স্টেশনের কাছে রেললাইনের নীচেই সারি সারি কয়েকটা ঝুপড়ি। রেবন্ত আর সুবালা তাদের পাঁঁচবছরের মেয়ে টুকটুকিকে নিয়ে এরই একটিতে সংসার পেতে বসেছে। গতবছর বন্যার কবলে সমস্ত হারিয়ে নিজের বাসস্থান থেকে উচ্ছন্ন হয়ে অন্য আধা গ্রাম আধা শহর এক জায়গার এই সরকারী জমিটুকুতে এসে আস্তানা বাঁধে তারা। সুবালা ছোট স্টেশনটির প্লাটফর্ম, টিকিট ঘর আর মাস্টারবাবুর ঘরটি পরিস্কার রাখার কাজ জোগাড় করেছে। তাতে কিছু আমদানী হয়ে যায়। রেবন্ত সকাল সকাল চা খেয়ে গামছায় কিছু খাবার বেঁধে বেরিয়ে যায় রিকশা চালাতে। স্টেশনের পেছনেই রিকশার আড়ত। সেখান থেকে ভাড়ায় রিকশা নেয় সে। দিন ফুরোলে ২০০ টাকা ভাড়া আর রিকশা সেখানে জমা দিয়ে বাড়ী ফেরে। হাতে খুব অল্পই বাঁচে। সুবালা আর তার পরিশ্রম মিলিয়ে কোনরকমে দিন গুজরান হয়ে যায়। সুবালা তাতেই সব গুছিয়ে সামলে নেয়। চার /পাঁচ কিমি দূরের দোকানের জিনিষ আনা-নেওয়া করলে কামাই একটু বেশী হয়, কিন্তু তার শরীরে কুলোয় না। বুকের ভেতরে হাপরের ওঠানামা সহজে বন্ধ হতে চায় না, দম বন্ধ হয়ে আসে। সুবালা তাই এধরনের কাজ করতে বারন করে দিয়েছে। দরকার নেই বেশী টাকার। কিন্তু মেয়েটার জন্য মাঝেমধ্যে বেশী রোজগার করার ইচ্ছে জেগে ওঠে। একটা নতুন ফ্রক, রঙিন ফিতে.... মেয়ের জন্য এটুকুও সে করতে পারে না। সাথে আনা জামা- কাপড় সব ছিঁড়ে গেছে প্রায়। সুবালা জোড়াতালি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। অবোধ মেয়েটার এমনিতে কোন চাহিদা নেই, কিন্তু তার বুক ফেটে যায় ওর দিকে চাইলে। নিজের গ্রামে ছোট্ট একটা মুদিখানা ছিল, ভালোই বিক্রীবাটা হতো। সংসারে অভাব ছিল না। বন্যার করাল গ্রাসে সব গেছে। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে রেবন্ত রিকশার প্যাডেলে পায়ের চাপ দেয়। এই রেললাইনের ধারে তার থাকতে একটুও ভালো লাগে না। আশেপাশে মদ খেয়ে চেঁচামিছি সে সহ্য করতে পারে না। একটু টাকা জমাতে পারলে ভদ্র জায়গায় উঠে যাওয়ার চেষ্টা করবে। মেয়েটার ভবিষ্যৎও তো ভাবতে হবে। সুবালা ওরই মধ্যে তিল তিল করে সঞ্চয়ের চেষ্টা করে।


আজ জন্মাষ্টমী। টুকটুকি আজকের দিনেই তাদের ঘর আলো করে এসেছিল। তার প্রত্যেক জন্মদিনে সুবালা পায়েস রান্না করে প্রসাদ চড়িয়ে মেয়ের মুখে দিত। পায়েস মেয়ের ভীষণ পছন্দ। এবার কি সুবালা ব্যবস্থা করতে পারবে! আজ সকালে বাড়ী থেকে বেরোবার সময় টুকটুকি আবদার করেছিল একটা লাল ফ্রক চাই তার। তাকে আদর করে এনে দেবার কথা দিয়ে আজ বেরিয়েছে সে। একটুও বিশ্রাম না নিয়ে বেশী করে রিকশার খেপ মেরে যাচ্ছে। একটা লাল ফ্রক কিনে নিয়ে যেতেই হবে আজ।

রাত্রি হয়ে গেছে। আকাশের দিকে মুখ তুলে চায়....চাঁদ লুকিয়ে গেছে কালো মেঘের পেছনে। চোখের সামনে মেয়ের চাঁদপানা মুখখানি ভেসে উঠলো। "আসছি মা, একটু সবুর কর ", মনে মনে কথাগুলো আওরায় সে। লাস্ট প্যাসেঞ্জার রিকশা থেকে নামায়, আর নতুন প্যাসেঞ্জার ওঠাবে না এখন। বাজারে গিয়ে পছন্দমত একটা ফ্রক আর একটু মিস্টি কিনে হাওয়ার বেগে রিকশা ওড়ায় রেবন্ত। এই বাহুল্য খরচের জন্য সুবালা একটু বকাবকি করবে বৈকি, কিন্তু আজ জন্মদিনে ফুলের মত মেয়েটার খুশী দেখার জন্য এটুকু বরদাস্ত করেই নেবে সে। অনেক দেরী হয়ে গেছে, মেয়ে ঘুমিয়ে না পড়ে। এমনিতে রোজ বাবা বাড়ী না ফেরা পর্য্যন্ত জেগেই থাকে টুকটুকি।


স্টেশনের কাছে পৌঁছে গেছে প্রায়। আড়তে রিকশা জমা দিয়ে বাড়ীর দিকে তাড়াতাড়ি পা বাড়ায়। অবাক হয় রেবন্ত, তার বাড়ীর কাছে অত লোকজন আর আলো কেন! এগিয়ে গিয়ে দু'হাত দিয়ে ভীড় সরায়। একি.... তার ঝুপড়ি কোথায়! সেখানে পুড়ে কয়লা আর ছাই হয়ে যাওয়া বাঁশ আর খড়ের স্তুপ। আর তার সামনে মাটিতে শোওয়ানো ছোট্ট একটা শরীর, কে যেন লাল একটা কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঢেকে দিয়েছে গলা পর্য্যন্ত। চাঁদের মত ঝকঝকে মুখে কৃষ্ণপক্ষের কালো মেঘের আবরন! পায়ের কাছে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে সুবালা নিথর হয়ে। তার সামনে ধূলোয় ছড়িয়ে পড়ে আছে দুধের প্যাকেট, চাল আর চিনি। দুপুরে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে পাশেই দোকানে গেছিলো সুবালা মেয়ের জন্য পায়েস রান্না করবে বলে জিনিষ কিনতে। এরই মধ্যে ঝুপড়ির ওপর দিয়ে চলে যাওয়া হাই ভোল্টের ড্যামেজ তার ছিঁড়ে পড়ে তার ওপর। দাউ দাউ জ্বলে ওঠে খড়ের ছাউনি। লোকের নজর পড়াতে সঙ্গে সঙ্গে ইলেক্ট্রিক গ্রিডের অফিসে ফোন করে মেইন সুইচ অফ করায়। তারপর আগুন নেভাবার আর পাশের ঝুপড়ি বাঁচাবার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে তারা। টুকটুকি যে ভেতরে আছে কেউ খেয়ালও করে নি। ঘুমন্ত টুকটুকি ঝুপড়ির ভেতরে এ জন্মের মত ঘুমিয়েই থেকে যায়। সুবালা খবর পেয়ে ছুটে আসে, কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। হাতের প্যাকেট ছুঁড়ে ফেলে হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে হা হা করে বুক চাপড়ে কেঁদে ওঠে রেবন্ত।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.