ব্যতিক্রম



দু দিন আগে রক্তিম পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। মদ্যপ অবস্থায় একজন মহিলাকে ধর্ষণ করার অপরাধে। স্বভাবতই শহর জুড়ে তুলকালাম অবস্থা। গোটা শহরবাসী রাস্থায় নেমে এসেছে এ ঘটনার বিরোধিতা করতে। মিছিল, বনধ -সামলাতে পুলিশের একেবারে নাজেহাল অবস্থা। তার ওপর মিডিয়া পাগলের মতো পিছনে পড়ে রয়েছে। সারাক্ষণ সব নিউজ চ্যানেলে একটাই খবর চলছে। যেন ছোটোখাটো একটা তাইফুন বয়ে গেছে কোলকাতা শহরে।


রক্তিম কে একটা আলাদা কেবিন এ রাখা হয়েছে। উচ্চপদস্থ অফিসার ছাড়া সেখানে যাওয়ার পার্মিশান আর কারোর নেই। গত দু দিন ধরে থার্ড ডিগ্রি র চরমসীমা ব্যবহার করা হয়েছে রক্তিমের ওপর। কিন্তু তার মুখ দিয়ে একটা শব্দ ও বেরোয় নি। নিজের মধ্যে কোথাও একটা হারিয়ে আছে সে। খাওয়া দাওয়া কিছুই করছে না। যেন বিরাট একটা শকের মধ্যে আছে।


রক্তিমের তখন দু বছর বয়স যখন তার বাবা মারা যান। ফুটপাথে ঘর ছিলো তাদের। চার ভাই বোনের মধ্যে রক্তিম ছিলো সব চেয়ে ছোটো। এর আগে একটি মেয়ে ও দুটি ছেলে আছে তার বাবা - মার। তার বাবা স্টেশনে স্টেশনে হকার গিরি করতো। মা বাড়ি বাড়ি কাজ করতো। বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছিলো। বড়ো ছেলে কাজ করে কিছুটা ইনকাম করে নিতো।কোনোরকমে কেটে যেতো তাদের। কিন্তু হঠাৎ ই এক অ্যাক্সিডেন্ট এ তার বাবার মৃত্যু হয়। এই ঘটনার ফলে মানুষিক আঘাত পায় তার মা। তার ৬ মাস পর মা ও মারা যায়। বড়ো ভাই দু জনের দায়িত্ব নিতে না পেরে রক্তিম কে একটা রাস্তার ধারে থাকা ডাস্টবিন এর মধ্যে ফেলে আসে। তখন তার আড়াই বছর বয়স। সেদিন থেকে কোলকাতা শহরে সে একা। মাঝের সময়টা ধোঁয়াশা র মতো।


রক্তিম র তখন সাত বছর বয়স। সে একটি চায়ের দোকানে কাজ করে। একদিন চা দিতে গিয়ে একটা কাপ তার হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়। সেদিন প্রথম সে মালিকের কাছে থার্ড ডিগ্রির পরিচয় পেয়ে যায়। রক্তিম হাজার রকম অভাব অনটনের মধ্যে বেড়ে উঠলেও সে ছায়া তার রুপের উপর পড়ে না। যার ফল হয়েছিলো ভয়ংকর । কারণ এই রুপের কারনে অনেক বয়স্ক বিকৃত মানষিকতার পুরুষের লালসার শিকার তাকে হতে হয়েছে। আর একটু বড়ো হওয়ার পর তার মালিক তাকে পাচার কারবারি দের হাতে তুলে দেয়। যেখানে তাকে কাজ করতে হতো পুরুষ প্রস্টিটিউট হিসাবে। তাকে বড়োলোক বাড়ির মেয়েদের কাছে হবুবার হেনস্থা হতে হয়েছে। যে কারণে নিজের অজান্তেই তার মনের মধ্যে একটা নারী বিদ্বেষী মনোভাব গড়ে ওঠে। তাই যখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।,পরে জেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তার চোখমুখে কোনো অনুতাপ, ভয় কিচ্ছু ছিলো না।


কিন্তু বর্তমান সমাজ রক্তিম এর অতীত সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তারা তার শাস্তির দাবীতে ক্রমাগত ধর্না দিতে থাকে আদালত চত্বরে। প্রতিটা খবরের কাগজের পাতা চেয়ে যায় এই ঘটনার নিন্দা তে। রাজনৈতিক মহল ও চাপ দিতে থাকে। যথারীতি এ ধরনের কেশে ডিফেন্স উকিল পাওয়া খুব কষ্টকর হয়। আর মহিলা উকিল ডিফেন্সের হয়ে সেটা খুব ই অবাস্তব শোনায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছিলো। রক্তিম র হয়ে তার তরফ থেকে কেশ টা হাতে নিয়েছিলো নিশা সেনগুপ্ত।


বরাবর ছক ভাঙা পথে চলতে ভালোবাসতো নিশা। বাবা বিশাল বড়ো সাইক্রিয়াটিস্ট আর মা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা। অভাব বলতে ছিলো শুধু ভালোবাসার। বাবা - মা সারাক্ষন কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে কোনোদিন সেভাবে বাবা - মার ভালোবাসা পায় নি সে। তার ছোটোবেলার বেশীর ভাগ সময় কাটতো তার ঠাম্মার সাথে। তার ঠাম্মাই তাকে নানা মহাপুরুষ আর নানা মহান মহিলার গল্প শোনাতেন। যা তার মনে গভীর প্রভাব ফেলে। সেখান থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ টা তার আসে। পড়াশোনায় খুব ই ভালো ছিলো সে। তাই পরীক্ষা দিয়ে বিদেশ থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে সে দেশে ফেরে। তার উদ্দেশ্য ছিলো যারা টাকার অভাবে কেশ লড়তে পারে না তাদের হয়ে কেশ লড়া। সেই উদ্দেশ্য থেকেই রক্তিম র কেশ টা হাতে নেওয়া। এদিকে মিডিয়ায় তো আগুন লাগার অবস্থা। একজন মহিলা হয়ে কি করে নিশা একজন ধর্ষকের পক্ষ নিতে পারেন সেই নিয়ে সব চ্যানেলে গবেষণা শুরু হয়ে গেছে।


কেশ টা হাতে নেওয়ার পর নিশা রক্তিম এর সাথে দেখা করতে এলো। কিন্তু রক্তিম তার সাথে দেখা করতে রাজী হলো না। তাও জোর করে নিশা গেলো তার কাছে। সে প্রশ্ন করে চললো কিন্তু রক্তিম র তরফ থেকে কোনো উত্তর এলো না। এ জিনিস টা নিশা কে আরো কৌতুহলী করে তুললো রক্তিম র ব্যাপারে। যে সবাই উকিল সব বলে দেয় যাতে সে বাঁচতে পারে। এই লোকটার কি বাঁচাফ ইচ্ছে নেই। সে আরো চার - পাঁচ দিন যায় কথা বলতে কিন্তু কোনো লাভ হয় না। অবশেষে নিশা উকিলি পন্থা অবলম্বন করে। খবরি নেটওয়ার্ক কে অ্যাক্টিভেট করে আর আরো অনেক লোক লাগায় রক্তিম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। ধীরে ধীরে রক্তিম এর জীবন সম্প্রর্কে। রক্তিম জীবনের প্রতিটা অধ্যায় তাকে শিহরীত করে তোলে। সে ভেবে পায় না একটা বাচ্চা ছেলে এত কিছু সহ্য করার পরও বেঁচে আছে কি করে। রক্তিম র জীবন্ত লাশ হয়ে থাকার আর জানোয়ার মতো আচরনের কারণটা সে বুঝতে পারে।


এরপর শুরু হয় কোর্ট কেশ। ভিক্টিম পক্ষের উকিল প্রমাণ স্বরুপ একে একে সাক্ষী পেশ করতে থাকে রক্তিম এর বিরুদ্ধে আর সেগুলো সব ই সত্যি ই ছিলো। এভাবে প্রথম দিন শেষ হয় কেশের। পরের দিন কেশ শুরু হতেই জজ সাহেব ডিফেন্সের দলিল শুনতে চান। নিশা বলা শুরু করে। রক্তিম র শৈশব থেকে শুরু করে বড়ো হওয়ার মাঝের প্রতিটা স্তর সে তুলে ধরে আদালতের সামনে। যা শুধু আদালতের ভিতরে থাকা মানুষদের নয় গোটা শহরবাসীকে টলিয়ে দেয়। নিশা বলে যায় " ইয়োর অনার আমি মহিলা হয়ে এই কেশ টা নেওয়ায় গোটা শহর আর রাজ্য জুড়ে আমার অনেক সমালোচলা হয়েছে। কিন্তু আমি এই কেশ নিয়ে আজকে বুঝতে পারছি আমি কোনো ভুল করিনি। কোনো সন্দেহ নেই রক্তিম যে অপরাধ করেছে সে প্রচন্ড নিন্দনীয় আর এর জন্য তার কঠিনতম শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু যে পরিস্থিতি আর যে পরিবেশে সে বেড়ে উঠেছে সেটা তাকে এই কাজ করতে বাধ্য করেছে। ছেলেটার মহিলাদের প্রতি বিদ্বেষ থাকা খুব স্বাভাবিক। ওকে ভালো মন্দ বোঝানোর মতো।কেউ ছিলো না ইয়োর অনার। ওর সাথে ছিলো শুধু পুড়ে যাওয়া কপাল আর পেটে খিদে। ইয়োর অনার যে জীবনে হিংস্র তা বর্বরতা ছাড়া কিছু পায় নি তার মধ্যে মানবতা আসবে কোথা থেকে। সে জানোয়ার ই হয়ে উঠবে। তাই আমার অনুরোধ ওকে যতটা সম্ভব কম শাস্তি দেওয়া হোক আর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। " এই বলে নিশা নিজের বক্তব্য শেষ করে।


গোটা রাজ্যে এই কেশ মহামারী র মতো ছড়িয়ে পড়ে। আলোচনা শুরু হয়ে যায় শাস্তি হওয়া উচিত কি না। এদিকে মেয়ের পরিবার ও সরকার কে ফাঁসি র জন্য আবেদন করতে থাকে। অবশেষে সেই দিন আসে। আদালতের রায় বেরোয়। তাতে রক্তিম কে ফাঁসির শাস্তি দেওয়া হয়। নিশা র সব লড়াই ব্যর্থ যায়। শেষ হয়ে যায় রক্তিমের জীবন - যা সে কোনোদিন দেখেই নি।


এভাবে প্রতিদিন অনেক শিশুকে ফেলে রাখা হয়, ভিক্ষা করানো হয় রাস্তায়। পেটের টানে সহজে টাকা কামানোর আশায় তারা নেমে পড়ে অপরাধের জগতে। আর আমাদের সমাজ তাদের সাহায্য করার বদলে তাদের কে ঠেলে ঢুকিয়স দেয় সেই কোঠরের মধ্যে। এই কেশ নিশার মনে রিরাট প্রভাব ফেলে। হেরে যাওয়ার মেয়ে সে ছিলো না। তাই সে নিজের টাকা দিয়ে অনাথ আশ্রম খোলে আর বাচ্চাদের মানুষ করে সেই সব শিশুদের যাদের টাকার অভাবে তাদের পরিবার দেখাশোনা করতে পারে না। যাতে আর একটা রক্তিমকে যাতে মরতে মরতে বাঁচতে না হয়। যাতে তারা মাথা তুলে বাঁচতে পারে। কারোর ভাই হয়ে উঠতে পারে, কারোর স্বামী হয়ে উঠতে পারে।

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.