কথার শরীর


মধ্যরাতের শহর তখন ঘুমে আচ্ছন্ন। বিজয়ের কাজ যদিও কিছুটা বাকি।

টেবিলের ওপর আবর্জনার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাগজপত্রের মধ্যে থেকে মোবাইল ফোনটাকে উদ্ধার করে ক্লান্ত চোখদুটোর সামনে মেলে ধরে বিজয়। কৃতিকার ফোন বা মেসেজ আসা অনেক কমে গেছে আগের থেকে। আর আজ তো একটাও নেই। একদিক থেকে ভালো। ঘন্টায় ঘন্টায় হাল - হকিকতের ফিরিস্তি দিতে বিরক্তই লাগতো বিজয়ের। কিগো অফিসে ঢুকেছো ? দুপুরে বেশি দেরি করে লাঞ্চ কোরও না ! আজ কি কাজের খুব প্রেশার ? কখন ফিরছো ? মাঝে মধ্যে আবার তাতানের হাতে ধরিয়ে দিতো ফোনটা। বিজয় তখন কাজ করবে না ছেলের সাথে হ্যারি পটার আর কার্টুন নিয়ে গল্প করবে ! তবে সে সব দিন গেছে। তাতান এখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। বিজয়ের মাঝে মধ্যে মনে হয় তাতান যত বড় হয়েছে কৃতিকার ফোন আর মেসেজের পরিমাণ ততই যেন হ্রাস পেয়েছে।

জলতরঙ্গের শব্দ করে কম্পিউটারে ইমেল ঢুকল একটা। বিদেশী ফ্রেমের চশমাটা নাকের ওপর চাপিয়ে তাতে মনোনিবেশ করল বিজয়।

আজ সন্ধ্যায় মিটিং ছিল শহরের এক নামজাদা রিয়েল - এস্টেট সংস্থার সাথে। কয়েক কোটি টাকা দিয়ে একটা নতুন প্রজেক্ট শুরু করতে চলেছে তারা। লোনের দরকারে গত ক’মাসে কোনও ব্যাঙ্কের দরজায় কড়া নাড়তে বাকি রাখেনি। তবে কেউই তাদের লোন দিতে রাজি হয়নি এবং সেটাই স্বাভাবিক। কারণ যে জমির ওপর আকাশচুম্বী ইমারতগুলো তৈরী হতে চলেছে সেই জমির মালিকানা নিয়ে এখনও জটিলতা থেকে গেছে। কোর্ট – কাছারি করে সমস্যার সমাধান মেলেনি। আর অদূর ভবিষ্যতে মেলার সম্ভাবনাও কম ।

শুরু থেকেই সেই সংস্থার কার্যকলাপের ওপর নজর রাখে বিজয়। হাতে ক্ষমতা আর ভারী পকেট থাকলে ফেউয়ের অভাব হয় না। তাও আবার যে সে ফেউ নয় , পেশাদার ফেউ। নতুন প্রজেক্টের প্ল্যান যখন প্রায় বাতিল হওয়ার জোগাড় তখন ব্যাঙ্কের প্রতিনিধি হিসেবে বিজয় যোগাযোগ করে সংস্থাটির কর্ণধার, মিস্টার ডি.কে.ভার্মার সঙ্গে। একটা লোকদেখানো মিটিং-এর সময় নির্ধারণ করা হয় আজ সন্ধ্যে সাতটায়। আর সেই মিটিং ভাঙার আধঘন্টা পর ঠিক রাত দশটায় বিজয় তার আসল প্রস্তাব ইমেল মারফত পাঠিয়ে দেয় ভার্মার কাছে।

বিজয়ের প্রস্তাব সামান্য না হলেও সরল তো বটেই। তার দশটি নারী শরীর চাই, একদিন অন্তর, অর্থাৎ মোট কুড়ি দিনের ব্যবধানে। শরীরগুলোকে হতে হবে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। একটা শরীরের স্বাদ অন্য শরীরের সাথে এক হওয়া চলবে না। সঙ্গে নতুন নতুন উপায়ে আনন্দ দেওয়ার দক্ষতাও থাকা চাই। বদলে বিজয় তার চেয়ারের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে লোন পাইয়ে দেবে ভার্মাকে। প্রয়োজনে জমি সংক্রান্ত জাল তথ্যাদিও তৈরী হয়ে যাবে। সেই প্রস্তাবেরই উত্তর এল এইমাত্র। ভার্মা সম্মতি জানিয়েছে প্রস্তাবে। বিজয়কে আনন্দ দিতে কবে, কখন, কোথায় শরীরগুলো পৌঁছে যাবে তা ক’দিনের ভিতর ভার্মা নিজেই জানিয়ে দেবে বিজয়কে।

চোখের ওপর থেকে চশমা সরিয়ে বিজয় ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত সোয়া বারোটা। এগ্রিমেন্ট-এর কাগজগুলো ড্রয়ের থেকে বের করে একেবারে শেষ পাতায় নিজের নামটা যেখানে ছাপার অক্ষরে লেখা তার ঠিক মাথায় ধীরে সুস্থে স্বাক্ষর করে আবার রেখে দেয় যথাস্থানে। ক’দিনের ভিতর এই সইয়ের ওপর ভিত্তি করে বিজয়ের ব্যাঙ্ক ভার্মাকে কয়েক কোটি টাকা লোন হিসেবে প্রদান করবে। যদিও সে টাকা ব্যাঙ্কে সুদ সমেত ফেরত না এলে তার এই লোন দেওয়ার সম্মতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, খতিয়ে দেখা হবে কাগজপত্র, বিজয়ের চাকরি নিয়েও টানাটানি হতে পারে। কিন্তু এদেশে আঠেরো মাসে বছর। কেঁচো খোঁড়াখুঁড়ি করে, তিলকে তাল বানিয়ে, রাধাকে নাচিয়ে, সাত মণ তেল পুড়িয়ে কবে কী প্রমাণ হবে সেই আশঙ্কায় বিগত দু'দশকের উদয়াস্ত পরিশ্রমের ফলস্বরূপ পাওয়া ক্ষমতার প্রয়োগ করবে না – এমন মূর্খ কিংবা ভীতু বিজয় নয়। তবে ক্ষমতার মালিকানা ও তার প্রয়োগ চাট্টিখানি কথাও নয়। জেনারেল ম্যানেজার পদের রাশভারী দায়িত্বগুলোকে বয়ে চলার ধকল গভীর ক্লান্তি ঢেলে দেয় বিজয়ের অস্তিত্বে। মাঝে সাঝে অস্তিত্বের সংকটও অনুভব করে বিজয়। নিজেকে বোকার মতো প্রশ্ন করে ফেলে – ক্লান্তির নিষ্পেষণ কি মানুষকে পঙ্গু করে দিতে পারে ?

এই মুহূর্তে অবশ্য এসব নিয়ে বেশি ভাবতে যায় না সে। রাত অনেকটাই হল। ইন্টারকমের মাধ্যমে রিয়াকে ডেকে পাঠায় নিজের কেবিনে। মারণক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়গুলো যে কি করে সব অকেজো হল!

বছর পঁচিশের রিয়া কেবিনে প্রবেশ করে কয়েক সেকেন্ডের ভিতর। রিয়ার পরণের সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট তার শরীরের নিখুঁত ভাঁজগুলোকে যেন আরও প্রকট করে তুলেছে। রিয়ার শরীরটাকে দু’চোখ দিয়ে খানিক অনুসরণ করে বিজয় বলে, “সরি রিয়া, আজ একটু বেশীক্ষণই আটকে রাখলাম! বাট ডোন্ট ওরি, আমি তোমাকে বাড়িতে ড্রপ করেই ফিরবো।”

"নট এ প্রব্লেম বস! টেল মি হাউ আই ক্যান হেল্প?” স্মিতহাস্যে জবাব দেয় রিয়া।

বিজয়ের মুখেও হাসি লেগে থাকে। সে হাসি না বাঁকা না সহজ।

“আজ সারাদিন খুব স্ট্রেস গেলো। বাট ইউ উইল বি গ্ল্যাড টু নো যে ভার্মার সাথে ডিলটা ফাইনাল হয়েছে। আমাদের টার্মস এন্ড কন্ডিশনে ওরা রাজি। এই লোনটা প্রচুর রেভিনিউ দেবে আমাদের।”

“এ তো দারুন খবর স্যার! কংগ্রাচুলেশন টু দা ম্যান অফ দা আওয়ার!”

শরীরের বিনিময় এমন একাধিক ডিল গত কয়েক বছরে ফাইনাল করেছে বিজয়। রিয়া বা অফিসের অন্যান্যরা এ বিষয় অবগত নয়। তবে যে কারণেই হোক কৃতিকার ব্যাপারে এতটা নিশ্চিত হতে পারে না সে। নারী শরীরের প্রতি তার এই দুর্বলতার বিষয়ে কি কিছু আঁচ করতে পারে কৃতিকা ? আজকাল কৃতিকাকে চিনতে অসুবিধাই হয় তার। কৃতিকার সাথে কথাই বা হয় কতটুকু!

আপাতত কৃতিকাকে ভুলে হাতের লক্ষ্মীতে মন দেয় বিজয়। রিয়ার উদ্দেশ্যে বলে, “এতকিছুর মধ্যে ভেবো না আমি তোমার প্রমোশনের ব্যাপারটা ভুলে গেছি। ওটা আমার মাথায় আছে। যদি সবকিছু ঠিকঠাক চলে দেন ইউ ক্যান এক্সপেক্ট ইওর প্রমোশন উইদিন নেক্সট সিক্স মান্থস, ইফ নট দ্যাট, সার্টেনলি এ হ্যান্ডসম রেইজ।” সামান্য সময় নিয়ে বাছাই করা কিছু শব্দ পুনরায় উচ্চারণ করে, “যদি সবকিছু ঠিকঠাক চলে !”

আসলে পন্থাগুলো প্রাগৈতিহাসিক , কিন্তু আজও সমানভাবে কার্যকরী।

“ওসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে স্যার। আপনি একটু রিলাক্স করুন। লেট মি হেল্প ইউ ডু দ্যাট!”

কেবিনের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে বিজয়ের দিকে ভেসে আসে একটা ছায়ার শরীর, চোখদুটো দেখা যায় না যার।

সাদা আর কালো মিশে তৈরী হয় ধূসরবর্ণ। সেই ধূসরতার ভিতর অনিয়ন্ত্রিত বিচরণে ধরা পড়ে যায় বিজয়ের মন। বিজয় ভাবে, সবকিছু বদলে গেছে এই শহরটার। ল্যান্ডলাইন থেকে টাচস্ক্রিন হয়েছে, কানাগলি থেকে ফ্লাইওভার, বসন্ত কেবিন থেকে মেনল্যান্ড-চাইনা। বদলায়নি শুধু পিছিয়ে পড়ার ভয়, স্বপ্ন ছোঁয়ার লোভ,ওপরে ওঠার মোহ।

আর এই সবকিছু নিয়ে পুতুল-পুতুল খেলে বিজয়।

*

রিয়াকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে অফিসের গাড়ি বিজয়কে নিয়ে ছুটে চলেছে তার বাসার উদ্দেশ্যে।

একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। ভ্যাপসা গরমটা আজ রাতটুকুর জন্য রেহাই দিয়েছে। বহুদিন পর গাড়ির এসি বন্ধ করে জানলার কাঁচ নামিয়ে দেয় বিজয়। হাওয়ার দমক চোখ-মুখ স্পর্শ করতেই আনমনা হয়ে পড়ে সে। শহুরে সম্পর্কগুলোর মতোই ভাঙাচোরা শহরটা আজ ভিজে স্নান। সেদিকে চেয়ে অকারণে মনে করার চেষ্টা করে শেষ কবে কৃতিকাকে স্পর্শ করেছে সে। কিন্তু মনে পড়ে না সে কথা। চেষ্টা করে আবার। ব্যর্থ হয় ফের। বিরক্তি ধরে যায় নিজের ওপর। আসলে ব্যর্থতা এক্কেবারে বরদাস্ত করতে পারে না বিজয়।

আজকের দিনটাই কেমন গোলমেলে। সকাল থেকেই বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে সে। মিটিংয়ের মাঝেও এমনটা হয়েছে। এমনকি রিয়া যখন কেবিনে এল তখনও। অত্যধিক কাজের চাপটাই কালপ্রিট নির্ঘাত! কৃতিকা আর তাতানকে নিয়ে ক’দিন বিদেশে ছুটি কাটিয়ে আসবে কিনা তাই ভাবতে ভাবতে কখন যে সে তার প্রাসাদোপম তিনতলা বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে খেয়ালই করেনি বিজয়।

থেমে থাকা গাড়ির সাথে বিজয় নিজেও স্থির হয়ে থাকে। যে মানুষটা আজকাল আর তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে না, তার কথা ভাবে মুহূর্তের জন্য। কৃতিকা কি তার সব গোপন কথা জানে, নাকি জানে না সে কিছুই?

একবুক ধোঁয়াশা বুকে নিয়ে নেমে পড়ে বিজয়। মাঝরাতের অন্ধকারে দ্রুত মিলিয়ে যায় কালো রঙের দানবীয় এক গাড়ি।

বেল বাজিয়ে বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। দরজা খুলে দেয় কৃতিকা ।

“তুমি এখনও জেগে ?” কৃতিকাকে এত রাতে দরজা খুলতে দেখে অবাক হয় বিজয়। এখন মা-ছেলের ঘুমিয়ে থাকার কথা। অন্যদিন দরজা খোলে স্বদেশ। বুঝতে পারে স্বদেশকে আবার ছুটি দিয়েছে কৃতিকা। গ্রামের বাড়ি যাওয়ার নাম করে অন্ততপক্ষে পনেরো-বিশ দিন না কাটিয়ে ফেরে না স্বদেশ। কেয়ারটেকার হিসেবে তাকে বিন্দুমাত্র পছন্দ নয় বিজয়ের। তবু স্বদেশ আছে। কৃতিকার দয়াতেই আছে।

বিজয়ের প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যেতে থাকে কৃতিকা। কৃতিকার পরণে সদ্য কেনা নীল রঙের বালুচরীটা চোখে পড়তে বিজয়ের খেয়াল হয় যে আজ রাতে কৃতিকার কোথাও নেমন্তন্ন ছিল, কৃতিকাই গতরাতে বলছিল সে কথা। কারও বার্থডে সেলিব্রেশন, না কোনও কোটিপতির আর্ট -গ্যালারি উদ্বোধন, নাকি উইমেন্স ক্লাবের পার্টি – কিছুতেই মনে করতে পারে না। হাল ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করে - “কোথায় গেছিলে?”

কৃতিকা এবারও নিরুত্তর। কিছুটা আদুরে ঢঙে শেষ চেষ্টা করে বিজয়, “কি গো , তুমি তো কথাই বলছো না আমার সাথে !”

দুটো তলার মধ্যিখানে সিঁড়ির চাতালে দাঁড়িয়ে পড়ে বিজয়ের দিকে ঘুরে তাকায় কৃতিকা। প্রশান্ত স্বরে জবাব দেয়, “কথার তো শরীর নেই বিজয়! আর যার শরীর নেই তার কোনও মূল্য কি আছে তোমার কাছে?”

সিঁড়িতে বিরাজমান অন্ধকার কৃতিকাকে ছায়া করে দিতে পারেনি। ক্রমবর্ধমান বয়েস তার সৌন্দর্য্যকেও কেড়ে নিতে পারেনি। বরং দরজার বাইরের আপাত নিষ্পাপ শহরটার শিরায় শিরায় বয়ে চলা পিছিয়ে পড়ার ভয়, স্বপ্ন ছোঁয়ার লোভ, উপরে ওঠার মোহ বিজয়কে কেড়ে নিয়েছে কৃতিকার থেকে। বিজয় জানে সে কথা। কৃতিকাও সব জানে।

কৃতিকার চোখের দিকে চেয়ে বিজয় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। আর অবাধ্য টেলোমিয়ার-এর হাত ধরে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় নির্বাক সময়।

(সমাপ্ত)





bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.