শেষ থেকে শুরু


বৌদি,জানালাটা বন্ধ করে দেব?? না,থাক। বৃষ্টির ঝাঁট আসছে। আসুক না, একটু প্রকৃতি আসুক। তোমার দাদাবাবু বেড়িয়ে গেল না?? একটু থেমে রাধা বলল, হুম বৌদি। বৌদি তুমি কিছু খেয়ে নাও, ওষুধ খেতে হবে তো।খাচ্ছি পরে। তুমি টিফিন গুলো গুছিয়ে রাখো। আজ কি রাঁধবে? কাল দাদাবাবু গলদা চিংড়ী এনে রেখেছে। আজ মালাইকারি করব বৌদি? দীপ খুব ভালবাসে মালাইকারি খেতে। বহুদিন পর আজ এনেছে। ঝুম আনন্দ পেলেও ভেতরে ভেতরে একটা কষ্ট অনুভব করল। মনে পড়ল বছর দুয়েক আগের কথাগুলো। বরষা আসা মানেই বাড়িতে চিংড়ি আর ইলিশ এর ছড়াছড়ি। রাঁধতে রাঁধতে এক এক সময় বিরক্ত হয়ে যেত ঝুম। কিন্তু দীপ আদুরে গলায় আবদার করত,এই তো কটা দিন। ব্যস, অমনি নরম হয়ে যেত ঝুম। দীপের উপর আর বেশি রাগ করতে পারত না। ভাল দিনগুলো খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। মনে পড়ে ঝুমের, কি তাড়াতাড়ি সকাল সকাল উঠে টিফিন তৈরি, দীপকে ঘুম থেকে তোলা, নিজে তৈরি হওয়া,তারপর দীপের বাইকে করে রওনা। প্রথমে ঝুমকে অফিসে নামিয়ে দীপ নিজের অফিসে যেত। কোন কোন দিন দুপুরে একটু সময় পেলে, কোন রেস্তরাঁ তে একসাথে খাওয়া, আবার কখনো অফিস শেষে কিছু কেনাকাটা করে বাড়ি ফেরা। এভাবেই চলছিল। সেদিন ও ছিল এমন একটা দিন। ঝুম আর দীপ তাদের প্রিয় একটি জায়গা মিত্র ক্যাফেতে মিট করার কথা। রবীন্দ্র সদন মেট্রো থেকে শোভাবাজার এ পৌঁছেই রাস্তার উল্টো দিকে দীপকে দেখে হেসে রাস্তা পাড় হতে গিয়েই ঘটে গেল সেই ঘটনাটা।একটা বারো চাকার লড়ি চলে গেল ঝুমের ছোট্টখাট্টো শরীরটার পাশ দিয়ে।। মাত্র কয়েকটা ক্ষণ, তারপর দীপ দেখল, তার কাছের মানুষ টা রাস্তায় কাতরাচ্ছে। তারপর টানা দুমাস যমে মানুষে টানাটানির পর ঝুম বাড়ি ফিরল।কিন্তু একটা পা হারিয়ে। তারপর থেকে বিছানাটাই একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠল ঝুমের। বইপত্র, গান শোনা আর সারা দিন জানালাটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকা, কখন দীপ ফিরবে তার জন্য।প্রথম এক বছর দীপ খুব চেষ্টা করত যত তাড়াতাড়ি পারে বাড়ি ফেরার। তারপর দুকাপ চা নিয়ে দুজনের আড্ডা চলত। মাঝেমধ্যে আসত ঝুমের অফিসের কোন বান্ধবী রা,আর আসত অনির্বাণ। ঝুম আর দীপের প্রেম পরব শুরুর একদম প্রথম দিকের বন্ধু। প্রেসিডেন্সি থেকে ক্লাসের মাঝে বেড়িয়ে দীপ আর ঝুম কে কোন আলুকাবলি ওয়ালার কাছে পাওয়া যাবে,তা জানত একমাত্র অনির্বাণ। এমন কি ঝুমের কড়া মেজাজের বাবা দীপ কে নাকচ করার পরে অনির্বাণই রাজি করিয়েছিল তাঁকে। এক বছর সময় টা খুব ভাল কেটেছিল ঝুমের। সে যে আর আগের মত নেই,এই চিন্তা টাই তাকে করতে দেয়নি দীপ। আগলে রেখেছিল ঝুম কে। প্রভিডেন্ট ফাণ্ড এর টাকা গুলোও ধীরে ধীরে শেষ হল। ঝুমের অফিস থেকে যা পাওয়া গিয়েছিল, তা বন্ধুবান্ধব এর কাছ থেকে নেওয়া ধার শোধ করতেই শেষ হল। দীপের জমানো পুঁজি বলতে এখন আর কিছুই প্রায় নেই। কয়েক মাস আগে থেকে ঝুম লক্ষ্য করছে, দীপ আর আগের মত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরেনা। আর ফিরেও বাইরের ঘরে সোফায় শুয়ে থাকে। প্রথম কয়েকদিন সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি ঝুম। কাজের চাপে এমন ভেবেছিল। তারপর একদিন জিজ্ঞাসা করতেই দীপ এড়িয়ে গেল। এরপর দীপের সাথে খুব কম দেখা, আর কথা হত ঝুমের। শুধু জানালা টার দিকে তাকিয়ে দীপের অফিস যাওয়া টা দেখত। আগে দীপ বাইকে স্টার্ট দিয়ে জানালাটার দিকে তাকিয়ে ঝুম কে হাত নেড়ে যেত। অনেকদিন হল সেটাও বন্ধ। চূড়ান্ত অভিমানী ঝুম মরে গেলেও নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলবেনা। আর যেখানে তার সবচেয়ে আপনজন দীপ তার মনের কথা বোঝেনি, তাহলে আর কাকে কি বলবে ও?
আজ ১৫ই জুলাই। অন্য যে কোন দিনের চেয়ে আজকের দিনটা অন্য।আজ ঝুমের জন্মদিন। আজ রাধাকে একটু তাড়াতাড়ি আসতে বলেছিল ঝুম। দীপ বেরনোর আগেই স্নান করে দীপের দেওয়া ওর প্রিয় রঙ গাঢ় লাল সিল্ক টা পড়ে সাজল ঝুম। অনেকদিন পর আজ নিজেকেই ভাল লাগল ঝুমের। দীপের টিফিন খাওয়া অব্ধি রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করল ঝুম। ওর স্থির বিশ্বাস, আজ দীপ ওর সাথে দেখা না করে কিছুতেই যাবে না। কিছুক্ষণ পরেই দরজা বন্ধের আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠল ঝুম। চলে গেল দীপ??গত আট বছরে যা হয়নি,তাই হল আজ। জানালা দিয়ে দীপের চলে যাওয়া টা দেখল ঝুম। রাধাকে দরজা বন্ধ করতে বলে নিজেকে একটা বই এ ডোবানোর চেষ্টা করল ঝুম। কিন্তু একটা অক্ষর ও পড়তে পারল না।দুচোখ বড্ড ঝাপসা। অফিসে আজ হঠাৎ অনির্বাণ কে দেখে খুব আনন্দ হল দীপের।নানান কথার পর জিজ্ঞাসা করল অনির্বাণ, আজ কি প্ল্যান? অবাক হয়ে তাকাল দীপ। কিসের প্ল্যান? এবার অবাক হওয়ার পালা অনির্বাণ এর। মানে,আজ ১৫ই জুলাই, ঝুমের জন্মদিন। তুই ভুলে গেছিস? কি করে? স্তব্ধ হয়ে যায় দীপ। শেষ কমাসে এতটা দূরে চলে এসেছে ও ঝুমের থেকে? গত আট বছরে যা হয়নি,আজ ও তাই করেছে। নিজের প্রতি লজ্জায় অনির্বাণ এর দিকে তাকাতে পারল না দীপ। দীপের মনের কথা বুঝতে পারল হয়ত অনির্বাণ। তাই জোর দিয়ে বলল, দাম্পত্যে কখনো কখনো একটু ঢিলেমি ভাল রে, তাতে ভালবাসা বাড়ে।
অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে ঝুমের প্রিয় কেক আর ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরল দীপ। অন্ধকার ঘর,রাধা ফিরে গেছে। আস্তে আস্তে বাড়ির সব আলো গুলো জ্বেলে ঘরে ঢুকল দীপ। সকালের শাড়ী পরেই সারাটাদিন বসে আছে ঝুম। খাবার, ওষুধ সব পড়ে আছে। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল দীপের। আলো টা জ্বালতেই চমকে তাকাল ঝুম। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা দীপকে দেখে একটু অবাক হল ঝুম। তারপর দীপ ফুলের গুচ্ছ টা হাতে দিয়ে বলল, ঝুমঝুমি, চল না, নতুন করে শুরু করি আরেকবার। পারব না আমরা?? চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এল ঝুমের। কোন কথা বলতে পারল না কিছুক্ষণ। অনেক্ষণ পরে ঝুম বলল, জন্মদিনে শুধুই ফুল, ডিনারে কি খাওয়াবি?? অনেক অনেক দিন পর দুজনে হেসে উঠল।

bengali@pratilipi.com
+91 9374724060
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.