হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসে ডেস্কটপটা অন করে ফেসবুকে লগইন করল অরিত্র।অনলাইন হতেই নোটিফিকেশন প্যানেলে জেগে উঠল একটা নতুন ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট।প্রোফাইল হাইড করা।শুধুমাত্র প্রোফাইল পিকচারে একটা চাকার ছবি।নামটাও অদ্ভুত ধরণের।'ক অর্ণ'।এ আবার কে রে ভাই! কৌতূহলী হল অরিত্র।যাকে তাকে ফ্রেন্ড লিস্টে অ্যাড করে না অরিত্র।একমাত্র যদি চেনাশোনা কেউ হয় তাহলেই ফ্রেন্ড লিস্টে জায়গা দেয় ও।এই জন্য ওর ফ্রেন্ড লিস্টও খুব একটা বড় নয়। এই 'ক অর্ণ' প্রোফাইলটাকে দেখে চেনাশোনা কেউ লাগছে না।ডিলিট করে দিল।এবার চলে এলো নিউজ ফিডে।স্ক্রল করতে করতে আবার একটা নোটিফিকেশন।আবারো ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট।খুলে দেখল সেই 'ক অর্ণ' প্রোফাইলটাই ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছে, এবার সাথে ইনবক্সে আদার ফোল্ডারে একটা আনরিড মেসেজ।আগে মেসেজ ইনবক্সটা খুলে দেখল কি মেসেজ এসেছে।'হাই, আমি কর্ণ।আমার রিকুয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করছ না কেন?'
জবাবে অরিত্র লিখল 'আমি কি তোমাকে চিনি?’
-ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করলে চেনাজানাটা হয়ে যাবে।
-আসলে আমি অচেনা কারো রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করি না আর অচেনা কাউকে রিকুয়েস্ট পাঠাইও না।
-একবার নাহয় চেনা ছক থেকে বেড়োলে।কি হবে তাতে? তুমি তো মেয়ে নও যে প্রোফাইলে অচেনা কেউ থাকলে নোংরামি করতে পারে।
-না ঠিক তা নয়, তবে হঠাত তুমিই বা আমার বন্ধু হতে চাইছ কেন?
-বলব?
-বলো।
-আমি তোমাকে খুব ভালো করে চিনি, আর আমি জানি তুমি কদিন আগে কি করেছ।
এবার ঘাবড়ে গেল অরিত্র।ওকে চেনে, কদিন আগে কি করেছে সেটাও জানে, অথচ অরিত্র চিনতে পারছে না! কোনো চেনা পরিচিত কেউ ইয়ার্কি মারছে না তো? প্রোফাইলটা যে ফেক প্রোফাইল সেটা নিশ্চিত হতে পারছে না কারন প্রোফাইলটা হাইড করা।একমাত্র ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করেই সেটা বুঝতে পারবে।তবে প্রোফাইলে নিজের ছবি কেন দেয় নি?
অরিত্র জিজ্ঞাসা করল 'প্রোফাইলে নিজের ছবি দাও নি কেন'।
-মহাভারতের যুদ্ধে ভূমিদেবীর অভিশাপে কর্ণের রথের চাকা বসে গেছিল তা জানো?
-হ্যা জানি।তার সাথে এর সম্পর্ক কি?
-একে বলে ভাগ্যের পরিহাস।গ্রীক ট্র‍্যাজেডিগুলো বেশিরভাগই যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।রাজা অয়দিপাউসের গল্পে কে দোষী খুঁজতে গেলে দেখবে একমাত্র ভাগ্য ছাড়া আর কেউ নয়।
-তোমার জীবনেও কি এরকম ভাগ্যের পরিহাস আছে?
-সেটা তুমি একটু পরে নিজেই বুঝতে পারবে।
-আচ্ছা তোমার আসল নামটা কি?
-কর্ণ
-উহু।বিশ্বাস হচ্ছে না।
-কেন?
-কারন আমি কর্ণ বলে কাউকে চিনি না।
-চিনে যাবে আরেকটু পর।
-ঠিক করে বলোতো তুমি কে? খালি বলে যাচ্ছো সব বুঝে যাবে আরেকটু পরে আরেকটু পরে।কি হবে আরেকটু পরে?
-রেগে যাচ্ছো?আচ্ছা তাহলে তোমাকে একটা গল্প শোনাই।রাগ কমে যাবে।
-কি গল্প? কিসের গল্প?
-শোনো তাহলে।একটা ছেলে বাইরে থেকে কলকাতায় চাকরি করতে এলো।এখানে এসে ঘরভাড়া নিল।যেহেতু কলকাতার বাইরের ছেলে তাই অফিস কলিগরা খুব পেছনে লাগত ছেলেটার।ওদের মধ্যে একটা মেয়ে ছিল, যে এইসবের প্রতিবাদ করত।ধীরে ধীরে ছেলেটার ভালো লাগতে লাগল মেয়েটাকে।একদিন ছেলেটা মেয়েটাকে জিজ্ঞাসা করল 'ওরা সবাই আমার পেছনে লাগে আর তুমি আমার হয়ে বলো কেন? আমাকে ওদের হাত থেকে বাচাও কেন?' মেয়েটা শুনে বলল কারন আমার তোমাকে ভালো লাগে তাই।এই শুনে ছেলেটার মনে মেয়েটার প্রতি আকর্ষণ আরো বেড়ে গেল।এরপর ওরা দুজনে মাঝে মাঝে একা দেখা করতে লাগল, ছেলেটা মাঝে মাঝে গিফট দেওয়া শুরু করল মেয়েটাকে।কি ভালো লাগছে গল্পটা?
-এই এই এই এটা তুমি কি বলছ? কার গল্প বলছ? আর এই গল্প তুমি জানলে কি করে?
-আরে শোনই না গল্পটা পুরো।দেখবে আরো ভালো লাগবে।
-না না না আমি শুনতে চাই না এই গল্প।
-আরে শোনো শোনো।আসলে কি জানো তো? ছোটবেলা থেকেই ওই ছেলেটা ভাগ্যের হাতে মার খেয়ে এসেছে।খুব অল্পবয়সে ওর মা মারা যায়।বাবা ওকে পাঠিয়ে দেয় মামার বাড়িতে।সেখানে দাদু দিদা যে কদিন ছিল ততদিন একটু আদর পেয়েছিল, কিন্তু তারাও কিছুদিনের মধ্যে মারা যেতেই মামা মামীদের রূপ পরিবর্তন হয়ে যায়।তাই ওকে আদর দেওয়ার মত কেউ ছিল না।ছোটবেলা থেকে অনাদরে অবহেলায় বড় হচ্ছিল।নিজেই নিজের পড়াশোনা শেষ করে চাকরির সন্ধান করতে করতে কলকাতায় এসে পৌঁছায়।ও ঠিকই করে রেখেছিল বাড়ির সাথে আর কোনো সম্পর্ক রাখবে না।এরকম অবহেলার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে যখন অফিসে ওই মেয়েটির প্রশ্রয়ের ছোঁয়া পায় তখন পৃথিবীটাই ওর কাছে বদলে যায়।
-আর কিছু বোলো না প্লিজ।আমি আমি শুনতে পারব না।
-আর একটু বাকি আছে।এটুকু শুনে নাও।এরপর হল কি, দুনিয়াটা যখন ওর কাছে নতুন ভাবে ধরা দিচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে একদিন সেই মেয়েটাকে অফিসের ক্যান্টিনে অন্য একটা ছেলের সাথে বসে কি আলোচনা করতে শুনল।ওই ছেলেটাই সব থেকে বেশি র‍্যাগিং করত ওকে।ও শুনতে পেলো দুজনে মিলে খুব হাসাহাসি করছে আর ছেলেটা বলছে 'কি রে আর কতদিন খেলাবি মালটাকে?' মেয়েটা উত্তর দিল 'এই তো উঠেই এসেছে প্রায়।এবার শুধু ওর ফ্ল্যাটে যাওয়া বাকি।ওখানে কিছু করতে গেলেই হাতেনাতে ধরে একদম ব্ল্যাকমেইল।আর ও যা ছেলে এতেই ঘাবড়ে গিয়ে যা বলব তাই দিতে রাজি হয়ে যাবে' বলে দুজনে আবার হেসে উঠল।
-না প্লিজ প্লিজ।আর আমি শুনতে পারব না।
-এবার কি হল শোনো।ক্যান্টিনের বাইরে থেকে ছেলেটা শুনে ঠিক করল এবার আর ভাগ্যের হাতে মার খাবে না।এবার নিজের ভাগ্য নিজেই ঠিক করবে।এই ভেবে ঠিক সেই ঘটনার পরদিনই ছেলেটা মেয়েটাকে বলল, তোমাকে খুব ইচ্ছে করছে আজকে আমার ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে।মেয়েটা এই শুনে চোখে মুখে একটা খুশির ভাব দেখিয়ে বলল চলো তাহলে।এবার ছেলেটা মেয়েটাকে ফ্ল্যাটে নিয়ে এলো।মেয়েটাকে চমকে দিয়ে ছেলেটা দুটো গ্লাস আর টিচার্সের একটা বোতল বের করল।মেয়েটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল তুমি ড্রিংক করো? ছেলেটা বলল, হ্যা মাঝে মাঝে করি।খুব খুশির কোনো কিছু আমার জীবনে ঘটলে আমি ড্রিংক করি।কিছুক্ষণ দুজনে মিলে মদ খাওয়ার পর ছেলেটা এবার বলল যাহ বরফ শেষ হয়ে গেছে।একটু বরফ নিয়ে আসি।কিন্তু ফ্রিজে ছেলেটা বরফ খুঁজে পেলো না।বরফ আনতে সে বাইরে বেরোল এবং একটা বরফের স্ল্যাব নিয়ে এলো।এত বরফ কি হবে মেয়েটার এই প্রশ্নের জবাবে ছেলেটা বলে উঠলল সবই লেগে যাবে দেখে নিও।পাটের বস্তার মধ্যে বরফটা ঢুকিয়ে একটা লোহার ডান্ডা দিয়ে বরফটাকে কুচি কুচি করল ছেলেটা।মেয়েটা তখন কিছুটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে পরেছে।হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে মেয়েটার মুখে একগাদা বরফের কুচি ঠেসে ধরল ছেলেটা।মেয়েটা খানিকক্ষণ ছটফট করল, তারপর ছেলেটা আবার আরো বরফের কুচি ঠেসে ধরল মেয়েটার মুখে।মেয়েটার তখন আর জ্ঞান নেই।ওই অবস্থাতেই কোনোমতে মুখটা হা করে পর পর বরফ কুচি ঢুকিয়ে গেল ছেলেটা।একসময় মেয়েটার শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে গেল, ঢলে পরল মৃত্যুর মুখে।তার পরদিন পুলিশ এসে তদন্ত করল, কিন্তু বরফ গলে জল হয়ে যাওয়াতে এবং সেই জলও শুকিয়ে যাওয়াতে খুনের কোনো চিহ্ণই খুঁজে পেল না পুলিশ।
-তুমি কে? কে তুমি ঠিক করে বলো।কে তুমি?
-আমি যেই হই না কেন, সেটা বড় কথা নয়।কথাটা হচ্ছে এবার সেই ছেলেটা কি করবে?
-কি করবে?
-ছেলেটা এখন পুলিশের কাছে গিয়ে আমাদের দুজনের এই কথোপকথনটা দেখাবে আর পুলিশকে অ্যারেস্ট করতে বলবে।
-কিন্তু তুমি কে সেটা বলো! আর তুমি এত কথা জানলে কি করে বলো।আমার এসব কথা তো কারো জানার কথা নয়!
-বাই।যা বললাম সেটা করো।তা না হলে আমি আবার আসব।
-শোনো শোনো প্লিজ শোনো
-বাই
-প্লিজ তুমি কে বলে যাও, যেও না প্লিজ

ততক্ষণে 'ক অর্ণ' প্রোফাইলটা দেখা যাচ্ছে লগ আউট হয়ে গেছে।


নিউটাউন থানার পুলিশ লক আপে অরিত্র রায় এখন বসে আছে।ও আত্মসমর্পণ করেছে আর পুলিশকে ওর ফেসবুকের চ্যাট মেসেঞ্জার দেখিয়ে সব অপরাধ স্বীকার করেছে, কিন্তু পুলিশকে বারেবারে করে বলেছে কর্ণ কে সেটা বের করতে।পুলিশ আইপি অ্যাড্রেস ট্র‍্যাক করছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটা জানা যাবে।অধীর আগ্রহে অরিত্র বসে আছে কর্ণ কে সেটা জানার জন্য।
একজন কনস্টেবল সাইবার সেল থেকে ফ্যাক্স করে পাঠানো আই পি অ্যাড্রেস ট্র‍্যাক করার রিপোর্টটা নিয়ে এসে ওসির হাতে দিল।ওসি দেখেই ঘাবড়ে গেল।এ হতে পারে নাকি কখনো? না না এ অসম্ভব।নিশ্চয়ই সাইবার সেল কোথাও একটা ভুল করছে।তা নাহলে 'অরিত্র রায়' আর 'ক অর্ণ' এই দুজনের প্রোফাইলের আইপি অ্যাড্রেস এক হয় কি করে!মানে দুজনে একই সময়ে একই কম্পিউটার থেকে টাইপ করেছে? মানে পাশাপাশি বসে!অসম্ভব।এ কখনো হতেই পারে না।হঠাৎ, হ্যা হঠাৎ ই কি মনে হতে ওসি বলে উঠলেন, আরে আরে তাই তো তাই তো, ঠিকই তো।কি হল স্যার? কনস্টেবলের প্রশ্নের জবাবে ওসি বললেন সমার্থক শব্দ জানো?
কিসের স্যার?
নৌকার হালের কি কি সমার্থক শব্দ হয়?
জানি না স্যার।
জানতেও হবে না।শুধু দুটো শুনে রাখো।
কি কি স্যার
অরিত্র আর কর্ণ।


bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.