প্রতীক্ষা


-এরা কারা?
-রং মিস্ত্রি ।
-আবার রং?আগের বারও তো করালে।বছর বছর কারা রং করায় শুনি।
-আস্তে।তোমরা শুরু কর। ভাল করে দেবে।যা বেছে দিয়েছি।বাচ্চার ঘরটাতে কার্টুনের কিছু ছবি।আরে তুমি বুঝছ না কেন ওরা এত দিন বাদে আসছে।একটু আয়োজন____
স্ত্রীর অগ্নিদৃষ্টির দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলেন।
-টাকা?
-কী?
-টাকা কোথায় পেলে?
-ইয়ে ঐ মানে হয়েছি কী___
-আমতা আমতা করছ কেন?বুঝতে পেরেছি। ভুলে যেও না ঐটাই আমাদের শেষ আর একমাত্র সম্বল ।বুঝবে না যখন যা খুশি কর।কিছু বলার নেই।
-শোন আমি_____
পাঠকের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জেগেছে যে এরা কারা?ঝগড়া এই তর্কের কী কারণ।তো আর দেরি নয় বন্ধুরা
শুন শুন পাঠক শুন দিয়া মন।এই না পড় পড় পাঠক পড় দিয়া মন। পাঠিকা ক্রুদ্ধ হইবেন না কারণ ছন্দ মিলছিল না।যাইহোক এনারা হলেন সেন দম্পতি । পীষূষকান্তি সেন এবং কণা সেন।দেখা যাক এনারা কী করছেন ।
এনারা বৈকালিন চা পানে রত। কিন্তু চা পান শুধু কণাদেবী করছেন।পীষূষকান্তিবাবু অনেক জিনিসপত্র নিয়ে কী সব বলছেন।এনারা আর্ল গ্রে খাচ্ছেন না লেডি গ্রে নাকি গ্রীণ টি তা জানার দরকার নেই। যেটা দরকার সেটা হল পীষূষকান্তি কী দেখাচ্ছেন।
-এই গয়নাগুলো দেখ।মায়ের গয়না বেচে গড়ালাম।ওসব পুরোনো সব ফ্যাশন তো বৌমা পরতে পারবে না।তাই এসব__
-তোমার মায়ের গয়নাগুলো স্মৃতি ছিল।সব বেচে দিলে?
-আরে বাবা বৌমা তো আমার মাই।যা পরবে তাই মায়ের গয়না।বৌ-মা তাই না?ভাল হয়েছে তো?বল।
-হ্যাঁ ।
-হবেই তো। সবচেয়ে বড় দোকানে বানানো।আর এই পোষাকগুলো কেমন?আমি নিজে পছন্দ করে কিনেছি। এতবার বললাম তুমি তো গেলে না।বৌমার জন্য এই বালুচরীটা এনেছি।জানি পরে না কিন্তু আমি বললে কি না করতে পারবে বল?
-তোমার জন্য কী কিনেছ দেখাও।
-তোমার জন্য এটা।পরে অঞ্জলি দেবে।
-তোমারটা?
-আমার আবার কেন?অনেক আছে তো।
পীষূষকান্তিবাবুর মলিন জীর্ণ জামাটার দিকে তাকিয়ে কণাদেবী দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন-আসলে ভুলে গিয়েছিলাম তোমার তো অনেক আছে।
কণাদেবী উঠে গেলেন।
-আরে খেলনাগুলো দেখে যাও।জিয়ার জন্য আনলাম।আর ইয়ে কিছু ফার্নিচার order দিয়েছি।ওদের জন্য মানে শুনছ আমার কথা____
সেন দম্পতির একমাত্র সন্তান অর্ক।অস্ট্রেলিয়াতে সেটেলড্।লোন করে পড়িয়েছিলেন।প্রচুর অর্থব্যয় করেছিলেন।শেষ পর্যন্ত সন্তান কতটা মানুষ হয়েছিল সে প্রসঙ্গে যাব না।তবে অর্ক অতি মাতৃভক্ত।আরে বাবা mother-in-law ভক্ত।হাজার হোক law মানে আইন আর আইনের জোর তো থাকবেই।আইনত মা বলে কতা।মেয়েদের ক্ষেত্রে নয় ছেলেদের জন্য only for sons বিয়ের পর in-law -র টান বিরাট।রক্ত,নাড়ী প্রভৃতি যেসব অতি বাজে টান আছে তা ছাপিয়ে law-র টানটা বড় হয়। কারণ law মানে আইন।
নাতনী হলে পীষূষকান্তি নাম রাখতে চেয়েছিলেন বর্ণালী ।কিন্তু এখানেও বাধ সাধল law. Mother-in-law নাম রাখল কোন এক মেগার নামে জিয়া ।পীষূষকান্তি যে কত বই ,অভিধান ঘেটে নামটা বের করেছিলেন তার কী?কিছুই না।
এদিকে যত দিন ঘনিয়ে আসছে পীষূষকান্তির উৎসাহের সীমা নেই।
-শুনছ বাবুকে ফোন করেছিলাম।ওরা আসছে সপ্তমীর দিন ।
-কী বলল?
-India আসছে।
-India তে আমাদের বাড়ি ছাড়াও অনেক জায়গা আছে। আর ওর বাড়িও আছে।
এখানে বাড়ি বলতে কণাদেবী শ্বশুরবাড়ির কথা বলেছেন।অর্ক অস্ট্রেলিয়াতে যখন ছাত্র ছিল তখন এক মারাঠী মেয়ের সাথে আলাপ হয়। পরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।বিয়ে হয়।মেয়েটির বাড়ি মুম্বইয়ে।প্রতিবছর মাঝে মাঝে অর্ক শ্বশুরবাড়ি আসে।কিন্তু কলকাতা আসতে কষ্ট হয়। মনে হয় শ্বাসকষ্ট । অতি কষ্ট,অতি কষ্ট।এবার মানে প্রতিবার পুজোর সময় অর্কস্যরকে আসার জন্য অনেক অনুরোধ করেন পীষূষকান্তি ।কান্নাকাটি করেন।বিরক্ত হয়ে প্রতিবার বলে আসব।কতকাল দেখেন নি নিজের ছেলেকে।নাতনীকে। এই বয়সে যদি নাতনীর সাথে নাই খেলল তবে আর কি হল।
বছর খানেক আগে অর্কসাহেব তার পুরো in law পরিবারকে বিদেশ ভ্রমণ করিয়েছিল।শুধু টাকার জন্য মানে শট তো পড়ারই কথা এতবড় in law family যারা ওকে বিদেশ পাঠালো তাদের বিদেশ দেখা হল না।লোন নিয়ে পড়িয়েছিলেন। এখনও শোধ হয়নি । মেলা টাকা।টাকার জন্য ছানি operation টাও হচ্ছে না।পীষূষকান্তি সব কিছু দেখছিলেন।ঠিকঠাক আছে কিনা।আর কিছু লাগবে কিনা?কণাদেবী ঝড়ের বেগে এসে বললেন-তুমি ওষুধ খেয়েছ?
পীষূষকান্তিবাবুর মুখ শুকিয়ে গেল।তিনি কয়েকদিন ওষুধ খাচ্ছেন না।কেনার টাকা নেই।যা ছিল জিনিসপত্র কিনে শেষ করে দিয়েছেন।যা আছে বাকি তাতে বাজার করতে হবে ওষুধ কিনবেন কীভাবে?
-ইয়ে মানে টিভিতে দেখছিলাম ওষুধ খাওয়া ভাল নয়।তাই আর খাচ্ছি না।শরীরের জন্য খুবই ভাল।কণাদেবী রাগে কাঁপতে লাগলেন।তারপর নিজের সমস্ত ওষুধ নর্দমায় ফেলে দিলেন।
-এ কি করলে?
-খাওয়া ভাল নয় তো।আর শোন তোমার ছেলে ফোন করলে বোল আগে জানলে ওকে আতুঁরে মুখে নুন দিয়ে মেরে ফেলতাম।
-কণা!
-কী বল?
কণাদেবী চলে গেলেন।দিন কাটতে লাগল। পীষূষকান্তিবাবুর মনে হচ্ছে কিছু কম পড়ে নি তো।তাই পাড়ার লোকের সাহায্য নিলেন।সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন সব ঠিক আছে কিনা?কেউ মুখ টিপে মুচকি হাসল,কেউ বৃদ্ধবন্ধুর জন্য চোখের জল ফেললেন।কিন্তু মুখ ফুটে কেউ কিছু বলল না।কারণ ওনার মত মানুষ হয় না ।বিপদে আপদে পাশে থাকতে ওনার জুড়ি নেই।
আর কণাদেবী?সারাবছর নিজেকে শক্ত রাখেন।কিন্তু এই কটা দিন পীষূষকান্তির পাগলামি দেখে নীরবে চোখের জল ফেলেন।যখন পারেন না তখন bathroom এ গিয়ে জোরে কল চালিয়ে চিৎকার করে কাঁদেন।তার বুকফাটা হাহাকার তিনি কাউকে শুনতে দিতে চান না।
ফোনে কথা বলছেন পীষূষকান্তি ।তিনিই ফোন করেছেন।
-তুই আসবি তো বাবু?
-দেখি নয় তোকে আসতেই হবে।কতকাল তোকে দেখিনি।ছোটোবেলায় এইসময় তোকে কত মন্ডপ দেখাতাম।কত কিছু কিনে-হ্যালো অর্ক hello শোন অর্ক শোন।
কণাদেবীকে দেখতে পেয়ে উনি বললেন -আসবে।বলেছে।
-চল খাবে।
-সপ্তমীর আর কদিন যেন?দুদিন___
নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত করে কণাদেবী বললেন-আজ তোমাকে একানব্বই বার বলেছি।বার বার বললে কি দ্রুত আসবে?
ষষ্ঠীর দিন সকালে পুরো বাজার উঠিয়ে নিয়ে এলেন পীষূষকান্তি ।কী আনেন নি।
-এই দেখ বাজার আনলাম।সব ভাল জিনিস বাবুর পছন্দের।
-আবার আমিষ আজকের দিনে?
-আরে বাবা ওরা সাহেব। আমাদের গরীবের খাবার কি মুখে রুচবে তুমি বল।
-দাও।
-শোন বিদেশি ফুল আছে ঘর সাজাবে।আর রান্না বলতে brown rice করবে____
-বলতে হবে না।হাজার বার বলেছ।মুখস্থ আছে।
অনেক প্রতীক্ষার পর এল সপ্তমীর সকাল। আনন্দ,কোলাহল । খুশি আর খুশি।পীষূষকান্তি সারারাত ধরে ঘর বাগালেন।কণাদেবী বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদলেন
-তাড়াতাড়ি কর । বললাম তাড়াতাড়ি উঠতে না উঠলেন চারটাই।আরে বাবা সব রাঁধতে হবে তো।শোন ওরা এলেই দই ,মিষ্টি আর শরবত দেবে।এসি রুমে বসে খাবে।ওদের জন্য কেনা অথচ একবারও ব্যবহার হল না।তুমি কিন্তু একদিন এঁটোকাঁটার বিচার করতে পারবে না।ওরা সাহেব ভুলে যেও না। ইলিশ মাছের পাতুরি বেশ খরে রেঁধো।গঙ্গা যমুনাও কোরো।হাঁস আর কচি পাঁটা এনেছি বেশ করে বানিও।চাটনী,পায়েস আর পাঁপড় ভুলো না। মাছের মাথা দিয়ে ডালটা কোরো।আমি অনেক আইসক্রিম এনেছি।যখন ইচ্ছে খাবে। অনেক snacks আছে দিও।তাড়াতাড়ি কর।নাড়ুগুলো খুব ভাল হয়েছে।তাড়াতাড়ি ।ফোন এলেই ওদের আনতে যেতে হবে।
কণাদেবীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ।ফোন না আসায় ফোন করতে গেলেন পীযূষকান্তি।কণাদেবীও গেলেন। উৎসাহে নয়। স্বামীকে সামলাতে।
-হ্যালো -তোরা কখন আসছিস?-এসে গেছিস।-কোথায়?-ম-মুম্বই ।-এখানে কবে আসবি?- কাল আয়-একদিনের জন্য আয় বাবা।-শোন অর্ক রাখিস না।শোন অর্ক শোন এই__________
কাঁধে হাত পড়তে সম্বিৎ ফিরল।
-ইয়ে মানে একটা problem হয়েছে।ওর শাশুড়ি মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেছেন।তাই আমি বললাম ওখানে থাকতে।
-সব শুনেছি।যে ছেলে মাসে একবার ফোন করেনা তুমি কী করে আশা কর যে সে আসবে?
কণাদেবী স্বামীর বুকে মুখ গুঁজে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলেন।
বছর পাঁচেক পর। এক mental hospital এ নতুন ডাক্তার join করলেন।সারাদিন এক বদ্ধ পাগলের চিৎকারে তিনি তিতিবিরক্ত । শক দিয়েও কিছু হচ্ছে না। সারাদিন সবাইকে শুনতে হচ্ছে-কণা রান্নাটা চটপট সার। বাবুকে আনতে যেতে হবে তো। ফোন বাজছে-ক্রিং ক্রিং ধর বাবুর ফোন। কণা_____
__________________________:_______________________________________

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.