শখ


আজও হলো না।
আজকাল ইন্টারভ্যু-এর পর মল্লিকা নিজেই বুঝতে পারে, যে সে সিলেক্টেড হয়নি। আগে আগে তবু একটা ক্ষীণ আশা থাকত যদি একটা চিঠি বা ফোন আসে... দু-বার তো এত নিশ্চিত ছিল যে নিজেই ফোন করে জানতে চেয়েছিল তাকে কবে ডাকা হবে। জবাবে ভদ্র প্রত্যাখ্যানের মধ্যেই যে বিদ্রূপটা লুকিয়ে ছিল...
বিদ্রূপ! সেও সয়ে গেছে আজকাল। এই সেক্টর ফাইভ চত্ত্বরেই এতবার আসতে হয়েছে তাকে, যে চিংড়িহাটার এক অটোওয়ালা একদিন দুপুরে তাকে ডেকে বলেই ফেলল, “কী দিদি, আজ তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লেন অফিস থেকে?” সত্যি, প্রায় প্রতিদিন একজনকে অফিস টাইমে একই রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখলে চাকুরিরতা মনে হওয়াই স্বাভাবিক!
বায়োডাটা আর সার্টিফিকেটগুলোর ফাইলটা জাপটে ধরে, মুখ নীচু করে হাঁটছিল মল্লিকা। কলেজ মোড়ে দাঁড়ালে বাসটা ফাঁকা পাবে। সকালে এক কাপ চা ছাড়া কিছু খাওয়া হয়নি। এখন আর দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু সেই দাঁড়াতেই হলো। কে যেন ডাকলো, “মল্লিকা না?”
গৌতম! শুধু ওদের ব্যাচের বা ডিপার্টমেন্টেরই নয়, হয়তো গোটা ইউনিভার্সিটির মধ্যেই এমন ভালোমানুষ আর ছিল না। সক্কলে ওর পিছনে লাগতো, পরে জুনিয়াররাও। মুখচোরা ছিল তাই মেয়েরাও বেজায় মুরগী করতো ওকে। আর মল্লিকা নিজেও...
মল্লিকাকে ও একবার প্রপোজ করেছিল। হ্যাঁ, গোটা ব্যাচের মধ্যে শুধু মল্লিকাকেই। তাও বুক চিতিয়ে প্রেমের স্বীকার করা নয়, মিনমিন করে একদিন বলেছিল, “দ্যাখ, আসলে তোকে, আমার, মানে আমার, তোকে...”
মল্লিকা খুব মজা পেয়েছিল। ওর প্রতি গৌতমের দুর্বলতা স্পষ্ট বোঝাই যেত, তবু না বোঝার ভান করে বলেছিল, “হ্যাঁ রে, কী রে, তোকে আমার, আমার তোকে?”
-“খুব ভাল লাগে!” সবটুকু সাহস সঞ্চয় করে বলে উঠেছিল লাজুক ছেলেটা।
মল্লিকার খিলখিল হাসি প্রতিধ্বনিত হয়েছিল গোটা করিডোরে। ক্লাশরুম থেকে অন্যরা জানতে চেয়েছিল, “কী হয়েছে রে মলি?”
মল্লিকা হাসির দমক সামলাতে সামলেতেই বলেছিল, “কিচ্ছু না রে, ভাইফোঁটা নেওয়ার আমন্ত্রণ পেলাম একটা!” মুখ নীচু করে গৌতম চলে গেছিল সেদিন।
এতদিন তার মনেই ছিলনা গৌতমের কথা। তখন মল্লিকার ছিল রূপের দেমাক, বিদ্যার অহংকার। আজ পাঁচ বছর পর অনেক ঝড় বয়ে গেছে, বাস্তবের মাটিতে আছাড় খেয়ে মল্লিকার জগতটাই টালমাটাল হয়ে গেছে। তবু আজ গৌতমের সাথে দেখা হতেই সে যেন যেই কলেজের মল্লিকা হয়ে গেল ফের।
-“আরে, গৌতম! তুই এখানে!”
-“আমি তো ওয়েবেল-এ আছি! লাঞ্চ আওয়ার চলছে তাই। তুইও সেক্টর ফাইভে আছিস নাকি!”
সেই লাজুক ছেলেটা আজ এত সপ্রতিভ, তবু কত সরল, ভালমানুষ! মল্লিকার খারাপ লাগলো। “না রে, একটা ইন্টারভ্যু দিতে এসেছিলাম। হলোনা।”
-“ইন্টারভ্যু! সেকি রে, তুই তো আমাদের ক্লাশে টপার ছিলি! আচ্ছা চল, আমার সঙ্গে লাঞ্চ করবি। আড্ডা হবে।”
আড্ডা! তার মানে মল্লিকাকে আবার তার সমস্ত কথা উজাড় করে বলতে হবে এই সরল ছেলেটাকে! সমস্ত অপমান, ব্যর্থতা... মিথ্যা অহংকার... নাঃ, পারবে না সে কিছুতেই।
-“এই না রে, একটু তাড়া আছে। ও ওয়েট করছে বার্বিকিউ নেশন-এ। আগে গিয়ে জায়গা না রাখলে আবার অপেক্ষা করতে হয়... তোর নাম্বারটা দে, ফোন করব। কিছু মাইণ্ড করিস না, কেমন?”
গৌতমের মুখটা একটু ম্লান হয়ে যায়। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “তোর হাব্বি? বেশ রোমান্টিক মানুষ তো! কোন কোম্পানিতে আছেন উনি? সেক্টর ফাইভেই?”
-“ধুসস, ও করবে চাকরি! একটা বিরাট ব্যবসা চালায় রে! রমরমা অবস্থা। তবে আমি তো ওকে ড্রাইভারের মতোই ট্রিট করি।”
-“সে ত ভাল কথা! কিন্তু... তাহলে তুই চাকরি খুঁজছিস কেন!”
মল্লিকা গৌতমের চোখে চোখ রেখে বলল, “কিচ্ছু না রে, শখ।”
-“শখ!”
=-“হ্যাঁ রে, শখ। ছোটবেলা থেকেই আমার শখ বেশ সকলকে দাপিয়ে বেড়াবো! কারো কাছে মাথা নীচু করব না! এখনো সেটাই চলছে রে! হিহিহিহি! কই, কার্ড দিলি তোর?”

আর কিছু না বলে গৌতম পকেট থেকে ভিজিটিং কার্ড বার করে দিল। মল্লিকা সেটা ব্যাগে রেখেই, “আসছি রে! কথা হবে!” বলে প্রায় দৌড় লাগাল।

ভাগ্যিস বার্বিকিউ নেশন-এর নামটা তার মনে পড়েছিল সময়মতো!!
---------------------------------------------

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.