটা দেখলাম। ভেতরে গিয়ে দেখি, অতীনদা তখনও আসেনি। মি দেশমুখ বারান্দার একটা সোফায় বসেছিলেন, পাশে একটা টুলে বিজয় বাবু। মি. দেশমুখ আমাকে দেখে বললেন, কি ব্যাপার—তোমার গুরুমশাই কোথায়?

আমি বললাম, আমাকে ফোন করল আসছে- বলতে বলতেই দেখি অতীনদা ঢুকছে। ঢুকেই মি. দেশমুখকে গুড মর্নিং জানিয়ে বলল, বাবা সবাই হাজির দেখছি। তারপর মি. দেশমুখকে বলল, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এনেছেন?

মি. দেশমুখ বললেন, তোমার সন্দেহই ঠিক। আগে হাত দুটো বাঁধা হয়েছে, তারপর মাথায় ভারী কিছু দিয়ে বাড়ি। তবে দেহে ক্লোরোফর্ম পাওয়া গেছে-

অতীনদা বলল, তাহলে আগে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করা হয়েছে, তারপর হাত বেধেছে। আর ওই অ্যালোভেরা পাতার ব্লাডের ফরেন্সিক রিপোর্ট?

-ও-পসিটিভ এবং মহিলা দেহের রক্ত— ইদানীং খুব আন্টিবায়োটিক খাচ্ছেন-

অতীনদা বিজয় বাবুকে বললেন, আপনাদের বাড়ীতে ও-পজিটিভ ব্লাড গ্রুপ কারোর আছে?

পৃথ্বীশদা কিছুক্ষন আগে এসে দাঁড়িয়ে ছিল, বলল, ও পজিটিভ তো ত্রিপর্ণার। কিন্তু ও তো বাপের বাড়িতে।

অতীনদা বলল, আর কারোর ও পজিটিভ নেই?

বিজয় বাবু বললেন, না।

অতীনদা বিজয় বাবুকে বলল, প্রীতিশ বাবু আছেন বাড়িতে?

-হ্যাঁ।

-একবার ডেকে দিন, কিছু কথা আছে।

কিছুক্ষন পর প্রীতিশ বাবু সিঁড়ি দিয়ে নামলেন, মাথার পেছনের চুল ঠিক করতে করতে। এসে অতীনদাকে বললেন, হ্যাঁ বল?

অতীনদা বলল, কোথায় ছিলেন?

-মেজো বৌদির ঘরে।

অতীনদা বলল, কোথাও হেলান দিয়ে বসেছিলেন?

-হ্যাঁ, কিন্তু কেন বলত?

-না, আপনার মাথার পেছনের চুল গুলো এলোমেলো হয়ে রয়েছে, তা ঠিক করতে করতে নামছিলেন। তাই-

প্রীতিশ বাবু বললেন, হ্যাঁ, বিছা—মানে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিলাম।

অতীনদা বলল, আচ্ছা যেটা বলার, আপনি ব্যাঙ্গালুরু যাচ্ছেন?

-হ্যাঁ।

-ফ্লাইট কবে?

-এক মাস বাদে আজকের তারিখেই। আসলে ফ্লাইটের টিকিট আগে থেকে বুকিং করে রাখলে ভাড়াটা কম পড়ে।

-টিকিট কবে বুক করেছেন?

-টিকিট পরশু বুক করেছি, আর গতকালই কনফার্ম হয়ে গেছে।

-আপনি আর কে যাচ্ছেন?

প্রীতিশ বাবু শুকনো হাঁসি হেঁসে বললেন, আর কে যাবে? আমি একাই যাচ্ছি।

-কোনো মেডিক্যাল ডিগ্রি?

প্রীতিশ বাবু হেঁসে উঠলেন, ঠিক তাই। ভেলোড় যাচ্ছি, এম. ডি. –এর জন্য।

অতীনদা বলল, কাল আপনি ফ্লাইট-এর টিকিট আনতে কখন বেরিয়েছিলেন?

-এই সাতটা নাগাদ।

-কোন সাইবারে গেছিলেন?

-স্টেশনের কাছে—স্টুডেন্ট সাইবার ক্যাফে।

-আর ফিরেছেন?

-অতটা খেয়াল করিনি, তবে পৌনে ন’টা মতো হবে হয়তো।

অতীনদা বলল, ঠিক আছে, আপনি আসুন।

মি. দেশমুখ বললেন, কিছু কিনারা হল?

-হ্যাঁ... তবে একটা জায়গায় বিঁধছে, সেটা স্টুডেন্ট সাইবার ক্যাফেতে না গেলে বোঝা যাবে না।

মি. দেশমুখ বললেন, এখনই যাবে?

-হ্যাঁ। বেশি দেরি করলে, হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।



পৃথ্বীশদা বলল, আপনারা তাহলে পাঁচ মিনিট বসুন, আমি তৈরি হয়ে আসছি। বলে তাঁর নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।

মি. দেশমুখ বললেন, খুনীর সন্ধান পেয়েছো?

অতীনদা বলল, প্রায় পেয়ে গেছি। তবে আপনার কি মনে হয়? কে খুন করতে পারে?

মি দেশমুখ বললেন, আমার তো মনে হয় যে লোকটা মনোতোষ কয়াল সেজে আসতো সেই।

অতীনদা বলল, কিন্তু সে খুন করবে কেন?

-ভেবেছিল মনোতোষ কয়াল সেজে এলে, ত্রিদেব বাবু পুত্রস্নেহে সম্পত্তির ভাগ দেবেন। ত্রিদেব বাবু হয়তো দিয়েও দিতেন। পরে দেখল ত্রিদেব বাবু মত বদলেছেন। ব্যাস সেই ক্ষোভেই খুন।

অতীনদা মি. দেশমুখের কথাটা শুনে মোহগ্রস্তের মত ওনার দিকে তাকিয়ে ছিল। পৃথ্বীশদা এসে বলল, চল।

অতীনদা চমক ভেঙে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, হ্যাঁ চল।

বেলঘরিয়া স্টেশনের কাছেই স্টুডেন্ট সাইবার, ক্যাফেটি অনেকদিনের পুরানো। ক্যাফেতে ঢুকতেই ক্যাফের মালিক বললেন, কি ব্যাপার বলুন?

মি. দেশমুখ বললেন, একটা খুনের ব্যাপারে এনকোয়ারী করতে এসেছি। গতকাল আপনার ক্যাফে থেকে প্রীতিশ শ্যাম চৌধুরী নামের কোনো ব্যক্তি ফ্লাইটের টিকিট নিয়ে গেছেন?

তিনি বললেন, ওয়ান মিনিট। আমাকে ডিরেক্টরি চেক করতে হবে। আপনারা বসুন, আমি দেখে বলছি।

ভদ্রলোক ড্রয়ার থেকে ডিরেক্টরির খাতা বের করে পৃষ্ঠা ওল্টাতে লাগলেন। একটা পৃষ্ঠায় এসে থেমে গেলেন, তারপর বললেন, হ্যাঁ প্রীতিশ শ্যাম চৌধুরী নামের একজন ব্যক্তি টিকিট বুকিং করেছেন, ব্যাঙ্গালুরুর।

অতীনদা বলল, কজনের টিকিট?

-দুজন।

-আর একজনের নাম কি?

তিনি ডিরেক্টরি দেখে বললেন, আত্রেয়ী শ্যাম চৌধুরী।

অতীনদা টেবিলে টোকা মেরে বলল, ঠিক ধরেছি।

স্টুডেন্ট সাইবার থেকে বেরিয়ে অতীনদা পৃথ্বীশদাকে বলল, তুই ত্রিপর্ণা আর বিধুদাকে বিকালের মধ্যে এখানে নিয়ে চলে আয়। আজ রাত্রেই সব রহস্যভেদ হয়ে যাবে। বিধুদাই একমাত্র দেখেছে কে খুনটা করেছে, আর ও আজ নিজেই বলবে এবং তাঁর প্রমান বিধুদার কাছেই আছে। বিকালের মধ্যেই কিন্তু, দেরি করবিনা।

পৃথ্বীশদা উত্তেজিত হয়ে বলল, কে করেছে খুনটা?

-এখন বলবনা। আজ রাত্রেই সব জানতে পারবি।

পৃথ্বীশদা বিরক্ত হয়ে বলল, ওফ, তোর এই সাস্পেন্স...টু মাচ...

অতীনদা হালকা হেঁসে বলল, সেটা টু মাচ হোক কি ভেরি মাচ, অপেক্ষা তো করতেই হবে বাবা। তারপ মি. দেশমুখকে বলল, আপনি আজ কনস্টেবলদের তুলে নেবেন। আর পাহাড়ার দরকার নেই।

পৃথ্বীশদা শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সামনে নেমে গেল, আর কনস্টেবল দুজন গাড়িতে উঠে এলেন। তবে আমি আর অতীনদা, গাড়ি থেকে নামলাম না। অতীনদা মি. দেশমুখকে বলল, আমাদের একটু বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে। কিন্তু শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সামনে রাস্তা ঘুরতেই অতীনদা মি. দেশমুখকে গাড়ি থামাতে বলল। মি. দেশমুখ আশ্চর্য হয়ে বললেন, কি হল?

অতীনদা বলল, আমরা এখানেই নেমে যাবো। আপনার সাথে কয়েকটা কথা ছিল, আলাদা। তাই পৃথ্বীশের সামনে আপনাকে মিথ্যা কথাটা বলতে হল।

আমার মনে একটু শঙ্কোচ জাগছিল, তাই অতীনদাকে বললাম, আমি দাঁড়াবো?

অতীনদা বলল, হ্যাঁ, তুই শুনলে কোনো অসুবিধা নেই।

মি. দেশমুখ বললেন, কি কথা?

-আজ রাত্রে আমরা শ্যাম চৌধুরী বাড়িতে যাবো না।

আমি অবাক হয়ে বললাম, যাবে না? কিন্তু পৃথ্বীশদাকে যে বললে...

-হ্যাঁ, সেটা ইচ্ছা করেই বলেছি।

মি. দেশমুখ বললেন, তাহলে কেশ শলভ হয়নি?

-না, রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে গেছে। তবে যথেষ্ট প্রমানের অভাব বোধ করছি। তাই ভেবেছি আজ রাত্রে একটা ফাঁদ পাতবো। আর আমার সন্দেহ যদি ঠিক হয়, তবে খুনী নিশ্চই ফাঁদে পড়বে।

আমি বললাম, কি করবে?

অতীনদা বলতে শুরু করল, শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সবাই সাড়ে এগারোটায় মোটামুটি ঘুমিয়ে পড়ে। বাড়ির সব আলো নিভে যাওয়ার পর, আমরা মেন গেট খুলে ঢুকবো।

আমি বললাম, মেন গেটে তো তালা দেওয়া থাকবে?

অতীনদা বলল, ওটা আমার ওপর ছেড়ে দে। তারপর... বিধুদার ঘরে যাবো। বিধুদার ঘরের দরজা বন্ধ থাকে না, ভেজানো থাকে। বিধুদাকে অজ্ঞান করে, বিধুদার জায়গায় তুই ঘুমাবি। আমি আর মি. দেশমুখ ঘরেই থাকবো, ভয় পাবি না। তবে সমস্ত কাজটা খুব সন্তর্পনে করতে হবে। একচুলও যেন ভুল না হয়। খুব সাবধান কিন্তু—

আমি বললাম, বিধুদা যদি জেগে যায়-

-সেটা তুই আমার ওপর ছেড়ে দে।

-কিন্তু অজ্ঞান করবে কি দিয়ে?

-ক্লোরোফর্ম।


পূর্নিমার নিঝুম রাত্রি। ঘড়িতে তখন রাত্রি বারোটা। শহর দিনের ক্লান্তি নিবারনে নিদ্রাভিভূত। রাস্তায় লোক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তার বাতিস্তম্ভগুলি অজানা পথিকের পথ দর্শনের আশায় অপেক্ষা করছে। কুকুরগুলি তাঁদের রাত্রিজাপনের দূর্নিবার ডাক ডেকে চলেছে। এমন সময় তিনজন লোক খুব সন্তর্পনে শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সদর দরজার পাশে এসে দাঁড়ালো। সুবিশাল অট্টালিকা চাদের রূপোলী আলোয় রহস্য ক্ষুধা নিবৃত্তির আকঙ্খায় উন্মুখ হয়ে রয়েছে। বাড়ির সামনে বাগানের পরীটি হাত জোড় করে যেন এই পূর্নিমার মায়াবী রাত্রিকে স্বাগত জানাচ্ছে। বাগানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আসছে। হঠাৎ দূরে কোথাও একটা প্যাঁচা ডেকে উঠল। ডাকটা শুনে শরীরের মধ্যে কেমন যেন শিহরণ খেলে গেল। সমস্ত শ্যাম চৌধুরী বাড়ি অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে, শুধু প্রীতিশ বাবুর ঘর ছাড়া। তবে কিছুক্ষন পর প্রীতিশ বাবুর ঘরের আলোও নিভে গেল। আর তার সাথে সাথেই অতীনদাও পকেট থেকে একটা লোহার তার বের করে অনধিকার প্রবেশের চেষ্টায় লেগে পড়ল। দু-তিনবার খুচ-খাচ শব্দের পর একটা ধাতব শব্দে শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সদর দরজা খুলে গেল। আমরা তিনজন সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সামনের বাগানের ডানদিকে পাঁচিলের নীচের দিকটায় চাঁদের আলো না পৌঁছনোয়, স্থানটা গভীর অন্ধকারে ঢেকে ছিল। সেদিক থেকে একটা খসখস শব্দ আসতেই চোখটা সেইদিকে চলে গেল, আর সেদিকে তাকানো মাত্রই দেখলাম, অন্ধকারে দুটো উজ্জ্বল চোখ আগুনের ভাঁটার মতো জ্বলছে। আর সে দুটো আমাদের দিকেই স্থির হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। আমি অতীনদার জামায় টান দিলাম। অতীনদা দেখে ফিসফিস করে বলল, বিড়াল, ভয় পাওয়ার মতো কিছু হয়নি। একদম গন্ডগোল পাকাবি না।

ধীরে ধীরে আমরা বাড়ির ভেতর ঢুকলাম। গোটা বাড়ি অন্ধকার, কোনোদিক থেকে সামান্যতম আলোর আভাসও এসে পৌছয়নি। বিধুদার ঘরটা বাড়ির একতলায়। অতীনদা খুব আস্তে ঘরের দরজা দুটোকে খুলল, যাতে কোনোরকম আওয়াজ না হয়। আমরা তিনজন পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকলাম, জুতো রাস্তাতেই খুলে এসেছিলাম। তারপর অতিনদা পকেট থেকে ক্লোরোফর্মের শিশিটা বের করে তা থেকে অল্প একটু তরল, রুমালে ঢেলে দিল। আর তারপরই রুমালটা সজোরে চেপে ধরল বিধুদার নাকের ওপর। এক-দু’বার ছাড়ানোর চেষ্টা করেই সমস্ত শরীরটা অসাড় হয়ে স্থির হয়ে গেল। এইসব দেখে আমার রক্ত জল হয়ে যাওয়ার সামিল, সারা শরীর তখন ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। আমি বিধুদা অচেতন দেহটার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত গলায় বললাম, অতীনদা...? বেঁচে আছেন তো?

অতীনদা স্বাভাবিক ভাবেই বলল, হ্যাঁ। পালস চলছে। শুধু অজ্ঞান হয়ে গেছেন মাত্র। তুই এবার শুয়ে পড়।

আমি আর কোনো কথা না বলে কম্পিত শরীর নিয়ে বিধুদার খাটের ওপর শুয়ে পড়লাম, তারপর গায়ে বিধুদার চাদরটা চাপা দিয়ে নিলাম।

তারপর আবার সব চুপ-চাপ, নিস্তব্ধ। কোনো জায়গায় কোনো আওয়াজ নেই। শুধু চিন্তায় আর ভয় আমার নিঃশ্বাসের শব্দটা শুনতে পাচ্ছিলাম। এইভাবে কতক্ষন কাটলো জানিনা। এক একটি সেকেন্ড যেন এক একটি ঘন্টার সমান মনে হতে লাগল। জানিনা কার অপেক্ষায় এই রাত্রিজাগরণ। অতীনদা যার জন্য এতকিছু কারসাজি করল সে আদৌ আসবে তো? ধীরে ধীরে ঘরের অন্ধকারটা আস্তে আস্তে সয়ে যাচ্ছিল। একটু একটু দেখতে পাচ্ছিলাম, না নড়ে চোখের মনিটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু অতীনদা বা মি. দেশমুখ কাউকে দেখতে পেলামনা। এমন সময় মনে হল, অতীনদা বলেছিল বিধুদা দেখেছে কে খুন করেছে। আর খুনী যদি সেই চিন্তায় বিধুদাকে খুন করতে আসে, তবে কি হবে? বিধুদার জায়াগায় তো আমি শুয়ে আছি! তাহলে কি আমারই প্রানটা বেঘোরে যাবে? এখন বুঝতে পারলাম, অতীনদা প্রথমে বলেছিল যে ও কোনো অ্যাসিস্ট্যান্ট রাখবেনা। আমি জোর করে ওর ঘাড়ে ঝুলে পড়েছিলাম বলেই, এখন আমাকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করছে। নিজের দোষে নিজে পস্তাচ্ছি এখন। কি করতে যে এতদিন ঘুরঘুর করতে গেছি!

এখন শুধুমাত্র একজনই আমার প্রান বাঁচাতে পারেন, স্বয়ং ভগবান। চোখ বন্ধ করে ভগবানের নাম নিতে শুরু করলাম। রাত্রি ক’টা হবে জানিনা। এমন সময় নিঝুম রাত্রির সেই সূচীভেদ্য অন্ধকারে বিধুদার ঘরের ভেজানো দরজাটি খুব আস্তে খুলে গেল। কেউ একজন বিধুদার ঘরে ঢুকেছে। কিন্তু কে ঢুকল, বুঝতে পারলাম না, কারণ আমি উল্টোদিকে মুখ করে শুয়ে ছিলাম। লোকটা পা টিপে টিপে আশার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পায়ের শব্দ খুব অল্প হলেও পাওয়া যাচ্ছিল। আর পায়ের শব্দটা আস্তে আস্তে বিছানার দিকে এগিয়ে এল। এমন অবস্থায় আমার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলা করতে শুরু করেছে, ভয়-আতঙ্কে অনবরত ঘেমে যাচ্ছি। বুঝে উঠতে পারলাম না, যে ঘরে ঢুকেছে সে কি করবে? যদি গুলি করে দেয়...? না...না...গুলি করবে না। ত্রিদেব বাবুকে তো মাথায় বাড়ি মেরেছিল। সর্বনাশ......আমাকেও আবার মাথায় বাড়ি মারবে নাকি?

এইসব ভাবছি। হঠাৎ লোকটা আমার মুখের ওপর একটা রুমাল চেপে ধরল, আমি তাকে ছাড়ানোর আপ্রান চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন একসাথে কাজ করা বন্ধ করে দিল। খোলা চোখে যে আবছা আলো দেখছিলাম, তা আরোও ঘনান্ধকারে পরিনত হল আর পঞ্চেন্দ্রিয় একসাথেই সে সূচীভেদ্য আঁধারে হারিয়ে গেল...


সাত


চোখে মুখে কেমন যেন ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ অনুভব করলাম। আর তার সাথে প্রচুর আলো যেন চোখের ওপর ফেলা হয়েছে এরকম মনে হল। ধীরে ধীরে চোখ খুলে দেখি, বাইরে দিনের আলো ফুটে গেছে। সমস্ত ধোঁয়াশা, আঁধার শরিয়ে দিয়ে নতুন সূর্য উঠেছে। অতীনদা হাতে একটা জলের বোতল নিয়ে আমার সামনে বসে রয়েছে, আমার চোখে মুখে জল ছেটানো। অতীনদা বলল, কিরে দেখতে পাচ্ছিস তো সব ঠিকঠাক?

চারপাশে তাকিয়ে দেখি শ্যাম চৌধুরী পরিবারের সমস্ত সদস্য আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমি কোনো একটা ঘরে বিছানায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। খাটের এক পাশে বিধুদা গোল গোল চোখ করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। বিধুদাকে দেখামাত্রই আমি ধড়ফড় করে উঠলাম। অতীনদাকে উত্তেজিতভাবে প্রশ্ন করলাম, কি হল? সব সমাধান হয়ে গেছে না? আমার আগে জ্ঞান ফেরালেনা কেন?

অতীনদা হেঁসে বলল, বিগত দুঘন্টা ধরে অনবরত সেই চেষ্টাই করে চলেছি, আর এতক্ষনে সফল হলাম। আর সমাধান কিছুই হয়নি। শুধু খুনীর সন্ধানটা হাতেনাতে পাওয়া গেছে।

আমি আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারছিলামনা। উদ্বেগের সাথে প্রশ্ন করলাম, কে খুন করেছে?

তার প্রত্যুত্তরে মি. দেশমুখ যে লোকটিকে আমার সামনে এনে হাজির করলেন, তাকে দেখার পর শুধু যে চমকালাম, তা নয়। একসাথে স্তম্ভিত, অবাক, বিস্ফারিত-এছাড়া বাংলা অভিধানে আরোও যা যা এই জাতীয় শব্দ রয়েছে একসাথে সবই হলাম। শেষ পর্যন্ত কিনা এই লোকটা? এতদিন রহস্য গল্পগুলোয় পড়ে এসেছি— যে লোকটাকে গল্পে সবচেয়ে বেশি ভদ্র, সবচেয়ে বেশি অমায়ীক অলে মনে হয়; শেষে গিয়ে দেখা যায় সেই আসল খুনী। আর সেরকমই বাস্তব জীবনও তো তবে এর ব্যতিক্রম নয়! আমি একবারও ভাবতেই পারিনি যে এই লোকটি এতবড়ো একটা কান্ড ঘটাতে পারেন। মি. দেশমুখ যে লোকটির হাতে হাতকড়া পরিয়ে আমার সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, তিনি আর কেউ নন, এই পরিবারের বড়ো ছেলে শ্রী বিজয় শ্যাম চৌধুরী- ত্রিদেব বাবুর একমাত্র জীবিত পুত্র; যার হাতে ত্রিদেব বাবুকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হল।

অতীনদা বিজয় বাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, সম্পত্তির লোভে নিজের বাবাকে হত্যা করলেন? আপনার হাত কাঁপলনা?

অতীনদার কথা কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। অতীনদাকে বললাম, ত্রিদেব বাবু তো সম্পত্তি ভাগ করেন নি। তবে অসুবিধা কোথায়?

অতীনদা বলল, সেটা তো খুন করার পর জানতে পারেন উনি। এবং সেটা জানার পরেও ওনার মন থেকে লোভটা যায় না। আর সেই লোভের কারনেই আজ বিজয় বাবুকে ধরতে পেরেছি।

আমি অতীনদাকে বললাম, তার মানে বিজয় বাবুই মনোতোষ কয়াল সেজে ত্রিদেব বাবুর কাছে কাজ করত?

-না। মনোতোষ কয়াল সেজে যে এসেছিল সে কোনোদিনই ত্রিদেব বাবুকে খুন করার প্রত্যাশায় আসেনি। সে আসত সম্পত্তির লোভে। তুই ভাবতো মনোতোষ কয়াল সেজে যে ছিল, সে ত্রিদেব বাবুকে কেন খুন করবে? ত্রিদেব বাবু তো ওর কাছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। বরং ত্রিদেব বাবুর মৃত্যু হলে ওরই তো ক্ষতি...

আমি বললাম, আচ্ছা, সেটা না হয় বুঝলাম, কিন্তু মনোতোষ কয়ালের ছদ্মবেশের আড়ালে আসল লোকটা কে ছিল?

ঠিক এই সময় অতীনদা ঘরের মধ্যে আরেকটা বিস্ফোরণ ঘটালো, যাতে আমাদের সবার চোখ-মুখ আবার হাঁ হয়ে গেল। পৃথ্বীশদার দিকে তাকিয়ে বলল, কিরে... তুই বলবি? নাকি আমি বলব?

পৃথ্বীশদার মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, কপালের পাশ থেকে ঘাম ঝরছে। মেঝের দিকে তাকিয়ে নীরব অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল। অতীনদা বলল, তাহলে আমিই বলি... মনোতোষ কয়ালের আড়ালের ব্যক্তিটি হলেন শ্রী পৃথ্বীশ শ্যাম চৌধুরী।

আমি বললাম, পৃথ্বীশদা তো স্কুলে শিক্ষকের চাকরী করে। তবে এখানে কাজ করতো কখন?

-পৃথ্বীশ কোনোদিনই কোনো স্কুলে শিক্ষকতা করেনি। ও বরাবর এখানেই কাজ করে এসেছে।

আমি বললাম, কিন্তু তুমি বুঝলে কি করে?

তোর কথা মত—তুই আর পৃথ্বীশ যেদিন কুমোরটুলির ওই বাড়িটায় গেলি, সেদিন পৃথ্বীশের কাছে কোনো দেশলাই ছিল না। কারণ ও সিগারেট কিনে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে, কিন্তু নিজের কাছে আগুন নেই এটা ওর খেয়াল ছিল না, তাই তারপর আরেকটা দোকান থেকে আবার সিগারেট ধরায়। তারপর কুমোরটুলির ওই বাড়িটায় যখন কারেন্ট যায়, পৃথ্বীশ ওই অন্ধকারের মধ্যেই লন্ঠন জ্বালায়। আগুন কোথা থেকে পেল? সেটা ছিল ওই ঘরে জানলার তাকে। এটা তখনই সম্ভব যখন ওই ঘরে যাতায়াত থাকবে। আমি তখনই বুঝতে পারি পৃথ্বীশই আসলে মনোতোষ কয়াল।

এবার প্রশ্ন ওঠে মনোতোষ কয়ালের চিঠিপত্র-রেজাল্ট পৃথ্বীশের কাছে এল কিভাবে? মনোতোষ কয়াল আর পৃথ্বীশ শ্যাম চৌধুরী দুজনেই একই কলেজে পড়তেন, তবে সময় কালটা আলাদা। কোনোভাবে হয়তো কলেজ থেকে মনোতোষ কয়ালের ওই চিঠিটা পৃথ্বীশের হাতে আসে। আর ওই চিঠিটাতে যা লেখা আছে, তা থেকে যে কোনো মানুষ মোটামুটি বুঝে যাবে ত্রিদেব শ্যাম চৌধুরী, মনোতোষ কয়াল আর ননীবালা দেবীর মধ্যে সম্পর্কটা কি? তখন ও মনোতোষ কয়াল সম্বন্ধে খবরা-খবর নিতে শুরু করে। তারপর একদিন কলেজের ক্লার্ক সেজে কমলা দেবীর থেকে মনোতোষ কয়ালের সমস্ত রেজাল্ট আর সার্টিফিকেট নিয়ে চলে আসে। কারণ অ ভেবেছিল মনোতোষ কয়ালের ছদ্মবেশে এলে হয়তো ত্রিদেব বাবুর সম্পত্তির ভাগীদার হওয়া যেতে পারে। আর তাছাড়াও ত্রিদেব বাবু মনোতোষ কয়ালকে প্রায় ষোলো-সতেরো বছর দেখেননি। তাই তাঁর ছদ্মবেশ নিতেও কোনো অসুবিধা হল না।

তারপর পৃথ্বীশ সকাল আটটা থেকে সন্দ্যা ছ’টা পর্যন্ত নিজের বাড়িতেই ছদ্মবেশে কাজ করতে শুরু করে, এবং ধীরে ধীরে ত্রিদেব বাবুর পুত্র হিসাবে প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠে। আর এইভাবে ত্রিদেব বাবুও একদিন ঠিক করে ফেলেন যে তাঁর সম্পত্তির ওয়ারিশ দুজন নয়, তিনজন হবেন। এদিকে ত্রিদেব বাবু বিজয় বাবুর সাথে এই সংক্রান্ত আলোচনা করেন। কিন্তু বিজয় বাবু কখনোই এটা মেনে নেননি কিন্তু ত্রিদেব বাবু ছিলেন এদিকে বেজায় জেদি লোক, তিনি রীতিমতো উইলও করে ফেলেন। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল বিজয় বাবু যদি মনোতোষ কয়ালের ছদ্মবেশে পৃথ্বীশকে মারতেন তবেই তো সব ঘটনা শেষ। কিন্তু পরে বুঝলাম যে, না, পৃথ্বীশ মরলেই সমাধান হবে না। কারণ বিজয় বাবু জানতেন না যে মনোতোষ কয়াল ত্রিদেব বাবুরই ছেলে ছিলেন। বিজয় বাবু মনোতোষ কয়ালকে সামান্য একটা সেক্রেটারিই ভেবেছিলেন। তাই তিনি দেখলেন, মনোতোষ কয়ালকে মারলে, আবার অন্য একটা সেক্রেটারি এসে হাজির হবে। সেক্ষেত্রে ত্রিদেব বাবু আবার সম্পত্তি ভাগ করে দিতে পারেন। তাই তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুটাই স্থির করলেন। এবং তারজন্য আগে থাকতে একটা খুব সুন্দর ছক কষলেন, প্রতিদিন ঠিক একই সময় কারেন্ট যাওয়ার নাটকটা। আর বিজয় বাবু ঠিক যেদিন থেকে এটা শুরু করেন, ঠিক তাঁর আগের দিনই মনোতোষ কয়াল অর্থাৎ পৃথ্বীশের চোখ থেকে খয়েরী লেন্সটা কোনো কারণে ত্রিদেব বাবুর ঘরে খুলে পড়ে, আর ত্রিদেব বাবু সেটা পেয়ে যান। ফলে তারপরের দিন থেকে মনোতোষ কয়ালের এবাড়িতে আসা বন্ধ হয়ে যায়। লেন্সটা পাওয়ার পর ত্রিদেব বাবু আমাকে মঙ্গলবার রাত্রেই মনোতোষ কয়ালের সম্বন্ধে খোঁজ খবর নিতে বলেন। আর ওদিকে উনি নিজে গিয়ে শ্রীনিবাস বাবুর কাছ থেকে উইলটা নিয়ে আসেন। তারপর যখন পরের দিন দেখলেন মনোতোষ কয়াল আর এলনা, তখন উনি শ্রীনিবাস বাবুকে ফোন করে বলেন যে, তিনি উইল করবেননা। কিন্তু এই খবরটা বিজয় বাবু আর পাননি। মঙ্গলবার রাত্রে বাবার হাতে উইলের কাগজ-পত্র দেখে বিজয় বাবু নিশ্চিত হয়ে যান যে, সম্পত্তি ভাগ হবেই।

আমিও এদিকে মনোতোষ কয়ালের সম্পর্কে খোজ-খবর নিতে শুরু করি। আর পৃথ্বীশ খুব ভালোভাবেই আমার এবং আমার মস্তিষ্কের সাথে পরিচিত ছিল। তাই কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে, সামান্য পুরনোদিনের একটা থিয়োরী অনুযায়ী আমাকে একটা দুলাইনের হুমকি চিঠি লেখে। যেটার ভয় আমার থেকে বেশি ধীমান পেয়েছে।



তারপর সেদিন রাত্রে নিয়ম মাফিক ঠিক আটটার সময় কারেন্টটা গেল। আর বিজয় বাবু গায়ে একা কালো কাপড় চাপা দিয়ে পৌঁছে গেলেন দোতলায়। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত তাঁর এই রূপ বিধুদা দেখে ফেলেন, কিন্তু চিনতে পারেননা। দোতলায়, শুধুমাত্র ত্রিদেব বাবু আর আত্রেয়ী দেবীর ঘর, আত্রেয়ী দেবী সেই সময়টায় সাধারণত ঘর থেকে বেরোননা। বিজয় বাবুর হাতে সময় ছিল মাত্র কুড়ি মিনিট, তিনি এটা জানতেন, কারণ আগের দু-দিনে উনি দেখে এসেছেন পৃথ্বীশের এটা সারাতে কতক্ষন সময় লাগে। এই কুড়ি মিনিটের মধ্যে ঘরে ঢুকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে ত্রিদেব বাবুকে অচেতন করেন, তারপর হাতদুটো বাঁধেন, তারপর মাথায় বাড়ি মেরে ত্রিদেব বাবু ইহজীবন সাঙ্গ করেন। তারপর তাঁর দেহ নিয়ে সিঁড়ির নীচে রেখে দেন এবং অন্যান্য ঘটনাগুলি ঘটান।’

ঠিক এই মূহুর্তে বিজয় বাবু বন্দী বাঘের মতো গর্জে উঠে বললেন, তোমার কাছে প্রমাণ কি আছে, যে আমিই মেরেছে বাবাকে?

অতীনদা বলল, সে প্রমাণ আমি গেল রাত্রিতেই দিয়ে দিয়ছি।

বিজয়বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন, না না, তুমি মনে হয়ে আমার প্রশ্নটা বুঝতে পারোনি! বিধুদা বা ধীমান কেউই আহত বা নিহত হয়নি। আমি বলেছি, বাবাকে যে আমি মেরেছি, তার কি প্রমান আছে? এই সামান্য একটা ফাঁদ পেতে শিকার ধরাটাকে তুমি গোয়েন্দাগিরি বল?

অতীনদা স্বাভাবিক স্বরেই বলল, না। একদমই বলি না। আমি কখন বললাম যে আমি গোয়েন্দা? আমি এখনো গোয়েন্দা হয়ে উঠিনি। আর আপনি কখন জানতে পারলেন যে আমি কোনো প্রমান পাইনি?

তারপর অতীনদা বিধুদাকে বলল, তুমি ত্রিপর্ণার বাড়িতে যে ব্যাগটা নিয়ে গেছিলে ওটা একটু নিয়ে এসো।

বিধুদা ব্যাগটা নিয়ে এলে অতীনদা বিজয় বাবুকে বলল, এটা আপনার ছেলের ব্যাগ তো?

বিজয় বাবুর মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছেনা। তিনি অবাক দৃষ্টিতে অতীনদার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতীনদা আবার বলল, কি হল বলুন... হ্যাঁ কি না?

বিজয় বাবু চাপা গলায় বললেন, হ্যাঁ।

অতীনদা আবার বলল, আর এটা আপনার ঘরেই থাকে তো?

-হ্যাঁ।

এরপর অতীনদা আর কোনো কথা না বলে ব্যাগের পেছনের কভারটা ধরে এক টান মারল, আর সাথে সাথে ব্যাগের কভারটা ফ্যার-ফ্যার শব্দ করে ছিঁড়ে গেল। আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কোর্টের হলদেটে রঙের উইল পেপার।

অতীনদা সেটা হাতে নিয়ে বলল, আপনি যদি খুনটা না করে থাকেন, তবে এটা সরিয়েছেন কেন?

বিজয় বাবু নীরব ভাবে ঘাড় নীচু করে বসে রইলেন, কোনো উত্তর দিলেননা। অতীনদা বলে চলল, আর শুধু এটাই নয়। আরো প্রমাণ রয়েছে। তারপর মি. দেশমুখের কাছ থেকে ত্রিদেব বাবুর সেই নোট বুকটা চেয়ে নিল, যেটার কাগজগুলি ভিজিয়ে আবার শুকিয়ে রাখা ছিল। অতীনদা তা থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে আমার হাতে দিয়ে বলল, পড়।

আমি ফ্যাল ফ্যাল করে অতীনদার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এ তো সাদা কাগজ, কি পড়ব? অতীনদা বলল, আলোয় ধর।

আলোয় ধরতেই দেখি কাগজটার মধ্যে জলছবির মতো লেখা ফুটে উঠল। ছোটোবেলায় এটা বহুবার করেছি। কাগজ ভিজিয়ে কাচের ওপর রেখে তার ওপর সূচালো কোনো কিছু দিয়ে দাগ কাটলে তা জলছবি হয়ে যায়। কাগজ শুকিয়ে গেলে লেখা গুলোও মিলিয়ে যায়, আলোয় ধরলে তা আবার ফুটে ওঠে। টাকার বামদিকে মহাত্মা গান্ধীর ছবিটি ঠিক যেমন থাকে। আমি কাগজটা আলোয় ধরে পড়তে শুরু করলাম—

“৫ই জুন, ২০১৬

আমার মনে হয় আমি যা করছি তা ঠিকই করছি। মনোতোষও আমার ছেলে, তারও সমান অধিকার আছে আমার ওপর, আমার সম্পত্তির ওপর। বিজয়কে আজ বলেছি যে ওও সম্পত্তির এক অংশ পাবে। কিন্তু বিজয় মেনে নেয়নি। তবে আমি মনোতোষকে বঞ্চিত করবনা। বিজয় অনেক কথা শুনিয়ে গেছে। আর সেই কথার পেছনে যে একটা হুমকিও লুকিয়ে রয়েছে তা আমি স্পষ্টই বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তাই জন্য আমি মনোতোষের সাথে অন্যায় হতে দিতে পারি না। ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই অনেক কষ্ট.........”

এটুকু পড়ার পর অতীনদা আমার হাত থেকে কাগজটা নিয়ে বলল, ওইটুকুই যথেষ্ট। তারপর মি. দেশমুখকে বলল, আপনি এবার আপনার অপরাধীকে নিয়ে যেতে পারেন।

অপরাজিতা দেবী এতক্ষণ দরজার সামনে কাঠের পুতুলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অতীনদার কথাগুলো তাঁর কাছে কিভাবে পৌচেছে আমি জানিনা। তবে দৃষ্টি স্বামীর মুখের দিকে নিবদ্ধ ছিল, দু চোখের জল অসীম কষ্টে আটকে রেখেছিলেন তা ওনার চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। মি. দেশমুখ বিজয় বাবুকে হাত কড়া পরিয়ে ঘর থেকে বেরোতেই তিনি চৌকাঠের ওপর বসে পরলেন। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেননা, অঝোর ধারায় কাদতে শুরু করলেন। দু চোখের অঝোর ধারা স্বামীর সাজা-ঘোষনার পথ ধুয়ে চলল। এই অবস্থায় কেউ আর তাকে স্বান্তনা প্রদর্শনে এগিয়ে গেলেন না। অতীনদা বিধুদাকে ডেকে কানে কানে কি যেন বলল। বিধুদা অপরাজিতা দেবীর কাছে গিয়ে বললেন, বৌমনি ঘরে চল। অপরাজিতা দেবী হঠাৎ মুখ তুললেন, চোখে-মুখে ঘৃণার প্রখর ছাপ ফুটে উঠল। শ্লেষ মিশ্রিত কন্ঠে বললেন, থাক, আমি একাই যেতে পারবো। অপরাজিতা দেবী উঠে চলে গেলেন নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে।

অতীনদা বলল, তবে এখানেই শেষ নয়। এখনো আরো একটা রহস্য উদ্ঘাটন বাকি আছে।

অতীনদা কথাটা বলতেই একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। আত্রেয়ী দেবী হঠাৎ অতীনদার পা ধরে বসে বললেন, অতীন এরকম কোরো না, তোমার দুটি পায়ে পড়ি।

অতীনদা প্রথমটায় নিজেকে সামলাতে খানিক পিছিয়ে গেছিল। তারপর আত্রেয়ী দেবীকে ধরে দাঁড় করিয়ে বলল, আমি না। আপনিই বলুন আপনি কি করেছেন? অবশ্য যেটা করেছেন, আমার কাছে তা কোনো অপরাধ নয়। আপনারা যদি পালিয়ে যেতেন, সেটা পরে জানাজানি হলে আরো বেশি অপমানজনক হত।

আত্রেয়ী দেবী বললেন, না আমি বলতে পারবোনা।

অতীনদা প্রীতিশ বাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনিও বলতে পারেন!

প্রীতিশ বাবু নতমস্তকে বলতে আরম্ভ করলেন, আমি আর আত্রেয়ী কলেজ জীবন থেকে একে অপরকে ভালোবাসি। কিন্তু বাড়িতে কোনোদিন জানাতে পারিনি। তারপর একদিন হঠাৎ জ্যাঠামশাই দাদার সাথে ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। এদিকে হঠাৎ দাদা মারা গেল, আর আত্রেয়ীর কপাল পুড়ল। তখন আমি আত্রেয়ীকে বিয়ে করব বলে ঠিক করি। কিন্তু এ বাড়িতে তা কোনোদিনই সম্ভব ছিল না, তখন আমরা ঠিক করি যে এখান থেকে অন্য কোথাও গিয়ে থাকবো। আর তাই কয়েকদিন আগে ব্যাঙ্গালুরু যাওয়া হবে বলে ঠিক হয়। টিকিটও কাটা হয়ে গেছে, পরের মাসে ফ্লাইট।

অতীনদা একটু হেঁসে বলল, প্রীতিশ বাবু, আপনি অনেক কিছু বাদ দিয়ে দিলেন যে!

প্রীতিশ বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন, না, আমি কিছু বাদ দিইনি তো! যা সত্যি তাই বলেছি।

অতীনদা বলল, আপনি যা বলেছেন, তা সবই সত্যি। কিন্তু অনেক সত্যি কথা আপনি বলেননি।

-মানে?

অতীনদা বলতে শুরু করল, অজয় বাবু যখন টাইফয়েডে আক্রান্ত হন, তখনই ওনার ক্যানসার ধরা পড়ে। এবং তাও ব্লাড ক্যানসার, যার আরোগ্যবীধি এখনও সেইভাবে আবিষ্কার হয়নি। এটা যানা সত্ত্বেও আত্রেয়ী দেবী অজয় বাবুকে বিয়ে করলেন কেন? এটা আসলে আপনার ও প্রীতিশ বাবুর একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনারই অংশ। আসলে অজয় বাবুর সাথে বিবাহ হলে ত্রিদেব বাবুর সম্পত্তির একটা অংশ আত্রেয়ী দেবীও পাবেন। আপনারা দুজনেই জানতেন অজয় বাবুর আয়ু বেশিদিন নেই, তাই তাঁর মৃত্যুর পর প্রাপ্ত সম্পত্তিটাও প্রীতিশ বাবুরই থাকবে, এবং ভালোবাসাটাও থাকবে। সেক্ষেত্রে প্রীতিশ বাবু, আপনি কিন্তু সফলই হলেন। আর আমার বিশ্বাস ত্রিদেব বাবু কোনো একভাবে আপনাদের সম্পর্কের ব্যপারটা জানতে পেরে গেছিলেন, তাই আপনাকে কিছুদিন ধরে অপছন্দ করতে শুরু করেছিলেন। এদিকে ত্রিদেব বাবুর মৃত্যুটাও আপনাদের দুজনের মিলনের পথ আরো একধাপ এগিয়ে দিল।

আত্রেয়ী দেবী বললেন, না। আমি কখনোই এমনটা ভাবিনি, আর—

অতীনদা আত্রেয়ী দেবীর কথার মাঝখানেই সটান প্রশ্ন করল, তাহলে আপনি অজয় বাবুর টাইফয়েডের সময় তাঁর ক্যান্সারের কথাটা ত্রিদেব বাবুকে জানাননি কেন?

আত্রেয়ী দেবী শান্ত কন্ঠে উত্তর দিলেন, ব্লাড ক্যানসার মানেই মৃত্যু। নিজের ছেলের সম্বন্ধে এতবড় একটা কথা বাবা সহ্য করতে পারবেননা বলেই আমি জানাইনি।

অতীনদা বলল, তিনি কি পরে সহ্য করেননি?

আত্রেয়ী দেবী চুপ করে রইলেন। অতীনদা বলল, তাই জন্য আপনি ত্রিদেব বাবুর ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে সেদিন শুনছিলেন, সম্পত্তি ভাগের ব্যাপারে কোনো কথা হচ্ছে কিনা! ধন্য আপনারা। এতবড় একটা খেলা খেললেন, নিজের পরিবারের সঙ্গে!

রাজদেব বাবু এতক্ষণ ঘরেই ছিলেন, অতীনদার শেষ কথাটা শুনে কেন জানিনা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ত্রিপর্ণা দেবী প্রথমটায় পৃথ্বীশদার সামনে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন। কিন্তু যখন জানতে পারেন যে তাঁর স্বামীও অপরাধী তখনই চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। এমন সময় জানলার দিক থেকে মুখ ফেরালেন। চোখ ভর্তি জল নিয়ে বললেন, সেক্ষেত্রে পৃথ্বীশেরও জেল হওয়া উচিৎ।

পৃথ্বীশদা স্ত্রীকে তাড়া দিয়ে উঠে বলল, জেল হবে মানে? আমি কি করেছি, যে আমার জেল হবে?

ত্রিপর্ণা দেবীও আগুন মুখে বললেন, তোমার লজ্জা করছেনা, এতকিছু ঘটানোর পর উঁচু গলায় কথা বলছ? একটা লোককে দিনের পর দিন শোষন করে গেছো গোটা বাড়ির লোক। ভুলে যেওনা ওই লোকটার টাকাতেই তোমার সংসার চলেছে এতদিন।

পৃথ্বীশদা বলল, টাকাটা আমি পরিশ্রম করেই রোজগার করেছি। হতে পারে আমার মোটিভ অন্য ছিল, কিন্তু তা কি সফল হয়েছে? জ্যাঠার কাছে কাজ করেছি, বেতন পেয়েছি।

অতীনদা বলল, হ্যাঁ। ঠিক এই কারনেই আমি পৃথ্বীশকে পুলিশের হেফাজতে দিইনি। আর একটা কথা আপনাদের বাড়ির সবাইকে বলার, এতদিন যা হয়েছে তা হয়েছে। এখন সব কিছু ভুলে একসাথে থাকবেন এটাই আমার অনুরোধ। কারণ আপনাদের পরিবারে এখন যা অবস্থা, একসাথে না থাকলে হারিয়ে যাবেন। আমি এখন আসি, নমস্কার।

কতগুলো জলজ্যান্ত মানুষকে কয়েকঘন্টার মধ্যে কতগুলো পাথরের মূর্ত্তি বানিয়ে অতীনদা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, পেছন পেছন আমিও। উঠোনের মাঝখানে রাজদেব বাবু দাঁড়িয়ে ছিলেন। উদাস চোখে বাড়ির চারপাশ নিরীক্ষন করছিলেন। আমাকে আর অতীনদাকে আসতে দেখে বললেন, চললে তোমরা?

অতীনদা বলল, হ্যাঁ, আজ আসি। নমস্কার।

বিজয় বাবু কোনো উত্তর দিলেন না। শ্যাম চৌধুরী বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বেরোবো, এমন সময় রাজদেব বাবু পেছন থেকে ডাক দিলেন, শ্রীমান অতীন্দ্রিয় সোম? একবার শুনে যাও।

আমরা আবার ভেতরে গেলাম। অতীনদা বলল, হ্যাঁ বলুন?

-কি পেলে এইসব করে?

অতীনদা বলল, মানে?

-আমার পরিবারটাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে কি পেলে তুমি?

অতীনদা বলল, আমি কিছুই করিনি আর কিছু পাওয়ার জন্য আমি এখানে কোনোদিনই আসিনি। যা ঘটল তা এই পরিবারের লোকেদের জন্যই ঘটল। আর একজন অপরাধী সমজের মাঝে মাথা তুলে ঘুরে বেরাবে, এটা আমার পক্ষে কোনোদিনই স্বীকার্য নয়। তারজন্য আমাকে যত বড়ো ঝুকিই নিতে হোক, আমি নেবো।

রাজদেব বাবু ক্রুর হাঁসি হেঁসে বললেন, ভালো...করো তুমি তোমার সমাজসেবা। এখন আসতে পারো!


ত্রিদেব বাবুর মৃত্যু রহস্য ভেদ করে মনের ভেতর অনেক উৎকণ্ঠা, অনেক দুঃখ, অনেক অভিমাণ নিয়ে শ্যাম চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরোলাম। সম্পত্তির লোভ যে এত নিষ্ঠুর হতে পারে তা ভাবতে পারিনি। তবে এ লোভ এখন নয়, সেই মহাভারতের যুগ থেকে চলে আসছে। এ এক এমন বিষ যে নিজের সন্তানও পিতাকে খুন করতে উদ্যত হয়ে ওঠে। শ্যাম চৌধুরী পরিবারের প্রতিটি লোককে শ্রদ্ধা করে এসেছি এতদিন। আজ যেন সমস্ত শ্রদ্ধা-আন্তরিকতা এক নিমেষে ধূলোয় গুঁড়িয়ে গেল।

ঘড়িতে এখন সকাল আটটা। রাস্তার ওপর কৃষনচূড়ার ফুল লাল মখমলের চাদর পেতে দিয়েছে নতুন প্রভাতের নতুন ভাবনার এগিয়ে চলার জন্য। সপ্তাহের প্রথম দিনের ব্যস্ততা কাঁধে চাপিয়ে শহর ছূটতে শুরু করে দিয়েছে। সকাল বেলার পথচারীরা বাড়ির পথে ফিরছেন। পৌরসভার আবর্জনা সংগ্রহকারী গাড়ি বাশি বাজাতে বাজাতে চলেছে, গতকালের গৃহস্থালীর আবর্জনা সংগ্রহের আশায়। যাতে গৃহস্থালির সভ্য মানুষগুলি গতকালের সমস্ত নোংরা, কালিমালিপ্ত অতীত ঝেড়ে ফেলে নতুন আরেকটি দিন শুরু করতে পারে। এক জায়গায় দেখলাম তিন চারটে কুকুর রাত্রিযাপনের পরিশ্রম লাঘবের আশায় দিবানিদ্রায় রত।

রাস্তায় যেতে যেতে অতীনদা পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালো, তাপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোকে এই সাত-সকালে সিগারেট খেতে হবে না।

আমি অবশ্য খেতে বললেও নিতাম না। সকালবেলা খালি পেটে সিগারেট খেলে পেটে কেমন যেন একটা হয়। এমন সময় অতীনদা সিগারেট টানতে টানতে নিজেই নিজে বলে উঠল, এ বাড়ির প্রত্যেকটা লোকের প্রথম থেকেই নজর ছিল ত্রিদেব বাবুর সম্পত্তির ওপর। তারজন্য প্রত্যেকে তার নিজের সীমা অতিক্রম করে ফাঁদ পেতেছিল ত্রিদেব বাবুর চারপাশে। আর নিজের পরিবারের রচিত জালেই আবদ্ধ হয়ে ত্রিদেব বাবু প্রাণ হারালেন।

-আচ্ছা, তুমি আত্রেয়ী দেবী আর প্রীতিশ বাবুর ব্যাপারটা কখন বুঝতে পারলে?

-আত্রেয়ী দেবীর ঘরে প্রীতিশ বাবুর জামার বোতামটা দেখে। কারণ অতবড়ো বোতাম তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রের জামার কখনোই হতে পারেনা। আর জামার বোতাম যদি সুতোর জন্য ছিঁড়ত, তবে বোতামের মুখ ভাঙতনা। বোতামটা টান মেরে ছেড়া হয়েছিল, এখন সেটা কোন পরিস্থিতিতে ছেঁড়া হয়েছে সেটা আমি জানিনা।

আমার মাথায় আরেকটা প্রশ্ন ঘুর ঘুর করছিল। বললাম, খুনটা তো প্রীতিশ বাবুও করতে পারতেন। অন্ধকারে গায়ে কালো চাদর চাপিয়ে তো তিনিও যেতে পারতেন!

অতীনদা বলল, প্রীতিশ বাবুর ক্ষেত্রে খুনের কোনো মোটিভ আছে? খুন করলেও প্রীতিশ বাবু যা পেতেন, সেটা খুন না করেও তিনি পেতেন। তবে খুন করলে হয়তো একটু তাড়াতাড়ি পেতেন! কিন্তু ওনাদের কোনো তাড়া ছিলনা।

আমি বললাম, কি বিচিত্র পরিবার, না?

অতীনদা হাতের সিগারেটের অবশিষ্ট ফিল্টারটা দু-আঙ্গুলে অদ্ভূতভাবে নিয়ে রাস্তার ধারে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, গৃহপাশ!



সমাপ্ত



bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.