বাগানবাড়িটার গেটের ফলকে লেখা আছে – অমৃত ধাম। শেওড়াফুলি, হুগলী। গেট খুলতে হল না, কারণ গেটের একটা পাল্লা নেই। আর যেটা আছে, সেটাও একধারে সরানো। শুকনো পাতা মাড়িয়ে আগাছার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কিছুটা দূর হাঁটার পর আসল বাড়িটা দেখা গেলো। এক বিরাট আকারের জরাজীর্ণ দোতলা বাড়ি। বিবর্ণ, প্লাস্টার খসা দেওয়াল। দেওয়ালের ফাটল থেকে অশ্বত্থ গাছের চারা মুখ বাড়িয়ে। মাথার উপর ঝুল-বারান্দার রেলিঙের কারুকার্য বেশির ভাগ ভেঙ্গে গেছে। জানলা-দরজা বন্ধ প্রাচীন বাড়িটা গাছের ছায়ায় ঘুমচ্ছিল। মিলি পায়ে পায়ে এগিয়ে দরজার বেল খুঁজল। বেল নেই। বদলে সবজেটে দরজার বুকে দুটি বিশাল সিংহমুখী কড়া।

কড়া নাড়ার শব্দে মনে হয় বাড়িটার ঘুম ভাঙল না। দুপুরের নিঝুম রোদে শিতের গন্ধ। হঠাত এক ঝলক বাতাস কোথা থেকে এসে আশেপাশের বৃদ্ধ গাছগুলোকে নাড়িয়ে দিয়ে একটা মৃদু কোলাহল তৈরি করে দিল। কিছু শুকনো পাতা খসে পড়ল, ডালপালা দিয়ে তৈরি আলো ছায়ার নকশা কাঁপতে লাগলো চারপাশে। শালটা ভাল করে জড়িয়ে নিয়ে মিলি, আবার একবার কড়ায় হাত দিতে যাচ্ছে, এমন সময় দরজাটা খুলে গেলো। মায়া ভরা মুখের এক মহিলা, ফুল ছাপ নাইটি পরে তার সামনে। বন্দনা সোম। আগে থেকেই ফোনে কথা হয়ে আছে। মিলিকে পেয়িং গেস্ট হিসেবে থাকতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, কারণ এত বড় বাড়ি খালিই পড়ে আছে। তিনি হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন। বাড়ির ভিতরটা অন্ধকার, বাইরের থেকে তাপমাত্রা আরও দু-তিন ডিগ্রী কম। মিলি ভেবেছিলো, পুরনো আমলের বাড়িতে থেকে, বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার করা হবে। অন্ধকার ঘরগুলো দেখে সে উৎসাহ ঝুপ করে কিছুটা কমে গেলো। একতলাতেই মিলির জন্য ঘর বরাদ্দ হয়েছে, সাইজে বেশ বড়, মেন দরজার সামনেই। সঙ্গে এটাচড বাথরুম নেই অবশ্য। থাকার কথাও নয়, একশো-দেড়শ বছরের পুরনো বাড়িতে। লাল রঙের টানা বারান্দার শেষ প্রান্তে দোতলায় যাবার সিঁড়ি, আর সিঁড়ির তলায় গাড় অন্ধকারের মধ্যে বাথরুম।

বন্দনাদের বনেদী পরিবার। এখন অবস্থা পড়ে গেছে, পুরুষরা সব মরে হেজে গেছে, আছেন শুধু তিনি আর বোধহয় এক মাসী। এদিকে মিলির কাছে একটা থাকার জায়গা খুব তাড়াতাড়ি দরকার হয়ে পড়েছিল। হঠাত এদিকে পোস্টিং হয়েছে, তাই এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়র কাছে উঠেছিলো, তারপরই এই মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ। এখন মফঃস্বলে আধুনিক স্টাইলের বাড়ি পাওয়া শক্ত কিছু না হলেও, চটজলদি পাওয়াটা খুব শক্ত। ঘরটা মন্দ নয়। জানলা খুলতেই দেখা গেল, বাগানের সীমানার ওপারেই গঙ্গা। মিলি জামা কাপড় বদলে আবার বাগানে বেরোল। বিরাট জায়গা জুড়ে বাগান। সব গাছগুলোরি অনেক বয়স। বেশীর ভাগই বোধহয় ফলের। ঘন রোদ্দুর পড়ে তেতে উঠেছে জায়গাটা। এখানে একটা চেয়ার পেতে বসে সারাদুপুর বই পড়া যায়। মাঝে মাঝে গঙ্গা থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে, তখন শালের ভেতর শরীরটা শিরশিরিয়ে উঠছে। বন্দনা এলেন আবার। হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। বললেন, “তুমি এখানে? দেখ ভাই, মশলা চা এনেছি। শীতকালে আদা, এলাচ দিয়ে চা খেতে ভাল লাগে”। কথা বলতে ভালবাসেন বন্দনা। গুনগুন করে কথা বলতে লাগলেন -“কখন মশলাচা খেতে সবথেকে ভাল লাগে জান ? আমার মাসী বলে, সকালে খাও, জমবে না। বিকেলে খাও ,মজা পাবে না। কিন্তু, যখন চায়ের সময় নয়, তখন হঠাত যদি কেউ মশলাচা এনে দেয়, তখন পাবে আসল মজা। এই যেমন এখন তুমি ভাবতেও পার নি যে আমি চা করে আনবো। ঠিক কি না? এখন এই চা তোমার কাছে অমৃত লাগবে”। মিলি চায়ে চুমুক দিয়ে দেখল, সত্যি অমৃত লাগছে। বন্দনা বললেন, “আজ তুমি খাবে বলে, চিকেন করেছি। দেশি চিকেন। ঝাল ঝাল করে কষা। মাসী বলে, শীতকালে গেস্ট এলে, রাতে সবসময় চিকেন দিয়ে গরম ভাত খাওয়াবি। সঙ্গে স্যালাড। দেখবি, গেস্ট খেয়ে তৃপ্তি পাবে”। বন্দনার কথার বেশির ভাগ জুড়েই মাসীর গল্প। বয়স চল্লিশের কোঠায় হয়ে গেলেও, তিনি মাসীর অভিভাবকত্বের ছায়া থেকে বেরতে পারেন নি। কথা বলতে বলতে রোদটা মুছে যেতেই, বন্দনা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। বললেন, “সূর্য ডুবে গেলে বাগানটা কেমন মনমরা হয়ে যায়। এখন বাগানে না থাকাই ভালো”। চলে যাবার আগে, ফিসফিস করে বলে গেলেন “ তোমার কোন দরকার হলে নীচে থেকে ডাকবে, একদম উপরে যাবে না। ওটা প্রাইভেট এরিয়া”। শেষের দিকে কথাটা আদেশের মত শোনালো।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.