বীরপুরুষ


আজকের সকালটা অন্যদিনের থেকে একদম আলাদা।এতো আলো,মিঠে রোদ, উত্তুরে হাওয়া, এমনকি কানঝালাপালা করা গাড়ির আওয়াজটাও ভালো লাগছে আজ।সোনার খাঁচা বন্দী পাখি যে আজ মুক্ত হতে পেরেছে তার বীরপুরুষের হাত ধরে।পৃথিবীতে একা বাঁচার মধ্যেও যে এতো সুখ তা এই প্রথম বুঝতে পারল রিক্তা।অবশ্য সে তো একা নয়, তার ছোট্ট বীরপুরুষ যে আছে তার সাথেই।

মা মরা মেয়ে রিক্তা ছোটবেলা থেকেই আশ্রিতের মতোই বেড়ে উঠেছে তার বাবা আর নতুন মায়ের সংসারে।জন্মের সময়ই তার মা মারা যায়।বাবাও যে কেন এড়িয়ে চলে তাকে সেই প্রশ্নের উত্তর সে পায়নি।স্কুলে গিয়েও দেখত বন্ধুদের,তাদের বাবা মায়েদের।বাবা কেন তাকে স্কুলে দিতে আসেনা।বাবা কেন অন্য বাবাদের মতন তাকে কোলে নিয়ে আদর করেনা।ছোট্ট মনটায় অনেক প্রশ্ন তবু কোনো উত্তর পায়না সে।কিছু ঘুম না আসা রাতে শুধু মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে মাকে খোঁজার চেষ্টা করত রিক্তা।কোনো কোনো রাতে রিক্তার বাবা এসে দেখে যেত ওকে।ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকতো রিক্তা।ও জেগে আছে বুঝতে পেরে যদি বাবা চলে যায় আর হয়তো কোনোদিন আসবেনা।


অবশ্য বাবাকে কাছে পাবার এইটুকু সময়ও হাতছাড়া হয়ে যায় রিক্তার তার নতুন মা আসার পরে।ক্লাস ফোরে পড়া রিক্তা তখন থেকেই বুঝতে শিখেছে অনেককিছু।মানিয়ে নেওয়া আর মেনে নেওয়া এরমধ্যেই ছোট মেয়েটা বড় হয়ে ওঠে।স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হয়।সেই নিয়েও অনেক আপত্তি ছিল ওর নতুন মা আর ভাইয়ের।কিন্তু এই ব্যাপারে রিক্তার বাবার কোনো অমত না থাকায় সে যাত্রায় কলেজে ভর্তি হয় রিক্তা, ইংরাজি অনার্স নিয়ে।


লেখাপড়াতে বরাবরি মেধাবী ছিল রিক্তা।তবু নিজের মধ্যেই গুটিয়ে রাখত নিজের জগতকে।ছবি আঁকা, গান, কবিতা এসব নিয়েই থেকেছে চিরকাল।একাকীত্ব লোকানোর তাগিদে কিছু মানুষকে হয়তো ব্যস্ত থাকার অভিনয় করে যেতে হয় সারাজীবন।তবু বসন্তের ছোঁয়া নিয়ে অন্য কোনো মানুষ ঢুকে পরে সেই ব্যস্ততায়।কখনো বন্ধু হয়ে,কখনো বা আরেকটু বেশী অধিকার নিয়ে।যার চোখের গভীরতায় হারিয়ে গিয়ে মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়।


রিক্তার সাথে কলেজ লাইব্রেরীতে আলাপ সুমনের।সুমন বিজ্ঞানের ছাত্র, তবু লাইব্রেরীতে ইংরাজি নাটকের একটা রেফারেন্স ফিরত দিতে দেখে কৌতূহলী রিক্তা খানিকটা নিজের আগ্রহেই আলাপ শুরু করে তার সাথে।সেই তাদের কথোপকথনের শুরু।তারপর একসাথে আড্ডা মারা থেকে শুরু করে ঘুরতে যাওয়া, কখনো সাহিত্য,গান,নাটক নিয়েও আলোচনা শুরু হয় তাদের।কলেজে ক্লাসের সময়টুকু ছাড়া সুমনকে রিক্তা ছাড়া দেখাই যেত না।সেই নিয়ে বন্ধুদের অনেক হাসাহাসিও শুনতে হয়েছে তাদের।বইপাড়া থেকে নন্দন সবকিছুতেই সুমনের সঙ্গী রিক্তা।এতোদিনের অনেক না পাওয়ার অভিমান সুমনের ছোঁয়ায় যেন ধুয়ে যেতে থাকে।তার জীবনের প্রথম পুরুষ যে সুমন।বাবাকে পাশে না পাওয়ার অভাব, ঘুম না আসা রাতগুলোর তিক্ততা সবকিছুকেই ছাপিয়ে যায় সুমনকে পাওয়ার মধ্যে দিয়ে।সুমনও আগলে রাখতে চায় রিক্তাকে।কারোর হাত ধরে রাস্তা পার হবার মধ্যেও এতো সুখ আগে কেন বোঝেনি রিক্তা।ছোটবেলায় বন্ধুদের দেখে খুব হিংসে হত ওর ছোট্ট মনে।নিজের জন্মদিনগুলোর উপর খুব রাগ হতো।কিন্তু এমন ভাবেও কেউ মনে রাখতে পারে এইদিনটার কথা।সত্যিই কি ও সবার থেকে আলাদা।কেন যে সুমনের চোখে নিজেকে অন্যরকম লাগে।দুজন মানুষ পরষ্পরকে ভালবাসি না বলেও ভালবেসে যাওয়া যায় তাহলে।বন্ধুত্ব, নির্ভরতা, বিশ্বাস আর ভালবাসা এতো পবিত্র অনুভূতি সেও কতো গর্বের, কতো শান্তির।


মানুষ হয়তো পরিযায়ী পাখির মতোই হয়।বিশেষ কিছু ঋতুতে এসে জীবনের ক্যানভাসে রামধনুর রঙ ভরিয়ে দিয়ে আবার চলে যায় ঠিকানাহীন কোনো দূরদেশে।শুধু সেই রঙের দাগটুকুই পরে থাকে সাদা পাতার উপর।কলেজ শেষ হতেই রিক্তার বাবা আর নতুন মা ওর বিয়ের ঠিক করে ফেলে।আসলে ওর নতুন মা চাননি এতো বড় মেয়েকে বাড়িতে বসিয়ে খাওয়াতে।তাই স্কুলের শেষেই বলেছিলেন মেয়েকে তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে উদ্ধার করতে।সেইসময় বাবা শোনেননি কিন্তু এবারে আর বাবাকে বুঝিয়েও লাভ হয়না।সে চাকরি করে নিজের দায়িত্ব নিতে চায়।সুমনের সঙ্গে মেলামেশার কথা কানে আসায় বাড়িতে আর কেউই বিশেষ অপেক্ষা করতে চাননি।


সাত বছর হল বিয়ে হয়েছে রিক্তার।পাঁচ বছরের ছেলে অনিকেত আর স্বামী নিশিকেতকে নিয়ে ওদের ছোট সংসার।কিন্তু সুখী হতে পারেনি রিক্তা।নিশিকেত একটা বহুজাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ অফিসার।উচ্চবিত্ত পাড়ায় নিজেদের বাড়ি।তবু সে সুখী নয়।বাপের বাড়ির সাথে সম্পর্ক নেই তার।নিশিকেত চায়নি আর রিক্তার যে খুব ইচ্ছে ছিল তাও নয়।আবার মানিয়ে নিয়েছে রিক্তা, তার ভাগ্যের সাথে।হয়তো ছোট থেকে সব মেনে নিতে নিতেই মানিয়ে নেওয়া আর মেনে নেওয়ার অভ্যাসটা ওর রক্তে মিশে গেছে।ফুলশয্যার রাতে দুএক ফোঁটা লাল রঙ খুঁজে না পাওয়ায় ওর জীবনটা এখন রংহীন।বন্ধুত্ব, নির্ভরতা, বিশ্বাস আর ভালবাসা ছাড়াও সন্দেহ নামক আরেকটা অনুভূতি সে বাদ দিয়েছিল।নিশিকেত আসার পর শুধু সন্দেহ টুকুই রয়ে গেছে ওর জীবনে।তবু শুধু ছোটো ছেলেটার জন্যেই গায়ের কালশিটে দাগ গুলো নিয়ে নিশিকেতের সংসারে থেকে বাঁচার লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছে রিক্তা।


আজই শেষ।এবার মানুষের মতন বাঁচতে চায় রিক্তা।নিশিকেতের এতোদিনের করা অপমানগুলো তবু ছেলের চোখের আড়ালে ছিল।কিন্তু কাল রাতের ঘটনা বাকি সমস্ত কিছু ছাপিয়ে গেছে।প্রায় মাঝরাতে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে রিক্তাকে খাবারের থালা সাজিয়ে বসে থাকতে দেখে যেন তেলেবেগুনে জ্বলেউঠেছিল নিশিকেত।মারতে মারতে সে ক্ষতবিক্ষত করে তুলছিল রিক্তাকে।তার সঙ্গে চলছিল অশ্রাব্য গালাগাল,"নষ্ট মেয়েমানুষ!তোর ওই বন্ধুর সাথে ঢলাঢলির সমস্ত খবরই আমার জানা।এসব নাটক আমাকে দেখাস না"-বলেই রিক্তার মাথা ঠুকে দিয়েছিল দেওয়ালে।এতো চিত্কারের মধ্যে কখন যে অনি ঘুম থেকে এসেছিল খেয়াল করেনি কেউই।ছুটে এসে সে তার ছোট্ট হাতের ছোট্ট শক্তি দিয়ে নিশিকেতকে ঠেলে দিয়ে প্রতিবাদ করে ওঠে,"আমার মাকে মারছ কেন?মা কি করেছে?তুমি বাজে লোক।আমার মাকে মারবে না।"


এতো আঘাতেও চুপ করে থাকা রিক্তা আর ধরে রাখতে পারেনা নিজেকে।ছেলের প্রতিবাদে মনের মধ্যে জমে থাকা সমস্ত অপমান মুক্তো হয়ে ঝরে পরে।ছোট্ট অনি তার মাকে জড়িয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বলে,"মা আমি তো আছি,তোমার বীরপুরুষ।তোমার মনে নেই ওই ছড়াটা তুমি শিখিয়েছিলে?"অনিকে জড়িয়ে থাকে রিক্তা।না,সেতো একা নয়।তার ছেলে আছে তার পাশে।তার জীবনের শেষ পুরুষ।


সকাল হতেই বেরিয়ে পরে রিক্তা।নিশিকেত অবশ্য ওদের আটকানোর চেষ্টা করেছিল অনেক।ক্ষমাও চেয়েছিল তার গতরাত্রের ব্যবহারের জন্য।কিন্তু রিক্তা জানে দিনের আলোয় এই লোকটা একটা মুখোশ পরে থাকে।রাতের অন্ধকারে নোংরা রূপটা আবার বেরিয়ে আসবে।ছেলেকে কোলে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলে রিক্তা।পাড়ার মোড়ের সামনে এসে শুনতে পায় বাৎসরিক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে।অনির বয়সী একটা ছেলে কবিতা পাঠ করছে,"ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল!কী দুর্দশাই হত তা নাহলে..."

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.