কাপ-প্লেট আর বন্ধুত্ব

বৃষ্টি আসছে, মৌ কাপটা প্লেটের উপরে রেখে জানলা বন্ধ করতে গেল। কাপের তো প্লেটের সাথে অনেক দিনের বন্ধুত্ব। কাপ প্লেটকে বলল -- খুব মজা না তোর, যখন তোকে সুন্দর নেলপলিশ, নেল আর্ট করা নখে হাতল ধরে আর তোকে লিপস্টিক ঠোঁটে চুমুক দেয় আমার গা জ্বলে যায়।

~কেন রে তোর কিসের সমস্যা। আমি তো নারী, ধাত্রী। কাপ। আমার তো মৌ-এর ছোয়া ভালই লাগে।

-নেকি। তুই ওর সাথে থাকলে আমার সাথে গল্প করবি কখন। আমি তো প্লেট। আমার সাথে তোর স্পর্শ না হলে ঠিক ভালই লাগে না। আজকের সিরিয়ালটায় কি হবে সেটা নিয়ে আমায় বুঝিয়ে দিবি নাহ! মৌ তো এই সিরিয়ালটাই টিভিতে দেখতে দেখতে চা খায়। তাও আবার যদি...যা তুলে নিল কাপটা।

মৌ কাপে চুমুক দিল। সিরিয়ালটা আজ আর চালালো না। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কাঁচের বাইরে এই সময় শহরটা দেখতে বেশ লাগে। রণবীর বেশ উঁচুতে ফ্ল্যাটটা নিয়েছে। মৌ চাকরি করত স্কুলে কিন্তু এখন মা হতে চায় তাই স্ট্রিক্ট ডায়েটের ভিতরে রয়েছে। আগে দু’বার মিসক্যারেজ হয়ে গেছে। কাপ বলে উঠল...

~ভাগ্যিস চা খাওয়াটা বারণ করে দেয়নি, তাহলে আমাদের সিরিয়ালটা মিস হয়ে যেত। ঐ তো রান্না ঘরে ঝুলে থাকতে হত।

রণবীর বলেছিল একা থাকে একটা ল্যাব্রাডর নিয়ে আসবে কিন্তু মৌ কুকুর ভয় পায়। শেষে সময় কাটানোর জন্য আসে অ্যাকোরিয়াম। বলতে গেলে মৌ-এর ভালবাসা ঐ অ্যাকোরিয়াম। কত রঙিন মাছ। তাদের উপরে ওঠা, নিচে নামা। বুদবুদ। কেয়ারটেকারের ছেলেটা কেঁচো এনে দেয়। মৌ কেঁচো দেয় রোজ। মৌ-এর বেশ কথা বলে সময় কাটে মাছেদের সাথে। মাছেরাও কথা বলে কিন্তু মৌ শুনতে পায় না। তবু তাদের চাল চলনের তো ভাষা আছে। মৌ সেটাই বুঝে নেয়। আসলে মৌ নিজেও তো গভীর জলের মাছ।

***

চা শেষ করে উঠে গিয়ে দাঁড়ালো জানলার কাছে। মৌ আজ খুব ভিজল। কেন জানি না আজ তার পুরোনো প্রেম খুব মনে পড়ে যাচ্ছে। কাপ তখন প্লেটের সাথে দুঃখ করছে –

~আজ সিরিয়ালটা ইন্টারেস্টিং জায়গায় ছিল, কে যে খাবারে বিষটা মেশালো আজই সেটা দেখাবে কিন্তু চালালোই না। সে বৃষ্টি ভিজছে।

-তুই ওসব বুঝবি না, মাঝে মাঝে নিজেকেও সময় দিতে হয়।

~তার মানে? তুই কি আমার সাথে কথা বলতে চাইছিস না।

-সেটা কখন বললাম! আমি বললাম মৌ-কে নিজের সাথে একটু সময় কাটাতে দে।

~কেন ও টিভিটা চালিয়ে দিয়ে গিয়ে তো জানলার ধারে কেন ছাদে গিয়ে ভিজতে পারত।

-চুপ কর। দেখ মেয়েটা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

~হ্যাঁ রে। ওর আবার সেই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়েছে। রণবীর কতবার বুঝিয়েছে কিন্তু ও শুনতেই চায়নি।

-ওরে মনের থেকে বন্ধুত্ব হলে একটা প্রেম, একটা ভালবাসা, একটা কাছে পাওয়া থেকেই যায়, আর সেই পুরুষ যখন ছেড়ে চলে যায় চিরদিনের মতো তাকে তো মনে পড়বেই। তাই তো রণবীর ওকে এই অ্যাকোরিয়াম কিনে দিয়েছে। দেখিস না ঐ গোল্ডফিসটাকে বাবাই... বাবাই বলে কেমন করে ডাকে। ঐ মাছের মধ্যে দিয়ে ওর বাবাই-কে খুঁজে পায়।

~ঠিক বলেছিস, এই যেমন ধর আমি তোর সাথে কত ঝগড়া করি, আদর করি, ডাকি....ভালোবাসি

-কি বললি ভালোবাসিস!! মিথ্যে.. আমায় ভালবাসলে কখনও চামচের সাথে অত কথা বলতে পারতিস?

~অই তুই বুঝতে পারছিস না। কি হয়েছে তোর! চামচের সাথে আমার বন্ধুত্ব নেই, ওকে শুধু তেল দিই যাতে কাপের গায়ে আমায় আস্তে আঘাত করে। আমার বুঝি লাগে না। বুঝলি প্লেটু...

-মুমুয়া, বুঝলাম।

~অ্যাই তুই আমায় চুমু খেলি কেন? ইচ্ছে হল তাই।

-আমি কি তোর রণবীর?

~না, তুই আমার বাবাই। শোন ভালোবাসার একটা সীমাবদ্ধতা আছে কিন্তু বন্ধুত্বের কোনও সীমা নেই। বন্ধুত্ব চিরকালীন। তুই আমায় ছেড়ে যাবি না তো!

-সে তো একদিন সবাইকে চলে যেতেই হবে ....বলতে বলতে বেল বাজল। রণবীর আজ জলদি ফিরেছে। আজ আর ডিংক করেনি। আজ বাড়িতেই মৌ-এর সাথে বসবে। মৌ এসব পছন্দই করে না। মৌ খালি বাবাইকে ডাকে। মৌ বাবাইকে চায়, ভীষণভাবে চায়। মৌ তাই রণবীরের উষ্ণতা, টাকা, স্ট্যাটাস আর কিছুতেই আনন্দ প্রকাশ করে না। আজও তাই করল, মৌ রণবীরের সন্ধ্যাবাসরের সব আয়োজন করে দিয়ে ভিতরের ঘরে চলে গেল।

(২)

পরের দিন সকালে…

-আজ হাওয়াটা গরম, মেঘ করেছে, বৃষ্টি আসবে...

~কোথায় বাইরে তো বেশ নীল আকাশ।

-ধুর তুই কিছু বুঝিস না। রণবীরের সাথে মৌ-এর এক পশলা ঝগড়া হওয়ার চ্যান্স আছে।

~না। হবে না। মৌ ওরকম না। ও চুপ করে থাকবে, রণ অফিসে বেরিয়ে গেলে কাঁদবে।

-আরে রণবীর বলতে ছাড়বে নাকি।

বলতে বলতেই বর্ষা ভেজা সকালের কাপে আদা দিয়ে চা সামনে এগিয়ে দিল রণবীরকে। রণ চুপ করে নিউজ পেপারটা পড়ছে। ভালভাবেই মৌ-কে বলল যে সে নয় একটু ডিংক করে তাতে মৌ-এর এতো রাগের কী আছে!! মৌ জানায় নেশা রোজ করার কি দরকার...ব্যস রণবীরের রাগ বেড়ে যায়। কিছু কটু কথা বলে, সিগারেট ধরায়। উল্টে মৌ যে চা বারে বারে খায়, এই যে আদা দিয়ে চা বানিয়েছে তার খোটা দেয়। মৌ কিছু না বলেই চলে যায় নিজের ঘরে। রণবীরও বেরিয়ে যায় অফিসে।

***

বেলা হয়েছে। পেয়ালায় চা ঢেলেছে। নিজের আঙুল বোলাচ্ছে কাপের গায়ে, বাইরের আকাশ দেখে উদাসী মনে কেন জানি না ময়ূর ডেকে উঠেছে। সেই রোম্যান্টিকতা দেখে প্লেটের প্রচন্ড রাগ হল। আর কাপ তো প্লেটের রাগ দেখে হেসেই কুটোপাটি। অনন্ত চেতনার বৃহৎ আমি কে তা খুঁজতে খুঁজতে মৌ অগোছালো মন নিয়ে উদাসী দূরের মেঘ দেখছিল। প্রকৃতির থেকে কবিতা সে চুরি করবেই। হঠাৎ দৃষ্টি গেল অ্যাকোরিয়ামে। তার সাধের গোল্ডফিসটা উল্টো হয়ে ভাসছে। মাছগুলো তার সন্তানের মতো, আর এটা তো তার বাবাই, মারা গেল কি করে! অ্যাকোরিয়ামের ঢাকনা খুলে অবাক ভিতরে সিগারেট ভাসছে। মৌ নিজে হাতে এসব পরিস্কার করে...তাও রণ এমন করছে কেন!! রণবীর আসলে কি চায়...মদ খেয়ে ওর কিছু ঠিক থাকে না।

***

মৌ বুঝতে পারে হাতের নখ বড় হলে নখ কাটতে হয়, আঙুল নয়। তেমনি সম্পর্কে কিছু ভুল বোঝাবুঝি হলে ভুল ভাঙতে হয় সম্পর্ক নয়। এই ভাবনা সে বোঝে আর রণ কেন বোঝে না। এতটাই কর্পোরেট হয়ে যাচ্ছে, এমন তো ছিল না আগে। যখন প্রেম করত, পুরো অন্য ছেলে ছিল। এখন অজানা-অচেনা-অবুঝ শুধু নেশা তার বন্ধু।

প্লেট বলে কাপকে আমাদের সময় ফুড়িয়ে আসছে। এই ছেলে-মেয়ে দুটো একদিন ঝগড়া করবে, করতে করতে আমাদের ভেঙে ফেলবে।

~না। আমাদের ভাঙবে কেন! ওরা তো মিটিয়ে নেবে।

-সে নেবে তা মেটানোর আগে তুলকালাম করবে। রাগ কমাতে আমাদের বন্ধুত্বের উপরেই আঘাত আনবে।

~কে জানে...কি হবে।

-আমার বাবা কাকা এই ভাবে মরে ছিল। ঝগড়া করতে করতে মালিক ভেঙে দিয়েছিল টি-সেট।

~চুপ কর। আমার এই মরা, বিচ্ছেদ এসব শুনতে একদম ভালো লাগে না।

-আমরা যখন এক সাথে থাকব না, মিস করবি? আমায় তোর সত্যিই মনে পড়বে?

~এ সব বলিস না। আমাদের কেউ কোনও দিন, কোনও বাঁধাই আলাদা করতে পারবে না।

(৩)

-জানিস ফ্যাক্ট্রিতে যখন বানিয়েছিল, ভাবিনি তোর মতো বন্ধুর সাথে দেখা হবে।

~মাছটা মারা যাওয়ায় মৌ বেরিয়েছে। রণবীরকে ফোন করে গাড়ি পাঠাতেও বলেনি। নিশ্চয়ই নতুন কি সব ক্যাব বুক করা যায় তাই নিয়েছে।

-তারপর তোর সাথে দেখা হল বাক্স প্যাকিং করার সময়। তুই মুখ গম্ভীর করে আমায় দেখছিলি। ভয় পাচ্ছিলি। আমি কিন্তু হেসেছিলাম।

~মৌ বোধহয় আজ আরও সুন্দর সুন্দর মাছ কিনে নিয়ে আসবে। আর হয়তো আমাদের পাত্তাও দেবে না। চা খাবে কম মাছ দেখবে বেশি।

-এই জন্য ভালো লাগে না। আমি তোকে কখন থেকে বলে যাচ্ছি আমাদের কথা, তুই তোর ভাবনা-ভয়ে আটকে আছিস।

~না না আমি বলছিলাম তোকে, আর কাকে বলব বল। রাগ করে না বাবু...

গেট খুলে মৌ ঢুকল। বাবাইয়ের শোকে মাছ আর নতুন করে কেনেনি মনে হয়। ছোট্ট বোতল ব্যাগ থেকে বের করে টেবিলে রাখল। আজ রণবীর জলদি বাড়ি এসেছে। নিজেই সন্ধ্যাবেলায় চা খেতে চাইল। মৌ দিল। কাপ-প্লেট আজ অবাক। মৌ ভুল করে ওর প্লেটটা রণবীরকে দিল, রণবীরের কাপটায় নিজে চা নিল। রণবীর আবহাওয়া হাল্কা করার জন্য বলল “ম্যাডামের রাগ দেখছি কমেনি। কাপ অদল-বদল করেছেন দেখছি।” মৌ বলল “ভুলগুলো নিজেদের বুঝে সামলে নিতে হয়, পারলে সম্পর্কের ভিতর ভুলগুলো সামলে নিতে শেখো। যাও গিয়ে ঐ বোতলের লিকিউডটা আমার অ্যাকোরিয়ামে ঢেলে দাও...” রণ জানতে চায় কি আছে বোতলে, মৌ উত্তর দেয় না। জলে ঢালতে নীল হয়ে যায় জল। রণ বলে বোতলে কী বিষ ছিল, মৌ জানায় ওষুধ। কাল সে জলে সিগারেট ফেলায় তার প্রিয় মাছটি মারা গেছে। তাই অন্য মাছের যাতে ইনফেকশন না হয় তাই...। রণ চুপ করে থাকার পর মৌ-কে জড়িয়ে ধরে। বলে সে অফিসের চাপে হারিয়ে গেছে। সে নিজেকে পাল্টাবে। বেরিয়ে আসবে ওদের নেশা-পার্টি-সেলফি ঐ সব স্ট্যাটাসের ভিতর থেকে, সে আবার আগের মতো রণু হয়ে উঠবে।

-যাক বাঁচা গেল। এদের মতির পরিবর্তন হলে আমরা দু’জন সুখে থাকতে পারব।

~না রে এটা সুখ নয়। কিছু একটা রণদীপের মতলব রয়েছে।

-সেটা ঠিক। আমরা তো কোনও দিন এত সুন্দর করে কথা বলতে দেখিনি। যখনই বলেছে তারপর রণদীপ কিছু একটা নিজের চাহিদার কথা প্রকাশ করেছে। সেবার সোনার গয়না রেখে লোন নিয়ে গাড়ি কিনল। অদ্ভুত।

~দেখ আজ রাতে ডিনারের টেবিলে কি বলে।

-হুম। শুনতে হবে কি বলছে আজ।

না, সেদিন রাতে আর রণদীপ কোনও আলাদা প্রস্তাব দিল না। বর্ষার রাত। ঠান্ডা ভাব। একে অপরের উষ্ণতাকেই নিজেদের করে নিল। ভেসে চলল অনন্ত সৌন্দর্যে। রণদীপ কথায় কথায় মৌ-এর কানের চুল সরিয়ে দিতে দিতে বলল “জ্যোৎস্না রাতে নীল জলরাশি আর অনন্ত আকাশের শোভা দেখছ! তোমাকে আজ তেমন রাতের সুন্দর পরির মতো লাগছে।” মৌ অভিভূত হল। কাপ, প্লেটকে বলল “কোনও দিন আমাকে ভালবেসে এমন করে ভালবাসার নিবেদন তো করতে পারতিস। আমার যে কি ভালো লাগছে।” প্লেট বলল “ভালবাসলে ভালইবাসতাম অনন্ত সুখে নিজের মনে করে। স্বার্থ প্রকাশ করতাম না। কাল সকালটা খালি হতে দে। দেখবি রণ মনে মনে কিছু একটা পাকাচ্ছে।”

(৪)

আজ রণ সকালে উঠে চা করেছে। মৌ অবাক। তবু খুশি হয়ে রণ-কে আদর করল। মর্নিং উডস। কিন্তু সুখ যে ক্ষণস্থায়ী। কথায় কথায় চা খেতে খেতেই রণবীর জানালো কানাডায় একটা ভাল কাজের সুযোগ এসেছে। আগের বস তাকে তার টিমে চাইছে। তাই সে এখানের চাকরি ছেড়ে ওখানে চলে যাবে। কয়েক বছর পর মৌ-কে নিয়ে যাবে। মৌ চুপ করে শুনল। মনে মনে বুঝল যে সে ভুল করে ফেলেছে। চায়ের কাপটা ভাঙতে যাচ্ছিল মৌ...কিন্তু নিজেকে সামলে নিল। মৌ বোঝালো যে এখানে তাদের যা রয়েছে তা যথেষ্ট। আর নতুন করে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য সে চায় না। সে এই যা আছে তাকেই ঠিক করে রাখতে চায়। এই শহর জুড়ে এত স্মৃতি, অলিতে-গলিতে কত প্রেম। আনন্দ। উদযাপন। সুখ-দুঃখ। মৌ কথায় কথায় বলল এই কাপ-প্লেটও সে নিউমার্কেট থেকে সেকেন্ড ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে কিনেছিল, আরও আরও অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু...রণবীর অফিসের জন্য রেডি চলে গেল। মানে রণ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। মৌ-এর টিপিক্যাল বাঙালি মেন্টালিতে পাত্তা দিল না।

-এবার আমাদের কি হবে। হয় বিক্রি করে দেবে নয়তো এখানে ধুলো ময়লা মাকড়শার জালে ভূত হয়ে যাব।

~না রে। দেখ না, ওদের যাওয়া হবে না। আর গেলে তো রণ যাবে, মৌ তো থাকবে। আর আমাদের কি মৌ ভুলবে, সাথে করে নিয়ে যাবে কা-না-ডা....

-পোড়ামুখী তোর মুখে স্ন্যাক্স বিস্কুট পড়ুক।

মাঝে কিছুদিন কেটে গেল...মৌ মনস্থির করতে শুরু করেছে, রণ ভিসা পাসপোর্ট রেডি করছে। মৌ-কে সাথে নিয়েই যাবে বলে ঠিক করেছে। ফ্ল্যাটও বেচে দেবে। কাপ-প্লেটের মনে দুঃখ। একদিন...সকালে চা খেতে খেতে মৌ তার রণকে উইশ করল। বলল কি যুগ এলো, ফেবু-হোয়াটস অ্যাপ খুললেই উইশ আসছে। অথচ তুমি আবার ডিংক্সের নেশায় কাল রাতে আমাকে ভুলেই গেলে। রণ উঠে এসে হাগ করল। উইশ করল। তখনও মুখ দিয়ে দামী মদের গন্ধ বের হচ্ছে। সেদিন মৌ-কে রেডি হয়ে থাকতে বলল, রাতে বাইরে ডিনার করবে। মৌ-এর খুব আনন্দের দিন। সুখ। সারাদিন গুণ গুণ করল রবি। কতবার ভেবেছিনু..., এমনও দিনে তারে বলা যায়..., ভালবাসি ভালবাসি... আজ মৌ-এর রবি ঠাকুরে পেয়েছে। সুন্দর করে স্নান করল। চুলে কন্ডিশনার দিল। রণ যে ড্রেস ভালবাসে তা গুছিয়ে রাখল সামনে। সেন্ট ওয়ালা মোমবাতি দিয়ে সাজালো সারা বাড়ি। কিন্তু বিবাহ বার্ষিকীতে রণবীর অফিস থেকে অনেক রাতে ফিরল। তখন যে অবস্থায় রণ ছিল, সে অবস্থায় নতুন করে আনন্দ করা যায় না।

~একদম ঠিক করেনি।

-ছেলেরা একটু আধটু ডিংক করে।

~কি বলছিস তুই!! ও মৌ-কে একটুও ভালবাসে না।

-ভালবাসে বলেই তো আরও ভাল সুযোগ খুঁজছে জীবনের।

~হতে পারে না। যে নিজের বিয়ের দিনটা ভুলে যায়।

-না রে, দেখ আজ কি করবে...কিছু একটা সারপ্রাইজ মৌ-কে দেবেই।

পরের দিন সকালে রণবীর চা করেছিল, মৌ-কে বুঝিয়েছিল। সামনে কানাডা যাওয়ার ফ্লাইটের টিকিটও রেখেছিল। কিন্তু মৌ প্রচন্ড রেগে গেল। সে তার প্রিয় চায়ের কাপ-প্লেট, টেবিলের যাবতীয় সব কিছুই ছুড়ে ফেলে দিল।

-তোর খুব লেগেছে।

~না তেমন না হাতটা ভেঙেছে।

-আর তো কেউ জোড়াও লাগাবে না।

~তোকে তো দু-টুকরো করে দিল।

-ঠিক হয়ে যাবি। দেখ না সময় আমাদের ঠিক করে দেবে।

~শোন ডাস্টবিনে শুয়ে আর প্রেম দেখাস না। দোহাই তোকে। চুপ করবি। আমরা ফিনিসড। আমাদের সুখের দিন শেষ। আর হয়তো দেখাও হবে না। বন্ধু খুব ভাল থাকিস।

মৌ নিজেই ভাঙা কাপ-প্লেটকে ডাস্টবিনে ফেলেছে। নিজের মনটাকেও ফেলে দিয়েছে এই সমাজের লোভ-লালসা-টাকার কাছে। বুঝে গেছে তার আর মানসিক সুখ আসবে না। এখন থেকে সেও টাকা দিয়ে সুখ কিনবে। নিচে কেয়ারটেকারের ছোট ছেলেটাকে ডেকে অ্যাকোরিয়ামটা দিয়ে দিল। ছেলেটি মাঝে মাঝে আস্ত। মৌ-এর সন্তান নেই তাই ভালবাসত ছেলেটিকে। ছেলেটি মাছগুলোর খেলা করা দেখে খুব আনন্দ পেত। চলে তো যেতেই হবে তাই দিয়ে দিল। যাওয়ার আগে বলল “ময়লার প্লাস্টিকটা নিয়ে যাতো ময়লার ভ্যাটে ফেলে দিবি।”

মৌমিতা ও রণবীর ব্যানার্জী আজ বাইরে চলে যাওয়ার দিন। নিচে পার্কিং-এ যখন এলো ছেলেটি ছুটে এলো। বলল - “চলে যাচ্ছ। দেখ তোমার অ্যাকোরিয়ামটা কি সুন্দর করে রেখেছি।” মৌ তাকাতেই দেখল অ্যাকোরিয়ামের পাশে ভাঙা কাপটাতে মানিপ্ল্যান্ট রেখেছে। প্লেটটা পিছনে দিয়ে কি সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল “ঐ দেখ আমিও মানিপ্ল্যান্ট লাগিয়েছি। অনেক মানি হবে, আমিও বড় হয়ে হুশ করে উড়ে তোমার কাছে চলে যাব...আমায় গান, গল্প শোনাবে তো..”

কাপ বলে উঠল – মরণ। প্লেটটা বলল – তুই আর পাল্টালি না...

========================================================

bengali@pratilipi.com
080 41710149
সোশাল মিডিয়াতে আমাদের ফলো করুন
     

আমাদের সম্পর্কে
আমাদের সাথে কাজ করুন
গোপনীয়তা নীতি
পরিষেবার শর্ত
© 2017 Nasadiya Tech. Pvt. Ltd.