বিকেলে ভোরের আলো


সকালবেলা সূর্য আকাশে উঠছে। রঘু হাসপাতালের পাশের মাঠ দিয়ে নদীতে যেতে যেতে গণেশ ডাক্তারের কথা ভাবছিল। আগে কতবার তারা একসাথে সূর্যোদয়ের সময় এই নদীর পারে হাঁটতো। ডাক্তার বাবু বলতেন, "রঘু, সূর্যোদয় হচ্ছে। চেয়ে দেখ। এই আলো, অন্ধকার ভেঙে আসছে, এ আলো সত্যের আলো, জ্ঞানের আলো। সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। কোন উঁচু নিছু ভেদাভেদ মানে না। প্রনাম কর। এই আলো মাথা পেতে নে। দেখবি একদিন সব অন্ধকার কেটে যাবে। সব উঁচু নিচুর বেড়া ভেঙে যাবে .........।"

রঘু একথার মানে কিছু বুঝতেই পারে না। কিন্তু শুনতে শুনতে কথাগুলো যেন মুখস্ত হয়ে গেছে। ডাক্তারবাবু আজ তিন বছর প্রায় জেলে। কেন? রঘু জানে না।গণেশ ডাক্তার কোন ভুল করতে পারে না। কোন অন্যায় কে তিনি প্রশ্রয় দেন না। ওনার মতো একটা মানুষকে কি করে জেলে নিয়ে যেতে পারে রঘু ভাবতেই পারে না।

হাসপাতালে রঘু অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে। সবাই চুপ করে থাকে। রঘু কিছু বুঝতেই পারে না। শুধু দেখেছে, মাঝে মাঝে দু একটা বড় গাড়ি আসে। হাসপাতালের সবাইকে অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। কাউকে কাউকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর দু তিন দিন বাদে ছেড়ে দেয়। আজও নদীতে স্নান করতে আসার সময় একটা বড় গাড়ি হাসপাতালের সামনে সে দেখেছে। কিন্তু, এখন সে যাবে না। আজ তার মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেড়াবে। সে এখন স্কুলে যাবে।


বাস রাস্তার ওপারে রঘুদের স্কুল। সারস্বত বিদ্যামন্দির।গণেশ ডাক্তার , ডাক্তার সরকার, ডাক্তার রাও এব্ং আরো অনেকে মিলে আদিবাসী বাচ্চাদের জন্য এই স্কুলটি পাঁচ বছর আগে তৈরী করেছিলেন। তারপর থেকে, রঘু,হরি, মুনিয়া, মিতু নাজমা সবাই এই স্কুলেই পড়ে। আগে এই ডাক্তারবাবুরাই হাসপাতালের বারান্দায় বসে সন্ধ্যে বেলায় ওদের পড়াতো।


হরি মিতু রানা মুনিয়া সবার বাবা মা ই খনিতে মজুরের কাজ করে।রঘুর শুধু বাবা করে। রঘুর মাও আগে করতো। এখন অসুস্থ। এই হাসপাতালেই থাকে। অনেক বছর। রঘু যখন খুব ছোট তখন তার মা একবার খনি তে কাজ করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন এখানে কোন হাসপাতাল ছিল না। তাকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানের ডাক্তার নার্সরা এই নোংড়া খনি মজুরের গায়ে হাত দিয়ে দেখতে চায়নি। রঘুর মা তিন দিন অজ্ঞান হয়ে পরে থাকে। পরে, ডাক্তার সরকার ও ডাক্তার রাও এর চেষ্টায় সে যাত্রায় রঘুর মা বেঁচে যায়।এরকম নাকি আগেও হয়েছে। কিন্তু এবার সমস্ত খনি মজুররা আন্দোলন করেন। তারপর ডাক্তার সরকার, ডাক্তার রাও এরাও এসে এই আন্দোলনে যোগ দেন।এরপর এই হাসপাতাল গড়ে ওঠে এখান কার আদিবাসী মানুষদের জন্য। তখন অনেক ডাক্তার এসে যোগদেন এখানে।তখনই গণেশ ডাক্তার এখানে আসেন।হাসপাতাল শুরুর প্রথম থেকেই রঘুর মা এই হাসপাতালে আছে। তাই মার সাথে দেখা করার জন্য রঘু হাসপাতালে আসে। ডাক্তারদের সাথে পরিচয় হয়। তখন রঘু গণেশ ডাক্তারের খুব আপনজন হয়ে যায়। সারাদিন তার সাথে থাকত।সেই সময় রঘু দেখেছে, গণেশ ডাক্তার প্রায় সারা রাতই রোগীদের কাছে থাকে। বিভিন্ন ওয়াডে ঘোরেন। কারুর জ্বর হলে, মাথা যন্ত্রনা হলে, মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। এমন কি নিজের বাড়ি থেকেও পথ্য করে এনে দিতেন।গণেশ ডাক্তার বলতেন, "রঘু, খুব ভাল করে পড়াশোনা কর। তোদের সবাইকে মানুষ হতে হবে। এই খনি অঞ্চলের মানুষগুলোকে মানুষের মর্যোদা দিতে হবে। এই দেশের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই তোরা নতুন দেশ গড়তে পারবি।"


আজ রেজাল্ট। রঘু স্কুলে ঢুকতেই দেখে, স্কুলের অফিসের দিকে খুব ভীর। ও ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। একে একে হরি, মুনিয়া, রানা, মিতু নাজমা সবাই এসে গেছে। লিস্ট টাঙান আছে। রঘু দেখে সে ৮৫% নম্বর পেয়েছে। হরি, মুনিয়া, মিতু রানা ওরা সবাই ৮০% এর ওপরে পেয়েছে। হেডস্যার খুব খুশী। তার স্কুলে এবছর এতজন এত ভাল রেজাল্ট হয়েছে।


রঘুর চোখ জলে ভরে যায়। বার বার গণেশ ডাক্তারের মুখটা ভেসে ওঠে। রঘু যে তাঁকে কথা দিয়েছিল সে খুব ভাল রেজাল্ট করবে। অনেক বড় হবে। এই কয়লা খনি অঞ্চলের মানুষগুলো কে একটা নতুন জীবন দেবে। কিন্তু গণেশ ডাক্তার কোথায়? কান্নায় ভেঙে পরে রঘু।


বিকেলে রঘু ধীরে ধীরে হাসপাতালের দিকে যায়।তার সাথে সাথে মিতু, হরি, রানা, মুনিয়াও এসেছে। গেট দি্যে সামনে যেতেই একটা চাপা গুঞ্জন শোনা গেল। ওরা ভিতরে গিয়ে দেখে, গণেশ ডাক্তার বসে আছে। রঘুর চোখ জলে ভরে গেল। অনেক না বলা যন্ত্রনা যেন জল হয়ে বেড়িয়ে এলো। গণেশ ডাক্তার ওদের বুকে টেনে নিয়ে বললেন, "কি রে, তোরা নাকি দারুণ নম্বর পেয়েছিস? " এক মুহূর্তে রঘুর মনে হল, কেউ যেন হাজার খুশীর আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

গণেশ ডাক্তার রঘুদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "দেখ, এবার তোদের একটা বড় দায়িত্ব নিতে হবে। এই হাসপাতালের যত বয়স্ক রোগী আছে তাদের লেখাপড়া তোদের শেখাতে হবে। কিরে মিতু, হরি, মুনিয়া? তোরা পারবি না?" ওরা একসাথে বলে ওঠে, "হ্যাঁ ডাক্তারবাবু। পারবো। ঠিক পারবো।" গণেশ ডাক্তার ওদের হাত ধরে হাসপাতালের মাঠে হাঁটতে থাকেন।


পড়ন্ত বিকেল, আকাশে উজ্জ্বল সোনালী আলো। ডাক্তার বাবু বললেন, " দেখ, তোদের বাবা মা র মতো হাজার হাজার লক্ষ মানুষ এই দেশে আছে। যারা সারাদিন পরিশ্রম করেও নূন্যতম খাবার চিকিত্সা পায়না, শিক্ষার আলো দেখেনা।মানুষ হয়েও মানুষের মর্যোদায় বেঁচে থাকার অধিকার পায়না। এরা সবাই আমার দেশের মানুষ। প্রতিদিন সূর্যাস্তের সাথে সাথে তাদের জীবনও অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। তোরাই তো দেশের ভবিষ্যত। তোদেরই দেশের মানুষদের পথ দেখাতে হবে। বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন শেখাতে হবে......।"


রঘু পড়ন্ত সূর্যের উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। সে যেন এক স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে যায়, দেশ গড়ার স্বপ্ন, মানুষ গড়ার স্বপ্ন.......


অনেক বড় হতে হবে তাকে......তাদের সবাই কে।।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.