সায়ন্তন একটা ছোট প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করে। কোম্পানী বেদম খাটায় কিন্তু সামান্য বেতন দেয়। তার উপর সে নিজের পছন্দমত একটা বিয়ে করে নিয়েছে। প্রেমিকা এখন নতুন বউ। প্রেমিকার তুলনায় নতুন বউয়ের সাধ-আহ্লাদ বেশি হয়। নিজেদের জামাকাপড় কিনতে আর নতুন বউয়ের সাধ-আহ্লাদ মেটাতেই তার বেতনের সব টাকা চলে যায়। শুধু বাবার রোজগারের উপর দিয়ে চারজনের সংসার খুব ঘষটে গড়ায়।

সায়ন্তনের মা প্রতিদিন দু’বেলা ঠাকুরঘরে সাশ্রু কাতরতায় প্রার্থনা করেন। সে প্রার্থনার মুখ্য বিষয় একটাই – সায়ন্তন যেন একটা ভালো সরকারি চাকরি পায়। দশ-বারো ঘন্টা ডিউটি বলে সায়ন্তনকে সকাল সাতটায় বেরোতে হয়। তবুও সেই তাড়াহুড়োর মধ্যেও প্রত্যেক দিনই অফিস যাবার আগে অবশ্যই বাবা ও মাকে বলে, ঠিকমত তাঁদের প্রণাম করে তবেই সে বাড়ি থেকে বেরোয়। এই ব্যাপারটা তার একটা বদ্ধমূল দৈনিক অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। তাছাড়া বেরোবার সময় তার বুকপকেটে পুজোর প্রসাদী ফুলের একটা পাপড়ি সযত্নে গুঁজে দিয়ে ‘দুর্গা – দুর্গা’ বলতে বলতে তার মা পিছু পিছু বাড়ির গেট পর্যন্ত না এলে সায়ন্তনের মন কিছুতেই ভরে না। মায়ের পিছন পিছন তার বউও আসে। সায়ন্তন অবশ্য সেটাও মনে মনে চায়। নতুন বউয়ের কাছে চকিত কটাক্ষ থাকে।

সায়ন্তন সরকারি চাকরি পাওয়ার চেষ্টায় ছিল। পড়াশোনা চালিয়ে পরীক্ষা দিতে দিতে বছর দুই পরে সে সরকারি করণিকের একটা চাকরি পেয়ে গেল। শুরুতেই বেশ ভালো মাইনে। অ্যাপয়েমেন্টের পাকা চিঠি যেদিন এলো সেদিন খুব খুশি হল তার বউ, সে নিজে, তার বাবা, আর সবচেয়ে বেশি খুশি হল তার মা। সেদিন তিনি তাঁর ঠাকুরের কাছে গিয়ে কত কাঁদলেন। তবে সে কান্নার কারণ এবং উদ্দীপক দুটোই আলাদা ছিল।

খুব তাড়াতাড়ি নতুন চাকরির সঙ্গে নিজেকে ভালোভাবে মানিয়ে নিল সায়ন্তন। এখন তার অফিস যাওয়া আসার খুব সুবিধে হয়েছে। আগের মত আর অত সকালে উঠে নাকে মুখে কোনমতে যাহোক কিছু গুঁজে হুটোপাটি করে বেরোতে হয় না। আগের তুলনায় সে এখন অনেক সময় হাতে পায়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, অথর্ব বা অচল না হলে মানুষের সময় কখনও বেশি হয় না। কীভাবে কীকরে যেন সময় ঠিক কম পড়ে যায়।

খাওয়া দাওয়া সারতে গিয়ে সায়ন্তনকে তেমন হুড়োহুড়ি করতে হয় না বটে, তবে একটু আগে আগে না বেরোলে ট্রেনে ঠিকমত বসার জায়গা পেতে খুব অসুবিধা হয়। সেজন্য আজকাল সায়ন্তন অফিসে বেরোবার আগে বাবা-মাকে আর আগের মত রোজ বলে এবং প্রণাম করে যাবার সময় পেয়ে ওঠে না। অগত্যা তাঁদের কোনকিছু না বলেই সে অফিসে বেরিয়ে যায়। বুকপকেটে জরুরি কাগজপত্র থাকে বলে তার মধ্যে মায়ের দেওয়া প্রসাদী ফুলের পাপড়ি নেওয়া আর সম্ভব হয় না। এসব ব্যাপারে সায়ন্তনের সময়ের অভাব থাকে তো বটেই তাছাড়া তার বুকপকেটে প্রসাদী ফুল নিলে পকেটে ফুলের দাগ ধরে যেতে পারে।

এখন অফিস যাবার সময় মা না এলেও চলে বলে তার পিছনে পিছনে তার বউ আসে গেট পর্যন্ত, মোটামুটি আগের মত। চকিত কটাক্ষের ধার অনেক কমে গেছে বলে সেসব আর চোখে নিয়ে আসে না এখন। তার বদলে এখন বউয়ের হাতে প্রায়ই দরকারি জিনিসের ছোটবড় ফর্দ থাকে। অবিকল প্রসাদী ফুল গুঁজে দেবার মত করে সায়ন্তনের বুকপকেটে বউ হাসিমুখে সেটা গুঁজে দেয়। সেসময় বাড়ির ভিতরে কোথাও উৎকর্ণ হয়ে থাকা মা বাইরের গেট খোলার শব্দ পেয়েই কপালে জোড়হাত তুলে গাঢ় অস্ফুটে বার বার বলতে থাকেন – ‘দুর্গা – দুর্গা –’

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.