সেদিনও ছিল একই রকম বর্ষার রাত। নভেম্বর মাসে মুষলধারায় বৃষ্টি খুব অানইউজুয়াল। কোলাঘাটের ধাবায় ডিনার সেরে ফিরছিলাম আমি ও শর্মিলা। সেই জেদ ধরলো যে সে গাড়ি ড্রাইভ করবে। আমি তাকে মানা করলাম না। মা বলেন যে এই সময়ে মেয়েদের কোন ইচ্ছে নাকি অপূর্ণ রাখতে নেই! হ্যাঁ, আমার শ্রীমতী সন্তান সম্ভবা। তার ইচ্ছেপূরণ করতেই তাকে লং ড্রাইভে নিয়ে গিয়েছিলাম। কোলাঘাট ব্রিজের ওপর ট্রেলার উল্টে রাস্তা ব্লক হয়ে গিয়েছিল। শর্মিলা বললো,

"চলো না যাই, রূপনারায়নের ধারে, হাওয়া খেয়ে আসি..."

"শর্মি, শীত আসছে, রাতের দিকে কুয়াশা পড়ে এই সময়, ঠাণ্ডা লেগে বাচ্চার যদি কোন ক্ষতি হয়!"

"হাওয়া কই যে ঠাণ্ডা লাগবে? গুমোট হয়ে আছে, দেখছো না?"

"হুম। বৃষ্টি নামবে মনে হয়।"

"উড বি ফাদারের আজকাল দেখছি খালি ছেলের প্রতি নজর!"

"ও! খোঁটা দিচ্ছো? বাই দ্য ওয়ে, আমি কিন্তু মেয়েই চাই...বারবি ডলের মতো..."

হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে এলাম রূপনারায়নের পাড়ে। ঘাটে বাঁধা নৌকার ওপর বসে থাকলাম অনেকক্ষন। দূরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আলো গুলো নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করে চলেছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা, বাতাসের গতিবেগ শান্ত হলেও নদীর ঘোলাটে ঢেউগুলো ক্রমাগত চঞ্চল হয়ে পাড়ের সঙ্গে ধাক্কা খাচ্ছে। আমারও খুব আদর করতে ইচ্ছে করছিল শর্মিকে। এরপর দুজনে একসঙ্গে এমন অবসর আবার কবে পাবো, তা কে জানে? ছইয়ের নীচে বাহুডোরে আবদ্ধ করলাম ওকে। ওর সারাটা শরীর চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকলাম। ওর শরীরেও নদীর জলের মতো শিহরণ খেলে যেতে লাগলো। তবে বেশিক্ষন নয়। শর্মি বললো,

"ছাড়ো, গা বমি বমি করছে!"

স্বাভাবিক। আমি ড্রিংক করেছিলাম। এই সময়ে ও কোন উগ্র গন্ধ সহ্য করতে পারে না; তাই আজকাল আমার কাছে ও খুব একটা আসেও না। অগত্যা ধাবার সামনে পার্কিং এ ফিরে এসে গাড়িতে উঠে বসলাম। ততক্ষনে যানজট কেটে গিয়েছে, রাস্তাঘাট যথেষ্টই ফাঁকা, হবারই কথা, রাত প্রায় দুটো বাজে! পথেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। কিছুদূর গিয়ে শর্মি জেদ করে স্টিয়ারিং এ বসলো। আমি হালকা করে গান চালিয়ে দিলাম, "আরো দূরে চলো যাই, ঘুরে আসি। মন নিয়ে কাছাকাছি, তুমি আছো অামি আছি, পাশাপাশি।" এমন ওয়েদার, তার সঙ্গে এমন গান! রোমান্টিক না হয়ে যাই কোথায়! শর্মি গাড়ির স্পিড তুলে দিল সত্তর-অাশিতে। শর্মির বাঁ হাতটা ছিল গীয়ারের ওপর, আমি তার ওপর আলতো চাপ দিলাম; শর্মির দুষ্টুমি ভরা চাহনি আমার হার্টবিট বাড়িয়ে দিল! গাড়ি ছুটছে; আমি আমার শারীরিক উত্তেজনাকে প্রশমিত করতে পারলাম না, শর্মির ঠোঁটে ডিপ কিস করলাম; ওর উন্নত বুকের ওপর থেকে চূর্নী খসে পড়ে গেল; আধো আলো আধো ছায়াতেও ওর ক্লিভেজটা স্পষ্ট। অভ্যাস বশতঃ আমার হাত ওর স্তনের উপর চাপ দিল। সেও দুষ্টুমি করে ক্লাচে চাপ দিল। গাড়ির গতি আরো বাড়লো, আমি টাল খেয়ে পড়ে গিয়ে বললাম, "কি করছো, শর্মি?" সে মুচকি হেসে বললো, "দুষ্টুমি!"

আন্দুল রোডে গাড়ি ডান দিকে টার্ণ নিল, তখনও না স্পিড কমলো, না দুষ্টুমি থামলো। বৃষ্টির তোড় আর স্ট্রিট লাইটের রিফ্লেকশানে রাস্তার সাইডে কি আছে, ভাল করে ঠাওর করা যাচ্ছিল না; তার মধ্যেই সে আমার পাগলামি দেখে হাসতে শুরু করলো এবং ক্লাচ আর ব্রেকের ব্যালান্স ভুল করে ডানদিকের লাইট পোস্টে ধাক্কা মারলো! মনে হল, কে যেন ছিটকে পড়ে গেল। তড়িঘড়ি গাড়ি থেকে নামলাম আমরা। "ও মাই গড!" একটি যুবতী মেয়ের বডি লাট খেয়ে পড়ে আছে; তার মানে শর্মি লাইট পোস্টে নয়, একেই ধাক্কা মেরেছে! ওর মুখটা লাইট পোস্টে ধাক্কা খেয়ে থেঁতলে গেছে এমন যে চেনাই যাচ্ছে না! ওর পার্স ও ছাতা ছিটকে অদূরেই পড়েছিল। আমি দেখার চেষ্টাও করলাম না যে কে ও! আমি জানার চেষ্টাও করলাম না যে সে বেঁচে অাছে কিনা! তখন শুধু আমি আমার স্ত্রী আর যে আসছে, তার কথাই ভেবেছি! স্বার্থপরের মত পালিয়ে এলাম শর্মিকে নিয়ে! শর্মি এভাবে চলে আসতে চায় নি। সে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল! কাঁদছিলো! আমি ওর সেফটির কথা ভেবেই কোনরকমে ওকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। আমার নিজের দিদি একজন গাইনোকলোজিস্ট। তাকে সব খুলে বললাম। সে লাইট ডোজের নার্ভের মেডিসিন দিয়ে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিল। এই সময়ে যে কোন উত্তেজনাই নাকি ওর পক্ষে খারাপ। দিদির পরামর্শ মতোই আমি কাউকে কিছু জানালাম না, এমনকি আমার মা-বাবাকেও না। ওনারা শুধু শুধু টেনশান করতেন। পরেরদিন টিভি চ্যানেলে, নিউজ পেপারে ঐ অ্যাক্সিডেন্টের খবর ফ্লাস আউট হয়েছিল। আমি বা শর্মি কেউ সেটা ফলো করলাম না। শুধু জানতে পেরেছিলাম যে মেয়েটি নাকি একজন দেহ ব্যবসায়ী ছিল। ওর হয়ে লড়াই করার কেউ ছিল না, তাই কেসটা ধামাচাপা পড়ে গেল!

শর্মির গর্ভের সন্তান লাথি মারতে শুরু করতেই সে তাকে নিয়ে নতুন স্বপ্নে মগ্ন হয়ে গেল! কিন্তু আমি কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলাম না। দেহ ব্যবসায়ী হলেও সে তো আগে মানুষ! পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও ওপরঅলাকে কি জবাব দেবো? কেন যে সেদিন নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি নি? প্রতি রাতে ঐ থেঁতলে যাওয়া মুখটা আমার স্বপ্নে ভেসে উঠতো; আতঙ্কে অামার ঘুম ভেঙে যেত! মনে হতো সে যেন আমায় ডাকছে, অামায় কিছু বলতে চাইছে। আমার দিকে আঙ্গুল তুলে বলছে, তুমি খুনী, তুমি অপরাধী, তুমি কাপুরুষ! আমি ঘেমে নেয়ে একশা হতাম। আজও নিজেকে বড্ডো দোষী মনে হয়। তাই আমি নিঃশব্দে একাজ করে চলেছি; কোন পতিতা মেয়ে যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, আমার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তার রিহ্যাবিলিয়েশানের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে। তবু যদি এতে আমার পাপের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হয়!

কথাগুলো বলতে বলতে অনির্বানের চোখের কোণে জল এসে গিয়েছিল। সে তার লাস্ট পেগটা এক নিঃশ্বাসে গলায় ঢেলে নিজের ইমোশানকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করলো। পায়েল তখন "অচেনা অতিথি" র নীলাভ সুইটের জানালা দিয়ে অকাল বর্ষনের ছবি দেখছে! নেশার ঘোরে ঠিক এমনিভাবে কতবার তার কাছে কনফেসান করেছে অনির্বান; বারবার।

"চোখের জলেও পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয় অনির্বান!"

"তবুও পায়েল, আমি তো অপরাধী!"

"কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টটা তো শর্মিলা করেছিল, তাই না?"

ইলেকট্রিক কেটলে জল গরম করতে দিল পায়েল, কফি বানাবে। যেখানেই যায় সঙ্গে নিয়ে যায় ইলেকট্রিক কেটলটাকে। ব্ল্যাক কফিই তার একমাত্র নেশা!

"হ্যাঁ। আমিও তো সমান দোষী, তাই না? হাসপাতালে নিয়ে গেলে মেয়েটি হয়তো বেঁচে যেতো! যাইনি তো! আমি তো পুলিশের কাছে কনফেস করতে পারতাম, করিনি তো!"

অনির্বান দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে থাকে। পায়েল ওর দিকে তাকিয়ে থাকে খানিকক্ষন! তারপর গরম জলে কফি গুলতে গুলতে বলে,

"তুমি শর্মিকে এখনো খুব ভালবাসো..."

"তা নয়। আসলে দীর্ঘ দশ বছর পর ও মা হচ্ছিল; আমাদের সন্তানকে নিয়ে আমার মা-বাবার অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। শর্মিলার জেল হলে সব শেষ হয়ে যেত!"

"থাক ওসব পুরানো কথা। একবছর তো হয়ে গেল! তোমার ছেলে হল; ঘটা করে তার অন্নপ্রাশনও করেছো। "ধোঁয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিয়ে বলে পায়েল,

" তাছাড়া কত নষ্ট মেয়েকে নতুন জীবন দান করেছো..."

"শুধু তোমার জন্যে কিছু করতে পারলাম না!"

কফির কাপটা টেবিলের ওপর রেখে বিছানায় অনির পাশে এসে বসে পায়েল। হাতের আঙ্গুলের পিছনটা আলতো করে বোলায় ওর ক্লিন সেভ করা গালে।

"কেন? ভালোবাসো না আমায়?"

"তুমি জানো না?"

উত্তর দেয় না পায়েল, অনির্বানের শার্টের বোতাম গুলো এক এক করে খুলতে থাকে। অনিও পায়েলের টপ খুলে ছুড়ে ফেলে বুকের ভাঁজে নাক, মুখ ঘষতে থাকে।

"একটা সত্যি কথা বলবে অনি? তুমি আমাকে ভালবাসো নাকি শুধু আমার রূপকে?"

পায়েলকে সজোরে বিছানার উপর ফেলে আদর করতে করতে বলে অনির্বান,

"জানি না, জানতেও চাই না! সেই যে ডিসেম্বর মাসে এক কুয়াশার রাতে তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে ল্যাম্পপোস্টের নীচে; ব্যাকলেশ টপ আর ব্লু জিন্স পরেছিলে। লিফ্ট চাইছিলে তুমি। রাস্তা দিয়ে সাঁ সাঁ করে গাড়ি গুলো বেরিয়ে যাচ্ছিল...মনে পড়ে?"

"হুম। শুধু তুমি গাড়ি থামিয়েছিলে। কেন?"

অনির্বানকে উল্টে দিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পায়েল।

"কি অপূর্ব দেখতে লাগছিল তোমায়! মায়াবনবিহারিনী হরিনী, গহন স্বপনসঞ্চারিনী!"

"একজন এসকর্টকে রবিঠাকুরের রচনার নায়িকার সঙ্গে তুলনা করো না প্লিজ! তাতে কবির অবমাননা হয়।"

"আমি তো তোমায় ওভাবে ভাবিনি কখনো!"

এরপর অনর্বান ও পায়েল তাদের অর্ধ সমাপ্ত শারীরিক ভালবাসাকে পরিপূর্নতা দেয়।


আয়নার সামনে গিয়ে নিজের পোষাক ঠিকঠাক করে নেয় পায়েল। অনির্বান তখনো চিৎ হয়ে শুয়ে আছে বিছানার ওপর। অায়নার ভেতর দিয়ে অনির্বানকে দেখে পায়েল।

"কি ভাবছো?"

"সেদিন হয়তো একটা গিল্টি কনসাসনেস কাজ করছিল, তাই তোমাকে গাড়িতে তুলে নিয়েছিলাম।"

"আর আজ?"

"আজ তোমাকে খুব ভালবাসি পায়েল, খুব ভালবাসি।"

মুচকি হেসে আবার ইলেকট্রিক কেটলি অন করে পায়েল।

"আবার কফি খাবে? দিনে কতবার খাও বলোতো?"

"আই লাভ ব্ল্যাক কফি! জানো তো! কি জানো না?"

"হুম। একবছর ধরেই তো দেখছি! বাট টু ব্যাড ফর হেল্থ!"

হা হা করে হেসে ওঠে পায়েল।

"হেল্থ আর আমি? মরে যাবার পর শরীর নিয়ে কোন চিন্তা থাকে নাকি?"

"মানে? হোয়াট ডু ইয়ু মীন?

অনির মুখটা শুকিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যায়।

পায়েল আবার হেসে ওঠে।

"ইয়েস আই মীন ইট!"

"নো। নট পসিবল! তুমি মজা করছো!"

"না। এটাই সত্যি।"

" কি সত্যি? তুমি কে?" অনির হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যেতে থাকে। "কি হল? চুপ করে আছো কেন? বলো!"

"অনির্বান, সত্যিই আমি মৃত, আমি এক অতৃপ্ত আত্মা!"

"অবিশ্বাস্য!"

কফিতে চুমুক দিয়ে ওয়ার্ড্রপের ড্রয়ার থেকে একটা পুরাতন নিউজ পেপার বের করে অনির দিকে ছুড়ে দেয় পায়েল।

"প্রমাণ তোমার সামনেই আছে, চেক ইট আউট!"

অনির্বান কাগজটার ওপর চোখ বোলায়। এটা তো সেই নিউজটা! ডেটটাও সেম, ঠিক এক বছর আগের। অ্যাক্সিডেন্টে যে মারা গিয়েছিল, তার ছবি আর পায়েলের চেহারা হুবহু মিলে যাচ্ছে!

এক অচেনা, অজানা ভয় তাকে গ্রাস করে! হোটেলের চেনা রুমটা অচেনা মনে হতে থাকে! মনে হতে থাকে সে যেন এক অন্য জগতে চলে এসেছে হঠাৎ করে! হঠাৎ করেই ঘরের ঠাণ্ডাটা যেন বেড়ে গেল! বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে বলে নয়, এ এক হাড় হিম করা অনুভূতি!

"ভয় পাচ্ছো কেন? আমি তো তোমার কোন ক্ষতি করিনি।"

"এতদিন আমি অশরীরির সঙ্গে প্রেম করেছি, সহবাস করেছি সেই ব্যাপারটাকেই তো অ্যাকসেপ্ট করতে পারছি না।"

অনির পাশে এসে বসে পায়েল; ওর ভয় দূর করার চেষ্টা করে।


প্রথম যেদিন পায়েলকে লিফ্ট দেয় অনির্বান, সেদিন সে বাগনানের ফ্যাকট্রি ভিজিট করতে যাচ্ছিল। ভোরবেলা মাল ডেলিভারি করার থাকলে প্রায়ই তাকে মাঝরাতে বেরিয়ে পড়তে হয়। অফিসের গাড়ি ও ড্রাইভার এই সময়ে নেয় না সে। রাতেরবেলা ফুরফুরে হাওয়ায় গাড়ি চালাতে ভীষন ভালবাসে সে! ঘটনার পর থেকেই অ্যাক্সিডেন্টের জায়গাটা এলেই সে গাড়ি থামিয়ে দিত। কখনো চুপ করে বসে কিছু ভাবতো, কখনোবা স্টিয়ারিং এ মাথা রেখে অনুশোচনায় ভুগতো। কখনো আবার গাড়িতে হেলান দিয়ে স্মোক করতো একটার পর একটা। সেদিন ঠিক ঐ জায়গাতেই পায়েল দাঁড়িয়েছিল। গাড়িতে উঠে আসতেই, তার ঠোঁটের উপর ছোট্ট তিলটা, তার চোখের গভীর চাহনি, তার উজ্জ্বল তৈলাক্ত ত্বক, বাদামী রেশমি চুল, স্কিনটাইট জামার উপর পরিস্ফুট হয়ে থাকা স্তনের বোঁটা, পারফিউমের সুগন্ধ অনির ভেতরের অ্যাডমকে জাগিয়ে দিয়েছিল! শর্মিলার সঙ্গে তার ইন্টারকোর্স হয়নি, তা প্রায় পাঁচ মাস হয়ে গেল! নিজের বেসিক ইন্সটিংক্টকে সে ঠেকায় কিভাবে?

"ক্যান আই স্পেণ্ড সামটাইম উইথ ইয়ু? সামনে কোন হোটেল আছে?"

"নিশ্চয়। একটু এগিয়েই ডানদিকে একটা রাস্তা লেকের পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে; ফাইব মিনিটস গেলেই একটা থ্রি স্টার গেস্ট হাউস আছে। 'অচেনা অতিথি' রুম নাম্বার ৩০৭ , সেকেণ্ড ফ্লোর, আমার নামেই বুক করা আছে। কেউ প্রশ্ন করলে এই কি কার্ডটা দেখালেই হবে।"

তখনো অনির্বানের কিছু মনে হয় নি। আসলে পায়েলের অতৃপ্ত আত্মা ওর বোধশক্তি বুঝি কেড়ে নিয়েছিল। প্রতিবারই অনি আগে চলে আসে। পায়েলের নির্দেশ মত আলো না জ্বালিয়ে ওর জন্যে ওয়েট করে। দরজা ভেজানোই থাকে। পায়েল এসে ওর পছন্দের স্নিগ্ধ নীল আলো জ্বালায়। প্রথম রাতে অনি পায়েলকে ইচ্ছে থাকলেও টাচ পর্য্যন্ত করে নি। মন দিয়ে শুনেছিল তার করুণ ইতিহাস; তার পতিতা মায়ের স্ট্রাগেলের কথা, তার দালাল বাপের অত্যাচারের কথা। সে এসকর্ট হতে চায় নি। চাকরী করতে চেয়েছিল। কিন্তু তার মায়ের যৌন রোগের চিকিৎসার খরচ আর তার শয়তান বাপের হুশিয়ারি তাকে বাধ্য করলো ভদ্রলোকের মুখোশ পরা লোভাতুর পশুগুলোর সামনে মীটলোফের মত নিজেকে তুলে ধরতে। পায়েলের লড়াইয়ের ইতিহাস, পায়েলের প্রেম, পায়েলের ফুলের মত মন অনির্বানকে বদলে দিল।

প্রতিশোধ নিতেই এসেছিল পায়েল ; প্রেমের জালে জড়িয়েছিল অনির্বানকে। অনায়াসে মেরে ফেলতে পারতো; কিন্তু যে শিশু এখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি, তাকে অকালে পিতৃহারা করার মতো পাপ কাজ সে করতে পারলো না। প্রেতাত্মা বলেই কি তাকে নৃশংস হতে হবে? শর্মিলাকে ভুলে তার প্রেমে মজেছে অনির্বান। অনির্বানকে আর আগের মতো কাছে না পেয়ে শর্মিলা বড়োই কাতর। শর্মিলা তো শাস্তি পেল! এই কি যথেষ্ট নয়? তারপর অনির্বান যেদিন তার অসুস্থ মা'কে উদ্ধার করে নিজের আশ্রমে নিয়ে গেল, সেদিন সাঁইত্রিশ বছরের এই ধনী ব্যবসায়ীকে পায়েল মনে-প্রাণে ভালো না বেসে পারলো না। আজ সে অনিকে সত্যি ভালবাসে, তাকে ছেড়ে চলে যাবার কথা ভাবলেও কষ্ট হয়! তবুও যে চলে যেতেই হবে! তাদের জগতেরও কিছু নিয়ম কানুন আছে, যা সে মানতে বাধ্য। এক বছর সময় সে চেয়ে নিয়েছিল। আজ সেই দিন, যেদিন তার অশরীরি আত্মাকে পৃথিবী ত্যাগ করে চলে যেতে হবে। ভেবেই চোখে জল চলে এল তার, বৃষ্টির ঝাঁট সে জল ধুয়ে দিয়ে গেল! মন শক্ত করলো পায়েল।

"এবার আমায় যেতে হবে, অনি।"

"হুম। জানি, ভোর হলে তোমরা আর থাকতে পারো না।

পায়েলের স্পর্শে, পায়েলের কথায় জাদু আছে; অনির্বানের আতঙ্ক পুরোপুরি ভ্যানিস হয়ে গিয়েছে। পায়েল আবার চুম্বকের মতো তাকে টানছে!

"আচ্ছা, তুমি জীবিত নও, প্রেতাত্মা জেনেও আমার তোমায় আর় ভয় লাগছে না কেন? কেন তোমাকে এখনও ভালবাসতে চাইছে এই অবুঝ মনটা?"

"তোমার মনটাই তো সুন্দর অনি, আমি যে কল গার্ল প্রথম দিনই তো জেনেছিলে তুমি, তাও তো আমায় ঘৃনা করো নি!"

"আমি সামনের মাসে থাকছি না। বিদেশে বিজনেস ট্যুর আছে। ফিরে এসে মীট করবো। মোবাইল নাম্বার দাও নি বলে কতোবার রাগ করেছি তোমার ওপর, তখন তো জানতাম না...এনি ওয়ে আমি তোমাকে খুব মিস করবো। নতুন বছরে আবার দেখা হবে!"

"না! আমাদের আর দেখা হবে না! আমি আর আসবো না!"

"নো। প্লিজ ডোন্ট সে লাইক দিস পায়েল। আমি তোমাকে ছাড়া কি ভাবে থাকবো?"

অনির মন খারাপ হয়ে যায়! সে পাথরের মত বসে থাকে। পায়েল তার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে।

"আমার কথা মন দিয়ে শোন। এবার তোমাকে শর্মিলার কাছে ফিরে যেতে হবে। ও তোমার স্ত্রী, ওকে আবার ভালবাসতে হবে।"

"আর তুমি?"

"আমি ফিরে যাব আমাদের জগতে, তোমাদের জগত ছেড়ে ।"

"ভাবতে পারছি না যে আর কখনো তোমায় দেখতে পাবো না, স্পর্শ করতে পারবো না, আদর করতে পারবো না। আমায় তুমি তোমার দোষী বানিয়ে চলে যেতে চাইছো?"

"কেন অমন করে বলছো? তুমি আমাকে প্রেম দিয়েছো, ভালবাসা দিয়েছো, আমার মা'কে আশ্রয় দিয়েছো, কোন মানুষ কি কখনো আমায় এসব দিতে পেরেছিলো? আমি তোমার কাছে আর কিছুই দাবী করতে পারি না, অনি।"

"তুমি তো আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে এসেছিলে, তবে আমায় মারলে না কেন?"

"প্রেতাত্মা, অশরীরি মানেই কি খারাপ হয়? সুপারন্যাচারাল শক্তি বিজ্ঞানের ব়্যাডারে ধরা পড়ে না ঠিকই, তা বলে তারা অনুভূতি শূন্য তা তো নয়। শর্মিলার একটা ভুলের জন্য তোমার ছেলেকে পিতৃহারা করবো, এতটা নিষ্ঠুর হলে ঈশ্বরের আদালতে আমাকেও যে তার জবাবদিহি করতে হবে।"

"বাট পায়েল, তুমি আমার জীবনের অঙ্গ, কি করে অস্বীকার করবো তোমাকে?" তুমি আমায় কি শাস্তি দিয়েই যাচ্ছো না?"

"যদি বলি, আমি তোমার ভালবাসাকে সম্মানিত করতেই চলে যাচ্ছি! তোমায় পুরস্কৃত করতেই চলে যাচ্ছি।"

"মানে?"

"এখন মুক্তি লাভ না করলে আবার জন্মাবো কি করে?"

"তুমি আবার আসবে?"

"ঈশ্বর যদি কৃপা করেন...। আমি সেই রূপেই ফিরে আসতে চাই, যে রূপে একজন পুরুষ মানুষ তার জীবন দিয়ে আমায় ভালবাসবে।"

"তখন আমি কি তোমায় আর চিনতে পারবো?"

মুচকি হাসে পায়েল। শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে তার অনিকে, চোখে জল অথচ মুখের হাসিটা ধরে রেখে বিদায় নেয়। সত্যিই অনির্বান আর কোনদিন পায়েলকে স্ট্রীট লাইটের নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নি।


বছর দেড়েক পরে শর্মিলা অাবার মা হল। এবার সে একটি ফুটফুটে, সুন্দর কন্যা সন্তানের জন্ম দিল। অনির্বান যেন হাতে চাঁদ পেল; এত খুশি সে রাখবে কোথায়? সে যে তার কাঙ্খিত বারবি ডলকে পেয়ে গেছে আজ! ধীরে ধীরে পায়েলকে হারানোর কষ্ট বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেল! তবুও কখনো কুয়াশাছন্ন গভীর, নির্জন রাতে সেই জায়গাটা দিয়ে ক্রস করলে তার লোম খাড়া হয়ে যেত এই ভেবে যে সে এক অশরীরি আত্মার সঙ্গে প্রেম করেছে! ভয় ও ভালোবাসা মিশ্রিত সে এক অদ্ভূত অনুভূতি! 'সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়।' অনি-শর্মির ছেলে আয়ুস্মানের বয়স এখন সাত আর মেয়ে তিথি সবে পাঁচে পড়ল। তার বার্থডে উপলক্ষে শপিং করতে মলে হাজির সকলে। মেয়ে জেদ ধরলো, তার একটা ইলেকট্রিক কেটল বার্থডে গিফ্ট হিসাবে চাই।

"কেন? এত খেলনা থাকতে ইলেকট্রিক কেটল!"

"হ্যাঁ পাপা। মাম্মাম আমাকে কিছুতেই ব্ল্যাক কফি বানিয়ে দেয় না। আমি নিজেই বানিয়ে নেব, তাই। আই লাভ ব্ল্যাক কফি।"

"ব্ল্যাক কফি!"

অনির্বান অবাক হয়ে নিজের মেয়ের দিকে তাকালো। ভাল করে দেখলো তাকে। এ কোন তিথি? এ কি তারই বারবি ডল? পাঁচ বছরের এই ছোট্ট মেয়েটা যে তার কাছে চেনা দিয়েও আজ অচেনা! তিথি তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে! সেই চাহনি! ঠোঁটের ওপর কালো তিলটা সেই একই রকম মিষ্টি দেখতে লাগছে! সেই রেশমি চুল! তিথিও টপ আর ব্লু জিন্স পরে কোমরে হাত দিয়ে একই ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে! বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে একটা মুখ আবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। পায়েল! পায়েল ফিরে এসেছে তার কাছে, তারই মেয়ে হয়ে!

"আমি সেই রূপেই ফিরে আসতে চাই, যে রূপে একজন পুরুষ মানুষ তার জীবন দিয়ে আমায় ভালবাসবে।" পায়েলের শেষ কথাটা তার কাণে ইকো হতে থাকে! তিথিকে কোলে তুলে নেয় অনির্বান। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয়।

"কিনে দেব তোকে তোর ফেবারিট বার্থডে গিফ্ট, ইলেকট্রিক কেটল। তুই তো আমার জীবন, এতদিন তোকে কি করে ভুলেছিলাম সোনা? সত্যিই তো তোকে আমি নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালবাসি। সমস্ত ভয়কে জয় করে শুধুই ভালবাসি! তোকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসতে পারি না যে!" তিথি তেমনটাই মিষ্টি হেসে, তেমনি ভাবেই তার বাবার দিকে তাকিয়ে, যেমন করে পায়েল বুকভরা ভালবাসা নিয়ে অনির দিকে তাকিয়ে থাকতো! অনির্বান তার জীবনে এত খুশি বুঝি আর কখনো পায় নি! সেদিনের সেই অচেনা অতিথি'কে হারিয়ে এই ছোট্ট অচেনা তিথি'কে যে এমনি ভাবে ফিরে পাবে আবার তার বুকের মাঝে তা কি সে স্বপ্নেও ভেবেছিল???

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.