অর্জুন কথা


অনামিকা আর মধ্যমার সংযোগস্থলে বিড়িটা ধরে হাত মুঠো করে একটা সুখটান দিয়ে আয়েষ করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলতে থাকে অর্জুন ডেকা। ওই যে উঁচু মাঠটায় বাচ্চাটা খেলচে দেকতে পাচ্চেন? আমি ওর চোখ অনুসরণ করে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে বল্লাম। হ্যাঁ পাচ্ছি তো। ওরই বাবার কোন সম্পর্কের এক মামা ছিল লখাই। আমরা বলতাম লখাই মামা। তো সেই লখাই মামাকে নিয়েই আজ আপনাকে শোনাব এক কাহিনী। বলেই ডেকা তার কুতকুতে চোখ আরো সরু করে আমার দিকে চেয়ে রহস্যজনকভাবে হাসতে লাগল।

কাজের তাগিদে এখানে এসেছি আজ দু সপ্তাহ হল। এমাসে মেস চালাবার দায়িত্ব আমার। আমাদের প্ল্যান্টের অদূরেই স্টেশন। স্টেশনের কাছাকাছিই বাজার বসে। অটোয় বা সাইকেলে আসা যায় বটে তবু আমরা লাইনের পিছন দিয়ে সর্টকার্ট মারি। এখানে বেশ খানিকটা রাস্তা সোজা এসে একেবারে খাদে নেমে গেছে আবার অন্যদিকে ঢালু হয়ে উঠেছে। সেখান দিয়েই নেমে আবার উঠে ফিরে আসি। বর্ষাকালে এই নীচু জমিতে এক মানুষ সমান জল থাকে। শীতকালে আসামে একটু তাড়াতাড়িই সন্ধ্যে নামে। অন্যান্য দিন সঙ্গে মেসের ছেলেটি থাকে, আজ কাকার বাড়ি কীর্তন শুনতে গেছে বলে আসেনি। আজ আর বিশেষ কিছু কিনিনি শুধু একটু মুরগীর মাংস ছাড়া। ঢালু জমি দিয়ে নামবার সময়ই অর্জুনের সাথে দেখা। খাটো ধুতি আর সাদা ফতুয়া পরে কাঁঠাল গাছ ঠেসান দিয়ে বসে পাশের দোকান থেকে ভাঁড়ে চা খাচ্ছিল। কোমরে বাঁশিটা গোঁজা। এই বাঁশি শুনিয়েই লোকটি আমায় কাবু করেছে। চমৎকার সুর জ্ঞান লোকটির।। ফর্সা, বেঁটেখাটো চেহারার চীনাম্যানদের মত দেখতে। বয়স বোঝার উপায় নেই। একদিন কথায় কথায় বলেছিল ষাট চলছে। অনবরত বিড়ি খায়। তবু কি করে যে এত দম পায় কে জানে ! রোজ রাতে বিহুর সুর খান খান করে দেয় নিস্তব্ধতা। পাশের টিলায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকে বাঁশির মোহ জাল। রোজ অফিস যাতয়াতের পথে দুবেলা দেখা হয়, প্ল্যান্টের পাশের মাঠে ভেড়া চড়ায়। কোমরের চারদিকে পাঁচ ছটা বাঁশি।, হরেক রঙ আর সাইজের। দেশ বিদেশের বাঁশি সংগ্রহে রাখাই তার নেশা বা শখও বলা যায়। বল্লে দাঁত বের করে হাসে,বলে "এ আর এমন কি শখ? এ শখে নতুনত্ব কোথায় ? যদি জানতেন, যাক সে কথা"। পান খেয়ে খেয়ে দাঁতের রং যে কোনও কালে সাদা ছিল তা মালুম হবার উপায় নেই।

এখানে বাজার করতে এলে একবার যদি দেখা হয়ে যায়, আর রক্ষে নেই। দেশ, গ্রাম,পাড়া এমনকি ঘরেরও হরেক কাহিনী শোনাবেই। দেরী হয়ে যাবে বল্লেও ছাড় নেই। এমনই জেদি বুড়ো। তো যাক, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়। সেই যে দেখা হল, চায়ের দোকানের পাশ থেকে এখানে এই মাঠের পাশে ধরে এনেছে লখাই মামার কাহিনী শোনাতে। ক্রমে অন্ধকার নামছে ডিসেম্বর মাস, এখনো আকাশে চাঁদের দেখা নেই, কৃষ্ণপক্ষ চলছে।

বলতে থাকে অর্জুন।
আমাদের বাড়ির অনতিদূরে ছিল লখাই মামার আদি বাড়ি। লেখাপড়া তেমন না করলেও যেকোন ব্যাপারে তার জ্ঞান ছিল প্রগাঢ়। পনের ষোল বছর থেকে বাইরে বাইরে ঘুরত। বেশিরভাগ সময় কামাক্ষ্যায় কাটাতো। একবার হল কি, সেখান থেকে পাড়ি জমালো সোজা তারাপীঠ। ভৈরবীও জোগাড় করেছিল একজন। হঠাৎ একদিন সেই ভৈরবীকে নিয়ে সোজা বাড়ি চলে এল। বাবা তো ঢুকতেই দেবে না। বল্লেন,"আমি বেঁচে থাকতে এ বাড়ির ত্রিসীমানায় যেন না দেখি "। তা, কথা রেখেছিল লখাই। এক কথায় সেই ভৈরবীকে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল তার পুরোন ডেরায়। দেখতে ছিল বটে ভৈরবীকে, রূপ তো নয় যেন আগুন। এক পলক দেখেছিলাম সেইসময়। এক বছরের মধ্যে লখাইএর বাবা মারা যায়। তবে আশ্চর্য! মারা যাবার পাঁচ দশ মিনিটের মধ্যে লখাই এসে হাজির। মা আগেই মারা গেছিল।
মাঝপথে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করি, আর সেই ভৈরবী ?

কথা কানে না নিয়ে গল্প এগিয়ে নিয়ে চলে অর্জুন। "এদিকে লখাই তার বাপের শ্রাদ্ধ শান্তি মিটিয়ে ফিরে যায়। আবার মাস তিনেক বাদে ফিরেও আসে। আমি তখন এই বছর পনের ষোল হব। এখনো সেই দিনটা মনে আছে। মাঠের ধারে বসে আনমনে বাঁশি বাজাচ্ছি, একটা বড় চারচাকা গাড়িতে লখাই মামা তো এলেন। সেই রক্ত বস্ত্র কপালে লাল টকটকে সিন্দুর। কাঁধে একটা লাল ঝোলা ব্যাগ। মুখময় দাড়িগোঁফ,দূর থেক আমার দিকে খানিক দেখলেন । গাড়ির ডিগিতে দেখি একগাদা মাঝারি সাইজের সন্দেশের বাক্সের মত কাঠের বাক্স। গাড়ি থেকে গুনে গুনে নামাচ্ছে। তা মোটামুটি বিশ ত্রিশেক তো হবেই। আর সব কটায় তালা মারা। এতক্ষণে খেয়াল করলাম। আর সবচেয়ে অদ্ভুত কি জানেন, প্রত্যেক বাক্সের গায় লাল কালিতে কি সব লেখা রয়েছে। তার কোনটায় সত্য, কোনটায় শুভ্র, কোনটায় বা সুন্দর। হবে হয়তো কোন মন্তর টন্তরের বই। আবার সঙ্গে একটা কোৎকা মত কাজের লোকও নিয়ে এসেছে। সেইই ওগুলো নিয়ে বাড়ির ভেতর যাচ্ছিল। সব শেষে ড্রাইভারকে ভাড়া চুকিয়ে দুজনায় বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।কিন্তু ভারী আশ্চর্য বাক্সগুলি ছাড়া আর কোন ব্যাগ দেখলাম না। না জামাকাপড় না খাবার জিনিসপত্র। ও হ্যাঁ, বাড়ি ঢোকার আগে লাল জোব্বার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একমুঠো চকলেট আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাগুলোকে হাসি মুখে দিয়ে গেল। জঙ্গলের শেষ প্রান্তে সেই নিরালা জায়গায় তখন মাত্র দুটো বাড়ি, ওদের আর আমাদের। ওদের বাড়িটা জঙ্গলের দিকে আর আমাদেরটা টিলার দিকে। সন্ধ্যা হতে না হতেই এতদিনের ঘুটঘুটে তিনতলা বাড়িটায় আলো জ্বলে উঠল। বেশ খুশি লাগছিল, অনেকদিন বাদে আমাদের প্রতিবেশী এসেছে বলে। অনেক রাত অবধি জেগে বাঁশি প্র‍্যাকটিশ করতাম। তখন জানেন এটাই আমার ধ্যানজ্ঞান ছিল। আমার দোতলার ঘরটার জানলাটা ছিল ওদের বাড়ির দিকে। রাত বারোটাতেও জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, ঠিক আমার উল্টোদিকের ঘরটায় আলো জ্বলছে। জানলা খোলাই ছিল, দূরে কোনার দিকে খাটে লখাই মামার রক্তবস্ত্র দেখা যাচ্ছিল। আর একটা ঘরে সেই কোৎকা লোকটার ভুঁড়ি ওঠানামা করছিল। হঠাৎ চমকে উঠলাম! একি, এ কাকে দেখছি আমি? দেখলাম এক মহিলা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে লখাই মামার খাট লক্ষ্য করে। আশ্চর্য লাগল, সকালে যখন এরা আসে কোন মহিলাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখিনি। একরাশ চুল সারা পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। হঠাৎ কি মনে করে জানলা দিয়ে আমাদের জানলার দিকে এক পলক দেখল। মুহূর্তের মধ্যে ওই বয়সে শরীরের মধ্যে শিহরণ খেলে গেল। দেখলাম, সেই ভৈরবী, উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত, আলুলায়িত কেশরাশির অংশ দুই কাঁধের উপর দিয়ে বক্ষযুগলের পাশ দিয়ে সামনে নেমে এসেছে। সমগ্র শরীরে তরঙ্গ তুলে হাসতে হাসতে এগিয়ে এসে জানলা বন্ধ করে দিল। আচ্ছা এমন দৃশ্য দেখে কারো ওই বয়সে আর রাতে ঘুম আসে? বলুন। বলতে থাকে অর্জুন। জিজ্ঞাসা করি, তারপর? পরের সারাদিন ধরে শুধু ভাবতে লাগলাম কখন রাত আসবে। স্কুলে গিয়ে পড়াশুনায় মন নেই, প্রিয় বাঁশি বাজানোয় মন নেই, চোখ বুজলেই ভৈরবীর সেই অনাবৃত শরীর।

অবশেষে রাত বারোটা, সেই কাঙ্খিত মুহর্ত উপস্থিত। জানলার ধারে খাটের ওপর খড়খড়ি তুলে অধীর আগ্রহে বসে রইলাম। শরীরে টানটান উত্তেজনা। প্রতিটা সেকেন্ড, প্রতিটা মিনিট যেন এক একটা দিন। প্রতিক্ষার অবসান। আবার দেখা মিলল তার, ঠিক একইভাবে উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। এগিয়ে এসে হাসতে হাসতে জানলা বন্ধ করা, এবার একটু সময় নিল। এইভাবেই কেটে গেল পাঁচ পাঁচটা রাত । কেমন একটা নেশা হয়ে গেছিল জানেন! এরপর এল সেই দিন। সারারাত জেগে থেকেও দেখতে পেলাম না সেই ভৈরবীকে। দুরাত গেল, তিন রাত গেল, আমার পড়াশুনা, বাঁশি সব লাটে উঠল। আমার বাড়িতে কেবল বৃদ্ধ ঠাকুমা আর আমি। বাবা মা অনেক আগেই গত হয়েছে। কিছু ব্যাংক ব্যালেন্স ছিল তারই সুদে সংসার চলত। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করার ছিল না। যা মনে আসত করতাম। একদিন সন্ধ্যের দিকে সবার চোখ এড়িয়ে পিছনের পাঁচিল ডিঙ্গিয়ে ঢুকে পড়লাম ওই বাড়ির পিছন দিকে, যে করেই হোক ওই ভৈরবীকে সামনে থেকে দেখতেই হবে। পিছন দিক থেকে ঘুরে একটা ব্যাঁকানো লোহার সিঁড়ি ওপর দিকে উঠে গেছে ছাদে। পা টিপে টিপে উঠতে লাগলাম। ধুপ ধুনোর গন্ধে সারা বাড়ি আমোদিত, আর তার সাথেই একটা পুরানো ভ্যাপসা গন্ধও নাকে এসে লাগছে। অর্ধেক সিঁড়ি উঠেছি আচমকা কে যেন পিছন থেকে এসে আমায় শূন্যে উঠিয়ে নিল। কিছু বোঝার আগেই এক হাতে আমার মুখ চেপে আমার অর্ধেক ওঠা সিঁড়ি থেকে নেমে ছুট্টে বাড়ির সামনের দিকের সিঁড়ি দিয়ে ওপর দিকে উঠতে লাগল। শরীরের সব শক্তি একত্রিত করে যতই ছাড়াবার চেষ্টা করি ততই সে যেন আমায় সাপের মত পেঁচিয়ে ধরে। ক'তলা উঠেছে জানি না। একটা বিশাল হলঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে সে। আমায় ঘরের মেঝেতে নামিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পিছমোড়া করে আমার হাত বেঁধে ফেলে। আধো আলো আধো অন্ধকারে এতক্ষনে তার মুখ দেখতে পাই। সেই প্রথম দিনের দেখা কোৎকা লোকটা। অন্ধকারে ক্রমে চোখ সয়ে আসে। আমার সামনে প্রায় পাঁচ সাত মিটার দূরে ধূমায়িত হোম কুন্ডের ঠিক পিছনে বসে আছে লখাই মামা। ওই আধা অন্ধকারে তার লাল চোখদুটি যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে, মুখে এক ক্রুর হাসি। আমার চোখে চোখ রেখে বল্লে, কিরে, ভৈরবীকে খুঁজছিস? আমি কিছু বলার অবস্থায় ছিলাম না। ঘরের এক কোণে সে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বল্লে, ওই দ্যাখ তোর ভৈরবী। তার অঙ্গুলি অনুসরণ করে সেই দিকে তাকিয়ে থরে থরে সাজানো প্রথম দিন দেখা সেই বাক্সগুলি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। কি, দেখতে পেলি না তো। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল লখাই মামা।"অজাতশত্রু, সিমন্তিনীকে এদিকে আমার কাছে নিয় আয়"। আমার পাশে দাঁড়ানো কোৎকা মত লোকটার নাম এতক্ষণে জানলাম, দেয়ালে সেল্ফের ওপর রাখা সেই বাক্সগুলোর মধ্যে থেকে একটা নিয়ে লখাইএর কাছে নিয়ে গেল। কি সব মন্ত্র পড়ে ট্যঁক থেকে চাবির গুচ্ছ থেকে একটা চাবি নিয়ে বাক্স খুলে ফেল্ল লখাই। বাক্সের ডালার গায়ে পরিস্কার লেখা রয়েছে সিমন্তিনী। ধীরে ধীরে ঘর ভরে গেল নীল ধোয়ায়। সেখান থেকে এক অবয়ব তৈরী হল। পষ্ট দেখলাম হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আমার দেখা সেই ভৈরবী। উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত। ভয়ে, উত্তেজনায় আমি তখন বাক্য রহিত হয়ে গেছি। "তুই বাঁশি বাজাস, নারে? " আমার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করল লখাই মামা। সম্মোহিতের মত আমি বল্লাম "শুধু বাজাই না, ওটাই আমার শখ, আমার ভালোবাসা, আমার নেশা"। "আমারো বাজনা শুনতে খুউব ভালো লাগে, আর তাই তো তোকে এখানে নিয়ে আসার এত ছল " অট্টহাসিতে আবার ফেটে পড়ল ঘর। ভয় আর উত্তেজনায় আমার তখন করুণ অবস্থা। নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসে, এদিকে কথা বলছি বটে বার বার চোখ চলে যাচ্ছে সেই ভৈরবীর অনাবৃত বক্ষের দিকে। সেটা খেয়াল করে লখাই মামা যজ্ঞকুন্ড থেকে কিছু ছাই তুলে মন্ত্র পড়ে ছুঁড়ে দিল ভৈরবীর দিকে। আবার নীল আলোকচ্ছটা। এক নীলচে ধোঁয়া তৈরী হল অপসৃত হল ভৈরবীর শরীর। সেই ধোঁয়া সাপের মত কুন্ডলী পাকাতে পাকাতে পুরোটা ঢুকে গেল বাক্সের মধ্যে। মনে হচ্ছিল যেন সিনেমা দেখছি, যেন আমি এক স্থবির দাঁড়িয়ে রয়েছি। আবার হাসি, "অজারশত্রু নিয়ে আয় বাক্সটা।" চমকে উঠলাম বজ্রগম্ভীর শব্দে। ওই বাক্সগুলোর মত দেখতে আর একটা কাঠের বাক্স নিয়ে লখাই মামার হাতে তুলে দিল অজাতশত্রু। চমক তখনো বাকী ছিল। বাক্সের ডালা তুলতেই দেখলাম ডালায় লেখা অর্জুন ডেকা। ভয় আর্তনাদ করে উঠলাম। আবার হাসিতে ফেটে পড়ল ঘর। হা হা হা হা ভয়ের কি আছে রে। তোকে হত্যা করব ঠিকই, তবে তোর আত্মাকে চিরকালের জন্য বন্দী করে রাখব এই বাক্সে, যার চাবি থাকবে আমার কাছে। যখনই বাঁশি শুনতে ইচ্ছে করবে তখনই মন্ত্রবলে তোকে শরীর দান করব। হ্যাঁ রে, এটাই আমার নেশা, আমার শখ।অনেক ছোট থেকেই এই শখ আমি বয়ে বেরিয়েছি। আর তাই তো এই তন্ত্র সাধনা। বিভিন্ন শ্মশান ঘুরে এখান ওখান থেকে তোর মত গুণীদের আত্মা সংগ্রহ করে এনে এই বাক্সবন্দি করে রাখি। ওই যে ভৈরবী, এক সময় আমার সাধন সঙ্গিনী ছিল। তারপর কি হল, এক ভদ্দরলোকের সাথে প্রেম করে ঘর বাঁধার শখ করল। কাল বিলম্ব না করে ওকে লুকিয়ে হত্যা করলাম। এখন রোজ রাতে ওর আত্মাকে জাগ্রত করে রূপদান আমার কাম চরিতার্থ করি। এই সব শুনে, দেখে ভয় আমার অর্ধেক প্রাণ বেরিয়ে গেছে, সম্মোহিতের মত তাকিয়ে আছি লখাই মামার দিকে। নিজেকে কেমন ভূতগ্রস্থের মত লাগছে। মনে হচ্ছে আমি যেন এইজন্যই বলি প্রদত্ত। হঠাৎ "গুরুদেব" আর্তনাদে সম্বিত ফিরল। দেখি পাশ থেকে অজাতশত্রু চিৎকার করে উঠল। লখাই মামা চকিতে পিছন ফিরে চাইলেন। তাকিয়ে দেখি যে বাক্সে ভৈরবী ঢুকে গেছিল সেখান থেকেই সাপের মত কুন্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া নির্গত হয়ে পাকে পাকে জড়িয়ে ধরছে লখাই মামাকে। দুহাতে গলার প্যাঁচ খোলার চেষ্টা করছে। অজাতশত্রু আমার কানের কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলছে, সব্বনাশ হয়ে গেছে আজ আর গুরুদেবের রক্ষা নেই। মুহূর্তের ভুলে গুরুদেব বাক্সের চাবি লাগাতে ভুলে গেছেন। আর বশীকরণ মন্ত্র কাটতেই ফের বাক্স থেকে বেরিয়ে পড়েছে ভৈরবীর আত্মা। ক্রমে প্যাঁচ আরও মারাত্বক হয়ে চেপে বসতে লাগল। লখাই মামার চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসবে এক্ষুনি। আমরা ততক্ষণে ভয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সব চেষ্টার অবসান। ক্রমে লখাই এর শরীর শিথিল হয়ে নেতিয়ে পড়ল। ধোঁয়ার কুন্ডলী এতক্ষণে লখাইএর গলার প্যাঁচ খুলে পিছনের জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে জানলার ফাঁক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। আর কিছু বোঝার আগেই অজাতশত্রু আমার হাত ধরে হিড় হিড় করে টানটে টানতে নীচে নেমে এল। গেট খুলে আমায় ঠেলে বাড়ির বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে আবার ভেতরে চলে গেল।"

এতদূর পর্যন্ত বলে থামল অর্জুন। দেখলাম এই ঠান্ডাতেও ঘামছে সে। আমি বল্লাম তারপর। সে বল্লে, "তারপর আর কি, পরে অজাতশত্রু বাক্সগুলো ফাঁকা মাঠে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। আমার জন্য রাখা বাক্সটাও পোড়াতে গিয়েছিল, আমি পোড়াতে দিই নি। দেখবেন? এই দেখুন" বলে বসার জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। দেখলাম ছোট পিঁড়ের আকারের একটা কাঠের বাক্স। ল্যাম্প পোস্টের আলোয় পরিষ্কার দেখলাম বাক্সের ওপরে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লাল কালিতে আবছা হয়ে আসা লেখা "অর্জুন"।

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.